মুজঃফরপুরের দিনগুলো ২য় পর্ব

mujjafparpur

আজ স্কুল থেকে ফিরলাম ঠাকুর ললন সিঙের ছেলের সঙ্গে, সত্যেন্দ্র, ওদের উচ্চারণে সত্যেন্দর। ৩৫ বছরের যুবক, একটা শর্টস আর টি-শার্ট, জিপ নিয়ে এসেছিল। দোহারা চেহারা, পাঁচ-নয় হাইট, গায়ের রং কালো, হালকা দাড়ি আর গোঁফ, স্ট্রেইট চুল। সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছে, ২৯ তারিখ চলে যাবে।

আমি ফরমাল ড্রেসে ছিলাম, ফেরার আগে বৃষ্টি হয়েছে, বাংলার মাটি থেকে বৃষ্টির যে সোঁদা গন্ধটা উঠে আসে, সেটা এখানে নেই। যদিও পুরো পথটাই সবুজ, দুয়েকটা অস্থায়ী নালা তৈরি হয়েছে।
এখানে ‘ঠাকুর’ অর্থাৎ রাজবংশীয় ক্ষত্রিয়দের দাপট প্রচণ্ড। যদিও ঠাকুর এই অঞ্চলে একটা পদবীও হয়, তারা নাপিত। কিন্তু যারা নামের আগে ‘ঠাকুর’ বসায়, তারা ক্ষত্রিয়, এবং এই অঞ্চলে হওয়ায়, এরা সবাই দ্বারভাঙার রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের দাপটে ‘বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়’, এমনকি পার্লামেন্টে পর্যন্ত এদের লোক আছে। এখানকার লোক রসিয়ে রসিয়ে গল্প করে ঠাকুর শিবজী সিং কীভাবে থানায় ঢুকে এস.পি.-র গালে চড় মেরে এসেছিল। এবং আমি এখানে আসার পর আমাকে বলা হয়েছিল, “আপ হমলোগোঁকে পরিবার সে জুড় গয়ে হ্যাঁয়। আপ কে উপর কোই নজর উঠাকে দেখনে কা হিম্মত নহি করেগা।”

আমার অবশ্য এসব দিকে নজর ছিল না, এসব দাপট আমিও শৈশবে অনেক দেখেছি, তাই নতুন না। আমার মন পড়ে আছে এখানকার সাধারণ মানুষ আর প্রকৃতির দিকে।

মোতিহারি আর মজঃফরপুরের দুই প্রান্ত ছুঁয়ে থাকা একটা পথ, তার পাশে পাশে বিস্তীর্ণ ক্ষেত, গরিব চায়ের দোকান, শস্তার সিগারেট, মহুয়ার আড্ডা—এসব জায়গাতেই ঘুরে ঘুরে বেড়াই। আমবাগানের ভিতর মধু চাষের জায়গায় গেলে ওরা খাতির করে বসায়, মাঝেমাঝে শালপাতায় করে চাক ভাঙা মধু খেতে দেয়।

মধুতে প্রচণ্ড নেশা হয়। দুর্গাপুরে বি-জোনের একটা গাছে একটা বিরাট মৌচাক ছিল। আমাদেরই বন্ধুস্থানীয় একটা ছেলে, ভালো নামটা মনে পড়ে না, ঠেক থেকে দেওয়া নাম ছিল ‘বোতা’, এক দুপুরে চাক ভেঙে মধু খেতে খেতে ওর কথা জড়িয়ে গিয়েছিল, এবং তারপর ওই গাছতলাতেই ঘণ্টাখানেক শুয়ে থাকতে হয়েছিল। তবে আমার নেশা করার ইচ্ছা নেই। উপকরণ প্রচুর, চাইলেই ঘরে চলে আসবে, কিন্তু সে সব দিন পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছি।

এই বিস্তীর্ণ প্রকৃতি, শস্যক্ষেত, এখানকার ভূমিপুত্ররা, এরা সবাই আমাকে খুব আপন করে নিয়েছে। মাঝেমাঝে দূরের সিগারেটের দোকানে বেরোই, লাল মাটির পথ, ক্ষেতে মেয়েরা কাজ করছে, অবাক হয়ে চোখ তুলে শহুরে মাস্টারমশাইকে দেখে। আর মাঝরাস্তা থেকে কেউ আমাকে বাইকে তুলে নেয়। তারপর একটু আড্ডা, তবে আমার হাঁটতেই ভালো লাগে।

নগেন্দ্র সিং এদেরই আত্মীয়, এক সকালে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ওদের বাড়ি, অনেকটা ছড়ানো, গাছের ছায়ায় একতলা বাড়ি, বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সবাই এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। একে মাস্টারমশাই, তার ওপর পৈতা আছে। না করলেও শুনতে চায় না, তারপর যত্ন করে বসিয়ে একটা প্লেটে প্রায় দশটা গরম মালপোয়া আর এক গ্লাস চা এনে উপস্থিত করল। আমি সবগুলোই খেলাম। বাঙালিদের মতো তো হবেই না, কিন্তু খেতে খারাপ না।

একদিন ক্ষেতের ভিতর চাষীদের সঙ্গে মাচায় বসে রাত কাটানোর ইচ্ছা আছে। নেপালের দিক থেকে গভীর রাতে কনকনে হাওয়ার ভেতর আগুনে হাত সেঁকে নিতে নিতে এদের গল্প শুনব। এদের সাথে এদের মতো করেই নেশা করব। এদের সঙ্গে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে থাকব, আর মনে পড়বে না কিছু, কলকাতা, আমার ফ্ল্যাট, সামনের পার্ক, সেসব বিগত জন্মের কথা। ফিরব না আর। এখান থেকেই পাড়ি দেব আরো উত্তরের দিকে। কলকাতায় আমার কিছু নেই।

মুজঃফরপুরের দিনগুলো পর্ব-১

ক্রমশ


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top