সত্যজিৎ ও হেমন্ত: একটি অসম্পূর্ণ সহযোগিতার ইতিহাস

whatsapp image 2026 05 02 at 5.17.15 pm

বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু না-ঘটা ঘটনাও বড় ঘটনা হয়ে দেখা দেয়। যেমন সত্যজিৎ রায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্কের রসায়ন। কারণ প্রশ্নটা নিছক এই নয় যে, তাঁরা একসঙ্গে কত কাজ করেছেন। আসলে প্রশ্নটা হল, কেন দুজনে একসাথে কাজ। করেননি। যে হেমন্ত মৃণাল সেনের ছবির প্রযোজক হন, ঋত্বিক ঘটকের পরিসরেও পৌঁছে যান, এমনকি কনরাড রুকসের Siddhartha-র মতো আন্তর্জাতিক প্রজেক্টেও কাজ করেন, সেই হেমন্ত সত্যজিতের চলচ্চিত্র-বিশ্বে প্রায় অনুপস্থিত কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ব্যক্তিগত অভিমান নয়, বরং আমাদের পড়তে হয় শিল্পীসত্তার ভেতরের ব্যাকরণ টাকে।

শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলে নেওয়া দরকার। সত্যজিৎ রায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব ছিল না ।প্রকাশ্য শত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিরোধের অকাট্য দলিল আজও আমাদের কাছে আসেনি। আছে দূরত্ব, আছে অল্প সহযোগিতা, আছে নন্দনতাত্ত্বিক অমিলের ইঙ্গিত, আছে সমকালীন স্মৃতির আক্ষেপ। তাই বিষয়টাকে ‘বিবাদ’ বললে তা বিকৃত হয়ে যায়; বাড়াবাড়ি শোনায় বরং ‘অসম্পূর্ণ সহযোগিতা’ বললে সত্যের কাছাকাছি যাওয়া যায়।

সত্যজিৎ রায়ের কাজের ধরনই এই রহস্যের প্রথম চাবি। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তার চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার জন্য পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ বিলায়েত খান, আলি আকবর খানের মতো মহারথীদের সঙ্গে কাজ করেন। কিন্তু তিন কন্যা থেকে তিনি নিজেই নিজের ছবির সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। তাঁর নিজের কথায়, তিনি এর পর কোনো পেশাদার সুরকার দের সঙ্গে আর কাজ করেন নি, কারণ তাঁর নিজেরই এত সুর-ভাবনা আসে যে, অন্য সুরকারদের অতিরিক্ত নির্দেশনা মানতে অসুবিধা হওয়াই স্বাভাবিক। আরও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি সুরকে আলাদা অলঙ্কার হিসেবে নয়, দৃশ্যের সঠিক সম্প্রসারণ হিসেবে ভাবতেন। অর্থাৎ, সঙ্গীত তাঁর কাছে ছিল পরিচালনারই একটা অঙ্গ

এখানেই হেমন্ত-প্রশ্ন জটিল হয়ে ওঠে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধু একজন সুমধুর গায়ক নন; তিনি নিজেই এক সাংস্কৃতিক আবহ। তাঁর কণ্ঠে উষ্ণতা আছে, বিষণ্নতা আছে, রোম্যান্টিক মাধুর্য আছে, আর আছে এক অসাধারণ আধুনিক উচ্চারণ রীতি। এই ধরনের কণ্ঠকে কোনো পরিচালক ব্যবহার করলে, কণ্ঠ নিজেও একটা আলাদা অর্থ নিয়ে আসে। সত্যজিৎ ঠিক এই জায়গাতেই ছিলেন আর পাঁচজনের থেকে আলাদা অন্যরকম। তিনি এমন কণ্ঠ চাইতেন, যা দৃশ্যের ভেতরে গিয়ে মিশে যাবে; কণ্ঠ নিজে কোনো আলাদা ঘটনা হয়ে উঠবে না। আমরা লক্ষ্য করে দেখেছি সত্যজিতের সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা গান অনেক সময় চরিত্রের সম্প্রসারণ হিসেবে , কখনও পরিবেশের অনুষঙ্গ হিসেবে, কখনও বা নীরবতার বিপরীত সুর হিসেবে ধ্বনিত হয়েছে সেখানে হেমন্তের মতো সাংস্কৃতিকভাবে ভারী একটি কণ্ঠ কে ব্যবহার করলে ছবির ভেতরে আর-একটি স্তর ঢুকে পড়ত যা চলচ্চিত্রের গতিকে অনেক সময় ব্যাহত করতে পারত অথবা অন্য এক নাইরেটিভ তৈরি হয়ে যেতে পারত।

