ভূমিকা ও অনুবাদ : শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়
কে. সচ্চিদানন্দন সমকালীন ভারতীয় সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম—কবি, অনুবাদক, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে যাঁর অবদান গভীর ও বহুমাত্রিক। ১৯৪৬ সালে কেরালায় জন্মগ্রহণ করা এই মালয়ালম কবি তাঁর রচনায় মানবিকতা, স্বাধীনতা, ভাষা-সংস্কৃতির বহুত্ব, নির্বাসন ও রাজনৈতিক চেতনার সূক্ষ্ম দিকগুলোকে আধুনিক সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সংলাপ তৈরি হয়, যা পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তাঁর কবিতা ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা সহ প্রায় ৩০টিরও বেশি ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতার বই। ফলে তিনি বিশ্বসাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও নানা ভাষার কবিতাকে মালয়ালমে অনুবাদ করে আন্তঃভাষিক সাহিত্য-সংলাপকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্য অকাদেমির প্রাক্তন সচিব হিসেবে তিনি দেশের বহুভাষিক সাহিত্যধারাকে সমুন্নত রাখার জন্য নিরলস কাজ করেছেন। তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি Sahitya Akademi Award, Kerala Sahitya Akademi Award, Vayalar Award, Odakkuzhal Award সহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীল স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে সমকালীন ভারতীয় সাহিত্যে এক অনন্য ও প্রভাবশালী কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
খুলি
আমাকে দাহ কোরো না,
বরং মাটির নিচে পুঁতে দিও।
হাজার বছর পরেও
যদি মানুষ টিকে থাকে,
তাহলে হয়তো কোনো হ্যামলেট
আমার খুলি হাতে তুলে নিয়ে
তার হোরেশিওকে বলবে—
এই ঠোঁট একসময় হাসাত মানুষকে রসিকতায়,
আলেকজান্ডার কিংবা সিজারের গল্পও শোনাবে,
যাদের দেহ মাটির গর্ত ভরাটে কাজে লেগেছিল।
অথবা সে হয়তো কথা বলবে ওফেলিয়ার ভূতের সঙ্গে,
ভেজা চুলে ভেসে থাকা স্মৃতির মতো
এই খুলির ভেতরকার অচেনা গল্পের কথা,
যেখানে ছিল কল্পনা, উদ্বেগ,
স্মৃতি আর বিস্মৃতির দ্বন্দ্ব,
অদ্ভুত কল্পনার ভাষা
যা জন্মেছিল মস্তিষ্কে টিউমারের মতো।
সে যদি খুলিকে মাটিতে পুঁতে দেয়,
সেখানে হয়তো গজাবে খুলির গাছ—
একদিন হয়তো পুরো এক বন।
যার ফুল হবে প্লেটো, পতঞ্জলি,
হেগেল কিংবা সার্ত্রের খুলি—
সব ভাবনায় অবসন্ন।
তখন এক বালক এসে
মাটির হাঁড়ির মতো ভেঙে ফেলবে খুলিগুলো
হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে বলবে—
‘দার্শনিকেরা শুধু ব্যাখ্যা করেছে পৃথিবীকে,
কেউ জানে না—
সত্যিই কেউ কি বদলাতে পেরেছে একে ?’
2.চারজন ভূত
ফোর্ট কোচির এক বাড়িতে
চারটি ভূত, চারটি ছায়া—
আমি একজন, আমি আরেকজন,
তৃতীয়, চতুর্থ—সবই আমি।
সবাই চায় একে অন্যকে
দাবার বোর্ডে সরাতে,
ম্যাট দিতে,
হারিয়ে দিতে, জিতে যেতে।
একজন লেখে, আরেকজন পড়ে,
একজন ঘুমায়, অন্যজন জেগে থাকে।
একজনের জ্বর এলে
অন্যজন ওষুধ নিয়ে আসে।
একজন ফর্সা, অন্যজন কালো।
একজন জ্ঞানী, অন্যজন বোকা,
একজন বৃদ্ধ, অন্যজন তরুণ—
তাদের মধ্যে আমি কে?
