পাথর আমার ডাকনাম (৪-র্থ পর্ব)

pathor amar

শৈশবের কথা লিখতে বসে যত পিছন দিকে তাকাচ্ছি, চোখে ভেসে উঠছে নানান বিচিত্র সব ঘটনা! স্মৃতি এসে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে একেকটি দিনের কাছে। একেকটি গূঢ় অত্যাশ্চর্য ঘটনার কাছে। আজ এই পূর্ণাঙ্গ বয়সে এসে তাদের নতুন করে দেখছি আর পৌঁছে যাচ্ছি সেই সব ঘটনার একেবারে অন্তরীণ অন্তর্গত ভিতরে। দেখছি কত বিচিত্র ও বিস্ময়কর মুখ! আপাতদৃষ্টিতে কিন্তু সেইসব মুখ নিতান্তই সাধারণ! একেবারেই আর পাঁচটা মানুষের মুখের মতো স্বাভাবিক। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতার চিহ্ন মাত্র নেই। কারও পক্ষে সম্ভবই না সেই সব মরমি মুখের ওপর থেকে মুখোশের শক্তপোক্ত পরতটাকে টেনে সরিয়ে আসল মুখটাকে বের করে আনা। আত্মীয়-অনাত্মীয়ের সেই সব ভয়াবহ মুখ, খোলসের মতো সেসব মুখোশ খুলে পড়ার পর তাদের মুখগুলো দেখতে যে কী ভীষণ কুৎসিত লাগে! আর সব চেয়ে দুঃখের ব্যাপার হল যে সেই ভয়াবহ মুখগুলো একটি শিশুর মনে কী সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া রেখে যায়!

বড় বয়সে এসে, একটা জিনিস বুঝলাম, জীবনের নানান প্রতিকুলতা কিংবা বিরুদ্ধ পরিবেশ পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাদের জীবনে নানান চৌর্যবৃত্তির (?) প্রতিফলন দেখা যায়। জীবন যাপনের জন্য মানুষকে কত না ছলনা, কত আড়াল, কত বিশেষ লুকোচুরির খেলা যে খেলতে হয় বড় বয়সে এসে! মানুষ তাকে বহু ক্ষেত্রে এক কথায় চৌর্যবৃত্তিই বলে। আজ আমি যে ঘটনার কথা বলছি তাকে যদি চুরি করা বলা হয়, তাহলে সেটাই আমার জীবনের সর্বপ্রথম চৌর্যবৃত্তির সূচনা।

সেটা শীতকাল। আমাদের শৈশবে, ফি বছর শীতকাল এলেই এখানে ওখানে সার্কাস, ম্যাজিক, যাত্রা আরও কত মজার মজার অনুষ্ঠান যে শুরু হয়ে যেত! পুরো শীতকাল জুড়েই সব বাচ্চাদের মনে বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকত। আমিও ছিলাম সেই আনন্দের শরিক। সার্কাস, ম্যাজিক এসব তো ছোটদেরই আকর্ষণ করে বেশি। কোথাও সার্কাস বা ম্যাজিক এলে কোম্পানির তরফ থেকে সারা শহর জুড়ে মাইকিং করে তাদের উপস্থিতি এবং স্থান জানান দেওয়া হতো। আর সেই বার্তা কানে এলেই সকাল থেকে আমি ঠাকুমার গায়ে গায়ে ঘুরঘুর করতাম। এটা সেটা কাজ করে দিতাম, যদি ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে! যদি সার্কাস বা ম্যাজিক কোথাও একটা নিয়ে যায়!

