মিসড কলের ভিতর বসে আছে শীতকাল

lonely call on a winter's ledge

​​আমার এখন প্রধান কাজ হল ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা।
​এ কথা আমি কাউকে বলি না। বরং বলা ভালো বলতে পারি না, কারণ বললে ছেলেরা খুব চিন্তা করবে। নাতিরা আবার মজা পাবে। বলবে, “গ্রানি, you need a hobby।” যেন ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা কোনো hobby নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন hobby। মাছ ধরার মতো ধৈর্য লাগে, শিকার করার মতো একাগ্রতা লাগে, আর বিধবার মতো নীরবতা লাগে।
​আমি রোজ সকালে উঠে প্রথমে পর্দা সরাই। তারপর কেটলিতে জল চড়াই। তারপর ফোনটা চার্জে। আমার বয়স এখন সত্তর পেরিয়ে গেছে। হাঁটতে পারি, গাড়ি চালাতে পারি, তাই নিজের বাজার নিজেই করি, ডাক্তারখানাতে একাই যাই। এদেশে এইটুকু না পারলে উপায় নেই। এখানে হাঁটুর ব্যথা হলে প্রতিবেশী এসে সরষের তেল গরম করে মালিশ করে দিয়ে যাবে না। এখানে “একটু দেখো তো” বলার মানুষও appointment নিয়ে আসে।
​আমি আমেরিকার মিশিগান শহরে থাকি। কথাটা এখনও মুখে নিলে একটু যেন নকল নকল শোনায়। আমেরিকায় থাকি, কিন্তু আমার ভেতরে এখনও শ্রীরামপুরের দুপুর থেকে গেছে। কাকের ডাক, ভিজে জামা, উঠোনে চাল শুকোনো, ছাদের কার্নিশে পায়রার গু, আর দূর থেকে “মাছ নেবে গোওও” বলে মাছওয়ালার ডাক। এইসব নিয়ে মানুষ বুড়ো হয়। মিশিগান শহরের সুন্দর রাস্তা, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাজার আর ঘাসকাটা লনের উপর বুড়ো বয়স খুব স্বাস্থ্যকর ভাবে নামে, কিন্তু মনের ভিতর নামে না।
​আমার ছেলে দুটো খুব ভালো। এই কথাটা আগেই বলে নিচ্ছি। এখনকার দিনে ছেলে ভালো হওয়াটাও মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ আর এই বাজারে দু-দুটো ছেলেকে ভালো করে বড় করা কম কথা নয়। বড় ছেলে রঞ্জন পনেরো মাইল দূরে থাকে। ছোট ছেলে শুভ বোস্টনে। দুজনেই প্রতিষ্ঠিত। আমার নামে এখানে মেডিক্যাল কার্ড করেছে, গাড়ি কিনে দিয়েছে, প্রতিবার শীতে ভালো ও দামি জ্যাকেট কিনে দেয়, চোখে কম দেখি শুনলে নতুন চশমা করে দেয়। শুধু একটা জিনিস দিতে পারে না—অকারণ সময়।
​একদিন রঞ্জন আমাকে জিজ্ঞেস করল,
“মা, তুমি কি lonely feel করো?”