এই যুক্তি শুনলে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন—তা হলে কিশোর কুমারকে চারুলতা-য় ন কেন লিলেন ? উত্তরটাই আসলে তাৎপর্যপূর্ণ। আমি চিনি গো চিনি তোমারে গানটির জন্য সত্যজিৎ কিশোরকুমারকেই বেছে নেন এবং আপত্তি সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত বদলাননি। সন্দীপ রায়ের স্মৃতিচারণে স্পষ্ট, তাঁর বাবা আগেই স্থির করেছিলেন যে ওই দৃশ্যে ওই কণ্ঠই দরকার। অর্থাৎ, সত্যজিৎ জনপ্রিয়তার যুক্তিতে গায়ক বাছেননি, আবার শুদ্ধতাবাদী চাপে নতও হননি। তিনি দেখেছেন দৃশ্যের জন্য কোন কণ্ঠ ঠিক। সেই জায়গা থেকে দেখলে হেমন্তকে না-নেওয়া কোনো অপমানের নয়।

হেমন্তের সমকালীন অবস্থান বুঝলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। মৃণাল সেনের নীল আকাশের নীচে ছবির প্রযোজনা-পরিসরে হেমন্ত ছিলেন কেন্দ্রে; আজও মৃণালের সরকারি সাইটে ছবিটির প্রযোজক হিসেবে Hemanta Bela Productions এবং সঙ্গীতে Hemanta Mukherjee-র নাম জ্বলজ্বল করছে , প্রসঙ্গত এই চলচ্চিত্রটি সর্বভারতীয় পুরস্কারও পায়। সুতরাং এই ঘটনাগুলি বলে দেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধুই playback singer হিসেবেই ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন না; বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকাঠামোয় তাঁর নিজস্ব একটা ভূমিকা ছিল।

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গেও সঙ্গেও হেমন্ত সম্পর্ক প্রান্তিক নয়। দুজনেই ছিলেন আইপিটি এর কর্মী There Flows Padma, the Mother River ছবির ক্রেডিটে বিশেষায়িত চলচ্চিত্র তথ্যভান্ডারে গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম পাওয়া যায়। আবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছনো কেও অস্বীকার করা যায় না। হলিউড খ্যাত কনরাড রুকসের Siddhartha ছবিতে ভারতীয় গানগুলির সুরকার হিসেবে Hemant Kumar-এর নাম নথিভুক্ত আছে; অন্য এক বিশ্বস্ত জীবনী-ভিত্তিক সূত্রে তাঁকে এই ছবির মাধ্যমে হলিউডে playback করা প্রথম ভারতীয় গায়ক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সুযোগের অভাব ছিল না; বরং হেমন্ত নিজেই তখন বহু জগতের শিল্পী।

তবু সত্যজিতের ছবিতে তিনি এলেন না। কেন? এমনকি হীরক রাজার দেশ গুপী গাইন বাঘা বাইন এর মতন সংগীত নির্ভর চলচ্চিত্র কি কি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বর কে কি ব্যবহার করা যেত না ?আমার মনে হয়, এর প্রথম কারণ সত্যজিৎ এর চলচ্চিত্রে নন্দন-নিয়ন্ত্রণ। সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রের শব্দ-ভাষাকে নিজের হাতে নির্মাণ করতে চাইতেন। দ্বিতীয় কারণ, হেমন্তের কণ্ঠের সঙ্গে ইতিমধ্যেই গড়ে ওঠা সামাজিক স্মৃতি। বিশেষত উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দি বাংলা দর্শকের কানে এত গভীরভাবে বসে গিয়েছিল যে, সেই কণ্ঠ শোনা মাত্র পর্দায় অন্য এক আবেগ এসে যেত। নায়ক-এর মতো ছবিতে সত্যজিৎ যে উত্তমকে তাঁর স্টার-ইমেজ থেকে খানিক সরিয়ে, ভিতরের মানুষ হিসেবে পড়তে চেয়েছেন, সেখানে হেমন্তের কণ্ঠ ব্যবহার করলে সেই বিশ্লেষণের ওপর জনপ্রিয় স্মৃতির আবরণ নেমে আসতে পারত। এটা প্রমাণ নয়, কিন্তু শক্তিশালী অনুমান। তৃতীয়ত সত্যজিৎ রায় এমন শিল্পীদেরই নির্বাচন করতেন যারা তাকে সব সময় সময় দিতে পারবেন সেই দিক দিয়ে অনুপ ঘোষাল ছিলেন সবচাইতে সুবিধাজনক গায়ক অনুপ কুমার একই সাথে নতুন এবং সহজাত কন্ঠের মালিক অন্যদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পক্ষে বাণিজ্যিক কারণে সারাক্ষণ সত্যজিৎ রায়ের গানের জন্য পড়ে থাকা সম্ভবপর হতো না ফলে হেমন্ত এবং সত্যজিতের যুগলবন্দী থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।

