এমন সময়ে যদি দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া যায় তাহলে যেন সব দিক রক্ষা করা যায়। কিন্তু আমার পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেল । দরজাটা সশব্দে খুলে গেল, রুক্ষ গলায় শৈলেন বাবু ধমকে উঠলেন, “কী হয়েছে টা কী?”
প্রায় অস্ফুটে উচ্চারণ করলাম, “মা পড়ে গিয়ে কেমন যেন করছেন। এদিকে কঙ্কাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।”
প্রত্যুত্তরে যে বিজাতীয় শব্দ গুলো তাঁর ঝাঁজালো কটু গন্ধ যুক্ত মুখ থেকে বের হয়েছিল সে গুলো আমার চেনা না হলেও বুঝেছিলাম ভদ্র সভ্য কিছু নয়। কিন্তু সেসব আমার উদ্যেশ্যে না নিজের মায়ের উদ্যেশ্যে বর্ষণ হলো কে জানে। মাথা নিচু করে ফিরে আসার সময় দেখলাম এলোমেলো করে কোন রকমে থানটা গায়ে জড়িয়ে ওঁকে প্রায় ঠেলে কঙ্কা বের হয়ে এল। ও ওই অবস্থায় শাশুড়ির ঘরে ঢুকতেই আমি আঙ্গুল তুলে বললাম, “ওঁকে ছোঁয়ার আগে চান করে এসো।”
প্রথমটায় থতমত খেয়ে মাথা নিচু করলেও পরক্ষণেই মুখ তুলে বলল, “এ কথা মাসির ছোট ছেলেকেও বলতে পারবে তো?”
আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম , গালের ওপরে যেন সজোরে কেউ চড় মারলো।
চান করে নয় হাত পা ধুয়ে কাপড় ছেড়ে ও ঘরে এল। দুজনে মিলে রোগীকে তোলার সময় মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব মাংস খসে পড়ে হাড়গোড় বের হয়ে যাবে।
রোগীকে তুলে বিছানায় দিয়ে কঙ্কা আমার মুখোমুখি দাঁড়াল, ওর দৃষ্টিতে লজ্জা ঘেন্না ভয় কিছুই নেই, আছে শুধু প্রবল বিরাগ। আমার চোখের দিকে চেয়ে একটা স্পষ্ট প্রশ্ন উচ্চারণ করল,”ঘেন্না লাগছে আমাকে দেখে? কেন বল তো? তুমি জানো কত বছর ধরে এ বাড়িতে সব রকম ভাবে গতর খাটাচ্ছি? প্রথম আমাকে কে নষ্ট করেছে জান? এ বাড়ির কর্তা বাবা। তার আগে সে আমার মাকে নষ্ট করেছিল। দিনাজপুরে বাড়ি জমি খেত খামার সবই ছিল। দুবেলার অন্ন আর বছরের মোটা কাপড়ের কোন অভাব কোন দিন ছিল না। দেশ কাড়ল , বাড়ি কাড়ল নেতারা আর এদেশে যারা আশ্রয় দিল তারা দু মুঠো ভাতে আর কাপড়ের বিনিময়ে মান আর ইজ্জত কাড়লো। ভাইকে নিয়ে মা বিষ খেয়েছিল, কেন জানো? অনেক জ্বালায়। একদিন বাড়ির সবাইকে বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে পাঠিয়ে কত্তা বাবা আমাকে নিয়ে খিল তুলেছিল। তার পর থেকে তার আর মাকে মনে রুচতো না। পেটে ছেলে আসায় এরা তড়িঘড়ি করে আমার বিয়ে দিয়েছিল । শউর বাড়িতে এদের সব চালাকি ধরা পড়ে গিয়েছিল। খুব মার খেয়েছিলাম জান? তখন সবে তেরো বছর বয়স আমার। বাড়ির সবাই মিলে পালা করে পেটাতো। কার পাপ পেটে নিয়ে বে করেছি জানতে চাইত। সব অত্যাচার মুখ বুজে সয়েছি। সব জানা জানি হওয়ার পর থেকে আমার সোয়ামী মানুষটা আমায় ছুঁয়ে দেখতো না। তা সাপ কাটি হয়ে তার জ্বালা জুড়োলো আর প্রতিদিন মারের চোটে আমার পেটেরটাও তিন মাসের বেশি টিঁকলো না। ওরা আমার পেটেও লাথি মারত।
