বালিতে বিদেশ দর্শন – পর্ব ২

পেংলিপুরান গ্রাম

পেংলিপুরান

কীন্তামণি থেকে আমাদের প্রথমে যাওয়ার কথা ছিল লেম্পুয়াং মন্দির। কিন্তু ওখানে যাওয়ার জন্য উঁচু নীচু পথে বেশ কিছুটা হাঁটতে হবে জেনে আমরা পিছিয়ে এলাম। আমার এবং আমার সহধর্মিণীর কোমর তার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি দিলো না। তার ওপর, ওখানের যে গেট টিকে স্বর্গের দরজা বলা হয় সেটির কাছে যাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অত সময় এবং কোমরের সামর্থ্য কোথায় আমাদের? তাছাড়া এত কম বয়সে স্বর্গের দরজা দেখবই বা কেন? অতএব রুট বদল করে আমরা দ্বিতীয়কে প্রথমে আনলাম। চলে গেলাম পেংলিপুরান গ্রামে। সাতশ’ বছরের পুরনো এই গ্রামটিকে ইউনেসকো পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রামের তকমা দিয়েছে। বাড়ি গুলোর সত্যিই কী অপূর্ব বিন্যাস! সাতশ’ বছর আগেও এত প্ল্যান করে বাড়ি গুলো তৈরি হয়েছিল? আর কিছু থাক আর নাই থাক, সন্দেহ প্রবণ মন আছে আমাদের। এসব বিশ্বাস করব কেন? গ্রামের সমান্তরাল এবং সৎ মানুষের শিরদাঁড়ার মতো সোজা রাস্তা গুলোর মাঝে একটানা বাড়ি গুলো। মাঝে মাঝে কানেকটিং রোড দুটো সমান্তরাল রাস্তাকে মইয়ের পাদানির মতো করে যুক্ত করেছে। প্রত্যেক কানেকটিং রোডের শুরুতে একটা ছোট ছাউনি দেওয়া গেট। অনেক বাড়িতে একটা করে ছোট্ট দোকান। বেশির ভাগই ওখানে তৈরি হওয়া জিনিস পত্রের পসরা সাজিয়েছে। কিছু লোকাল ফলের দোকানও ছিল। ঘুরে দেখার সময় হঠাৎই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নেমে গেল। একটা কানেকটিং রোডের গেটের ছাউনির নীচে আমরা তিনজনে দাঁড়ালাম। হঠাৎ ভেতর থেকে আমাদের কেউ ডাকল—

“প্লিজ কাম ইনসাইদ। সিত হিয়ার।”

আমাদের নিজের দোকানে ডেকে এক মধ্যবয়সী তিনটে টুল বাড়িয়ে দিলেন। যাচ্চলে! এ আবার কী অসভ্যতা? আমরা তো বৃষ্টির সময় দোকানে কেউ ঢুকলে হয় তাকে জিনিস কিনতে বাধ্য করাই না হলে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার সভ্যতা দেখাই। অনভ্যস্ত মন ভয় পাচ্ছিল। না জানি, কী কিনতে বলবে! না, কোনো কিছু কেনার হুকুম ছিল না। ছিল শুধুই আতিথেয়তা। আমরাই বরং ইতস্তত করে একটা ওদের নিজের হাতে তৈরি টুপি কিনলাম। কৃতজ্ঞতায় নাকি অভ্যাসের বশে জানি না।

গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসে আমরা চলে এলাম এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে মেঘের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আগুং আগ্নেয়গিরি। আমরা কীন্তামণিতে যেদিক থেকে আগুং দেখেছিলাম, এবারে তার উল্টোদিকে চলে এলাম। জায়গাটা সবে পার্ক হিসাবে মাথা চাড়া দিচ্ছে। প্রচুর কনস্ট্রাকশনের কাজ হচ্ছে। ওখানেও সেই দুহাতে ঠেলে সরানো গেট আছে। (আসলে এই গেটগুলো সবই লেম্পুয়াংয়ের স্বর্গের দরজার প্রতিরূপ।) আছে ট্রি প্লাটফর্ম। দূরে সাদা মেঘের ভেলার মাঝে আগুং কখনও বেরুচ্ছে, কখনও হারিয়ে যাচ্ছে দেখে যাচ্ছিলাম একমনে। ওখানেও ছবি তোলার জন্য লোক আছে এবং অবশ্যই তার জন্য ফি দিতে হলো। তারা কিছু সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিলো।