প্রসঙ্গ সত্যজিৎ রায় এর নির্বাচনের প্রসঙ্গে আমাদের চলে যেতে হয়। হেমন্তর নিজের কথায় যদি ওই কথাগুলি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গে নয় তবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় চিন্তাভাবনা বা বক্তব্য আশ্চর্যরকম ভাবে আমাদের কাছে জরুরি ।কারণ। ১৯৮৯ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট বলেন, সাধারণত সঙ্গীত পরিচালকই ঠিক করেন কোন composition-এর প্রতি কোন কণ্ঠ “full justice” করবে। এমনও হয়েছে, তিনি আগে গান রেকর্ড করেছেন, পরে অন্য গায়ককে নেওয়া হয়েছে। এই মন্তব্য আমাদের কে দু’টি জিনিস শেখায় । এক, হেমন্ত শিল্পকে ব্যক্তিগত অভিমান দিয়ে মাপতেন না। দুই, গায়ক নির্বাচন যে একান্তই composition centric সিদ্ধান্ত, তা তিনি মেনে নিতেন। এই সূত্রে সত্যজিৎ তাঁকে না-নেওয়ার মধ্যে যে একমাত্র ‘অপমান’ ছিল—এ কথা বলা কঠিন।

অপরদিকে সত্যজিৎ সুরকে ভাবতেন সংযমের শিল্প হিসেবে। তাঁর মতে, সঙ্গীতের কাজ দর্শককে সাহায্য করা, সিনেমাকে কখনোই সুরের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা নয়। তিনি এমন সুর চাইতেন যা “right for the scene”। অর্থাৎ, গানের স্বয়ংসম্পূর্ণ মহিমার চেয়ে দৃশ্যের সত্য তাঁর কাছে বড়। হেমন্তর শিল্পীসত্তা আবার বিপরীত মেরুতে নয়, কিন্তু ভিন্ন ধারায়—তাঁর কণ্ঠ নিজেই আবেগ উৎপন্ন করে, নিজেই চরিত্রকে জাগিয়ে তোলে, নিজেই দৃশ্যের বাইরে আর-একটি নরম আলোর বৃত্ত তৈরি করে। সত্যজিতের সিনেমা সেই আলোক কে সব সময় আমন্ত্রণ জানায়নি।

তবে এই দূরত্বের মধ্যে কোথাও কিন্তু কোনো পারস্পরিক অসম্মান ছিল না। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ তাই নির্দ্বিধায় মন্তব্য করেছিলেন, “Rabindra Sangeet has died a second time.” এই মন্তব্য হঠাৎ বলা যায় না। এর মধ্যে আছে শিল্পীসত্তার প্রতি গভীর স্বীকৃতি, আছে হেমন্তের গায়কের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সম্পর্কের সচেতনতা। যদি এই সম্পর্ক নিছক বিরোধে ভরা হত বা অশ্রদ্ধার হত, তা হলে এমন শোকবাক্য কি সত্যজিৎ রায় উচ্চারন করতে পারতেন সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা ছিল কম । তাই বলা ভালো, হেমন্ত সত্যজিতের মধ্যে শৈল্পিক সহযোগিতা অসম্পূর্ণ ছিল; কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা অসম্পূর্ণ ছিল না।