ফোর্ট কোচির সেই বাড়িতে…
তারা একে অন্যকে হত্যা করে,
তবু থেকে যায়—
একই মানুষ
চারটি ঘর দখল করে থাকে।
একজন আগুন, অন্যজন জল,
একজন বৃষ্টি, অন্যজন রোদ,
একজন ভেতরে তাকায়,
অন্যজন বাইরে।
একজন ভীরু,
অন্যজন সাহসী—
যে কোনো জায়গায় ঢুকে পড়তে প্রস্তুত।
আমি সবার বন্ধু হতে পারি না,
তাদের শত্রুও হওয়া চলে না…
ফোর্ট কোচির সেই বাড়িতে…
3. অলিখিত কবিতা
আমি সেই কবিতা,
যেটি এখনও কেউ লেখেনি।
অনেক কবির আঙুলের ডগা পর্যন্ত
আমি উঠে গিয়েছিলাম,
তবু ফিরে গিয়েছি স্বপ্নের ভেতর,
অব্যক্ত ভালোবাসার মতো—
কারণ আমার নিজস্ব কোনো ভাষা ছিল না।
আমি ভাষাকে ভয় পাই না,
যতক্ষণ না তার ভবিষ্যৎ আছে।
একদিন আমি খুঁজে পাব আমার শব্দগুলো—
এক বিস্মিত শিশুর চোখে
একটি পাল উন্মোচিত হবে ধীরে ধীরে
একটি শূন্য পাতায়,
এক নতুন তারার নিচে।
4. কাপুরুষ
আমি জানি
যে লড়াই আমি এড়িয়ে গেছি
তার প্রতিধ্বনি আমাকে চিরকাল তাড়া করবে।
আমি জানি
যে সত্য আমি মুখে আনিনি
তার ভার আমার জিভকে আরও ভারী করে তুলবে।
আমি জানি
যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি চুপ থেকেছি
তার ছায়া আমার নীরবতাকে রক্তাক্ত করবে।
আমি জানি
যে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি টোকা মারিনি
তার বন্ধ দরজার ভিতরেই হয়তো ছিল আমার মুক্তি।
আমি জানি
যে ভালোবাসাকে আমি অস্বীকার করেছি
সে-ই ভালোবাসা আজও আমাকে খুঁজে ফেরে।
আমি জানি
যে মৃত্যুকে আমি ভয় পেয়ে এড়িয়ে যাই
সে-ই মৃত্যুই আমাকে সবচেয়ে সহজে খুঁজে পাবে।
5. ধ্বংসস্তূপের গান
ক্লান্ত পদক্ষেপে আমি দাঁড়িয়ে আছি এই ধ্বংসস্তূপে,
যেন হরপ্পা বা হাম্পির প্রান্তে।
একদিন এ-ও ছিল এক জাতি—
লবণ আর ঘামের মাটিতে গড়া এক মহাদেশ,
রক্তে লাল হওয়া এক ফুল,
সমুদ্র থেকে জেগে ওঠা এক শঙ্খ,
অশ্রু দিয়ে আঁকা এক রঙিন মানচিত্র,
যার বিস্তার হিমালয় থেকে
আরব সাগর পর্যন্ত।
এখন দেখি, মানুষের উৎসব
কালো শবযাত্রায় রূপ নিয়েছে,
বিজয়ের গান হয়ে গেছে বিলাপ।
প্রত্যেক হত্যার পেছনে একেকটা কাহিনি,
প্রত্যেক স্মৃতির পেছনে একেকটা যুদ্ধ,
প্রত্যেক হৃদয়ে নতুন এক দেশভাগ।
এক সময় আমরা আমাদের দখলদারদেরও
অতিথির মতোই সম্মান দিয়েছিলাম;
তারা আমাদের ভূমিকে রঙধনু বানিয়ে গেল,
আমাদের ভাণ্ডারে রেখে গেল জীবনধারা, ভাষা, শিল্প, সংস্কৃতি।