তো সেদিন ঠাকুমা নিয়ে গেছে  ম্যাজিক দেখতে। ত্রিপল পেতে বসার ব্যবস্থা। সব ছোটরা সামনের সারিতে বসেছে। পিছনে বড়রা। আমার পাশাপাশি আমাদের পাড়ার অন্য ছোটরাও রয়েছে। সবাই একমনে ম্যাজিক দেখছি। কিছুই বুঝছি না কিন্তু, শুধু অবাক হয়ে দেখছি। ম্যাজিশিয়ান ভদ্রলোক ভুরুংভারুং কী সব বলছে আর নানান খেলা দেখিয়ে চলেছে! কী যে অবাক আর অবিশ্বাস্য সব খেলা! এক সময় সেই ম্যাজিশিয়ান কী জানি কোন ছু মন্ত্র বলে রাশি রাশি খেলনার ছোট্ট ছোট্ট হাঁড়ি কড়াই থালা গেলাস এসব  তৈরি করে ফেলল তারপর সেই সুন্দর ঝকঝকে বাসনপত্রগুলো সব ছড়িয়ে দিল আমাদের দিকে। কী লোভনীয় সেসব খেলনা! ওরকম খেলনা আমার একটাও নেই, আর হবেও কোনওদিন, হবে কী করে? কে কিনে দেবে? বাড়ির লোকজন তো খেলতেই দিতে চায় না, তারা নাকি আবার খেলনা কিনে দেবে! আমি দেখছি আমার একদম হাতের নাগালের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আছে খেলনাগুলো। অত অগুনতি খেলনার মধ্যে থেকে আমি যদি দু’ একটা লুকিয়ে তুলে নিই ওরা কি ধরতে পারবে? নিশ্চয়ই পারবে না। ওদের নিশ্চয়ই গোনা নেই! নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ চলছে আমার, নেব? নাকি নেব না? কয়েকবার হাত নিয়ে গিয়েও ভয়ে নিতে পারলাম না। কিন্তু অতক্ষণ ধরে ফেলে রেখেছে কেন? তবে কি ওরা ওগুলো আর নেবে না? লোভ আমাকে কিছুতেই সুস্থির থাকতে দিচ্ছে না। এক সময় একদম আমার হাতের কাছে পড়ে থাকা দু’টো হাঁড়ি আর একটা কড়াই আমি টুক করে তুলে নিয়ে আমার জামার ভেতরে লুকিয়ে রাখি। সে যে কী ভয়াবহ মনের অবস্থা! এক দিকে আনন্দ, স্বপ্ন, কোনও ভাবে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারলেই কাল থেকে এই খেলনা আমার, একদম আমার নিজের! আর অন্যদিকে ভয়। যদি ধরা পড়ে যাই! তাহলে তো দিয়ে দিতে হবে! হাতের মুঠোয় স্বপ্ন পেয়েও ছেড়ে দিতে হবে! আর একটু পরে তাই ঘটল। ম্যাজিশিয়ানের একজন লোক এসে সব খেলনা কুড়িয়ে বস্তা ভরে নিয়ে গেল, আমার কাছ থেকেও লুকোনো খেলনা কেড়ে নিল, আসলে ওরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছিল যে আমি ওগুলো নিয়েছি, আর যেটা সব চেয়ে লজ্জার আর কান্নার ব্যাপার, সেটা হল, সবার চোখে আমি চোর বনে গেলাম। সবাই দেখল আমি তিনটে খেলনা চুরি করেছিলাম। ঠাকুমা তো যার পর নাই বকলো, বলল, আর কোনওদিনও তোকে কোথাও সঙ্গে নেব না।

পরদিন বিকেলে খেলতে গেছি, দেখছি আমাকে কেউ খেলতে নিচ্ছে না। বলছে, তুই চোর তোকে খেলতে নেব না। তুই আমাদের সঙ্গে খেলতে আসবি না। সবাই চিৎকার করে বলছে, ওকে কেউ খেলতে নিবি না, ও চোর… ও চোর…  আমি যত কাঁদছি ওরা তত চিৎকার করে উল্লাস করছে চোর… চোর… চোর…  আমার ভেতরে লজ্জা অনুতাপ কী যে হচ্ছে আর কী যে হচ্ছে না! চুরিটা তো আমি সত্যিই করেছিলাম! আর অতগুলো মানুষের সামনে ধরাও পড়ে গেছি! একেবারে হাতেনাতে ধরা পড়া যাকে বলে! সুতরাং চোর তো আমাকে বলবেই!

