স্কুলে যাওয়ার আগে বেঁটেখাটো শ্যামলা মেয়েটা যখন এক দৃষ্টিতে উনোনে চড়ানো ভাতের হাঁড়িটার দিকে চেয়ে থাকত, তখন গীতার খুব কষ্ট হত। চেষ্টা করত তিন মেয়েকে সকালের খাবারটা অন্তত পেটপুরে দিতে। বর্ষা সবার বড়, তাই ক্ষিদেও বেশি, গোগ্রাসে গিলত। গীতার ভাগ্যের দোষ, রতনটা কত কম বয়সে চলে গেল। গ্রামে বাস, জমিজায়গা নেই, রতন পুকুরে জাল দিয়ে তবু কিছু উপার্জন করত। নেশাভাঙ যে করত না তা নয়, তা বলে লোকটা খারাপ ছিল না। সে কথা বলতে গেলে বাগদীপাড়ায় কোন পুরুষমানুষটা নেশা করে না? আগে গীতা দু-ঘর বাবুবাড়িতে কাজ করত, এখন সংখ্যাটা বাড়াতে হয়েছে। খাটত প্রচুর, তাও অভাবের সংসার।
বর্ষা সবে গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক দিল, এক ছেলের পছন্দ হয়ে গেল। কোলিয়ারীর শ্রমিক। বর্ষাদের গাঁয়ে, ছেলের দিদির শ্বশুরবাড়ি। সেখানে এসে দেখা আলোতে চার চোখের মিলন। ছেলের আর তর সইল না। যাকে বলে শাদি। মাধ্যমিকের রেজাল্ট তখনও বের হয়নি। কুলটিতে বাড়ি, কোন এক কনে চট মাগ্রী, পট।
পড়াশোনায় ইতি টেনে, মায়ের বকুনি, বোনেদের খুনসুটি, ভাঙা মাটির পুতুল ছেড়ে লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে বর্ষা গেল শ্বশুরবাড়ি। ফেলে আসা দিগন্তব্যাপী ধানের ক্ষেত, দীঘির কালচে জলে বৃষ্টির টাপুরটুপুর, লাল ফড়িঙের উড়ে চলা খুঁজতে চাইত কুলটির এক চিলতে পাকা ঘরের জানালা দিয়ে। বস্তির কংক্রিটের জঙ্গলে পেত দুর্গন্ধ আর ধুলোবালি, ময়লা ছোট্ট হৃদয় হাঁপিয়ে উঠত। তবু মেয়েমানুষকে মানিয়ে নিতে হয়— এটাই শিখেছে জন্মাবধি।
তারকের রঙটাই কুচকুচে কালো, কিন্তু পুরুষালি। আর মাথার চুল তো একদম মিঠুন চকোত্তির মতো। সকালে এক খালা ভাত বাড়ে দিত, খেয়ে তারক কাজে চলে যেত। সন্ধ্যার মুখে সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শুনতে পেত, পাখিগুলো যখন বড় বটগাছটায় ফিরতে শুরু করত, তখন। বেশি সময় বাড়িতে থাকত না, ঠেকে ছুটত। রাতের বেলা যখন ফিরত, প্রায়ই কথা বলার মতো অবস্থায় থাকত না। রুটি কটা হামহাম করে গিলেই শুয়ে পড়ত। বর্ষা জানে নেশাগ্রস্ত পুরুষমানুষের সঙ্গে বেশি পিরিত করতে নেই— মাকে দেখেছে।
সুখের সময় নয়, খুব দুঃখেরও নয় দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। কতবার বলেছিল একটা টিভি কিনে দিতে, তারক দেয়নি। প্রতিবেশী ঝুনু মাসির সঙ্গে সিনেমাতলায় যেত নতুন বাংলা বই লাগলেই। পোসেনজিতকে তার বেশ লাগে।
হঠাৎ করেই নতুন মানুষের আগমনবার্তা এল দেহে, তখনও বর্ষার আঠেরো হয়নি। নাম নিয়ে খুব ভাবল কদিন— ছেলে হলে মেঘ, আর মেয়ে হলে বৃষ্টি। নামের ব্যাপারে তারকের কোন আপত্তি সে শুনবে না। তারক অবশ্য বলল— ছেলে হলে মিঠুন বলে ডাকবে। পরিবারের সদস্য বৃদ্ধির আশু সম্ভাবনার উত্তেজনায় তারক বাড়ি ফিরছিল তাড়াতাড়িই।