বেশিক্ষণ ওখানে থাকা গেল না। কারণ, সেই সময়ের দারিদ্র্য। কী আর করা যাবে? ওখান থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার রাস্তা পেরিয়ে আমরা যাব কুটা। তখনই সূর্য ডোবার মতো অবস্থা। অতএব আদি গাড়ি ছোটাল। ওখানে রাস্তার দুধারে প্রতি কিলোমিটারে একটা করে “ইন্দো মার্ট” আর “আলফা মার্ট”-এর মাল্টি পারপাস শপ। আলফা মার্টের এক গ্লাস কফি সত্যিই অপূর্ব। আমরা যাওয়া-আসার পথে এই মার্টেই কফি খাচ্ছিলাম। এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। দাম? এক গ্লাস কফি ইন্দোনেশিয়ার টাকায় ২০০০০ টাকা। ও হ্যাঁ, কফিটা কিন্তু নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে।

ফেরার পথে কত যে মন্দির, কত মূর্তি চোখে পড়ল তার ইয়ত্তা নেই। কিছু মন্দির নতুন করে তৈরি হচ্ছে তো কিছু মন্দির কত বছরের পুরনো তা হয়ত কেউ জানেই না। একটা নতুন তৈরি হওয়া (এখনও সম্পূর্ণ নয়) মন্দির দেখে আদিকে গাড়ি থামাতে বললাম। অবাক হয়ে তার কাজ দেখছিলাম। আমরা এ দেশে কি এমন স্থাপত্যের নিদর্শন রাখতে পারি? হয়ত পারি, কিন্তু আমরা আরো অনেককিছু পারি যা ওরা পারে না। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটা ওরা পারে না, তা হলো শহরের মুখ ঢেকে দেওয়া রাজনীতির বড় বড় হোর্ডিং লাগিয়ে রাখা। এমনকি ট্রাফিক পুলিশ বিহীন মোড় গুলোতে কাউকে রাস্তা পার হতে দেখলে গাড়ির গতি যেন নিজে থেকেই কমে যায় এবং থেমে যায় গাড়ি গুলো। যারা গাড়ি চালায় তারা এত সাবধানী এবং ডিসিপ্লিনড হলে ভাল লাগে আমাদের?

উলু ওয়াতু

এবারে আমাদের হোটেলে ফেরার কথা। পূর্ব নির্ধারিত “হোটেল পাত্র” (Hotel Patra) কুটার নাকি সবচেয়ে বড় হোটেল। একদম সমুদ্রের ধারে। আমাদের ইচ্ছে ছিল হোটেলে চেক-ইন করে আমরা বিচে চলে যাব। তা আর হলো না। রাস্তায় আমাদের বেশ দেরি হয়ে গেল। আমরা হোটেলে পৌঁছুলাম রাত প্রায় ন’টায়। সমস্ত ফর্মালিটি কমপ্লিট করে আমরা যখন রুম কোনদিকে খুঁজছি তখন একজন হোটেল কর্মচারী আমাদের মালপত্র গুলো নিয়ে গিয়ে একটা বড় আকারের টোটোয় তুললো। যাচ্চলে! আবার কোথায় যাব রে বাবা! জিজ্ঞেস করতেই জানলাম, রুম কিছুটা দূরে। তাই এই ব্যবস্থা। টোটোয় চড়ে যেতে গিয়ে বুঝলাম কতটা দূরে আর হোটেলটা কতটা বড়! বিশাল জায়গা জুড়ে এই হোটেল। আমরা প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একটা দোতলা বিল্ডিংয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরের দুটো রুমের গর্ভে ঢুকে গেলাম। এইরকম দোতলা বিল্ডিং যে কতগুলো আছে তার ইয়ত্তা নেই। রুমে মালপত্র রেখে আর কোনো কিছু না ভেবে আলফা মার্ট থেকে কিনে আনা কিছু ড্রাই খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, রুমের ভেতরে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে একটা বেশ বড় হৃদয় তৈরি করা ছিল এবং টেবিলে একটা মাঝারি কেক রাখা ছিল। কেকে লেখা ছিল “হ্যাপি হানিমুন”। মেয়েকে জিজ্ঞেস করে জানলাম হোটেল টার এটাই দস্তুর। ওরা ধরেই নেয়, ওদের হোটেলে যারা আসছে তারা হানিমুনেই আসছে। তাই বলে, আমাদের মতো বুড়ো বুড়িও? বোঝো ঠ্যালা!

