এ পোড়ার দেশে বিধবারা একটা আলাদা জাত। ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো বলে একটা কথা আছে না? আমরা বিধবারা হলাম গিয়ে তাই। সেই শৈশব থেকে থেকে দেখছি এই সমাজ মাঙ্গলিক কোনো আচার থেকে শত হস্ত দূরে রাখলেও গায়ে গতরের খাটনি গুলো সবাই বেশ করিয়ে নিত। মাথার সিঁদুর খুইয়ে কত গুলো বর্ণহীন জীবনের মানুষের সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। সেখানে অভিশপ্ত দীর্ঘ একশো বছরের জীবন কাটানো বৃদ্ধাও যেমন ছিল তেমনি আমার মত মতো কিছু শৈশব কৈশোরে মাঝে দাঁড়ানো অবুঝ জীবও ছিল। হঠাৎ করেই জীবনের সব রঙের অধিকার, সব সুখাদ্যের অধিকার কেন হারালাম বুঝতে পারিনি। শুধু বুঝতে বাধ্য হয়েছিলাম , ‘এটাই তো হওয়ার কথা। এটাই তো নিয়ম’। এ নিয়মের বাইরে যাওয়া চলবে না। বিধবার কোন কুল থাকে না শুধু থাকে কলঙ্কের মহাভয় সুযোগ বুঝে ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। স্বামী পরিত্যক্তরাও একই রকম দুর্ভাগা। সেটা বিনিকে দেখে বুঝেছি। এসব দেখতে দেখতে হাজার রকম অবহেলা, অবজ্ঞা আর নানা রকম নিষেধের নিচে পাথর চাপা থাকতে থাকতেই কখন যেন যৌবনে পা দিয়েছিলাম। যদিও বিনি আমার মতো বোকা নয়,ওর খুব বুদ্ধি। শ্বশুরবাড়ির থেকে চলে আসার আগে চেঁচামেচি ঝগড়া ঝাঁটি করে নিজের সমস্ত গয়না নিয়ে এসেছিল। একদিন আমাকে বলল, “হ্যাঁ লো পুঁটি তোর গয়না কোথায়? কার কাছে রেখেছিস?”
আমি মুখ বেঁকিয়ে বলেছিলাম, “তোর সোয়ামী ত্যাগ দিলেও শাঁখা সিঁদুরটুকু তো আছে! সেই জোরে গয়না গায়ে তুলতে পারবি, আমি গয়না নিয়ে কী করব লো?”
বিনি ভ্রু কুঁচকে বলল, “বলিস কী রে তুই? পরতে না পারিস তোর গয়নার কোন খবর রাখবি নে তুই? পাগল নাকি? আহা লো, কত আর দেখব! এরেই কয় ন্যাকা ন্যাকা কয় ছেলে, না ভাতার নিয়ে ছয় ছেলে! বলি গয়নাটুকু হলো ইস্ত্রি ধন তাও বুজি জানিস নে? হতভাগী তোর জন্যি কি তোর বাপ ভাই জমি জিরেত লিখে দেবে? বাপ মলে তো ভাই ভাজের আচ্ছয়ে থাকবি। যতদিন গতর আছে খেটে খাবি, যে দিন গতর থাকবে না সে দিন কী করবি লো?
এমন কথা তো কখনো ভেবে দেখিনি , তখন সবে পনেরো বছর বয়স আমার। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা মনে আসেনি। থান পরা ইস্তক পিসি ঠাকমার দাঁতের তলায় আর বাকিদের অবজ্ঞায় বাঁচতে শিখে গিয়েছিলাম। বিনির মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়েছিলাম, কী বুদ্ধি মেয়েটার! রূপও ফেটে পড়ছে। একটু শ্যামবর্ণ ঘেঁষা গায়ের রং, টিকলো বাঁশির মতো নাক, পাতলা ঠোঁট আর জোড়া ভ্রু। টকটকে লাল সিঁদুর ওর সিঁথি ভরে রেখেছে, ভ্রুর ওপরে পরিপাটি গোল সিঁদুরের টিপ।
বিনি কোমরে দু’হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ওমা! হাঁ করে কী অতো দেখছিস লো? বাক্যি হরে গেল বুঝি? যে কথা গুলো বললাম কানে গেল না? ভাল কথা বলছি পুঁটি, নিজের গয়না সব্বদা নিজের কাছে তালা চাবি দিয়ে রাখবি। মায়ের কাছে রেখে দিবি নে। বাপ দাদারা নানা ছল ছুতোয় টেনে বের করে নেবে। কাউকে বিশ্বেস করবি নে। আধ আনা সোনাও কাউকে দিবি নে।”
আমি হেসে বলেছিলাম, “হাঁ করে আর কী দেখব? দেখছি তোর রূপ! তোর বর কি কানা নাকি? এমন হিরে ফেলে কাচ কুড়িয়ে নিল। তোর মুখের পানে চেয়ে দেখেছে কোনদিন?”
