এই মেলা সেই মেলা নয়

book fair under the tent

 বইমেলা এলে মনে হয় ক্ষয়ে যাওয়া কোনো এক দিনকে তন্দুরে চাপিয়ে গনগনে করে পরিবেশিত হবে রুপোর থালায়। থালাখানি চকচকে আজও, তবু দিনের স্বাদ বদলে গেছে। কত অভিমান, কত অভিযান, কত লালিত অক্ষর জমে জমে একখান মেলা। যার যত অভিমান সে তত দূরে। যে মিশিয়ে দেবে পালক আর পালকের রঙ সে পাবে হাতে-গরম ফলাফল। মিলনমেলা আরো একটু বড়ো হলে বাতাস নেওয়া যায় ফুসফুসে। বড়ো মানে সর্বার্থে। গায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে এই মেলা যেন এক বদ্ধ তাঁবু! এ যেন কিছুটা মুখপুস্তিকাজাত মেলা। অনেকটাই জানা। কে কখন কোথায় থাকবেন, কারা থাকবে চারপাশে। যেন এক সাজানো উৎসব! আবিষ্কারের আনন্দ কমে গেছে আমাদের। নতুন অভিজ্ঞতার ঝুলিও ভরে ওঠে না। বইমেলা আর ‘আমাদের’ নেই, বইমেলা এখন ‘তোমার’ কিংবা ‘আমার’।  দূরে দূরে স্টলে স্টলে যারা দাঁড়িয়ে আছে, বই হাতে কেউ কেউ ম্যানিকিন।  কেউ আবার বই নিয়ে উদাসীন। লেখক উদাসীন কিংবা লাজুক হলে প্রকাশক জ্ঞান দেন “কিভাবে বই বিক্রি করতে হয়”। কমজোরি লেখার বিক্রি বেশি হলে পাড়ার নেতার মতো সেই লেখার মালিকের প্রভূত সম্মান! দেখো! কী বিকোচ্ছে রোমাঞ্চ! চাণক্যের চাতুর্য!  যারা এই খেলায় নেই তারাই বিচ্ছিন্ন। মহাসমুদ্রে উলটোপথে কে যায় ভাই! সকলে স্রোতের দিকেই ভাসিয়েছে ভেলা। তাই বইমেলা এলে পালটে যায় লেখক, প্রকাশক, চেনা মানুষ। বাজারের উন্মাদনা, নেতাদের পোস্টার, সেলিব্রিটিদের বাউন্সার, একশো টাকার রোল, কানের পর্দা ফাটানো জগঝম্প গান, সেলিব্রিটির সঙ্গে সেলফি, উৎকট সাজ, দেঁতো হাসি, দৈত্যাকার প্যাভিলিয়ন, চিমনি থেকে সিমেন্টের কোম্পানি, হিন্দু মহাসভা থেকে আচার, বড়ি, ব্যাগ… ত্যাগ করতে ইচ্ছে হয়।  মেলায় যাওয়ার পথে এক মিটার অন্তর শাসকের বিরাট কাট আউট… যেন ছেদ না পড়ে ভাবনায়, ভোটের কথা, অনুপ্রেরণায় ধন্য যাপন পাঠকের মাথায় সেঁটে দেওয়া গদের আঠা দিয়ে।

এক বন্ধুর স্টলে হলুদ, সবুজ চুলের ফাঁপা বাচ্চা বাচ্চা ফানুস ফটফট করছিল। বন্ধু আলাপ করিয়ে দিতেই উক্তি- “কবিতা ব্যাপারটা কী করে যে…”। বন্ধু ব্যস্ত ছিল, শোনেনি বোধহয়। সত্যিই ভালোবাসে আমাকে, আমিও তাকে। আবার তার স্টলে যাব। অপমানিত হলে কবিতা আরো ভালো হয়। দুঃখ পেলে তো কথাই নেই। ভালোবাসা কি পাইনি? অনেক। আন্তরিকতা ঢের সারি। সেসব স্টারি নাইট আমার। যখন ফিরে আসি নিজের জানলার কাছে তখন আকাশে নিবিড় অথচ উজ্জ্বল তারারা শান্ত হতেই শেখায়। আরো বিনয়ী হই। কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, বই কিনতে চান কতজন যেচে পড়েই, সিরিয়াস পাঠক খুঁজে খুঁজে ফেরেন ভালো বই, দুষ্প্রাপ্য বই। কতজন চান দেখা করতে। পুরনো বন্ধু ডেকে ওঠে নাম ধরে… অগ্রজ লেখক খোঁজ নেন নতুন লেখার… তখনো রোদ আমার কাঁধে এলিয়ে আছে বিনুনিকে ঘিরে।