পরদিন ভোরে উঠে আমরা তিনজনে টোটোটাকে ডাকলাম। তা আসে আর না। আমাদের হাতে সময় বাড়ন্ত। অতএব হাঁটা শুরু করলাম। আমার লাম্বার খুব একটা বেইমানি না করলে আমি হাঁটতে ভয় পাই না। দেখলাম, হোটেলের রিসেপশন পর্যন্ত থেমে থেমে কোনো রকমে হেঁটে চলে এলাম। হোটেলের পিছনেই বিচ। আমরা চলে এলাম বিচে। সামান্য দূরে বিচের ওপরেই একটা স্ট্যাচু। আমরা বিচ ধরে হাঁটা শুরু করলাম। বিচটা একদম ভাল নয়। বেশ নোংরা। চারিদিকে বিভিন্ন প্রাণীর (মানুষ সমেত) বিষ্ঠা। চারিদিকে ইতস্তত শুয়ে আছে প্রচুর খালি বোতল। আমরা হাঁটতে হাঁটতে গেলাম স্ট্যাচুর দিকে। স্ট্যাচুটা গরুড় বিষ্ণুর। এখানকার বেশিরভাগ মূর্তির মুখ রাক্ষসের (আমাদের ধারণায়) মতো। কেন, জানি না। সেখান থেকে ফিরে এসে আমরা সোজা হোটেলের ডাইনিং রুমে ব্রেকফাস্টের জন্য চলে এলাম। ওরে বাবা রে! এত খাবার? ব্রেকফাস্টে কেউ এত খায় নাকি? না হয় কমপ্লিমেন্টারি তাই বলে এত? সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এখানে প্লেন তাওয়া রুটি এবং আলু-ফুলকপির তরকারিও পেলাম। আমি তাই নিলাম। বাকি খাবারের মধ্যে, ইডলি, ধোসা, মি গোরেং, নাসি গোরেং, কেক, পিৎজা, প্রচুর ফল, চিকেন, মাছ… কী যে ছিল না! যাই হোক, ব্রেকফাস্ট সেরে আদির ভরসায় ছুটলাম উলু ওয়াতু মন্দির। একটা কথা জানিয়ে দেওয়া ভাল। বালিতে যত চার চাকার গাড়ি দেখলাম, তার প্রায় নিরানব্বই শতাংশ গাড়ির রং হয় সাদা নতুবা কালো। আদি জানালো, অন্য রঙের গাড়ির দাম নাকি ওখানে অনেক বেশি। তাই সবাই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটেই আটকে থাকতে চায়।

বালির নিয়ম, কোনো মন্দিরে পেট এবং পা ফাঁকা রেখে যাওয়া যাবে না। আমার আর সহধর্মিণীর অসুবিধা ছিল না, কিন্তু মামকে কোমরে একটা সারেঙ (অনেকটা লুঙ্গির মতো) বাঁধতে হলো। আমাদের শুধু কোমরে একটা করে কাপড়ের ফিতে বেঁধে নিতে হলো। উলু শব্দের অর্থ উঁচু আর ওয়াতু মানে রক বা পাথর। বোঝাই যাচ্ছে, মন্দিরটা অনেক উঁচুতে। মেয়ে বলল ওখানকার দৃশ্য খুব সুন্দর। আর মন্দির কর্তৃপক্ষ বলল, বাঁদর হইতে সাবধান। নিজের জিনিস পত্রের দিকে নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে মোবাইল, হ্যান্ডব্যাগ এবং চশমা। আমরা গাছের ছায়াঘেরা রাস্তায় বেশ কিছুটা হেঁটে সমুদ্রের ধারে পৌঁছে গেলাম। সমুদ্র অনেকটাই নীচে। মাম তার মোবাইলে নীচের সমুদ্রের ছবি তুলতে গিয়েই আঁতকে উঠল। তার বাঁ হাতে ধরা আইফোনটা ধরে টানছে একটা বাঁদর। সে এক মজাদার দৃশ্য। বাঁদর এবং মানুষে একটা মোবাইলের জন্য টাগ অফ ওয়ার। শেষে মামের তেড়ে যাওয়া আর চিৎকারে বাঁদরটা বাঁদরামি ত্যাগ করল।