একটু কি মেঘের ছায়া ওর মুখে পড়েছিল? কে জানে, বিনি তো সব ছায়াকে হেসে উড়িয়ে দিতে জানে। মুখ বেঁকিয়ে বলল, “দূর দূর! রূপের কতা আর কোসনি। শুনিসনি সেই কথাখানা, যার যেথা মজে মন কিবা হাড়ি কিবা ডোম! তবে হয়তো সে মেয়েটি সত্যিই হিরে, আমিই কাচ। তাই এত অবহেলা করে ফেলে দিয়ে যেতে পারলে। ওসব কথা বাদ দে দিকিনি, তোকে যেটা বললাম সেটা মন দিয়ে শোন। তোর ছোটদার বে হচ্ছে তো? এই সময় কায়দা করে তোর গয়নার কথা পাড়বি। গয়নাগুলো চেয়ে নিয়ে নিজের তোরঙ্গে তালা দিয়ে লুকিয়ে রাখবি। বুঝলি আমার কথা?”

বাড়িতে তখন ছোটদার বিয়ের কথা চলছে, সে সময় একদিন অনেক দোনোমনো করে কথাটা পেড়েই ফেললাম। পাত্রীর বাড়ি কলকাতায়, সে লেখাপড়া শিখেছে। বেশ বড়লোক আর নামি বংশে বিয়ে হচ্ছে। সে কারণে এবারে বিয়ের সব সামগ্রী কলকাতা থেকে কেনা হয়েছে। নতুন বেহাই বাড়িতে যেমন তেমন তত্ত্ব দিলে তো চলবে না। কদিন ধরে পাড়ার বউ ঝি আর জ্ঞাতি গুষ্টি বিয়ে তত্ব, গয়না আর প্রনামী দেখতে আসছে। নিজেকে ওসব আসরে বড্ড বেমানান লাগে তাই কোনদিনই যাই না। কখনো বিনি থাকলে জোর করে টেনে নিয়ে যেত। খোঁচা দেওয়া কথা বিনিকেও শুনতে হতো বই কি। যাদের কপাল পুড়েছে তাদের পোড়া ক্ষতে বেশ করে নুন লঙ্কা ঘষে দিতে যেমন আহ্লাদ হয় তেমনটা আর কিছুতে নয়। স্বামী পরিত্যাক্তা বউ অমন করে শাঁখা সিঁদুর গয়নায় সেজে চোখের সামনে ঘুরে বেড়াবে তাও কি সহ্য করা যায়? তবে খুব শিগগিরই বিনি মুখরা নামের অখ্যাতি অর্জন করেছিল । ওকে আর কেউ ঘাঁটাতে সাহস পেতো না।
ছোটদার বিয়ে এগিয়ে এসেছিল। এক দুপুরে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছে তাই সেদিন আর কেউ আসেনি। বাড়ির মেয়েরা এক সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিল, হাসি মস্করার সঙ্গে কাজের কথাও হচ্ছিল। আমি মায়ের পাশে বসে বললাম — মা আমার গয়না গুলো কোথায়?
বাজ পড়লেও বোধহয় কেউ এতটা চমকাতো না। পিসি ঠাকমা দেয়ালে ঠেস দিয়ে থানটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে খেমিকে দিয়ে পায়ে তেল মালিশ করাচ্ছিল। আমার কথা বুড়ির কানে কি ভাবে গেল কে জানে, ধমকে উঠলো — কী … কী বললি রে মেয়ে? এত আসপোদ্দা তোর? কী করবি গয়না নিয়ে তুই? ভায়ের বে হচ্ছে দেখে তোর পরানে বে’র শখ জেগেছে বুঝি! নাকি গয়না পরে মুজরো নাচবি লো?
