বাড়ি থেকে ঘর, পর্ব- ৪

01

দেবাশিষ নিজেকে সামলে নিল। শ্যামদাস প্যাটেলের তাদের বাড়িতে আসার কথা সব বলল তাকে। শুনে সুমনা উত্তেজিত হয়ে বলল—আমি সিওর, বাড়িটা এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়ার মূলে ঐ লোকটা। আজ না হয় কাল বাড়িটা ভেঙে পড়তই। ও সেটাকে এক্সপিডেট করেছে।
—মা, কিছুতেই ওকে জায়গা দেবে না।
—তুমি কি দিতে চাও নাকি?
—কখনোই না। সেরকম হলে ভাঙা বাড়িই পড়ে থাকবে ঐ জায়গায়।
তার কথায় সুমনা খুশি হল, বলে মনে হল। হেসে বলল—যাক, তোমার মধ্যে কিছুটা অন্তত দৃঢ়তা এসেছে। একটা কথা জেনে রাখো, নীলাদ্রিদা, তুহিনাদিকে বর্ধমান শহরে অনেকে জানে, চেনে। প্যাটেল চট করে ওদের ঘাঁটাবে না। কিন্তু তুমি বাইরে থাকো, এখানে অনেকেই তোমাকে চেনে না। প্যাটেল তোমাকে ছাড়বে না।
দেবাশিষ চমকে গেল। সুমনা কী বলতে চায়? ছাড়বে না মানে? জিজ্ঞাসা করল—ছাড়বে না মানে? কী বলতে চাইছিস?
—দেখো, এতখানি জায়গা পেলে প্যাটেলের ব্যবসা ভাল হবে। ও যে কোনো ভাবেই হোক জায়গাটা নেওয়ার চেষ্টা করবে। ওর পক্ষে তুহিনাদিকে বোঝানো বা ভয় দেখানোর চেয়ে তোমাকে বোঝানো বা ভয় দেখানো সহজ।
—কিন্তু আমি একা চাইলেও পুরো জায়গাটা ওকে দিতে পারব না। বড়কা আর ছোটকাকেও রাজি হতে হবে। সেটা নিশ্চয়ই প্যাটেল জানে। আমাকে ভয় দেখাবে কেন?
—সব ঠিক। ও হয়তো ভাবছে, তুমি বললে তোমার ভাই-বোনেরাও রাজি হবে।
দেবাশিষ সুমনার কথাগুলো ভাবছিল। এমনিতেই সৌরাশিষ বিদেশে থাকে। ও হয়তো আর দেশে ফিরবেই না। সেক্ষেত্রে সে আর তুহিনা রাজি হলেই প্যাটেলের কাজ সহজ হবে। সে সুমনার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, তাদের বাড়িটা নিয়ে তাদের থেকে যেন সুমনা বেশি চিন্তিত। সুমনার মতো এত গভীরভাবে সে ভেবেছে কী?
—কী হল? আবার কোথায় হারিয়ে গেলে?
সুমনার কথায় দেবাশিষের সম্বিৎ ফিরল। সে বলতে চাইল—তোর মধ্যে বারবার হারিয়ে যাচ্ছি রে! তোকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করছি। তা বলতে পারল না। তার পরিবর্তে বলল—তুই এত খবর রাখিস, জানতাম না।

—রাখি, কারণ, ঐ বাড়িটায় আমার আবেগ জড়িয়ে ছিল। যাই হোক, আর একটা কথাও জেনে রাখো। সৌরদা বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে আসবে।
দেবাশিষ আর কত অবাক হবে? সে সুমনার দিকে ঝুঁকে বলল—কী বললি? সৌর পারম্যানেন্টলি ফিরে আসবে? তুই কী করে জানলি?
—দাদার সঙ্গে সৌরদার মাঝে মাঝেই কথা হয়। ওর স্ত্রীর সঙ্গে বোধহয় খুব একটা সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না। ডিভোর্স হতে পারে।
দেবাশিষ আঁতকে উঠে বলল—সে কী? ডিভোর্স হবে কেন?
—বললাম তো, ওদের বনিবনা হচ্ছে না। তাছাড়া যে সম্পর্কে ভালবাসা নেই, সেই সম্পর্ককে সম্পর্ক বলা উচিত কি?
প্রশ্নটা করে সুমনা দেবাশিষের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন দেবাশিষকে সে প্রশ্নটা কোনো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করেছে। প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য দেবাশিষ বলল—সৌর তো প্রমোটারকে বাড়িটা দিয়ে দেওয়ার কথাই বলেছিল তুহিনাকে।