কিন্তু যারা উপনিবেশবাদীর ভূমিকা নিতে চাইল,
আমরা সবাই একসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম।
তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও
আমরা স্বাধীনতা জয় করেছিলাম।
আমরা গড়েছিলাম এমন এক দেশ—
যেখানে কোনও ধর্ম পর ছিল না,
কোনও ভাষা ছিল না বিদেশি।
অধিকারহীনদের অন্ধকারেও
জ্বলেছিল আশার সুগন্ধি চাঁদনী।
যেই মুহূর্তে তুমি ঘৃণা আর লোভের পতাকা তুললে,
মানুষের পতাকা হয়ে গেল ছেঁড়া কাপড়,
তাদের জাতীয় সঙ্গীত, এক শোকগীতি।
তুমি এলে নতুন ইতিহাস নিয়ে,
নতুন ভূগোল ও অঙ্ক নিয়ে।
আমাদের বন, জমি সব কেড়ে নিলে তোমার প্রভুদের জন্যে;
অস্ত্র নাড়াতে নাড়াতে ভীত করলে গরিবদের,
সত্য বলাদের করালে কারাবন্দি,
আত্মহত্যার প্রান্তে থাকা মানুষদের দিলে বিষের শিশি,
মুক্ত করে দিলে পাতালের দানবদের—এই পৃথিবীতে।
আমরা ছিলাম এক দেশ,
এখন আমরা ধুলো।
তবুও এই ধুলোতেও শোনা যায়
বন্দী পাথরের আর্তনাদ,
বেঁচে থাকা মানুষের গান,
শবফুলে ভরা ঘাসের মধ্যে থেকে
উঠে আসে রক্তাক্ত স্মৃতি,
বেহালার তারে ফুটে ওঠে অক্ষরের পাপড়ি,
মেঘে উড়ে যায় ফ্যাকাশে দেবদূতেরা,
আবর্জনার স্তূপ থেকে ছুটে যায়
অশ্বতুল্য সাদা ঘোড়া আর অনন্ত আকাঙ্ক্ষা,
পায়রা, পায়রা।
আমরা ফিরে আসব—
শূন্য ধানগোলার সূর্যস্বপ্ন থেকে,
যেখানে শীতেও সূর্যের ঘ্রাণ লুকিয়ে থাকে,
গলির মূত্র ও পরাগের গন্ধ থেকে,
স্তনে ভরা আনন্দ, কমলা আর কবিতা থেকে,
স্মৃতির ঘোলা জলাশয় থেকে,
জেলেদের কুটিরে ঢুকে পড়া
বর্ষাভেজা দিনের মতো,
উড়ন্ত ঝাঁটার ফিসফিস থেকে,
খনিশ্রমিকদের কালো তেলমাখা পোশাক থেকে,
আদিবাসী গ্রামে কোয়েলের পালকে আঁকা
বুনো দেবীর ছবির মধ্য দিয়ে,
ভাষায় বন্দি সাহসী স্মৃতি থেকে,
ছেঁড়া মানুষের ক্ষতবিক্ষত শব্দ থেকে,
রাতে মাড়িয়ে ফেলা সোনালি পাতার গাছ থেকে,
মূল থেকে, হ্যাঁ—মূল থেকেই।
আমরা গড়ব এক নতুন দেশ—
সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের দেশ,
যেখানে হাসি ঘৃণাহীন,
দেশ যেখানে দেয়াল বা সীমান্তহীন,
ধনী-গরিবের বিভাজনহীন,
যেখানে মাথা উঁচু,
আর বাহু—সবাইয়ের জন্য খোলা।
এই শুকনো নদীর পাড়ে,
উত্তরাধিকারহীন বনের মাটিতে,
যেখানে সন্ধ্যার তারা ঝরে পড়ে ম্যাগনোলিয়ার মতো—
সেখানেই আমরা রাখব সাতটি পাথর,
এক নতুন স্বপ্নের ভিত।
অনুবাদকঃ 



