বাঘমারি পাহাড়ের কোলে শালবনি রেল স্টেশন, নিঝুম জঙ্গলের বুক চিরে চলে গেছে রেলের লাইন। সারাদিনে একখানি প্যাসেঞ্জার ট্রেন থামে এখানে। টিনের শেডের নিচে একঘরের স্টেশন অফিসের জানলায় স্টেশনের একটি মাত্র কর্মচারী প্রভুচরণ ঘাড় নিচু করে টিকিট বেচে। আশেপাশে সাঁওতালদের গ্রাম থেকে আসা গুটিকয়েক বোচকা-কাঁধে মানুষ হাতের পয়সা গোনে। কটা আর লোক ওঠে এই স্টেশনে, নামে তার চেয়েও কম লোক। মানুষ এখান থেকে চলে যায়, আসে কম।
একমুখ কাঁচা-পাকা দাড়ি, অগোছালো চুল, রেলের নীল জামা পরা প্রভুচরণ সেই কবে যে এখানে কাজ নিয়ে এসেছিলো, সে নিজেই ভুলে গেছে। নিঃশব্দ এই স্টেশনের মতো সেও চুপচাপ, মাথা নেড়ে সে সব কথার উত্তর দেয়। টিকিট বেচা হয়ে গেলে প্রভুচরণ হাতে ওড়ায় জীর্ণ সবুজ নিশান, একরাশ কাজল-কালো ধোঁওয়া উগরে দিয়ে ট্রেন ঝিকি ঝিকি শব্দ তুলে চলে যায়। নির্জন শালবনি স্টেশন তারপর দুপুরের রোদে ঝিমোয়। শিরীষ গাছের ডালে ঘুঘু ডাকে, ময়লা আকাশে চিল কেঁদে যায়, প্রভুচরণ কি জানি কার আশায় স্টেশনের লোহার বেঞ্চে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোলাভাজা চিবোয়।
শালবনিতে দিনরাত জলের মতো গড়িয়ে যায়, কোন ঢেউ ওঠে না। স্টেশনের আশেপাশে মানুষের কোন বসতি নেই। একা প্রভুচরণ পড়ে আছে রেল লাইনের এই আচমকা স্টপেজে। সভ্যতার সীমানার ধারে পড়ে থাকা এই একা মানুষটি কী ভাবে, কী চায়, কেউ জানে না। তার কোন চাহিদা নেই, সে প্রতিবাদ করে না, তার মনের কথা কেউ জানতে চায় না। সন্ধ্যেবেলায় কুয়াশায় আবছা হয়ে যায় চারপাশ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে আঁধার তিরতির করে কাঁপে, প্রভুচরণ লন্ঠনে তেল ভরে পলতে উসকিয়ে দেয়, হলুদ আলোয় স্টেশনের দেয়ালে তার ছায়া খেলা করে, প্রভুচরণ শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে। সে দিন গোনে না, মাস গোনে না, এটা কোন বছর তাও সে জানতে চায় না। তার কাছে ক্যালেন্ডার জীবনের পরোয়ানা। মানুষ চলে গেলে ক্যালেন্ডারও চলে যায়।
শালবনিতে গ্রীষ্ম পার হয়ে বর্ষা আসে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। টিনের চালে ঝমঝম জল পড়ে সারারাত। প্রভুচরণের চাদর আর বালিশ ভিজে যায়, ঘরের মেঝেতে সে শুকনো কোণা খোঁজে। লাইনের ধারের আমলকী গাছের ডাল ফলের ভারে ঝুঁকে পড়ে। তারপর একসময় আকাশে আবার নীল রং ফিরে আসে, শীতের হাওয়ায় গাছের হলুদ পাতা ঝরে যায়। গায়ের জীর্ণ চাদর ভালো করে জড়িয়ে প্রভুচরণ বসে থাকে স্টেশনের সেই বেঞ্চে, চোখ তার আকাশের দিকে। কে আছে তার ওই আকাশে?
তারপর একদিন প্রভুচরণ চলে যায়। আশপাশের গ্রামের গুটিকয়েক সাঁওতাল জঙ্গল থেকে কুড়ানো কাঠের আগুনে তার জীর্ণ শরীর শুইয়ে দেয় পাহাড়ের ধারে, সাদা ধোঁয়া পাক খেয়ে উড়ে যায় প্রভুচরণের সেই আকাশের দিকে। মানুষটা যে কোথা থেকে এসেছিলো বা কোথায় গেলো কেউ খোঁজ রাখে না। আকাশে চিলের ডাক দুপুরের নিস্তব্ধতা খানখান করে ফেলে, প্রভুচরণ শুধু হেঁটে যায় হারিয়ে যাওয়ার দিকে।