​আমি বললাম,
“আমি feel করি না কি, আমি ভাত রাঁধি।”
​ও বলল,
“না মানে, emotionally…”
​আমি বললাম,
“তুই বাংলায় বল। ইংরেজিতে দুঃখ শুনলে আমার কষ্টটা ছোট হয়ে যায় না।”
​ও হেসে বলল,
“তোমার কারও সঙ্গে regular কথা বলা দরকার।”
​আমি বললাম,
“যে কারুর সঙ্গে irregular কথা বললেও আমি রাজি আছি।”
​আমার দুঃখটা এই নয় যে, কেউ আমাকে দেখে না। সবাই দেখে। ছেলে ফোন করে। বউমা খোঁজ নেয়। নাতিরা birthday-তে cake নিয়ে আসে। Mother’s Day-তে ফুল আসে। Thanksgiving-এ গাড়িতে করে নিয়ে যায়। ছবি তোলে। তারপর ছবির নীচে লেখে: Blessed to have you, Grandma. আমি blessed হয়ে বসে থাকি। বাকিটা বছর ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকি।
​আগে এরকম ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়িতে লোক কম ছিল, আওয়াজ ছিল বেশি, দোষারোপ ছিল, মন কষাকষি ছিল, গামলা পড়ে যাওয়ার শব্দ ছিল। সকালবেলা কাজের মেয়ে এলে তার সঙ্গে তর্ক হত। দুধ ফোটাতে গিয়ে উথলে গেলে তাকে নিয়ে আলোচনা হত। কার ছেলে আজকাল কেমন মাথা তুলেছে, কার বউ কতটা আধুনিক, কার জামাই ফাঁকিবাজ—এসব নিয়ে একেকটা সকাল কেটে যেত। তখন কেউ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবেনি, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য নিজে নিজেই ভালো ছিল।
​আমার দিদিমা বলতেন, “একটা সংসারে হাঁড়ির ঠকাঠক শব্দ না হলে সে বাড়ি মরার বাড়ি।” তখন বুঝিনি। এখন বুঝি। এই বাড়িতে সব যন্ত্র চুপচাপ কাজ করে। Dishwasher শব্দ না করে বাসন মাজে। Heater শব্দ না করে গরম দেয়। Refrigerator নিজের মতো ঠান্ডা করে। শুধু মানুষ চুপ করে গেছে।
​আমার ফোনের call list-এ এখনও কয়েকটা মৃত মানুষের নাম আছে। মুছিনি। ফেসবুক খুলতে মাঝে মাঝে ভয় পাই—প্রতিদিন কেউ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাকে আনফ্রেন্ড করতে হয়। বড়দি বেলা, শিউলি, বেলা পিসি। এমনকি এক মাছওয়ালার নম্বরও ছিল অনেকদিন—“মধু মাছ” নামে। ও মরে গেছে অনেক আগেই। নম্বরটা শেষ পর্যন্ত কবে মুছেছি মনে নেই। কিন্তু বড়দির নম্বরটা এখনও আছে। কোথাও নেই, শুধু আমার ফোনে আছে। মাঝে মাঝে নামটার দিকে তাকাই। আর মনে মনে ভাবি, মানুষ মরে যাওয়ার পর প্রথমে তার কণ্ঠস্বর যায়, তারপর মুখ, তারপর আলমারি, তারপর শাড়ি। শেষে শুধু নামটাই বেঁচে থাকে।
​একদিন খুব মন খারাপ করছিল। কারণ বিশেষ কিছু নয়। বুড়ো বয়সে কারণ ছাড়াও মন খারাপ করে। শরীরের কোথাও ব্যথা নেই, কিন্তু মনের ভিতর কেউ যেন মৃদু করে নাড়ু বেঁধে রাখছে। সেদিন সকালবেলা চা খেতে খেতে আমার খুব ইচ্ছে হল কাউকে ফোন করি। কাউকে বলি, “শোন, আমাদের স্কুলের সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার কথা মনে আছে?” এই কথার কোনো ব্যবহার নেই, কোনো জরুরি দরকার নেই, তবু কথাটা বলতেই হবে। নইলে মনে হবে আমি একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছি।
​আমি প্রথমে বড়দিকে ফোন করতে গিয়ে থেমে গেলাম। তারপর শিউলির কথা মনে পড়ল। শিউলি বেঁচে আছে, কিন্তু কানে কম শোনে। ওকে ফোন করলে কথার চেয়ে “হ্যালো? হ্যালো?” বেশি হয়। তারপর বেলা পিসির মেয়েকে ভাবলাম। তারপর ভাবলাম, থাক। আত্মীয়দের সঙ্গে এখন ফোনে কথাবার্তা অনেকটা সরকারি ফর্ম পূরণের মতো। “কেমন আছ?” “ওষুধ খাচ্ছ?” “চাপ কেমন?” “এই রাখি, পরে কথা হবে।” পরে আর হয় না।
​তখন আমি নাতি নীলকে ফোন করলাম। নীল ছোটবেলায় আমাকে “নানা-বিস্কুট” বলত। কারণ আমি ওর পকেটে বিস্কুট গুঁজে দিতাম। এখন ও কলেজে পড়ে। গলায় দাড়ির আভাস এসেছে। কথা বলে এমন ভাবে, যেন প্রতিটা শব্দের আগে কোথাও rate card ঝুলছে।
​ফোন ধরেই বলল,
“Hey grandma!”