—ফিরে এলে তা আর নাও বলতে পারে। একবার খোঁজ নিও, সত্যিই ও ফিরছে কি না! আমি এখন কলেজে যাব।

—বেশ, চল তোকে কলেজ পর্যন্ত এগিয়ে দিই।

—না। তা করো না। এটা বর্ধমান, দিল্লি নয়। এখানে অনেককিছুই মানায় না।

দেবাশিষ সুমনাকে আবিষ্কার করেই যাচ্ছিল। কত পরিণত হয়েছে সুমনা! বলল—ঠিক আছে। তুই একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসিস। মা দেখা করতে চেয়েছে।

—নিশ্চয়ই যাব।

বাড়ি ফিরেও দেবাশিষ সুমনার কথাগুলো ভেবে যাচ্ছিল। তাদের সম্বন্ধে কত ওয়াকিবহাল সুমনা। অথচ, সে যে এখনও কেন বিয়ে করেনি, তার কারণটা সে বোঝেইনি। শুধু বিয়ের কথা কেন, তার বাড়ির লোকজন কেমন আছে, কিছুই এতদিন খোঁজ নেয়নি সে। ওর দাদা সোমেন সৌরর বন্ধু। অথচ সেই সোমেনেরও কোনো খবর সে জানে না। একবারও সে তার সম্বন্ধে জানতে চায়নি। সত্যিই, সে বড় আত্মকেন্দ্রিক। কী করে সে এমন হতে পারল? নিজেকে বড্ড ছোট মনে হচ্ছিল তার। ঘরে ফিরেও মাথা নিচু করে ড্রইংরুমে বসে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পরে মা এসে তাকে ঐভাবে দেখে জিজ্ঞাসা করল—কী রে, এমনভাবে একা বসে আছিস কেন?

মাকে এখনি সবকিছু বলল না দেবাশিষ। এড়িয়ে গেল।

—এমনিই বসে আছি মা।

—সুমনার সঙ্গে দেখা হল? আসতে বললি?

—হ্যাঁ মা। আসবে বলল। তুহিনা চেম্বার থেকে ফিরেছে?

—না, দেরি হবে বলেছে। লাঞ্চের সময় আসবে।

—ঠিক আছে। আমি যাই, স্নান করে নিই।

তুহিনার আসতে প্রায় আড়াইটে বেজে গেল। দেবাশিষ স্নান করার পর একদম থাকতে পারে না। মা বলে, স্নান করলেই নাকি তার পেটে খাওয়ার ঘড়িতে এলার্ম বাজে। বর্ধমানে আসার পর থেকে সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে। তুহিনা আর নীলাদ্রি এই একটা জায়গায় স্থির। দুজনেরই নিজস্ব চেম্বার। যত যাই কাজ থাকুক না কেন, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার একসঙ্গে করবেই। ওদের একমাত্র ছেলে নীলাভ নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ে। হস্টেলেই থাকে। যখন বর্ধমানে আসে, তখন তার জন্যও একই নিয়ম। দেবাশিষ মাকে নিয়ে আসার পরও সে নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। দেবাশিষের অসুবিধা হয় ঠিকই, কিন্তু সে মানিয়ে নেয়। ওদের জন্য অপেক্ষা করে।

আজ খাওয়ার টেবিলে সে সৌরাশিষের ফিরে আসার কথাটা তুলল—তুই কিছু জানিস তুহিনা? সৌর কিছু বলেছে?