সারা ঘরে হাসির হুল্লোড় পরে গেল, কেউ কেউ মুখ ঘুরিয়ে মুচকি হাসলো। বেশ মনে আছে আমি খুব ধীরে কাছে গিয়ে খেমির হাত থেকে তেলের বাটিটা নিয়ে দেয়ালে আছাড় মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। বাকি সবার সঙ্গে পিসি ঠাকমার কালো কালো দোক্তা খাওয়া গুটি কয়েক দাঁতের হাসি বিস্ময়ে রূপান্তরিত হয়েছিল।
নিজের এক চিলতে ঘরে এসে অপমানে দুঃখে ঝলসাতে লাগলাম। বালিশের ওপরে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু তাতে আর কার কি এল গেল! যারা অকারণে আঘাত করতে চায়, অপমানে ধুলোতে মিশিয়ে দিতে চায় তারা বিন্দুমাত্র নিজের স্বভাব পরিবর্তন করে না।
পৃথিবীর বুকে দিন রাত পালাক্রমে আসতে যেতে থাকলো, গয়নার হদিস কেউ দিলে না আমিও আর কারোর কাছে নতুন করে জানতে চাইলাম না।
একসময় ধুমধাম করে ছোড়দার বিয়ে হয়ে গেল।
ভাদ্র মাসটা সংসারের হাজারটা জিনিস রোদে দেওয়ার মাস। বাড়ির মেয়ে বউরা তাদের দেরাজ আর তোরঙ্গের ভালো কাপড় চোপড়, শীত বস্ত্র মস্ত বড় উঠোনের দড়িতে সেঁকে নিচ্ছিল। সংসারের অনেক কাজের মধ্যে এটা একটা বাড়তি কাজ হলেও স্পষ্ট বোঝা যায় এ কাজে তাদের বেশ উৎসাহ। বিয়ে উপনয়ন সাধ ছাড়া ভালো ভালো রঙীন বস্ত্রগুলো পরার তেমন সুযোগ হয় কই। তা না হোক, কার কয়টা শাড়ি, গায়ে দেওয়ার জড়ির কাজ করা জামা সে খবর মেয়ে বউরা সবাই রাখে। কারোর নতুন কোন জামা কাপড় দেখলেই ঠেস দিয়ে কথা বলা, এর কথা ওর কানে লাগানো এসব চলতেই থাকে।
আমার তো সে সবের বালাই নেই। তবে বাড়তি কাজ আছে বৈ কি। আচার আমসত্ত্ব বড়ি এসব সাবধানে রোদে দেওয়া, কাক পক্ষী মুখ না দেয় তা দেখা, আবার সন্ধে লাগার আগে সে সব আচার মেনে তুলে রাখা … কাজ তো কম নয়! সেদিন সুয্যি পশ্চিম দিকে হেলতে সব তুলে ফেলছিলাম। এমন সময় কে যেন ডাক দিল – ঠাকুরঝি!
কানের কাছে খুব মিষ্টি চিকন অচেনা গলা বেজে উঠতে চমকে দেখলাম নতুন বউ।
বিয়ের পর পর ভাদ্র মাস পালতে বাপের বাড়ি যেতে পারেনি ওদের কে যেন মারা যাওয়াতে অশৌচ লেগেছিল।
আচারের বয়ামটা দুহাতে ধরে ভাঁড়ারে নিয়ে যাচ্ছিলাম, একটু হেসে বললাম – একটু রোসো বউ এই আসছি।
এ বাড়িতে দুপুরে বউ ঝিরা সোয়ামীর সঙ্গে ঘুমায় না, সে নিয়ম নেই। কেউ কাউকে নিয়মটা জানিয়ে দেয় না তবে নতুন আগন্তুকরা নিজের বাপের ঘর থেকে এ শিক্ষা নিয়েই আসে। এর ব্যাপার অবশ্য আলাদা, ছোটদা থাকে সেই কলকাতাতেই। বউকে রেখে সে চলে গেছে নিজের কাজের জায়গায়। ওকালতি করে সে, লেগে না থাকলে পসার বাড়বে কী করে। ও একা ঘরে শুয়ে ঘুমোতেই পারতো কিন্তু হয়তো দিনে ঘুমানোর অভ্যেস নেই।
– জানো সবার সঙ্গে গল্প করেছি শুধু তুমিই আমার কাছে আসোনা। কেন গো? আমি কী দেখতে খুব বিচ্ছিরি?