​আমি বললাম,
“কী করছিস রে?”
​ও বলল,
“Nothing much. Just working on something. You okay?”
​আমি বললাম,
“আমি ঠিক আছি। তোকে দেখতে ইচ্ছে করছিল।”
​ও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“Awww… that’s sweet.”
​আমি একটু লজ্জা পেলাম। নিজের নাতিকেই কথা বলার আগে এখন ভাষা বদলাতে হয়।
​আমি বললাম,
“তুই কবে আসবি?”
​ও বলল,
“This weekend maybe. Depends.”
​আমি বললাম,
“Depends কেন?”
​ও বলল,
“A lot going on, grandma.”
​তারপর আমি একটু সাহস করে বললাম,
“তুই মাঝে মাঝে নিজে থেকে ফোন করতে পারিস না? খুব ভালো লাগে।”
​ও চুপ করে রইল দু-সেকেন্ড। তারপর এমন একটা ভদ্র, চকচকে গলায় বলল যে আমার হঠাৎ ঠান্ডা লাগল।
​বলল,
“Grandma, you should join that senior app. Mom told you, right? There’s a support circle there. People talk, share memories, sing songs, all that. You’ll love it.”
​আমি বললাম,
“তুই করবি না?”
​ও বলল,
“I mean… I can, but I’m not always available, you know? This will be better for you.”
​Better for you. কথাটা আমি খুব ভালো চিনি। এই দেশে সব ভালোর ভেতর একটু করে পরিত্যাগ মেশানো থাকে।
​আমি বললাম,
“তা হলে ঠিক আছে রে। তুই ব্যস্ত থাক।”
​ও খুব মিষ্টি গলায় বলল,
“Love you, grandma.”
​আমি বললাম,
“হ্যাঁ।”
​ও বলল,
“Take care.”
​আমি বললাম,
“সে তো করতেই হবে।”
​ফোন রেখে আমি খানিকক্ষণ বসে রইলাম। তারপর নিজেই নিজের উপর রাগ হল। ছেলেটা খারাপ কিছু তো বলেনি। সে আজকালকার সময়ের ছেলে। তাদের কাছে সমস্যারও app আছে, দুঃখেরও app আছে, একাকিত্বেরও app আছে। মাথা ধরলে pill, মন খারাপ করলে playlist, মানুষ না পেলে help desk। এরা practical। আমরা sentimental। এই সংঘর্ষে কে জিতবে?
​সেদিন বিকেলে সত্যিই link এল। নীল পাঠিয়েছে। নীচে লিখেছে, This may help. Love you.
​আমি link-এ টিপে app download করলাম। এতেও আমি কম যাই না। বয়স্ক হলেই মানুষ বোকা হয় না। App খুলতেই অনেকগুলো মুখ দেখা গেল। কেউ গান গায়, কেউ knitting শেখায়, কেউ আবার বলে, “Tell us one happy memory from childhood.” শুনে আমার এমন কান্না পেল যে হাসি পেয়ে গেল। সুখস্মৃতি কি এভাবে ডাকা যায়? সুখস্মৃতি হল পাড়ার গলির মতো, নিজে থেকে আসে। তাকে zoom link পাঠিয়ে ডাকা যায় না।
​রাতে রঞ্জন ফোন করল।
বলল,
“মা, appটা দেখলে?”
​আমি বললাম,
“দেখেছি।”
​“কেমন লাগল?”
​“একদম হাসপাতালের waiting room-এর মতো।”
​ও হেসে ফেলল।
“মা, তুমি impossible।”
​আমি বললাম,
“তা আমি possible হলে তোদের এত দূরে থাকতে হত না।”
​ও চুপ করল। তারপর বলল,
“তুমি কী চাও?”
​এই প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে কঠিন। কারণ বুড়ো মানুষরা যা চায় তা এত ছোট যে বলতেই লজ্জা লাগে। আমি কি বলব, “তুই রোজ দশ মিনিট ফোন করিস”? না কি বলব, “আমার কথা কেটে দিস না”? না কি বলব, “আমি যখন একই গল্প দ্বিতীয়বার বলি তখন বিরক্ত হবি না”? না কি বলব, “আমাকে এখনও তোদের দরকার আছে, এই ভানটুকু নয়, সত্যিটুকু অনুভব করা”?
