মুজঃফরপুরের দিনগুলো (পর্ব তেরো)

mujjaffarpur 13

এখনকার দিনগুলো ( ১৩ )

কাল রাতে ওই রহস্যময় গাছটার কাছে গেছিলাম। বিরাট, মহীরুহ বলাই ভালো। আগের পর্বে ওই গাছটার কথা কিছুটা বলেছি।

বন জঙ্গল ভেঙে যেতে হলো, হাতে একটা সদ্য কেনা টর্চ, এদিকে এখন মনসার চেলা চামুণ্ডারা কিছু হলেই ফোঁস করে উঠছেন, কাজেই পদভারে মেদিনী প্রকম্পিত করে চলাফেরা করতে হয়। প্রায়ই ঘনঘোর বৃষ্টিতে সব ভিজে আছে, ঘাস বেড়ে উঠেছে, এদিকে ওদিকে নানান ঝোপঝাড়, বনের গন্ধ।

দূর থেকে গাছটাকে দেখলাম। নীচে একটা আগুন, কিছু লোক বসে আছে। ওখানে এক ওঝার সাথে দেখা হলো, তিনি ভৌতিক উপদ্রবের ধন্বন্তরী। পাঁচ ছয়ের পিটানো চেহারা, ছোটো করে কাটা চুল, ফর্সা, তাগড়াই গোঁফ, উর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, একটা পৈতে ঝুলছে। একটা গেরুয়া কাপড় লুঙ্গির মতো করে পরা। নাম জানা গেল অভয়জি। অভয়জি ওই মহাবৃক্ষের নীচে বসে সকলকেই অভয় দিয়ে চলেছেন। আমাকে দেখে হেসে বললেন, আপনাকে বহুবার দূর থেকে দেখেছি। আজ সামনাসামনি দেখলাম। আমি বললাম, আমি কিন্তু ব্রহ্মদত্যি, যাকে ধরি, সহজে ছাড়ি না। শুনে হা হা করে হেসে উঠলেন। ব্রহ্মদত্যিকে এরা বলে বরমদেও।

এই গাছের নীচেই দশহরার সময় ডাকিনীবিদ্যার চর্চা চলে। অভয়জি তখন নিজেই অভয় খুঁজতে ঘরে খিল দেন। ডাইনীরা আকাশের পোশাকে বাৎসরিক পিকনিকে সামিল হয়। বছরের বাকি সময় এখানে অভয়জির ভূত ছাড়ানোর প্রাচীন এবং জটিল পদ্ধতির কলাকৌশল চলে।

সেই ভূত ছাড়ানোটাও দেখলাম। একটা অল্পবয়সী বউ, বিশ্রস্ত বেশবাশ, আঁচল খসে পড়েছে, আলুলায়িত চুলে বিখ্যাত কাওয়ালদের মতো প্রবল বেগে মাথা ঝাঁকিয়ে চলেছে, আর দুই হাত ঘুরিয়ে চলেছে, গলার আওয়াজ একদম পুরুষের মতো।

ওই আলো আঁধারি গাছতলায়, ওই বন্য পরিবেশে, মনে হচ্ছিল তিনশো বছর আগের কোনো একটা রাতে চলে গেছি। এই পরিবেশ এখনো আছে ধারনার বাইরে ছিল।

প্রচণ্ড গরম, সমস্ত বন কাঁপিয়ে একটা হাওয়া ঝরঝর করে ছুটে এল, আর ওই মেয়েটি সেই প্রবল পুরুষালি কণ্ঠে হুংকার দিয়ে উঠল, ছেড়ে দে, ছেড়ে দে আমাকে, তোর সর্বনাশ হবে।

এবার দেখলাম অভয়জির অভয়দানের আসল কেরামতি। দুই লাফে মেয়েটির সামনে এসে অভয়জি আরো জোরে গর্জন করে উঠল, “একর কাহে পকড়ল বা রে? ছোড়ব কা নাহি?” একে কেন ধরেছিস রে? ছাড়বি কি না? মেয়েটি চিৎকার করে হিংস্র একটি “না” বলে উঠতেই শুরু হলো মার।