আমি কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এসে চুপ করে ঘরের কোণে বসে থাকি। কী যে কষ্ট হচ্ছে ভেতরে! আসলে আমি তো চুরি করিনি, আমার ওরকম সুন্দর ঝকঝকে খেলনা নেই তাই লোভ সামলাতে না পেরে তিনটে মাত্র নিয়েছিলাম!  ওদের তো অত্তোগুলো ছিল! ওই তিনটে কি আমাকে দিয়ে দিতে পারত না?

দিন কয়েক পরের ঘটনা। বৃষ্টির দুপুর। সকাল থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বৃষ্টি একটু ধরলে মা আমাকে পয়সা দিয়ে বলেছে, যা বেকারি থেকে এক পাউন্ডের দুটো পাউরুটি নিয়ে আয়। বেকারিটা বাড়ির  কাছেই। দোকানের তুলনায় বেকারির পাউরুটি টাটকা হয় বলে আমাদের বাড়িতে সব সময় বেকারি থেকেই পাউরুটি আনা হয়। আমি আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। হঠাৎ করে পাশ থেকে আমাদের পাশের বাড়িতে ভাড়া থাকা মাংসঅলার ছেলেটা (আমি ছেলেটার নাম জানি না। ওর বাবা বাজারে পাঠার মাংস বিক্রি করে) আমার সামনে এসে আমাকে বিদ্রুপ করছে, ‘এ্যাই চোর, এ্যাই চোর! কী চুরি করতে যাচ্ছিস? বল কী চুরি করতে যাচ্ছিস?’ শুনে প্রচন্ড রাগে আমার ভেতরটা রি রি করে ওঠে। কিন্তু তেরো চোদ্দো বছরের  একটা ছেলেকে আমি ওইটুকু পুঁচকে একটা মেয়ে কী করে আর প্রতিশোধ নেব? প্রচন্ড রাগে আমি তাকে দু’বার জিভ ভ্যাঙচিয়ে দিই। সেই মুখ ভ্যাঙানোর অপরাধে ছেলেটা আমাকে জোর করে ধরে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় নিঝুম মতো একটা বারান্দায়। তারপর হায়নার মতো হিংস্র হাতে আমার প্যান্ট খুলতে থাকে। সেকি নিষ্ঠুর আর ভয়ঙ্কর তার রূপ! যেমন কুৎসিত তার চেহারা তেমনই কুৎসিত তার আচরণ! যেন বা চরম ক্ষুধার্ত কোনও নেকড়ে নিজের নাগালে পেয়েছে এক কচি হরিণ ছানাকে। সেই শিশু হরিণের ইজেরের দড়ি টেনে খুলে দিচ্ছে সে। কী শক্তি! ছোট একটা শরীরের সাধ্য কী তার সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে মুক্ত করে! তবু আপ্রাণ চেষ্টা করি আমি। ভয়ঙ্কর চিৎকার করতে থাকি। বিপদে পড়লে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে কারও সাহায্য চাইতে তখনও শিখিনি, শুধু মা বলে দিয়েছে কেউ প্যান্ট খুলতে চাইলে তাকে বাধা দিবি, খুলতে দিবি না, আমি তাই করে যাচ্ছি, দুই পা দিয়ে সমানে লাথি ছুড়ছি আর চিৎকার করছি প্রাণপণ, ছাড়ো আমাকে, ছাড়ো, ততক্ষণে সে নিজেকে নগ্ন করে ফেলেছে, সে এক হাতে নিজের পুরুষাঙ্গটাকে ধরে অন্য হাতে আমার মুখ চেপে ধরেছে, দুই হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছে আমার দুই পা। আমার শরীরে ঢোকাতে চাইছে তার খাড়া হয়ে দাঁড়ানো পুরুষাঙ্গটিকে।

 কী ভাগ্য, ঠিক তখনই ওই বারান্দা লাগোয়া ঘরটির দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে সন্ধ্যাপিসি। সন্ধ্যা পিসিদেরই বাড়ি ওটা। হয়তো আমার চিৎকার শুনেই বেরিয়েছে পিসি। পিসিকে দেখেই আমাকে ছেড়ে দুদ্দাড় দৌড় দিয়েছে ওই শয়তানটা। সন্ধ্যা পিসির বেরতে আর একটুখানি দেরি হলে কী যে ঘটতে পারত!


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top