—নতুন করে কী আর বলবে? বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ওদের মধ্যে তিক্ততা বাড়েই যাচ্ছিল। সেটাই হয়তো খুব বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে।

দেবাশিষের মা এসব কিছু জানেই না। অবাক হয়ে একবার দেবাশিষ আর একবার তুহিনার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। তা দেখে তুহিনা বলল—সৌরর সঙ্গে ওর বৌয়ের একদম বনিবনা হচ্ছে না। সেই কথাই আলোচনা করছি।

—কেন বনিবনা হচ্ছে না রে?

—না হওয়াটাই স্বাভাবিক জেম্মা। ওরা দুজনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কালচারে মানুষ হয়েছে। সুতরাং সুস্থভাবে একসঙ্গে থাকতে গেলে দুজনকেই কিছুটা স্যাক্রিফাইস করতে হবে, অ্যাডজাস্ট করতে হবে। কোনো একজন যদি তা না করে, তাহলে অপরজন অ্যাডজাস্ট করতে করতে একসময় হাঁফিয়ে যায়। সৌরর অবস্থা তাই এখন। ও ক্লান্ত হয়ে গেছে।

—ওদের ডিভোর্স খুব তাড়াতাড়িই অ্যাকসেপ্টেড হয়ে যাবে।

নীলাদ্রি কথাগুলো বলতে সবাই ওর দিকে তাকাল। দেবাশিষ বলল—তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে?

—হুঁ।

—ভাগ্য ভাল যে ওদের কোনো ছেলেপুলে নেই। বাবা-মায়ের জন্য বাচ্চাটা কষ্ট পেত।

কথাগুলো শুনে তুহিনা তার জেম্মাকে বলল—ছেলেপুলে নেই নয়, ছেলেপুলে নেয়নি সৌরর বৌ। সেটা নিয়েই তো অশান্তি শুরু।

তুহিনার কথা শুনে দেবাশিষ অবাক হল। কোনো কোনো মহিলা বিয়ের পর মা হতে চায় না, এটা আজকাল সে শুনছে। মেনে নিতে পারে না। কী জানি, সে হয়তো ঠিক মডার্ন নয়।

—এক গাছের ছাল আরেক গাছে লাগে না রে দাদা।

অনেকদিন পর বাবার কথাগুলো তুহিনার মুখে শুনল দেবাশিষ। কী ভাল যে লাগল তার! তুহিনাকে বলল—বাবা খুব বলত কথাগুলো। তোর আজও মনে আছে দেখছি।

—জেঠুর আর একটা কথাও মনে আছে দাদা। জেঠু বলত, প্রত্যেক কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকে। সেই সময় যত বাড়ে, তত কাজের সাফল্যের হার কমে। আমি কী বলছি বুঝতে পারছিস তুই?

দেবাশিষ কিছু বুঝতে পারে না। সে তুহিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তুহিনা হেসে বলে—সুমনা অন্য গাছের ছাল নয়। এই বাড়ির গাছেরই ছাল। এটা সময় নষ্ট না করে এবারে বোঝার চেষ্টা কর।

দেবাশিষের মুখে কোনো কথা নেই। মা হঠাৎ বলল—সুমনাকে একবার আমার কাছে নিয়ে আয় তো তুহিনা। তারপর আমি যা ব্যবস্থা করার করব।

দেবাশিষ চমকে উঠল। সে যতটুকু বুঝেছে, সুমনা এখন খুব কড়া ধাতের হয়ে গেছে। মা যদি তাকে কোনো আবেগপ্রবণ কথা বলে, তাহলে সুমনা সেটা ভালভাবে নাও নিতে পারে। মাকে এটা বোঝানো উচিত। সে মাকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই তুহিনা বলল—ঐ ভুলটা করতে যেও না জেম্মা। সুমনা খুব দৃঢ়চেতা মেয়ে। নিজে যতক্ষণ না কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ততক্ষণ ওকে দিয়ে কিছু করানো যাবে না। যা করার তা দাদাই করুক।

প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য দেবাশিষ বলল—সুমনার দাদা, সোমেন এখন কী করে রে, তুহিনা?