কোলিয়ারির হাসপাতালে যেদিন সন্ধ্যায় লোহার খাটে মলিন রেক্সিনের উপর ন্যাকড়া জড়ানো বৃষ্টিকে বর্ষা প্রথম দেখল, কি আশ্চর্য। তখন বাহিরে মুশলধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। মেয়েটা বাপের মতো কালোকুলো হয়েছে; বর্ষার মতো শ্যামলা হলে কী এমন ক্ষতি হত। বকলে ফোকলা দাঁতে খালি হাসে। হিঁচিতে ভেজা কাঁখাকালি কেচে আর খিদে লাগার পোঁটা মুছিয়ে, বর্ষার যত আনন্দ।
মেয়েটা বাড়ে উঠছে তাড়াতাড়ি, তারকও যেন কেমন বদলে যাচ্ছে পাল্লা দিয়ে। বর্ষার সঙ্গে কোনকালেই তার বিশেষ বাক্যালাপ নেই, কিন্তু তা বলে নিজের মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে না? একবারও কোলে নেবে না? ছাইপাস গেল বাড়ে গেছে। কোনও কোনদিন রাত্রে বাড়িও ফেরে না। নতুন সংযোজন অমানবিক হিংস্র আচরণ। কীসের যে এত রাগ। কারণে-অকারণে জুটছে মার। আগে বর্ষা তারকের অপেক্ষায় থাকত, এখন বাড়ি না ফিরলেই বরং খুশি হয়। অবোধ ছোট্ট মেয়েটা বোধহয় বুঝতে শিখেছে মা ভাল নেই। বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায় না, দেখলে কেমন ভয়ে সিটিয়ে থাকে। কারও সঙ্গে মিশতে পারে না, কেমন তোতলায়। বস্তির সমবয়সী দু-চারটে ছেলে-মেয়ে খেলতে চায়, কিন্তু বৃষ্টির কোন উৎসাহই নেই। মূক নীরবতা গ্রাস করেছে সর্বক্ষণ। মেয়েটার গ্রহণ লেগেছে।
আগে তারক সংসার খরচটা দিত, এখন সেটাও ঠিকমতো দিতে চায় না। কোলিয়ারিতে মাইনেপত্র যে খুব খারাপ তা নয়, কিন্তু নেশার ঠেকে সব উড়ালে আর কি থাকবে। বর্ষা তারকের দুঃখবিলাস বুঝতে চেয়েছে, স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। বোধহয় বৃষ্টির বদলে মেঘ এলে ভালো হত।
অনেকদিন ধরে টানাটানি চলছিল, সেদিন রাবারটা ছিঁড়েই গেল। নেশায় চুর তারক এল বেশ রাত করে। বৃষ্টির দুদিন ধরে জ্বর, আজ বাড়তির দিকে। কাল ডাক্তার না দেখালেই নয়। মরিয়া বর্ষা টাকা চাওয়াতে জুটল বেদম মার, দরজার খিল ভেঙে একেবারে দু-টুকরো। তারক তখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে, বৃষ্টির নিঃসাড় দেহ বুকে জড়িয়ে বর্ষা যখন বেরিয়ে এল— রাতভর বৃষ্টির শেষে পুব আকাশ সবে ফর্সা হয়েছে, বটগাছের পাখিরা বহির্মুখী। যেখানে যা পেয়েছে, হাতের মুঠোয় ময়লা খুচরো টাকাগুলো সম্বল। ট্রেনে-বাসে সেদিন কীভাবে মায়ের বাড়ি পৌঁছেছিল, তা বর্ষাই একমাত্র জানে।
