ণ-শিল্প (পর্ব – এক)

mayuri mitra

সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্বের অবাস্তব তুল্যমূল্য বিচার কিংবা সৌন্দর্যের সঙ্গে সত্য :

সৌন্দর্যকে যিনি পরম আকুলতায় অনুভব করেন –বা পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চলে ন্যূনতম সৌন্দর্য খোঁজেন — তাঁরা কেউই কোন শিল্প শ্রেষ্ঠ এ বিচার এড়িয়ে যেতে পারেন না ৷ সচেতন ও সংবেদনশীল সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্কিত প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইলেই সৌন্দর্য তূল্যমূল্য বিচার অজান্তে তাঁদের মনে হানা দেবেন। এখন কথা হচ্ছে —সৌন্দর্যকে যদি আমরা আমাদের দেখার প্রেক্ষিত ও ” দেখার দর্শনেই ” ভিত্তিতে দেখি — তাহলে কি আমরা সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠত্বের বিচার থেকে সরে আসতে পারব? –যা কিনা সৌন্দর্যের নির্ভেজাল উপভোগকে নষ্ট করে দেয়। তত্ত্ব জানি না। জীবনের ঘটনা বলি পাঠকদের। বিচার – বক্তব্য আপনাদের।

নিজের ক্ষেত্রে চিরকালই দেখেছি, বৃহৎ সৌন্দর্যের চেয়ে ছোট্ট একটা সুন্দরের টুকরো একদম পাগলা করে দেয়। ভেতরটা ভালোলাগায় দুরমুশ হতে লাগে । জ্বর হওয়া লোকের মত সারা শরীরে একটা ছ্যাঁকছেঁকে ভাব । আর এই ভাবটা হঠাৎই আসে । পাখি তার ডানা একবার ঝাপটাতে যতটা সময় নেয় ঠিক অতটুকু সময় জুড়েই তার আসাযাওয়া ।
সেবার বিকেলে কাজ সেরে ফিরছি। বাস ছুটছে — ছোট এক মাঠের ঠিক মাঝে একথোকা কাশফুলের গাছ। শরৎ শেষ। ফলে অল্প কটাই পড়েছিল । তাও আবার রোগা কালিপটকা। কাশের বন কতোবার কতোভাবে দেখেছি। ঘন সবুজ মাঠ ভর্তি করে তাগড়া কাশ নাচছে —এমনটাই দেখেছি সাধারণত। ভাল যে লাগেনি এ বলি কী করে ?
ভালো না লাগলে মনে করে বলছি কেন ? কিন্তু সে ভালোলাগা সে বিকেলের অল্প কাশের দুলুনির মতো মজেনি।
শ্যামল মাঠে বিকেলবেলা সেই দুচারখানা কাশের লিকপিকে ঝুঁটিতে পড়েছিল দুর্গাপুজো শেষের মায়া-আলো। মনে হচ্ছিল — যেন কিশোরী টিয়ের দল মাথায় সফেদ ফিতে বেঁধে ইস্কুলে পড়তে যাচ্ছে ৷ ইস্কুলটা তাদের আকাশে। সেখানে কতো মাস্টার !–চাঁদ তারা তপন পবন !
বাসের দুর্দান্ত গতি আমার কল্পনাকে সেদিন রজু পরাতে পারেনি। অথচ এর থেকে সুন্দর যে আমি এত বছরের জীবনে উপভোগ করিনি তা নয়। তবে অল্প কাশের দৃশ্যটি দেখার সময় কিছুতেই আমি আগে দেখা সুন্দর দৃশ্য মনে করিনি। Better to say মনে পড়েনি। আসলে আমি ঐ অল্প দেখাটাকে নিবিড় করে দেখতে চেয়েছিলাম। সব শুকিয়ে গিয়ে সবুজ ক্ষেত্রে
অল্প কটা কাশ !
তার সঙ্গে আমার একটা বিশেষ জীবনদর্শন অন্তরালে কাজ করেছিল কি ? তা হল –অল্প বলেই সে সুন্দর। আর আমি এখন যেটুকু দেখছি সেটুকুই সত্যও। এর বাইরে আর কোনো পৃথিবীকে আমি এ মুহূর্তে জানি না।

         তাই ! কত কষ্টে একজন নিতান্ত সাধারণ  মানুষ বাঁচায় ঘরের পশ্চিমের জানলার গেরুয়া পর্দাটাকে ৷ যেখানে সূর্যাস্তরশ্মির শেষ আলো  এক মহান দৃশ্য তৈরি করে যায় নিয়ত ৷ আর  যখন সে টুকু পর্দায় অস্তমিত সূর্য মেশে --তখন কিন্তু অস্তে যাওয়া সূর্য  যেমন আবার বাঁচে -- প্রাণহীন পর্দাও তেমনি যৌবনের ভুলে যাওয়া  প্রেমিক হয়ে ওঠে ৷  তখন কত উজ্জ্বল আপনার জীবন !  মহার্ঘ --বোধহয় - ক্ষুদ্রের  সঞ্চয় !

           বাস যখন মাঠ পেরোচ্ছে --দেখি --প্রায় ফাঁকা মাঠ দিয়ে ফসলের ঝুঁড়ি মাথায় দিয়ে ঘরে পড়ছে শহরতলীর কৃষক ৷ একটা দুটো বউ ছিল - শাড়ির রঙ গাঢ় ৷ শ্রমের রঙ  ৷

1 thought on “ণ-শিল্প (পর্ব – এক)”

  1. সৌন্দর্য ধরা দেয় বিভিন্ন রূপে। এএকজনের কাছে এক এক রকম। আবার, এও সত্যি:
    “গোলাপের দিকে চেয়ে বললেম “সুন্দর। সুন্দর হলো সে”।। তবে চোখ আর মন সবসময় হাত ধরাধরি করে চলেনা। কিন্তু, “A thing of beauty is joy for ever.”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top