—লেখাপড়া তো তেমন করেনি। গ্র্যাজুয়েশনটা কোনো রকমে করেছিল। চাকরি-বাকরি কিছু পায়নি। হাসপাতাল মোড়ে একটা ফলের দোকান করেছে।

—বিয়ে তা করেনি?

—তা আবার করবে না? ঐ বিয়ে নিয়েই তো বাড়িতে অশান্তি। গ্র্যাজুয়েশন চলাকালীনই একটা নার্সের প্রেমে পড়ে। মেয়েটা উইডো আর ওর থেকে বয়সে অনেক বড়। তাতেও কাকু-কাকিমার বিয়েতে আপত্তি ছিল না। বলেছিল একটা কিছু কাজ জুটিয়ে নিয়ে তারপর যেন বিয়ে করে। তা বাবুর অত দেরি সহ্য হয়নি। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতেই বিয়ে করে নিয়েছিল। কাকু-কাকিমার সঙ্গে এখন কোনো সম্পর্ক নেই। খোসবাগানে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে।

—তাই সেদিন ওদের বাড়িতে গিয়ে সোমেনকে দেখিনি।

—সুমনা তোকে কিছু বলেনি?

—সেরকম প্রসঙ্গ আসেনি রে।

—প্রসঙ্গ নিজে থেকে আসে না দাদা। প্রসঙ্গ তুলতে হয়। তুই আর মানুষ হলি না।

তুহিনা খাওয়া শেষ করে উঠে গেল। দেবাশিষ মাকে বলল—মা, কাল তোমাকে নিয়ে বড়কাকে দেখতে যাব।

তুহিনা হাত ধুতে ধুতেই বলল—বিকালে চল দাদা। আমি আর নীলাদ্রিও যাব তাহলে। একেবারে ছোটকা আর কাকিমার সঙ্গেও দেখা করে আসব।

সৌরাশিষ একদিন নিজেই দেবাশিষকে ফোন করল।

—দাদা, বাড়িটার কিছু বন্দোবস্ত করলি তোরা?

দেবাশিষ হেসে বলল—বাড়ি বলতে এখন কিছু নেই। জায়গাটা আছে। সেটা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটা ভাবতে হবে।

—কোনো প্রমোটারকে দিস না দাদা।

—সে কী রে? তুই তো প্রমোটারকে দেওয়ার কথাই বলে এসেছিস এতদিন।

—তখন আমি মোহের ঘোরে ছিলাম দাদা। আমি দেশে ফিরে আসছি। আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমি সামনের সপ্তাহে দেশে ফিরব।

সৌর ফিরে আসবে শুনছিল এতদিন। আজ নিশ্চিত হল দেবাশিষ। বলল—আমি দিল্লি ফিরে যাব ভাবছিলাম। ঠিক আছে, তুই বরং আয়। তারপরেই যাব।

তুহিনা দেবাশিষের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। দেবাশিষ ফোন কাটতেই বলল—কবে নাগাদ ফিরবে বলল?

—কামিং উইকে।

—তাহলে তুই থেকেই যা দাদা। জায়গাটার একটা ব্যবস্থা করেই যাস।

—সৌরদা ফিরে আসছে এটা খুব ভাল কথা। কিন্তু তাতে কি প্যাটেলকে আটকানো যাবে?

—ওকে আটকানোর জন্যে কী করব তাহলে?

তুহিনাদের বাড়ির ড্রইংরুমে বসে সুমনা আর দেবাশিষ কথা বলছিল। তুহিনা বা নীলাদ্রি কেউ তখন বাড়িতে নেই। মাকে সুমনার আসার খবর দিয়ে এসেছে দেবাশিষ। সৌরাশিষের দেশে ফিরে আসার প্রসঙ্গে সুমনা প্যাটেলকে আটকানোর কথা বলল।

—তোমরা নিজেরাই ওখানে কিছু করো। তারপরেও অবশ্য ও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। সেটা একজনই আটকাতে পারে।

—কে?

ক্রমশ

বাড়ি থেকে ঘর – পর্ব ৩


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top