পিটিয়ে ভূত ভাগানো শুনেছি, আগেও দেখেছি, কিন্তু এ মারের তুলনাই হয় না। ওই চুলের মুঠি ধরে প্রথমে ঝাঁটা, তারপর লাঠি, তারপরেও চড় চাপড়, এবং ওই ধারাবাহিক মারে তখন একটু একটু মেয়েলি গলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তখন নাকের সামনে একটি হলুদ পোড়া ধরতেই মেয়েটি ছটফটিয়ে শিউরে উঠল। তারপর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসতেই অভয়জির প্রশ্ন, ছাড়বি কি না বল? নইলে তোকে এখানেই শেষ করে দেবো। ক্ষীণকণ্ঠে আওয়াজ এলো ছাড়ব, ছাড়ব।

এবার সেই ছেড়ে যাওয়ার প্রমাণ দেওয়ার পালা, কীভাবে বোঝা যাবে ছাড়ল? শিরীষ গাছের একটা ডাল ভেঙে দিয়ে যেতে হবে। আবার একটা প্রচণ্ড হাওয়া আছড়ে পড়ল শিরীষ গাছের ওপর, ডাল ভেঙে পড়ল কি না বোঝা গেল না, তবে একটা ধুপ করে আওয়াজ এল। তারপরেই মেয়েটি অজ্ঞান।

ভালো করে মেয়েটিকে দেখলাম। এই অঞ্চলের মেয়েদের মতোই শক্তপোক্ত, মুখে একটা আলগা লাবণ্য, রং ফর্সা, চোখ বুজে নিশ্চিন্ত ঘুম ঘুমাচ্ছে।
মেয়েটির স্বামী আর শ্বাশুড়ি তার হাত ধরে বনের পথে মিলিয়ে গেল। অভয়জি কিছুটা পথ আলো হাতে এগিয়ে দিয়ে এলেন। দক্ষিণা একটা মুরগি, আর একশো টাকা।

এরপর আরো ভূতে ধরা মানুষ আছে, রাত দশটা পর্যন্ত চলবে। ঘামে ভেজা অভয়জি আমার পাশে বসে একটা চুট্টা ধরালেন। এদিকে বিড়িকে বলে চুট্টা, মোটা এবং অত্যন্ত কড়া। আমাদের বাংলার মতো সুস্বাদু না।

এরপর অভয়জি কিছুটা তাড়ি খেলেন। গাছটার পেছনেই তাড়ির আড্ডা। উৎকৃষ্ট তাড়ি উৎপাদক বলে এই তাড়ি বিক্রেতার প্রভূত সুনাম। আমাকেও বলা হলো তাড়ি খাব নাকি, আগে প্রচুর খেয়েছি, তাড়িতে আমার নেশা হয় না, তাই না করলাম। নেশা না হলে খেয়ে কি লাভ?

অভয়জি চুট্টা শেষ করে পরের ভূতটার খোঁজে গেলেন। ওই গাছটার নাম এরা দিয়েছে “গাছি।” আমি ওই গাছি থেকে আবার বনের পথে ফেরার রাস্তা ধরলাম।

রাতে শিবজী সিং বলল “অরে উ বুরবক বা, ওকর কুছু না আওতা।” আরে ও একটা মহামূর্খ, ও কিছুই জানে না।

আমারও ওই পিটানো ছাড়া তেমন কোনো কেরামতিই চোখে পড়ল না। যদিও “হলুদ পোড়া” নামে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা অসাধারণ ভূতের গল্প আছে।

বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রাতে গায়ে হাত পায়ে একটা চুলকানি শুরু হলো। তারপর ঝুপুর ঝুপুর করে কিছুক্ষণ জলহস্তী অবতারে কাটিয়ে নিশ্চিন্দি।

( ক্রমশ )

আগের পর্বঃ মুজঃফরপুরের দিনগুলো ( পর্ব ১২ )


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top