সমুদ্রের ধারে ধারে অনেকটা উঁচু দিয়ে আমরা কখনও সিঁড়ি বেয়ে, কখনও র‍্যাম্প দিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চললাম। মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে আমার পা দুটোকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার জন্য বসলাম। বসার আগে চারিদিকে পর্যবেক্ষণ করে নিলাম, কোথাও বাঁদর আছে কি না! না, ধারেকাছে কোথাও নজরে এলো না। অতএব, নিশ্চিন্তে বসলাম। হঠাৎ সহধর্মিণী চিৎকার করে উঠল, “বাঁদর, বাঁদর”। আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম। সহধর্মিণী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই রে! তোমার চশমাটা খুলে নিয়েছে।” আমি ঝাপসা দেখতে পেলাম, আমার চশমাটা একটা বাঁদরের হাতে। যাচ্চলে! কখন খুলে নিয়েছে বুঝতেই পারিনি! এ তো দেখছি কলকাতার ১২সি/২ বাসের পকেটমার গুলোর থেকেও হাত সাফাইয়ে এক্সপার্ট। কী করব এবারে? অনেকের কথা অনুযায়ী অনেক কিছুই করা হলো। কিন্তু কিছু লাভ হলো না। বাঁদরটা চশমা হাতে নিয়ে বসে রইল। একটা ব্যাপার, ও কিন্তু ঐ এলাকা ছেড়ে কোথাও গেল না। অর্থাৎ ও চশমাটা ফেরত দেওয়ার জন্য তৈরি। শুধু এক্সচেঞ্জ রেটটা বোধহয় ফাইনাল করতে চাইছিল। শেষে আদিকে ফোন করতে সে একজন “মাঙ্কি কিপার” (হ্যাঁ, ওখানে এইরকম পোস্ট আছে) কে সঙ্গে নিয়ে এলো। তিনি কী একটা জিনিস বাঁদরটাকে ছুঁড়ে দিতেই আমার চশমা ফেরৎ পেলাম। এরপর যতক্ষণ ওখানে ছিলাম হয় খালি চোখে ঝাপসা দেখেছি, নতুবা চশমাটা যথাস্থানে রেখে হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিলাম। তবে, জায়গাটা সুন্দর হলেও কয়েকটা প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রথমত, বাঁদরের এত অত্যাচার জেনেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না কেন? মাঙ্কি কিপার রাখা তো ব্রেকডাউন মেনটেন্যান্স, প্রিভেনটিভ মেজার কেন থাকবে না? দ্বিতীয়ত, উলু ওয়াতু মন্দিরে শুধু উপাসনার জায়গা আছে। কোনো বিগ্রহ চোখে পড়ল না। তাহলে পর্যটকদের কাছে “উলু ওয়াতু মন্দির” বলা হয় কেন? তৃতীয়ত, ওখানে সন্ধ্যেতে খুব সুন্দর বালিনিজ নাচ হয়। অথচ গুগল জেঠু ছাড়া আর কেউ তা বলে না। এমনকি মন্দিরের কোথাও কোনো এ ব্যাপারে বোর্ড চোখে পড়ল না। মানে ‘টেকস্যাবি” লোকজন ছাড়া কেউ নাচ দেখার সুযোগ পাবে না?

বালিতে বিদেশ দর্শন – পর্ব ১

(চলবে)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top