রৌনক যখন এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের এসি কামরা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল, তখন সন্ধে সাতটা। মাথার ওপর ট্রাম লাইনের সেই আদিম আওয়াজ এখন ফিকে হয়ে এসেছে, তার বদলে চারদিকে এখন অ্যাপ-ক্যাবের হর্ন আর অজস্র মানুষের হাতে জ্বলে থাকা স্মার্ট ফোনের নীলচে আলো। মে মাসের গুমোট গরমেও স্টেশনের এসির ঠান্ডাটা পিঠে লেগে আছে, কিন্তু রৌনকের বুকের ভেতরটা অন্য কারণে ঘামছে।
ওর পকেটে এখন মোটে পঁচিশ টাকা আর একটা এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভ। এই পেন ড্রাইভ টাই গত তিনদিন ধরে ওর জীবনটা নরক করে দিয়েছে। মেসেজটা এসেছিল একটা আননোন নম্বর থেকে, সিগন্যাল অ্যাপে। কোনো লেখা নয়, শুধু একটা লোকেশন পিন আর একটা ভয়েস নোট। সেই গলার স্বরটা দশ বছর পরেও রৌনকের কান ভুল করেনি। অনিমেষ।
অনিমেষ। প্রেসিডেন্সি কলেজের সেই দিনগুলোয় অনিমেষ ছিল আইকন। গিটার হাতে কফি হাউসের সিঁড়িতে বসে ও যখন গান ধরত, তখন মনে হতো গোটা কলকাতা ওর পায়ের তলায়। কিন্তু এম.এ ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগে ও হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। কেউ বলেছিল ও ডার্ক ওয়েবের হ্যাকারদের সাথে জড়িয়ে গেছে, কেউ বলেছিল ও পাহাড়ের কোনো মঠে চলে গেছে। দশ বছর পর সেই ছেলেটা আজ ফিরে এসে ডেকেছে তাকে।
চৌরঙ্গীর মোড়ে দাঁড়িয়ে রৌনক দেখল একটা লম্বা মতন লোক জওহরলাল নেহরু রোডের ধারের একটা গ্রাফিতি করা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার পরনে ঢিলেঢালা কালো হুডি, মুখটা মাস্কে ঢাকা। হাতে একটা স্মার্টফোন, স্ক্রিনটা অন্ধকার। দশ বছরে মানুষ কতটা বদলে যায়! অনিমেষের সেই উজ্জ্বল শরীরটা এখন অনেকটা রোগা আর সতর্ক, যেন কোনো অদৃশ্য প্রিডেটর ওকে তাড়া করছে।
রৌনক কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটা ঘুরে তাকাল। মাস্কের ওপর দিয়ে ওর চোখ দুটো ঝিলিক দিয়ে উঠল। অনিমেষই বটে। কিন্তু চোখের কোণে একটা গভীর কাটা দাগ, যেটা হয়তো কোনো অন্ধকার গলির লড়াইয়ের স্মৃতি বহন করছে। অনিমেষ হাসল না, শুধু একটা ছোট করে ঘাড় নাড়ল।
“এলি তাহলে শেষ পর্যন্ত? ভাবিনি তোর ফোনে এখনও সিগন্যাল অ্যাপটা নামানো আছে,” অনিমেষের গলায় একটা যান্ত্রিক রুক্ষতা। “হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি চল। এই শহরটার এখন হাজার হাজার চোখ রৌনক। প্রতিটা সিসিটিভি ক্যামেরা এখন পুলিশ বা অন্য কারোর হয়ে আমাদের দেখছে।”
ওরা হাঁটতে শুরু করল কার্জন পার্কের সেই অন্ধকার দিকটার দিকে। অনিমেষ বলতে শুরু করল। ও কোনো সাধু হতে যায়নি। ও জড়িয়ে পড়েছিল এক বিশাল ডেটা স্ক্যামের সাথে। ও বুঝতে পেরেছিল যে এই শহরের প্রভাবশালী নেতা আর বড় বড় বিজনেস টাইকুনরা সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য আর ব্যাংকিং ডিটেইলস পাচার করছে বিদেশের সার্ভারে।
“জানিস রৌনক,” অনিমেষ নিচু স্বরে বলল, “ওই পেনড্রাইভে যা আছে, তা যদি লিক হয়, তবে এই রাজ্যের অর্ধেক পাওয়ার ফুল লোক নেতা-নেত্রী জেলে যাবে। এটা শুধু কয়লা বা বালির কেলেঙ্কারি নয়, এটা মানুষের মগজ আর পকেট লুঠের হিসেব। আমি ওদের মেইন সার্ভার হ্যাক করে এই ব্যাক আপটা নিয়েছি। ওরা এখন আমাকে ট্র্যাক করছে জিপিএস দিয়ে।”
রৌনক স্তম্ভিত হয়ে শুনছিল। ও সামান্য একজন হাইস্কুলের মাস্টার। সকালে হোয়াটস অ্যাপে স্টুডেন্টদের নোটস পাঠানো আর রাতে ফেসবুক স্ক্রল করা ছাড়া ওর প্রযুক্তির সাথে আর কোনো সম্পর্ক নেই। ও এখন এক ডিজিটাল যুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। ও জিজ্ঞেস করল, “তুই পুলিশকে দিলি না কেন?”