​আমি কিছু বললাম না। বললাম,
“কিছু না।”
​ও বলল,
“না, honestly বলো।”
​আমি বললাম,
“একদিন সময় করে চলে এসে আমার সঙ্গে চা খা। সেদিন কোনো কাজ রাখবি না। কোথাও যেতে হবে না। শুধু আমার কাছে বসে থাকবি। আমি কথা বলব। তুই সব শুনবি। এইটুকুই।”
​ও আবার চুপ। আমি জানি, এই চুপের মধ্যে calendar খুলছে, meeting সারছে, responsibility হাঁটছে।
​শেষ পর্যন্ত ও বলল,
“I’ll try.”
​এই I’ll try কথাটা পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র মিথ্যে।
যখন মানুষ সরাসরি না বলতে লজ্জা পায়, তখন বলে I’ll try।
​ফোন রেখে আমি রান্নাঘরে গেলাম। ফ্রিজ খুলে দেখলাম, আগের দিনের ডাল আছে। একটু গরম করলেই হয়। তারপর হঠাৎ কী মনে হল, আমি আলু পোস্ত বানাতে শুরু করলাম। এই দেশে আলু পোস্ত বানানোর মধ্যে একটু বিদ্রোহ আছে। Poppy seeds খুঁজে আনো, পেস্ট করো, কাঁচা লঙ্কা দাও, তারপর একা বসে খাও। কার জন্য? কারও জন্য নয়। নিজের অতীতের সঙ্গে ভাত মাখব বলে।
​আলু পোস্ত বানাতে বানাতে আমার দিদিমার কথা মনে পড়ে গেল। উনি বিধবা হওয়ার পরেও কখনও একা হননি। সকলে ওঁকে ডাকত। কেউ জপমালা আনতে, কেউ তুলসীপাতা ভিজিয়ে দিতে, কেউ সংসারের বিচার চাইতে। একবার দিদিমা বলেছিলেন, “বুড়ো বয়সে শরীর খারাপের কষ্ট কম, কেউ কথা না শুনলে কষ্ট বেশি।”
​তখন আমি হেসেছিলাম। এখন বুঝি, বুড়ো বয়সে মানুষ আসলে নিজের অস্তিত্বটা অন্যের কান দিয়ে যাচাই করে। কেউ মন দিয়ে শুনছে মানে বুঝে নিতে হবে আমি এখনও আছি। আমি এখনও বাতিল হয়ে যাইনি।
​দু-দিন পরে আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। সকালে ফোন বেজে উঠল। আমি ভাবলাম insurance-এর লোক হবে।
ধরতেই ওপাশে কাঁপা গলা—
“হ্যালো? মৃণাল?”
​আমি চমকে উঠলাম। বললাম,
“কে?”
​ওপাশে বলল,
“আমি শিউলি রে।”
​আমি ধপাশ করে চেয়ারে বসে পড়লাম।
“তুই?”
​“হ্যাঁ রে। তোর নম্বরটা অনেকদিন পরে পেলাম। কানে কম শুনি, তাই ফোন করি না। আজ কী মনে হল…”
​আমি বললাম,
“বল, বল, আমি আছি।”
​তারপর আমরা কথা বললাম অনেকক্ষণ। কী নিয়ে? কিছুই না। সব নিয়ে। স্কুলের ম্যাডামদের নিয়ে। কার বেণী লম্বা ছিল, কার গায়ে গন্ধ ছিল, কে প্রেমপত্র পেয়েছিল, কে ভূগোলে ফেল করেছিল।
​শিউলি হঠাৎ বলল,
“তুই এখনো আগের মতন ফর্সা আছিস?”