শৈশবে দেখেছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢুকলেন, কিছু মানুষ তাঁর সঙ্গে, তারপর তিনি বসলেন পিঠে রোদ দিয়ে, মানুষ বইয়ে সই করে নিচ্ছে। সুচিত্রা মিত্র এলেন । দু একটি গান গাইলেন হয়তো কারো অনুরোধে কিংবা অনুষ্ঠান আছে অডিটোরিয়ামে, বই-কেনা  মানুষ, না-কেনা মানুষ, না-কিনতে পারা মানুষ ওই সুরটুকু কানে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমি ফ্রক ঘুরিয়ে মধ্যিখানের মাঠে গোলাপি চুল হাতে নিয়ে। ধুলোর সঙ্গে ক্যান্ডিফ্লসের গন্ধ মিলে গেলেই শৈশবের বইমেলা। আমার চারপাশে বইয়ের দোকান আর জাফর পানাহির অনবদ্য ফ্রেমে আমার হাতে গোলাপি খোয়াব। পাশ থেকে আসে মেশিনে বানানো মশলা মাখানো পপকর্ণের গন্ধ। তখন পপকর্ণ তেমন কিনে দিত না বড়োরা। খোসা বাদাম, নুন… মাঠে বসে বইয়ের ব্যাগ জাপটে ধরে পায়ের বিরতি। বিকেলে ভিড় বেড়ে যাওয়ার আগে মেট্রো করে ফিরে আসা। যেন গতজন্মের কোনো এক দুপুর। স্বচ্ছ মাছ-লজন্সের মতো সে দুপুর ভেসে থাকে। খুব সাধারণ আটপৌরে স্বাদ। কিন্তু মুখের মধ্যে মাছ ক্রমশ ছোটো হয়ে আসে, ক্রমশ পাতলা… তারপর মিলিয়ে যায়। আরব্য রজনী ওই রাত থেকে ঘাই মারে, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে কেনা ‘দাদুর বাড়ি’ আমায় আচ্ছন্ন করে রাখে। এখনো সেই বই আছে বাড়িতে এবং মেলায় নতুন সাজে। এশিয়ার উপকথায় আমার বয়সি ছেলেমেয়েগুলোর দুঃখ, আনন্দ, উৎসব ম্যাজিক লন্ঠন জ্বেলে দিয়ে যায়।

এখন মেলায় অধিকাংশ দিন তেষ্টা পায়। প্যাকেটের জলে বিড়ম্বনা ও অতৃপ্তি। শুষ্ক হয় হৃদয়। মেলার মাঠে না না, মাঠ তো নেই… হয় বাঁধানো নয় এবড়ো খেবড়ো গলি পথ, সেখানে বিনয়ের পরিসর কম, ঠেলাঠেলি আর গুঁতোগুঁতি। আত্মসম্মানবোধ, যত্ন, সৌজন্য, উষ্ণতা সেখানে কম। কোলাহল, উচ্চকিত প্রচার, অহঙ্কারী এলিটিস্ট মুখ, আরও যা যা তেমন উৎকৃষ্ট নয় তাকে নিয়ে জাগো জাগো রব। আমি একা দাঁড়িয়ে আছি এক বর্ণময় ঘেরাটোপে আর চারপাশে সবই ঘুরছে। মরণকূপের মাঝে আমি, একেকজন স্টান্টম্যান ঘুরছেন। কতরকম স্টান্ট মোটরবাইকে চড়ে! ঘুরন্ত লেখকদের কাঁধে মাথায় বই। কতরকম কেরামতি। বেছে রাখা বইয়ের লিস্ট খুলে দেখি… পয়সাও গুনি। তারপর পালাতে থাকি। তবু পালানোর সময় চোখে জল, যেন ব্যর্থ হলাম। বইয়ের প্যাকেট জাপটে ধরে ভিড় বাসে টনটনে কাঁধ আর ব্যথাতুর পা নিয়ে বাড়ি ফিরি। আগেও কি ছিল না এসব? ছিল অবশ্যই। কিন্তু “বিপননই সব”, এরকম মানসিকতা এতখানি ছিল না। “হাম কিসিসে কম নেহি” ব্যাপারটাও প্রকট হয়ে ওঠেনি। শাসকের মনোভাব আদপেই হয়তো প্রভাবিত করে সব স্তরের মানুষকে।

