আমাদের কথা- প্রসঙ্গঃ রবীন্দ্রনাথ ও আত্মভক্ষণকারী বাঙালি

rabindranath

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর একশো পঁয়ষট্টি বছর পরেও তাকে ব্যবহার করে চলেছে বাঙালি কিন্তু দ্বিতীয় কোনো  রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিতে পারেনি। এই ‘ব্যবহার’ শব্দটি সামান্য অসম্মানজনক হলেও বাঙালির রবীন্দ্রপ্রীতি যে আসলে ব্যবহারমূলক সেটি বোঝানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথকে খোঁজার থেকে বাঙালি অনেক বেশি তৎপর রবীন্দ্রসাহিত্যের চর্চার মাধ্যমে ব্যক্তিগত উৎকর্ষ প্রমাণ করতে। কিন্তু উৎকর্ষ প্রমাণের জন্য রবীন্দ্রনাথের এই সার্বভৌম জনপ্রিয়তা আজও যে সমান প্রাসঙ্গিক সে তার পাশ্চাত্য স্বীকৃতির জন্য কিনা সেও ভেবে দেখা যেতে পারে।    

রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্যভাবে আন্তর্জাতিক স্তরের স্বীকৃতি বেশ কয়েকজন বাঙালি রেখেছেন বুকার প্রাইজ বা তার জন্য নমিনেশন  পেয়ে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন এবং বাংলা ভাষায় লেখেন এমন কোনো বাঙালি আজ পর্যন্ত বুকার প্রাইজ বা পুলিৎজারও পাননি। এই শূন্যতার জন্য বাঙালি দায়ী না বাংলা ভাষা দায়ী সেকথা তর্কসাপেক্ষ। কারণ শুধুমাত্র বাংলায় লিখে আন্তর্জাতিক লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব নয়। অনেকেই বলেন বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য ঠিকমতো অনুদিত হলে তারাও নোবেল পুরস্কার পেতে পারতেন। সেক্ষেত্রে ওই পাশ্চাত্য স্বীকৃতি আপামর বাঙালিকে একই মিলন মঞ্চে এখনকার থেকে বেশি আকর্ষণ করত না একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে পাশ্চাত্য স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য শুধুমাত্র মাতৃভাষায় যারা লিখেছেন এবং লিখছেন তাদের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা থাকাটাই স্বাভাবিক যতক্ষণ না সমকালীন কোনো লেখক আগ্রহী হয়ে তার ভাষান্তর করার দায়িত্ব নিচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ সে দায়িত্ব নিজেই নিয়েছিলেন এবং সেক্ষেত্রে নোবেল পর্যন্ত পৌঁছনর পথে যারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন তারা কেউই ভারতীয় ছিলেন না।

কিন্তু শূন্য দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে অনুবাদের কাজ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে অনুবাদ সাহিত্য একটি পৃথক সাহিত্যধারা রূপে প্রবলভাবে জনপ্রিয় এবং বাংলা ভাষা থেকে শুধু ইংরেজি নয়, বিবিধ ভারতীয় ভাষায় লেখা অনূদিত হয়েছে এবং বিবিধ ভাষাভাষি লেখকদের লেখাও বাংলা ভাষায় অনূদিত হচ্ছে। এতকিছুর পরেও আমরা বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কার পেতে দেখিনা। এই শূন্যতা কি বাংলা সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা নাকি এখানেও রাজনীতি বিরাজমান? রাজনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গে বলা যেতেই পারে রবীন্দ্রনাথের সময় কি বাংলা  সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতির ক্ষেত্রে এই রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না? অবশ্যই ছিল। সমকালীন সময়ে অনেকেই বিবিধভাবে রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথের অতি-আধুনিক ছন্দের এবং তাঁর অতীন্দ্রিয়বাদী ভাবনার তীব্র সমালোচনা করতেন। তিনি ‘আনন্দ বিদায়’ নামক একটি প্রহসন লিখে রবীন্দ্রনাথকে বিদ্রূপ পর্যন্ত করেছিলেন।  ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি ছিলেন রবীন্দ্র-সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সমালোচক। তিনি রবীন্দ্রনাথের ভাষাকে ‘অস্পষ্ট’ ও ‘দুর্বোধ্য’ বলে নিন্দা করতেন। বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে একদল তরুণ লেখক রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে ‘বাস্তববাদী’ সাহিত্য রচনার চেষ্টা করেন। তাঁদের অনেকের মতেই রবীন্দ্র-সাহিত্য ছিল অতিরিক্ত মাত্রায় কল্পনাপ্রসূত ও ধোঁয়াটে। মোহিতলাল মজুমদার একসময় রবীন্দ্র-ভক্ত হলেও পরে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘দেহহীন সুগন্ধী’ ভাবের সাহিত্যের সমালোচনা করেন। অনেক নিন্দুকের মতে, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন কারণ তিনি ইংরেজদের কাছে নিজেকে ‘অতীন্দ্রিয়বাদী ভারতীয় ঋষি’ হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। ‘গীতাঞ্জলি’র অতীন্দ্রিয় ভাবধারাকে সে সময় অনেকেই ‘দুর্বোধ্য ভণ্ডামি’ বলে বিদ্রূপ করতেন। ১৯১৩ সালে যখন শান্তিনিকেতনে নোবেল জয়ের অভিনন্দন জানানোর জন্য একটি ট্রেনভর্তি বিদ্বান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁদের অনেকের উপস্থিতিতেই বলেছিলেন যে, এই সম্মান আসলে তাঁর জন্য নয়, বরং পাশ্চাত্যের স্বীকৃতির জন্য। যারা আগে তাঁর নিন্দা করতেন, তাঁরা আজ অভিনন্দন জানাতে এসেছেন দেখে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। আবার প্রখ্যাত ইংরেজ চিত্রশিল্পী উইলিয়াম রোদেনস্টাইনের উৎসাহ এবং আইরিশ কবি ইয়েটসের ভূমিকা ছাড়া ‘গীতাঞ্জলি’ হয়তো সেভাবে নোবেল কমিটির নজরে আসত না। এছাড়াও টমাস স্টার্জের(রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচারের সদস্য) আনুষ্ঠানিক সুপারিশ বা মনোনয়নের কারণেই রবীন্দ্রনাথের নাম ১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয়েছিল।