সুতরাং হেমন্ত সত্যজিতের সম্পর্কের যুগলবন্দীর মর্মকথা অন্যত্র। সত্যজিৎ রায় এমন এক auteur, যিনি নিজের ছবির শব্দ, নীরবতা, সুর, বিরতি—সবকিছুকে নিজস্ব নির্মাণে আনতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এমন এক প্রতিষ্ঠান এমন এক কণ্ঠ, যিনি নিজেই এক পূর্ণাঙ্গ জগৎ। তাই সমস্ত ইতিহাসই দেখা গেছে গেছে দুই পূর্ণ প্রতিভার মিলন সব সময় ঘটেনি। কখনও তারা পাশাপাশি থাকে, একে অন্যকে স্বীকার করেন, তবু মিশে যান না। সেই না-মেশার মধ্যেও একটা ইতিহাস থাকে, আক্ষেপ থাকে, এবং কৌতূহলও থাকে।

শেষ পর্যন্ত, সত্যজিৎ ও হেমন্তর গল্প আমাদের একটা বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে । সব মহান শিল্পী-সম্পর্ক সহযোগিতায় শেষ হয় না। কিছু সম্পর্ক পূর্ণতা পায় অসম্পূর্ণ তাতেই থেকে যায়। এখন প্রশ্ন বাংলা সংস্কৃতির এই দুই শিখর কে একে অন্যকে দরকার ছিল কি? হয়তো ছিল। কিন্তু উল্টো দিকে এটাও প্রাসঙ্গিক একে অন্যকে ছাড়া তাঁরা ছোট হয়ে যান কি? না, একেবারেই না। কিন্তু তাঁরা একসঙ্গে আরও কিছু সৃষ্টি করলে বাংলা সংস্কৃতি অন্যরকম ভাবে সমৃদ্ধ হত কি? সম্ভবত হ্যাঁ। আর সেই ‘সম্ভবত’-র মধ্যেই এই ইতিহাসের দীর্ঘ নিঃশ্বাস চাপা আক্ষেপ।

ত্যজিৎ ও হেমন্ত: একটি অসম্পূর্ণ সহযোগিতার ইতিহাস

অয়ন মুখোপাধ্যায়

বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু না-ঘটা ঘটনাও বড় ঘটনা হয়ে দেখা দেয়। যেমন সত্যজিৎ রায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সম্পর্কের রসায়ন। কারণ প্রশ্নটা নিছক এই নয় যে, তাঁরা একসঙ্গে কত কাজ করেছেন। আসলে প্রশ্নটা হল, কেন দুজনে একসাথে কাজ। করেননি। যে হেমন্ত মৃণাল সেনের ছবির প্রযোজক হন, ঋত্বিক ঘটকের পরিসরেও পৌঁছে যান, এমনকি কনরাড রুকসের Siddhartha-র মতো আন্তর্জাতিক প্রজেক্টেও কাজ করেন, সেই হেমন্ত সত্যজিতের চলচ্চিত্র-বিশ্বে প্রায় অনুপস্থিত কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ব্যক্তিগত অভিমান নয়, বরং আমাদের পড়তে হয় শিল্পীসত্তার ভেতরের ব্যাকরণ টাকে।

শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলে নেওয়া দরকার। সত্যজিৎ রায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব ছিল না ।প্রকাশ্য শত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিরোধের অকাট্য দলিল আজও আমাদের কাছে আসেনি। আছে দূরত্ব, আছে অল্প সহযোগিতা, আছে নন্দনতাত্ত্বিক অমিলের ইঙ্গিত, আছে সমকালীন স্মৃতির আক্ষেপ। তাই বিষয়টাকে ‘বিবাদ’ বললে তা বিকৃত হয়ে যায়; বাড়াবাড়ি শোনায় বরং ‘অসম্পূর্ণ সহযোগিতা’ বললে সত্যের কাছাকাছি যাওয়া যায়।