বৃষ্টি সুস্থ হওয়ার পর বর্ষা আর ফিরে যায়নি, তারকও আসেনি। গাঁয়ের মাতব্বররা কী সব খোরপোষ আদায়ের কথা বলছিল বটে, বর্ষা আইনকানুনের ঝামেলায় পড়তে চায় না। তারকের দয়া-দাক্ষিণ্য দরকার নেই, বৃষ্টিকে নিজেই মানুষ করবে।
মায়ের পক্ষে গ্রামে কাজ নেই। বোনেরা বড় হচ্ছে, আরও দেড়টা মানুষের পেট ভরানো বেশ চাপের। এমন সময় সরকারগিন্নি প্রস্তাবটা দিলেন— তাঁর মেয়ের শাশুড়ি থাকে শহরে, সর্বক্ষণ দেখভাল করার বিশ্বাসী লোক খুঁজছে। মাইনে খারাপ দেবে না, তবে বুড়ি মানুষটাকে একা ছেড়ে যখন তখন বাড়ি আসা যাবে না। বর্ষা রাজি হয়ে গেল।
এতবড় বাড়িটায় বর্ষা প্রায় একা। বড়মা কথাবার্তা বিশেষ বলেন না, বেশিরভাগ সময় শুয়েই থাকেন। বর্ষার বৃষ্টির কথা খুব মনে হত, না চাইলেও হয়তো তারকের কথাও। তবু এখানে শান্তি, মারধোরের ভয় নেই। মাইনের প্রায় পুরো টাকাটাই মায়ের কাছে পাঠাচ্ছে, এখানে খরচা তো কিছুই নেই। ভাবতে ভালো লাগছে নিজের রোজগারে মেয়েকে স্কুলে পড়ছে। টাকাগুলো পাওয়াতে মায়ের আর বোনেদেরও একটু সুরাহা হয়েছে। স্কুলের ছুটিঘাটাতে বৃষ্টি তার কাছে আসে। সেও কালেভদ্রে যায় বাড়ি, বড়মার তখন অন্য ব্যবস্থা করতে হয়। বৃদ্ধা অসুস্থ মানুষটার উপর বর্ষার ছায়া পড়তে শুরু হয়েছে। একটু খিটখিটে, তবে কত অসহায়।
লম্বা গরমের ছুটিটায় বর্ষা বৃষ্টিকে নিয়ে এল। বৃষ্টি সেইরকম মুখচোরা লাজুকই রয়ে গেছে। মায়ের কাছেও তার কত লজ্জা, কেবল লুকিয়ে থাকতে চায়। নিঝুম বাড়িটা গমগম করে উঠল, দাদাভাই যখন এল লটবহর নিয়ে আমেরিকা থেকে। সঙ্গে মেমবউ, আনা না অ্যানি কী যেন একটা নাম। আর ফুটফুটে দুটো বাচ্চা— জয় আর টিউলিপ। টিউলিপ তো বৃষ্টির বয়সীই হবে। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত। মানুষ এত ফরমায়েশ হতে পারে? বর্ষা আগে কখনও মেমসাহেব দেখেনি। হাতের নীল শিরাগুলো অবধি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বর্ষা ওদের কথা বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারত না, আকার-ইঙ্গিতেই কাজ চলত। দাদাভাই বলে দিত কী করতে হবে। খাবার তো দেখছে, প্রায় সবই সিদ্ধ। মেমবৌদি নিজেই খাবার ফুটিয়ে নিত, বর্ষা গুছিয়ে বাগিয়ে দিত। ওসব খাবার বর্ষার মুখে রুচবে না। দাদাভাই অবশ্য বাজার থেকে দেদার খোড়, মোচা, লোটে-মাছ, গুগলি যা পারত, আনত। বর্ষা রেঁধে দিত, আর দাদাভাই জন্মের খাওয়া থেয়ে লিত। বর্ষার রান্নার হাত খুব খারাপ নয়। আসলে তারক স্বাদের ব্যাপারে নাক উঁচু ছিল, পছন্দ না হলে খালা ফেলে উঠে পড়ত।