সেই যে ওরা লাথি মেরে এখানে ফেলে দিয়ে গেল সেই থেকে আমি এ বাড়ির বাঁধা বেবুস্যে। নিজের সোয়ামী আর ছেলেদের সামলাতে পারতো না বলে মাসি দিনরাত দাঁতে পিষতো। কী ভাবছো তুমি? তোমরা নিজেদের ভদ্দরনোক বলে বড় বড়াই কর না? নাও তোমাদের সবার জামা কাপড় খুলে দিলাম। গলায় আমি দড়ি দেব না, কেন দেব? এ জেবন কী তোমাদের দেওয়া? এ বাড়ির রকম সকম দেখে অন্য দুই বউ নিজের নিজের সোয়ামী নিয়ে সরে পড়লো। মিথ্যে বলবো না, বড়দা, মেজদার এসব দোষ নেই , তোমার সোয়ামী তো কবেই মরে ভুত হয়ে গেছে। তবে সেও গঙ্গা জলে ধোয়া তুলসী পাতা ছিল না। ছোট বউ এসব কিছু জানত না। দিব্যি সাজিয়ে গুছিয়ে ঘর সমসার করছিল। ভায়ের অসুখ শুনে বাপের বাড়ি গেছিল। ভায়ের অসুখ সেরে যেতে একদিন চিঠি পত্তর না দিয়ে কিছু না বলে কয়ে সেখান থেকে এক রোববার দুপুরে হঠাৎ বাড়ি ফিরে তার বন্ধ ঘরে আমাকে দেখে ফেলে সে কী অশান্তি! সেদিন তাকে ভরা শীতের রাতে ঘাড় ধরে বের করে দিল ছোটদাদা বাবু। মজুমদার গিন্নি তোমাকে সাবধান করতে এয়েছিল, কিন্তু তুমি তো সে ধার দিয়ে হাঁটলেই না। তবে তুমি আজও কেন বেঁচে আছো জানো? এই কঙ্কা বামনির জন্য! ভদ্রনোকের মেয়েদের ছোটদা বাবুর পছন্দ নয়। আমার গায়ে নাকি একটা বুনো গন্ধ আছে। সেইটেই তার বড় প্রিয় । শিব ঠাকুরের মতো সব বিষ নিজে গিলে চলেছি গো সেজ গিন্নি … সব গিলে চলেছি। পেটেরটা সেই যে নষ্ট হল তার পর আমার আর গভ্য হয়নি। বাঁজা হয়ে গেছি। ভাগ্যিস বাঁজা হয়েছি। নইলে যে কী হত!”
সত্যের একটা দীপ্ত রূপ থাকে, সেটা হয়তো শ্মশানের চিতার আগুনের থেকেও জ্বালাময়। সত্যের অভিঘাত সবাই হয়তো সইতে পারে না। শুনতে শুনতে কখন যে মেঝেতে বসে পড়েছিলাম বুঝিনি। শুধু বুঝেছিলাম আমি বিপদগ্রস্থ, ভীষণ বিপদের মধ্যে আছি। আর আমাদের লতা! আমার ছোট বোন লতা! ওকে যে আমি জন্মাতে দেখেছি ভগবান! ওর কী হবে! এখন তো সব আড়াল সরে গেছে, আর কোন লজ্জা নেই, সংকোচ নেই। যে কোন মুহুর্তে আমার নিজেরও চরম সর্বনাশ হতে পারে!
ভোর হয়ে গিয়েছিল, আস্তে আস্তে উঠে নিজের ঘরে যাবো বলে পা বাড়ালাম। ভয় বোধহয় মানুষের অন্য অনুভূতি গুলোকে স্তব্ধ করে দেয়। নইলে রোগীর ঘরের এই তীব্র পচা গন্ধ এতক্ষণ আমার নাকে এলো না কেন? ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে এক বার রোগীর দিকে ফিরে চাইলাম , কেমন যেন মনে হলো। মুখটা তো এমন হাঁ করে খোলা ছিল না! চোখের মণি দুটো ওপরের দিকে উঠে গেছে। কাছে গিয়ে নাকে হাত দিলাম, বুকে হাত দিলাম। নাহ, জীবনের কোন স্পন্দন নেই!
পাশের ঘরে কঙ্কাও ঘুমিয়ে পড়েছে, বহুদিনের যন্ত্রণার বোঝাটা আমার কাছে নামিয়ে হয়তো মনের ভার খানিক হালকা হয়েছে। মুখটা নিদ্রার আবেশে কোমল সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছিল থাক ও ঘুমোক। একটু শান্তিতে ঘুমোক।
কিন্তু ডাকতে তো হবেই। মা যে নেই তা তো কাউকে জানাতেই হবে। ও ছাড়া আর কাকে বলব। ওর গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে গিয়েও কেমন একটা বোধ হলো, না ছুঁয়েই নরম গলায় ডাকলাম, “কঙ্কা, কঙ্কা, ও কঙ্কা!”
ও সদ্য ঘুম ভেঙে শিশুর মতো নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকাল।
“মা বোধহয় আর নেই কঙ্কা, ও ঘরে চলো।”
ক্রমশ
আগের পর্বঃ paap15