সত্যজিৎ রায়ের কাজের ধরনই এই রহস্যের প্রথম চাবি। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি তার চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার জন্য পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ বিলায়েত খান, আলি আকবর খানের মতো মহারথীদের সঙ্গে কাজ করেন। কিন্তু তিন কন্যা থেকে তিনি নিজেই নিজের ছবির সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। তাঁর নিজের কথায়, তিনি এর পর কোনো পেশাদার সুরকার দের সঙ্গে আর কাজ করেন নি, কারণ তাঁর নিজেরই এত সুর-ভাবনা আসে যে, অন্য সুরকারদের অতিরিক্ত নির্দেশনা মানতে অসুবিধা হওয়াই স্বাভাবিক। আরও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি সুরকে আলাদা অলঙ্কার হিসেবে নয়, দৃশ্যের সঠিক সম্প্রসারণ হিসেবে ভাবতেন। অর্থাৎ, সঙ্গীত তাঁর কাছে ছিল পরিচালনারই একটা অঙ্গ

এখানেই হেমন্ত-প্রশ্ন জটিল হয়ে ওঠে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধু একজন সুমধুর গায়ক নন; তিনি নিজেই এক সাংস্কৃতিক আবহ। তাঁর কণ্ঠে উষ্ণতা আছে, বিষণ্নতা আছে, রোম্যান্টিক মাধুর্য আছে, আর আছে এক অসাধারণ আধুনিক উচ্চারণ রীতি। এই ধরনের কণ্ঠকে কোনো পরিচালক ব্যবহার করলে, কণ্ঠ নিজেও একটা আলাদা অর্থ নিয়ে আসে। সত্যজিৎ ঠিক এই জায়গাতেই ছিলেন আর পাঁচজনের থেকে আলাদা অন্যরকম। তিনি এমন কণ্ঠ চাইতেন, যা দৃশ্যের ভেতরে গিয়ে মিশে যাবে; কণ্ঠ নিজে কোনো আলাদা ঘটনা হয়ে উঠবে না। আমরা লক্ষ্য করে দেখেছি সত্যজিতের সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা গান অনেক সময় চরিত্রের সম্প্রসারণ হিসেবে , কখনও পরিবেশের অনুষঙ্গ হিসেবে, কখনও বা নীরবতার বিপরীত সুর হিসেবে ধ্বনিত হয়েছে সেখানে হেমন্তের মতো সাংস্কৃতিকভাবে ভারী একটি কণ্ঠ কে ব্যবহার করলে ছবির ভেতরে আর-একটি স্তর ঢুকে পড়ত যা চলচ্চিত্রের গতিকে অনেক সময় ব্যাহত করতে পারত অথবা অন্য এক নাইরেটিভ তৈরি হয়ে যেতে পারত।

এই যুক্তি শুনলে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন—তা হলে কিশোর কুমারকে চারুলতা-য় ন কেন লিলেন ? উত্তরটাই আসলে তাৎপর্যপূর্ণ। আমি চিনি গো চিনি তোমারে গানটির জন্য সত্যজিৎ কিশোরকুমারকেই বেছে নেন এবং আপত্তি সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত বদলাননি। সন্দীপ রায়ের স্মৃতিচারণে স্পষ্ট, তাঁর বাবা আগেই স্থির করেছিলেন যে ওই দৃশ্যে ওই কণ্ঠই দরকার। অর্থাৎ, সত্যজিৎ জনপ্রিয়তার যুক্তিতে গায়ক বাছেননি, আবার শুদ্ধতাবাদী চাপে নতও হননি। তিনি দেখেছেন দৃশ্যের জন্য কোন কণ্ঠ ঠিক। সেই জায়গা থেকে দেখলে হেমন্তকে না-নেওয়া কোনো অপমানের নয়।

হেমন্তের সমকালীন অবস্থান বুঝলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। মৃণাল সেনের নীল আকাশের নীচে ছবির প্রযোজনা-পরিসরে হেমন্ত ছিলেন কেন্দ্রে; আজও মৃণালের সরকারি সাইটে ছবিটির প্রযোজক হিসেবে Hemanta Bela Productions এবং সঙ্গীতে Hemanta Mukherjee-র নাম জ্বলজ্বল করছে , প্রসঙ্গত এই চলচ্চিত্রটি সর্বভারতীয় পুরস্কারও পায়। সুতরাং এই ঘটনাগুলি বলে দেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় শুধুই playback singer হিসেবেই ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন না; বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকাঠামোয় তাঁর নিজস্ব একটা ভূমিকা ছিল।