অনিমেষ একটা শুকনো হাসি হাসল। “পুলিশ? ওদের আইটি সেলই তো আমাকে তাড়া করছে। তুই ওই পেনড্রাইভটা তোর কাছে রাখ। ওটা পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড। যদি কালকের মধ্যে আমার কাছ থেকে কোনো মেসেজ না পাস, তবে আমি তোকে একটা ইমেইল আইডি পাঠিয়ে দেব ড্রাফটে, সেখানে ওটা আপলোড করে দিবি। আমি জানতাম, যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তবে তুইই হবি একমাত্র লোক যাকে ওরা সন্দেহ করবে না।”
রৌনকের হাত কাঁপতে শুরু করল। ঠিক তখনই ও দেখল রাস্তার ওপারে একটা কালো রঙের এসইউভি গাড়ি খুব আস্তে আস্তেএগিয়ে আসছে। গাড়ির ভেতরে কেউ নেই মনে হচ্ছে, কিন্তু ড্যাশবোর্ডের ওপর একটা নীল আলো জ্বলছে-নিভছে। অনিমেষের শরীরটা হঠাৎ টানটান হয়ে উঠল। ও রৌনকের হাতে নিজের ফোনটা গুঁজে দিয়ে বলল, “পালা! এখনই পালা রৌনক। নিজের ফোনটা এখনই এয়ারপ্লেন মোডে দিয়ে দে।”
রৌনক ছুটতে শুরু করল। নিউ মার্কেটের অলিগলির ভেতর দিয়ে ও দৌড়াচ্ছে। পকেটে পেন ড্রাইভটা ওর ঊরুতে বারবার বিঁধছে। ওর নিজের স্মার্টফোন টা এখন পকেটে একটা বোমার মতো ভারী হয়ে উঠেছে। ও জানে, ওর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এখন ওর মরণফাঁদ হতে পারে। ও একটা অন্ধকার গলি দিয়ে সোজা ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে বেরিয়ে এল।
মাথা ঝিমঝিম করছে ওর। ও একমুহূর্তের জন্য একটা বন্ধ দোকানের শাঁটারের সামনে দাঁড়াল। হাঁপাচ্ছে ও। কলকাতার রাতটা এখন অন্যরকম। প্রতিটা মোবাইলের টাওয়ার কে এখন মনে হচ্ছে এক একটা নজরদারি করার মিনার। ও বুঝল ও বাড়িতে ফিরতে পারবে না। ওর মা একা থাকেন, সেখানে যাওয়া মানেই বিপদকে ডেকে আনা।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা শান্ত গম্ভীর গলা শোনা গেল, “ড্রাইভটা দিয়ে দিন রৌনক বাবু, খামোখা ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই।” রৌনক ঘুরে দেখল দুজন লোক দাঁড়িয়ে। একজনের হাতে একটা স্মার্টফোন, যেটার ক্যামেরা সরাসরি রৌনকের দিকে তাক করা। অন্যজনের হাতে ছোট একটা ধাতব বস্তু। রৌনক পকেটে হাত দিল। ও জানে ও লড়তে পারবে না। কিন্তু ওর ভেতরে হঠাৎ এক অদ্ভুত জেদ চেপে বসল।
“ড্রাইভটা আমি ড্রেনে ফেলে দিয়েছি,” রৌনক শান্ত গলায় বলল। লোকটা তেড়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার মোড়ে একটা পুলিশের পিসিআর ভ্যান সাইরেন বাজিয়ে ধেয়ে এল। লোক দুটো মুহূর্তের মধ্যে পাশের গলিতে মিলিয়ে গেল। রৌনক বুঝল, হয়তো রুটিন টহল ছিল, কিন্তু ও বেঁচে গেল।
পরদিন সকালে সূর্যটা যখন গঙ্গার ওপার থেকে উঠল, রৌনক তখন বাবু ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছে। ওর স্মার্ট ফোনটা বন্ধ। ও স্ক্রল করতে করতে একটা অনলাইন পোর্টালের ব্রেকিং নিউজ দেখল— “বাইপাসের ধারে এক অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের দেহ উদ্ধার। পাশেই পড়ে ছিল একটি ভাঙা আইফোন।”
রৌনকের চোখের কোণটা একটু ভিজে উঠল। অনিমেষ চলে গেছে, কিন্তু ও ওর কাজটা দিয়ে গেছে। রৌনক পকেট থেকে পেন ড্রাইভটা বের করল। ভোরের প্রথম আলোয় রৌনক দেখলো ওটা একটা ছোট তলোয়ারের মতো ঝকঝক করছে। রৌনক তাই আর পালাতে চাইছে না। ও উঠে দাঁড়াল। ওর গন্তব্য এখন শহরের সেই পুরনো প্রেস ক্লাব। তারপর সরাসরি লালবাজারে।
সাধারণ মাস্টারমশাই রৌনক আজ আর আগের মতন ভীতু নেই আর হাঁটাচলা বদলে গেছে ওর ভেতর এখন এক নতুন মানুষ জেগে উঠেছে। রুনক স্বপ্ন দেখছে অনিমেষের সেই ডিজিটাল বারুদ এখন এই শহরের অনেক নামিদামি মানুষের মুখোশ খুলে দেবে। রৌনক গঙ্গার দিকে পিঠ দিয়ে শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। রৌনক দেখলো ট্রামের ঘণ্টা আর স্টার্টআপ অ্যাপের নোটি ফিকেশনের শব্দে শহরটা জেগে উঠছে। রৌনক ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল, কিন্তু ও বুঝতে পারললো এখন থেকে আর সে একা নয়। ওর সাথে আছে অনিমেষের শেষ বিশ্বাস আর একটা এনক্রিপ্টেড পেন ড্রাইভের অমোঘ দায়িত্ব।