বউয়ের নাম সুরুচি, দুধে আলতা গায়ের রং। বেশ গোলগাল চেহারা, অনেকটা আমার মায়ের দেরাজে সাজানো গাউন পরা মেম পুতুলের মতো। এ মেয়ে আবার আমাদের মতো করে কাপড় পরতে পারে না। পিরিলি বাউনঘরের মেয়েদের মতো কুঁচিয়ে বুকের ওপর দিয়ে আঁচল ফেলে শাড়ি পরে। সেই আঁচল টেনে আবার ঘোমটা দেয়। কেমন যেন অদ্ভুত লাগে। ওর অনুযোগ শুনে বিব্রত গলায় বললাম — এমন কথা কে বলেছে বউ , তুমি তো খুব সুন্দর দেখতে।
— তুমিও তো খুব সুন্দর, ঠিক যেন ইন্দিরার মতো।
— ইন্দিরা আবার কে গো?
— ওমা তাও জানো না? নেহেরুর মেয়ে ইন্দিরা গো! এই তোমার মতোই ছোট ছোট চুল … তুমি কখনো দেখনি তাই না? তোমাদের গ্রামে কাগজ আসে না তো সেই জন্য দেখনি।
— ইন্দিরা বুঝি আমার মতো বেধবা?
বউ হেসেই কুটিপটি – না গো না, তার এখনো বিয়েই হয়নি। সে কী গো তুমি কী দাঁড়িয়েই কথা বলবে? এসো না ঘরে এসো। নাহ, আমি ভুল বলেছি …তুমি ইন্দিরার থেকেও সুন্দর … অনেক বেশি সুন্দর।
পর্দা সরিয়ে ওর ঘরে ঢুকলাম। এই পর্দা জিনিসটার চল এত দিন এ বাড়িতে ছিল না। নতুন বউ সুরুচি নিজের সঙ্গে পর্দা নিয়ে এলো, এটা পর্দা প্রথা নয় … সুন্দর রুচি বোধ আর অনেকখানি আধুনিকতা। ছোটদার ঘরটা নতুন চুন দিয়ে কলি ফেরানো হয়েছে। বউয়ের বাপের বাড়ি থেকে নতুন পালঙ্ক, দেরাজ, আয়না লাগানো টেবিল, মোটা গদি তোষক সব দিয়েছে। পালঙ্ক থেকে সুন্দর গোলাপী রঙের চাদর এক হাত ঝুলে আছে। আয়না লাগানো টেবিলের সামনে কারুকাজ করা বসার কাঠের মোড়ার মতো একটা জিনিস, একে যে কি বলে জানি না । সেখানাই টেনে বসলাম। বউ ঝুঁকে এসে আমার হাত ধরে টানলো – খাটে বসো না ঠাকুর ঝি !
তখনই এই পোড়ার চোখে পড়লো জিনিসটা। ওর আঁচলের তলা থেকে পিছলে আমার চোখের সামনে দুলছে … সাতভরির সীতেহার খানা। বিয়ের সময় যেটা প্রায় আমার পেট পর্যন্ত ঝুলেছিল সে খানা এখন ওর বুকের কাছে। নিজের অজান্তেই ওটা হাতে ধরে দেখছিলাম ।
— ঠাকুরঝি আমার বিয়েতে পাওয়া কিছুই তো তুমি দেখনি, এই হারটা দিয়ে পিসি ঠাকুমা আমায় আশীর্বাদ করেছেন, নোয়া বাঁধানো টা মা আর বড়দি ভাই …
ওর কোনো কথা শোনার আর ইচ্ছে ছিলো না। চোখ দুটো জ্বালা করছিল। উঠে পড়ে বললাম – আজ আসি বউ পরে আবার আসবো।
বিকেলের রোদ পরে আসছে। আকাশের পশ্চিম দিকটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। উঠোনের দিকে পা বাড়ালাম, বাকি বয়াম গুলো তুলতে হবে।