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গেও সঙ্গেও হেমন্ত সম্পর্ক প্রান্তিক নয়। দুজনেই ছিলেন আইপিটি এর কর্মী There Flows Padma, the Mother River ছবির ক্রেডিটে বিশেষায়িত চলচ্চিত্র তথ্যভান্ডারে গায়ক হিসেবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নাম পাওয়া যায়। আবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছনো কেও অস্বীকার করা যায় না। হলিউড খ্যাত কনরাড রুকসের Siddhartha ছবিতে ভারতীয় গানগুলির সুরকার হিসেবে Hemant Kumar-এর নাম নথিভুক্ত আছে; অন্য এক বিশ্বস্ত জীবনী-ভিত্তিক সূত্রে তাঁকে এই ছবির মাধ্যমে হলিউডে playback করা প্রথম ভারতীয় গায়ক বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, সুযোগের অভাব ছিল না; বরং হেমন্ত নিজেই তখন বহু জগতের শিল্পী।

তবু সত্যজিতের ছবিতে তিনি এলেন না। কেন? এমনকি হীরক রাজার দেশ গুপী গাইন বাঘা বাইন এর মতন সংগীত নির্ভর চলচ্চিত্র কি কি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বর কে কি ব্যবহার করা যেত না ?আমার মনে হয়, এর প্রথম কারণ সত্যজিৎ এর চলচ্চিত্রে নন্দন-নিয়ন্ত্রণ। সত্যজিৎ তাঁর চলচ্চিত্রের শব্দ-ভাষাকে নিজের হাতে নির্মাণ করতে চাইতেন। দ্বিতীয় কারণ, হেমন্তের কণ্ঠের সঙ্গে ইতিমধ্যেই গড়ে ওঠা সামাজিক স্মৃতি। বিশেষত উত্তমকুমারের সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দি বাংলা দর্শকের কানে এত গভীরভাবে বসে গিয়েছিল যে, সেই কণ্ঠ শোনা মাত্র পর্দায় অন্য এক আবেগ এসে যেত। নায়ক-এর মতো ছবিতে সত্যজিৎ যে উত্তমকে তাঁর স্টার-ইমেজ থেকে খানিক সরিয়ে, ভিতরের মানুষ হিসেবে পড়তে চেয়েছেন, সেখানে হেমন্তের কণ্ঠ ব্যবহার করলে সেই বিশ্লেষণের ওপর জনপ্রিয় স্মৃতির আবরণ নেমে আসতে পারত। এটা প্রমাণ নয়, কিন্তু শক্তিশালী অনুমান। তৃতীয়ত সত্যজিৎ রায় এমন শিল্পীদেরই নির্বাচন করতেন যারা তাকে সব সময় সময় দিতে পারবেন সেই দিক দিয়ে অনুপ ঘোষাল ছিলেন সবচাইতে সুবিধাজনক গায়ক অনুপ কুমার একই সাথে নতুন এবং সহজাত কন্ঠের মালিক অন্যদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পক্ষে বাণিজ্যিক কারণে সারাক্ষণ সত্যজিৎ রায়ের গানের জন্য পড়ে থাকা সম্ভবপর হতো না ফলে হেমন্ত এবং সত্যজিতের যুগলবন্দী থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি।

প্রসঙ্গ সত্যজিৎ রায় এর নির্বাচনের প্রসঙ্গে আমাদের চলে যেতে হয়। হেমন্তর নিজের কথায় যদি ওই কথাগুলি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গে নয় তবে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় চিন্তাভাবনা বা বক্তব্য আশ্চর্যরকম ভাবে আমাদের কাছে জরুরি ।কারণ। ১৯৮৯ সালের একটি সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট বলেন, সাধারণত সঙ্গীত পরিচালকই ঠিক করেন কোন composition-এর প্রতি কোন কণ্ঠ “full justice” করবে। এমনও হয়েছে, তিনি আগে গান রেকর্ড করেছেন, পরে অন্য গায়ককে নেওয়া হয়েছে। এই মন্তব্য আমাদের কে দু’টি জিনিস শেখায় । এক, হেমন্ত শিল্পকে ব্যক্তিগত অভিমান দিয়ে মাপতেন না। দুই, গায়ক নির্বাচন যে একান্তই composition centric সিদ্ধান্ত, তা তিনি মেনে নিতেন। এই সূত্রে সত্যজিৎ তাঁকে না-নেওয়ার মধ্যে যে একমাত্র ‘অপমান’ ছিল—এ কথা বলা কঠিন।