ফিরে এসে বেশ নিশ্চিন্ত হই… বিছানার ওপর তখন বই মেলা… চাদর প্রচ্ছদের ছটায় পালটে ফেলেছে তার রূপ। ততটাও সঙ্গিন মনে হয় না নিজেকে। এইবার এক বন্ধু ভালো ভালো বই দিয়ে যাবে বলেছে বিদেশে যাওয়ার আগে, মেলা বই বিছিয়ে আমি থাকব নিপাট যত্ন নিয়ে। লিখতে বসি এই জন্যই যে ভালো থাকতে হবে আর লিখলে, শব্দ নিয়ে সময় কাটালে ভালো থাকি। খারাপ থাকার হাজারটা উপায় ছিল। সিলিব্রিটি আর বাউন্সার, মিডিয়া আর মিউজদের দেখার হলে ঘরে বসেই সম্ভব। কষ্ট করে হাঁপিয়ে, ভিড় ঠেলে, পা টনটনিয়ে ঘুরে বেড়াব কেন? বাজেট থেকে ক্রিকেট, মেসি থেকে পিসি সব মঞ্চে, সকল ইস্যুতে ফিল্মিস্টার আর তাদের বাংরেজিতে বাণী… একই চেনা ছক। শ্বাস নেওয়ার, একটু কথা, গল্প আড্ডা দেওয়ার পরিসরকে মেরে ফেলে সব মেলাকেই একই গোত্রের করে দেওয়ার চেষ্টাটা শুভ নয়। তারা না এলে কি রাজনীতিবিদ, আয়োজক, মিডিয়া, প্রকাশকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে না? আঞ্চলিক বইমেলাগুলোতে গানের অনুষ্ঠান, নামীদামি শিল্পীদের ছবি দিয়ে পোস্টার, বইমেলার আকর্ষণ কমেছে অবশ্যই কিন্তু যেখানে বইটাই মুখ্য সেখানে শুধুমাত্রে ভিড় বাড়ানোর জন্য পাঁচমিশালি অনুষ্ঠান পীড়াদায়ক এবং বইকে তাচ্ছিল্য করার সামগ্রিক প্রক্রিয়া। অথচ কলকাতা বইমেলায় এলোমেলো গান, গিটার বাজিয়ে জড়ো হয়ে থাকা যুবক যুবতীর ভিড় উধাও। চিত্রশিল্পীদেরও ঠাঁই মেলে না আর। মেলা বাড়ছে দৈর্ঘ্যে, সংখ্যায়, ভিড়ের নিরিখে, কিন্তু মিলনমেলা কি হেরে যাচ্ছে? নিরুদ্দেশ হচ্ছে প্রাণবন্ত পরিবেশ? বাঙালিরা সব ক্ষেত্রেই হাঁফিয়ে উঠছি… বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য হাহাকার।

অথচ বইমেলা শুরুর আগে বেশ আনন্দ হয়… নতুন বইয়ের প্রচ্ছদ ভেসে ওঠে চেনা, অচেনা লেখকের। ভাবনা, কীর্তি, মনন ছুঁয়ে থাকে আমায়। এক একটা চমক। মনে মনে তালিকা করি। স্টলে স্টলে ঘুরছি কল্পনাও করি। বইমেলে নিয়ে এই উন্মাদনা এই শহর করতে পারে ভেবে গর্ব হয়। কিন্তু তারপর মেলা কাছে চলে এলেই ভয় করে। অনেকেই বেমালুম গছিয়ে দিতে চায় বই, অভদ্রতা করতে পারি না। সীমিত বাজেটে টান পড়ে। কত টান ফেলে আসতে হয়। পড়াও কমে যাচ্ছে ক্রমশ। তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়ফুঁক, সাস্পেন্স এবং ভূতেদের তাই হয়তো এত রমরমা, জলদি পড়া হয়ে যায়। জীবনের জটিল সমস্যার থেকে মুখ ফিরিয়ে অলৌকিক জগতে বেশ কিছুক্ষণ থাকা যায়। যেখানে রুটি-রুজি, যোগ্য-অযোগ্য, বৈধ-অবৈধ সমস্ত অভাববোধ আর অসহায়তা পেরিয়ে রহস্য, গোয়েন্দাগিরি, তদন্ত, কাল্পনিক অপরাধীর গ্রেপ্তার নিয়ে মজে আছে পাঠক। জলদির জালে আটকে পড়েছি আমরা। চটজলদি নাম, পয়সা, নিজস্ব-কাহিনি হয় কি? কাহিনি বদলে বদলে যায়। সই-শিকারি, বইয়ের-ব্যাপারি, ভদ্রলোকের রুচি, পৃথিবীর জলবায়ুর মতো বইমেলাও বদলে গেছে। পাতি বাঙালি আমি জিয়া নস্টাল করে নষ্ট করছি সময়…


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top