আত্মবিদ্বেষ বাঙালির মজ্জা গত, আর তার সবচেয়ে সহজ শিকার হলো মধ্যবিত্ত। কোনো এক অদ্ভুত সামাজিক ফ্যাশনে নামধ্যবিত্ত কে একই সঙ্গে কাপুরুষ, সুবিধাবাদী, হিংস্র আর পরশ্রীকাতর বলে দাগিয়ে দেওয়াটা আজকাল কার বুদ্ধিজীবী মহলের সবচেয়ে নিরাপদ ও সস্তা বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপরের তলার অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়ানো আর নিচের তলার মানুষকে বুটের তলায় পেষা— এটাই নাকি মধ্যবিত্তের একমাত্র পরিচয়! ভলতেয়ার যেমন বলেছিলেন, “আমরা যখন কোনো একটি শ্রেণীর নিন্দা করি, তখন আমরা আসলে নিজেদের ভয়ের মুখোমুখি হতে ভয় পাই।” মধ্যবিত্তের প্রতি এই ঢালাও বিষোদ্গারের আড়ালে যে গভীর একপেশেপনা লুকিয়ে থাকে, তা সমাজতত্ত্বের আসল সত্যটাকে আড়াল করে দেয়। মধ্যবিত্ত কি সত্যিই কেবল এক ‘ফ্যাশনদুরস্ত শয়তান’, নাকি সে আসলে এক অনন্ত টানা পোড়েনের শিকার, যার কাঁধে ভর করেই সমাজ আজও ন্যূনতম সুস্থতা টিকিয়ে রেখেছে?
আসলে এই তথাকথিত ‘উচ্ছেদ-উৎসব’ বা ‘সহিংসতার উল্লাস’ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর একক মনোরোগ নয়। ভিড়ের যে ইতরতার কথা বলা হয়, তা ক্ষমতার রূপান্তরকামী চরিত্র। যখন রাষ্ট্র বা কোনো বড় শক্তি অপরিকল্পিত ভাবে হকার উচ্ছেদ করে বা ফুটপাথ ফাঁকা করার অছিলায় ক্ষমতার আস্ফালন দেখায়, মধ্যবিত্তের একটা অংশ সেখানে শৃঙ্খলা খোঁজে— হিংস্রতা নয়। যে মধ্যবিত্তকে ‘জোম্যাটোয় পিৎজা খাওয়া’ সুবিধাবাদী বলা হচ্ছে, সেই মধ্যবিত্তই কিন্তু সকালের লোডশেডিং থেকে শুরু করে ট্রাফিকের জ্যাম, ট্যাক্সির জুলুম আর হাসপাতালের চড়া বিলের সামনে সবচেয়ে বেশি অসহায়। বড়লোকের সুরক্ষা আছে টাকার দেওয়ালে, গরিবের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আছে ভোটব্যাংকের রাজনীতি আর ঝান্ডাধারী দল। কিন্তু মধ্যবিত্ত? সে সম্পূর্ণ একা। এই দোলা চলকে ব্যঙ্গ করে অনেকেই বলেন,
ট্যাক্স দিই খাসা, ফুটপাথে পাই না হাঁটার জায়গা,
বড়লোকে মারে চড়, গরিব দেখায় ফ্যাঁকড়া!
আমরা তো সেই মাঝনদীর সস্তা চুনোপুঁটি,
সবার শেষে আমাদেরই ভাগ্যে জোটে জুতি।
জনরোষ বা ভিড়ের বিচারকে মধ্যবিত্তের ‘আমোদ’ বলে দাগিয়ে দেওয়াটাও এক ধরনের চাতুরী। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ নেতা বা দাম্ভিক তারকার গালে যখন চড় পড়ে বা জুতো ছিটকে আসে, তখন মধ্যবিত্তের ‘বেশ হয়েছে’ বলার মধ্যে কোনো স্যাডিজম থাকে না; বরং থাকে এক চিরবঞ্চিত সাধারণ মানুষের ঐতিহাসিক ক্ষোভের প্রতিফলন। যে বিচারব্যবস্থা বা রাষ্ট্র বড়লোকদের সাত খুন মাফ করে দেয়, সেখানে সাধারণ মানুষ যখন আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ক্ষমতার অহংকার ভাঙতে দেখে, তখন সে ক্ষণিকের জন্য হলেও একটা সমতার স্বপ্ন দেখে। একে ‘ইতরতা’ বলা সহজ, কিন্তু এর পেছনের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনাকে চেনা অত সহজ নয়।
ফুটপাথ ফাঁকা করার আকাঙ্ক্ষা কে যারা ‘বুলডোজার-সংস্কৃতি’ বা ‘গরিব-খুন’-এর ফ্যান্টাসি বলছেন, তারা নাগরিক অধিকারের ভারসাম্যকে অস্বীকার করছেন। একটা শহর কি শুধু কিছু মানুষের রুজি রোজগারের জায়গা, নাকি সেখানে সাধারণ পথচারীর নিরাপদে হাঁটার অধিকারও থাকবে? মধ্যবিত্ত যখন ফুটপাথ পরিষ্কার দেখতে চায়, তখন সে কোনো গরিবের পেটে লাথি মারতে চায় নি, সে শুধু তার করের টাকায় গড়া শহরের ন্যূনতম নাগরিক সুযোগটুকু ফিরে পেতে চায়। হকারদের পুনর্বাসন অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কিন্তু সেই ব্যর্থতার সমস্ত দায় মধ্যবিত্তের ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে ‘অ-দরদি হিংস্র’ সাজানো চরম অন্যায়। গরিবের প্রতি সহানুভূতি থাকা ভালো, কিন্তু সেই সহানুভূতির চশমা যদি নাগরিক বিশৃঙ্খলাকে রোমান্টিসাইজ করতে শুরু করে, তবে তা সমাজের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। মনে পড়ে জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎসের সেই অমোঘ বাণী— “যারা দানবের সাথে লড়াই করে, তাদের খেয়াল রাখা উচিত যাতে তারা নিজেরা দানব না হয়ে যায়।” নাগরিক বিশৃঙ্খলা কে প্রশ্রয় দেওয়াও এক ধরনের দানবীয়তাকে ডেকে আনা।
বাঙালি মধ্যবিত্ত চিরকালই সংস্কৃতির ধারক, প্রতিবাদের প্রথম কণ্ঠস্বর।বামপন্থী সমানুভূতির কম্বল সে ছুড়ে ফেলেনি, বরং সেই কম্বলের তলায় লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামিকে সে চনে নিয়েছে। যে দলগুলো গরিবের ঝান্ডা ধরেছিল, তারা যখন বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বিক্রি করেছে, তখন মধ্যবিত্ত মুখ ফেরাতে বাধ্য হয়েছে। একে ‘কক্রোচ-জনতা-পার্টির উত্থান’ বা ‘বর্বরতার বীরত্ব’ বলে গালি দিলে ইতিহাসের গতিপ্রকৃতিকে অপমান করা হয়। মধ্যবিত্ত আজ বাস্তববাদী হতে বাধ্য হয়েছে, কারণ সে বুঝেছে যে কেবল শূন্যগর্ভ তাত্ত্বিক সমানুভূতির বুলি আওড়ালে পেট ভরে না, সমাজও এগোয় না। তাই তাকে কদর্যচিত্ত বা দাঙ্গার নায়ক না ভেবে, এক ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থার মধ্যে লড়াই করে বেঁচে থাকা এক ক্লান্ত কান্ডারী রূপে দেখাই কি বেশি যুক্তিসঙ্গত নয়?




ভালো বাস্তব ধর্মী লেখা