অপরদিকে সত্যজিৎ সুরকে ভাবতেন সংযমের শিল্প হিসেবে। তাঁর মতে, সঙ্গীতের কাজ দর্শককে সাহায্য করা, সিনেমাকে কখনোই সুরের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা নয়। তিনি এমন সুর চাইতেন যা “right for the scene”। অর্থাৎ, গানের স্বয়ংসম্পূর্ণ মহিমার চেয়ে দৃশ্যের সত্য তাঁর কাছে বড়। হেমন্তর শিল্পীসত্তা আবার বিপরীত মেরুতে নয়, কিন্তু ভিন্ন ধারায়—তাঁর কণ্ঠ নিজেই আবেগ উৎপন্ন করে, নিজেই চরিত্রকে জাগিয়ে তোলে, নিজেই দৃশ্যের বাইরে আর-একটি নরম আলোর বৃত্ত তৈরি করে। সত্যজিতের সিনেমা সেই আলোক কে সব সময় আমন্ত্রণ জানায়নি।

তবে এই দূরত্বের মধ্যে কোথাও কিন্তু কোনো পারস্পরিক অসম্মান ছিল না। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ তাই নির্দ্বিধায় মন্তব্য করেছিলেন, “Rabindra Sangeet has died a second time.” এই মন্তব্য হঠাৎ বলা যায় না। এর মধ্যে আছে শিল্পীসত্তার প্রতি গভীর স্বীকৃতি, আছে হেমন্তের গায়কের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সম্পর্কের সচেতনতা। যদি এই সম্পর্ক নিছক বিরোধে ভরা হত বা অশ্রদ্ধার হত, তা হলে এমন শোকবাক্য কি সত্যজিৎ রায় উচ্চারন করতে পারতেন সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা ছিল কম । তাই বলা ভালো, হেমন্ত সত্যজিতের মধ্যে শৈল্পিক সহযোগিতা অসম্পূর্ণ ছিল; কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা অসম্পূর্ণ ছিল না।

সুতরাং হেমন্ত সত্যজিতের সম্পর্কের যুগলবন্দীর মর্মকথা অন্যত্র। সত্যজিৎ রায় এমন এক auteur, যিনি নিজের ছবির শব্দ, নীরবতা, সুর, বিরতি—সবকিছুকে নিজস্ব নির্মাণে আনতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এমন এক প্রতিষ্ঠান এমন এক কণ্ঠ, যিনি নিজেই এক পূর্ণাঙ্গ জগৎ। তাই সমস্ত ইতিহাসই দেখা গেছে গেছে দুই পূর্ণ প্রতিভার মিলন সব সময় ঘটেনি। কখনও তারা পাশাপাশি থাকে, একে অন্যকে স্বীকার করেন, তবু মিশে যান না। সেই না-মেশার মধ্যেও একটা ইতিহাস থাকে, আক্ষেপ থাকে, এবং কৌতূহলও থাকে।

শেষ পর্যন্ত, সত্যজিৎ ও হেমন্তর গল্প আমাদের একটা বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে । সব মহান শিল্পী-সম্পর্ক সহযোগিতায় শেষ হয় না। কিছু সম্পর্ক পূর্ণতা পায় অসম্পূর্ণ তাতেই থেকে যায়। এখন প্রশ্ন বাংলা সংস্কৃতির এই দুই শিখর কে একে অন্যকে দরকার ছিল কি? হয়তো ছিল। কিন্তু উল্টো দিকে এটাও প্রাসঙ্গিক একে অন্যকে ছাড়া তাঁরা ছোট হয়ে যান কি? না, একেবারেই না। কিন্তু তাঁরা একসঙ্গে আরও কিছু সৃষ্টি করলে বাংলা সংস্কৃতি অন্যরকম ভাবে সমৃদ্ধ হত কি? সম্ভবত হ্যাঁ। আর সেই ‘সম্ভবত’-র মধ্যেই এই ইতিহাসের দীর্ঘ নিঃশ্বাস চাপা আক্ষেপ।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top