​আমি বললাম,
“না রে, আমার গায়ের রং refrigerator-এর আলোর মতন কিন্তু বেঁচে আছি।”
​ও এমন হেসে উঠল যে আমি অনেক বছর পরে মানুষের হাসির মধ্যে নিজের বয়সটাকে ভুলে গেলাম। এক ঘণ্টা কথা হল। তারপর
​শিউলি বলল,
“আবার ফোন করব কিন্তু।”
​আমি বললাম,
“করবি। আমাকে বাঁচিয়ে রাখবি।”
​ফোন রেখে আমি বুঝলাম, দুঃখের একটা বড় অংশ আসলে প্রত্যাশা থেকে আসে। আমি নাতির কাছে বন্ধুত্ব চেয়েছিলাম, ছেলের কাছে অবসর চেয়েছিলাম, পৃথিবীর কাছে আগেকার মতো মন চেয়েছিলাম। কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে সব দরজা তো আর বন্ধ হয়ে যায়নি। কোথাও না কোথাও এখনও একটা মানুষ বসে আছে, যে আমাকে আমার পুরনো নামে ডাকবে।
​সেই দিন সন্ধেবেলা আমি নিজে থেকে নীলকে ফোন করলাম।
​ও ধরতেই বলল,
“Hey grandma!”
​আমি বললাম,
“শোন, তোর appটা ভালো। কিন্তু আজ আমার help desk-এর দরকার হয়নি।”
​ও বলল,
“Really? Why?”
​আমি বললাম,
“আমার পুরনো এক বান্ধবী ফোন করেছিল। আমরা এক ঘণ্টা হেসেছি।”
​ও খুশি হয়ে বলল,
“That’s great!”
​আমি বললাম,
“হ্যাঁ। তবে তুই ভুলে যাস না মাঝেমধ্যে করিস। App-এ শিউলি নেই।”
​ও চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল,
“Okay. I will.”
​আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম,
“I’ll try বলিস না। ওই কথাটা আমার সহ্য হয় না।”
​ও হেসে ফেলল। সত্যিকারের হাসি। বলল,
“Okay, grandma. I will call.”
​আমি বললাম,
“এই তো। এবার থেকে মানুষ হ।”
​ফোন রেখে আমি জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা, সাদা বরফ, সুন্দর ও নির্বাক। এই দেশের শীত বড় ভদ্র। কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না, অশান্তি করে না, শুধু ধীরে ধীরে সবকিছু বরফে ঢেকে দেয়। মানুষের জীবনে একাকিত্বও সেই রকম। প্রথমে মনে হয় কিছুই নয়। তারপর একদিন দেখা যায়, উঠোন, দরজা, গাছ, পথ—সব বরফ ঠান্ডা ও সাদা হয়ে গেছে।
​আমি জানালার কাচে হাত রেখে ভাবলাম, না, এখনও পুরো ঢেকে যায়নি। এখনও কোথাও কোথাও মাটি দেখা যাচ্ছে। এক বান্ধবীর গলা আছে। এক নাতির অনুতাপ আছে। এক ছেলের অস্বস্তি আছে। তার মানে সম্পর্কগুলো শেষমেশ পুরোপুরি মরে যায়নি। শুধু একটু ঠান্ডা হয়েছে এই যা।
​ফোনটা তখন টেবিলের উপর নিশ্চুপ পড়ে আছে।
​আমি তাকে বললাম,
“দেখিস, কাল আবার বাজবি।”
ফোন কিছু বলল না।
​যন্ত্ররা কখনও আশ্বাস দেয় না।
এই কাজটা মানুষকেই করতে হয়।
​আর আমি সেই রাত্তিরে অনেক দিন পরে খুব শান্ত হয়ে ঘুমালাম। কারণ আমি বুঝলাম, বুড়ো বয়সে মানুষ আসলে খুব বেশি কিছু চায় না। সে চায় না কোনো বড় বড় উপহার, বড় বড় বক্তৃতা, বা নিদেনপক্ষে বড় কোনো দায়িত্ব। সে শুধু চায়, কোথাও একটা মানুষ থাকুক, যার কাছে বলা যায়—
“শোন, আজকে আমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”


6 thoughts on “মিসড কলের ভিতর বসে আছে শীতকাল”

  1. Alok chattopadhyay

    খুবই ভালো লাগলো লেখাটা। আজকের দিনে জীবন অত্যন্ত দ্রুত বয়ে চলেছে। যখন সত্যি সত্যিই অন্যের কেন নিজের বাবা মায়ের সেবা যত্ন তো দূর ঠিক মতো খবরই রাখে না সন্তানরা বিশেষ করে পুত্র সন্তানরা। তবে দূর্ভাগ্য আমাদের এই তথাকথিত পুত্ররা হয় এমন লেখা গুলো পড়েই না আর নয়তো তাদের কোনো ভাবে নাড়া দেয় না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top