সুতরাং সাহিত্যের ক্ষেত্রে আত্মভক্ষণকারী বাঙালির প্রভাব খুব নতুন কিছু নয়। সমবেত সভাতে পারস্পরিক বন্ধুতা রক্ষার সঙ্গে কূটনীতির আদানপ্রদানও হয় যার মাশুল গুনতে হয় বাংলা সাহিত্যকে। কূটনীতির প্রভাব কথাটি লেখার ক্ষেত্রে অন্য একটি দিকও উদ্ভাসিত হয়। যেমন সাহিত্যের প্রসার এবং প্রচারে রবীন্দ্র পরবর্তী  যুগ থেকে আজ পর্যন্ত যা কিছুর পুনর্নবীকরণ হয়েছে তার একটি বিশেষ চরিত্র হল সাহিত্য এবং মনোরঞ্জন বিভাগের মিলমিশে একটি মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম। এই মিশ্র সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্র, শিল্প এবং সাহিত্য পারস্পরিক  আদানপ্রদানে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মও তৈরি হয়েছে। পূর্বসূরী সাহিত্য মঞ্চে এই রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী ছিল না মিডিয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে। আজ যেহেতু সমাজমাধ্যমের মঞ্চে যে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাহিত্যের বিকাশ এবং ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ওয়াকিবহাল, তাই চাটুকারিতার পাশাপাশি সমালোচনা এবং বিরোধাভাসও মুহূর্তে জনপ্রিয় এবং প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়েছে।     

এখানেই জনমানসে বাংলা সাহিত্যের গ্রহণযোগ্যতা সাহিত্যিক কৃষ্টিকে অতিক্রম করে মানবিক বোধের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে তার লেখকসত্ত্বা একীভূত হয়ে পড়ে। জনমানসে লেখকের সাহিত্যরীতি ছাড়াও তার মানবিক উচ্চারণ এবং রাজনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় এবং পাঠ এবং পছন্দের ক্ষেত্রেও এই ভূমিকা প্রভাব ফেলে। সহজ বাংলায় বলা যেতে পারে ‘যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা’! বিজ্ঞানের ভাষায় কনফারমেশন বায়াস।   

এই সমস্যা থেকেই বাংলা সাহিত্যে গোষ্ঠীবিভাগ এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ প্রবল প্রভাবশালী হয়েছে। অতীতে যা ছিল আজ তার দশগুণ। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ একমাত্র বাঙালি যিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য স্বীকৃতি একসঙ্গে জয় করেছেন তাই এই গোষ্ঠীদ্বন্দে একমাত্র মিলনক্ষেত্র বোধহয় রবীন্দ্রজয়ন্তী এবং বাইশে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ আজও বাঙালির সেই মুক্ত মঞ্চ যেখানে তাদের বিভেদ মিলে যায় সংহতিমন্ত্রে। বাঘে,গরুতে একঘাটে জল খায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্তব্যের দুটি পথ এসে একটি হৃদয়ের মোহনায় মিলে যায়।  

কারণ যাই হোক সাধারণ বাঙালি রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রেমে, অপ্রেমে, দ্রোহে ও বিপ্লবে মুক্তি খোঁজে। এই খোঁজ যদি পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের পথ আরও উদার করতে পারে তবে হয়তো ভবিষ্যতে এমন দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত রাখতে বাঙালি সফল হবে।   


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top