মেমবৌদি খুবই ভাল, ভুলচুক হলে কিছু বলে না, কেবল হাসে। পাজির-পাঝারা বাচ্চা দুটো, যাওয়ার আগে ঘরের একটা জিনিসও অক্ষত থাকলে হয়। ওরা আমেরিকা ফেরত যাওয়ার আগের দিন দাদাভাইয়ের বোন এল দেখা করতে, সঙ্গে স্বামী ও মেয়ে। বোনের মেয়েও ছোট। একেবারে চাঁদের হাট বসে গেছে। তিন বাচ্চার ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ, চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়িতে টেকা দায়। ভেতর ঘরে কিছু একটা ভাঙার আওয়াজ হল। বর্ষা দৌড়ে গিয়ে দেখে— দেওয়াল ঘড়িটা ভেঙে খানখান। এ বাবা! বৃষ্টিও কখন যে ওদের দলে যোগ দিয়েছে। বর্ষাকে যেন চিনতেই পারছে না, খেলার ঘোরে। বর্ষা যে চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছে, সেদিকে কোন হুঁশ নেই। খেলা ছেড়ে কিছুতেই যাবে না। বৃষ্টিকে বকে-ঝকে জোর করে ঘরে পাঠিয়ে দিল। চোখ ছলছল, গোসা হয়েছে। ইশ্! দাদাভাইরা যদি একবার জানতে পারে বর্ষার মেয়েও নাশকতামূলক কাজকর্মে জড়িত, তাহলে লজ্জার একশেষ হবে।
বসেছেন বৈঠকখানায় হৈচৈ, বড়মাকে সাজিয়ে গুছিয়ে আনা হয়েছে। রাজরানীর মতো তিনি জাঁকিয়ে সিংহাসনের মতো বিশাল চেয়ারটাতে, আর দেদার ছবি তোলা হচ্ছে। পারিবারিক ফটোশুটে একজন ক্যামেরাম্যান অবশ্য ভাড়া করে আনা হয়েছে। বড়মা কদিন বেঁচে থাকবেন তার ঠিক নেই, পরিবারের সদস্যরা আবার কবে মিলিত হতে পারবে, তারও কোন ঠিক নেই। তাই কোনো রকম ত্রুটি ও কার্পণ্য করা হয়নি।
ছবি তোলা হচ্ছে হরেক কম্বিনেশনে। তবে বড়মা প্রায় সব ছবিতেই কমন। শেষ ছবি বড়মার সঙ্গে পরিবারের ছোটদের। সহাস্য বড়মার সঙ্গে ফুটফুটে তিন নাতি-নাতনিকে বেশ লাগছিল। ক্যামেরাম্যান ফোকাস ঠিক করে এবার ক্লিক করবে, হঠাৎ রাগীরাগী মুখ করে টিউলিপ ফ্রেম থেকে বেরিয়ে এল। সে ছবি তুলবে না।
রাগ ভাঙাতে দাদাভাই টিউলিপকে কোলে তুলে নিল। বোঝানোর জোরদার চেষ্টা চলল। টিউলিপ সবেগে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে যাচ্ছে। বর্ষা ইংরেজিতে ওদের কথাবার্তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝছে না। শেষে দাদাভাই টিউলিপকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই সে এক ছুটে ঘরের ভেতরে চলে গেল। একটু পরেই টিউলিপ ফিরে এল, সঙ্গে বৃষ্টিকে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে। বৃষ্টির মুখ থমথমে। বাকি দুই বাচ্চা তখনও বড়মার পাশে দাঁড়িয়ে। টিউলিপ বৃষ্টিকে তাদের পাশে দাঁড় করালো। তারপর নিজে গিয়ে বড়মার গলা জড়িয়ে ধরল।
দাদাভাই হাসতে হাসতে বলল— আসলে আমরা ভুল করি, কিন্তু শিশুরা নয়। ফটোগ্রাফার মশাই, তুলুন তুলুন, এবার ছবি তুলুন। এতক্ষণে পরিবারের সবকটা বাচ্চা একসঙ্গে, এক ফ্রেমে হলো।
বাইরে তখন পচা গ্রীষ্মের দুপুরে, অনেকদিন বাদে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে।



