ভাঙা দিনের ঢালা – পর্ব পাঁচ

vanga diner dhela

সত্যিই আজও আমি ভাবি, যদি আমাকে তারা চুরি করে নিয়ে চলে যেত! এখন যে বিরাটাকার  শহর বাড়তে বাড়তে গ্রামকে খেয়ে নিচ্ছে  বা গ্রাম বাড়তে বাড়তে শহর হয়ে যাচ্ছে সেই সময় কেউ ভাবতে পারতো কি? সেই দৈত্যের মতো বিরাট আমবাগানের একদিকে এক বিশাল পুকুর, পুকুরে অনেক জল, সবাই স্নান করে। স্নান করার ঘাটটুকু ছেড়ে  চারপাশ জুড়ে প্রচুর পানিফল গাছ। পানি ফলে ভরে থাকে সবসময়।  গোবরা পুরের মানুষরা তা খায়।

সেদিন গোবরাপুরের অনেক মায়েরা নিত্যদিনের মতো স্নান করছে কাপড় কাচছে, সঙ্গে আমার মাও। আমাকে মা তার পেছনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে কিন্তু দুষ্টু আমি কখন যে সেখান থেকে উঠে গিয়ে আম বাগানের মধ্যে চলে গিয়েছি তা কেউ জানে না। তারপর ঘুরতে ঘুরতে এক সময় দেখি একটা মোটা আম গাছের আড়াল থেকে দু’জন লোক গায়ে রংবেরঙের জামা, গলায় অনেক বড় রঙিন মালা, আজও আমার সেই দৃশ্য মনে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে আর রঙিন মালা দেখাচ্ছে, যেন আমি ওদের কাছে গেলেই রঙিন মালা দেবে। আমি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি, তারা দু’জন ডাকছে তাদের ডাক  যেন নিশির ডাক। প্রায় ওদের কাছে চলে গিয়েছিলাম এই সময় হঠাৎ দাদা দৌড়ে এসে আমাকে তার পিঠের ওপরে তুলে মা-আ মা-আ বলে চিৎকার করে দৌড়াতে থাকলো। পুকুরের দিকে। দাদার চিৎকারে অনেকেই মার সঙ্গে পুকুর ছেড়ে  উঠে এসেছে। দাদা আমার চেয়ে  আট বছরের বড়। পুকুর থেকে উঠে আসা সবাইকে দেখে ওই দু’জন বাগানের মধ্য দিয়ে পালিয়ে গেল।

এই আমবাগানের পাশেই একটি ছোট পল্লী মতন। ওই যে সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় আমাদের কাকা, তাদের বাড়ির উঠোন শেষ হওয়ার পরের অংশে বাবাকে একটা ঘর বানিয়ে নিতে বললেন কিন্তু বাবার কাছে তেমন অর্থ কই? শেষে একটা জমিতে  মাটির ভিতের ওপর চাঁচের বেড়ার ঘর বানিয়ে বাবা মা দাদা আমি ভাই ঢুকে গেলাম। তখন পঞ্চাশ দশকের শেষ দিক, এখন ভাবলে চমকে উঠি। কোন লেখাটেখা নেই কারোর কাছ থেকে জমি কেনা নেই। ঘর বানিয়ে থাকা আরম্ভ হলো। এই পল্লী ছিল বর্ধিষ্ণু। সংস্কৃতি নিয়ে প্রতিটি ঘর থাকতো। এখনো চোখে ভাসে ছবির মতো পাড়াটুকু। আমাদের ঘরের সামনেই ছিল গভীর একটা পুকুর। পুকুরের পাড় দিয়ে মেজাজে দুলকি চলে হেঁটে বেড়াতো গুই সাপগুলো। আমাদের ভয় লাগত না। নবদ্বীপ থেকে আসার সময় মা হারমোনিয়াম আনেনি, আমার মনে পড়ে না! এই যে আমরা এখানে এলাম, পাড়ার সবাই এসে মাকে বলল সংস্কৃতি নিয়ে কিছু করতে হবে, মা লজ্জা পায়, বলে আমি কি করবো! তখন ওখানকার মুখার্জি বাড়ির খুকুদি পুসিদি বলল চিন্তা নেই আমাদের হারমোনিয়াম আছে, আমরা হারমোনিয়াম আনবো, আপনি গান তুলে দেবেন। মুখার্জী বাড়ির বুলুদিও এগিয়ে এলো, আমি তখন ঠিক বুঝতে পারতাম না দিদিরা কী করতে চায় মাকে নিয়ে। এখানে আরেকটা কথা বলে নিই — আমাদের খড়ের চালের বাড়ির পেছনে ছিল আর একটা মুখার্জি বাড়ি সেখানে থাকে ছবিদি। আমার পুরো মনে আছে সেই ছবিটি। খুব সুন্দর গান গান এবং  খুব সুন্দর নাচেন , ওরা খুবই প্রতিষ্ঠিত। সেই ছবিদিকে গান শেখাতে আসেন চেনা মোটা চেহারার  ভগীরথ সরদার। আমরা দেখি, আমি তো বেশ দুষ্টু আমি ছবিদির বাড়ির একটা ঘরে ঢুকে যেতাম যেখানে ছবি দিয়ে গান করতো এবং নাচতো। সেই ঘরে ছিল একটা হারমোনিয়াম এবং তবলা। এর আগে একটু বলে নিই— আমাদের খড়ের চালের বাড়িতে ছিল দুটো অভয়া ঘি-এর বড় খালি কৌটো। সেই কৌটো দুটো সামনে বসিয়ে তবলার মতন করে বাজাতাম। তাই দেখে মা একদিন কথায় কথায় বাবাকে বলেছিল, মলয়ের তালজ্ঞান  আছে, ও ছবিদের গানের  ঘরে ঢুকে ওদের গানের শিক্ষক না থাকলে টুলের ওপর বসে তবলা ঠোকে। বাবা বলেন, তা ছবিরা কিছু বলে না? মা বলে, না না ছবি মলয়কে খুব ভালোবাসে। এইসব যে কথা লিখছি আমি তিয়াত্তর  বছর বয়সে, আজ এখনো ছবিদি’ কত বয়সী হয়ে গেছেন!এখনো আমাকে ভালবাসেন, ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেন। আজও তার গলা প্রায় অটুট। সেই ছবিদির ছেলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। স্বনামধন্য গদ্য লেখক ভবানী ঘটক। এরা বনগাঁতে থাকেন, মনে পড়ছে কত কথা, আসলে প্রতিটি মানুষের জীবন যেন মনে-পড়া দিয়ে বাঁধা থাকে। তা যাক সেই ছবিদির ঘরের কথা বলি, গোবরাপুরের ছবিদি’ গান গেয়ে গেয়ে নাচ করছেন  আর আমি ওদের তবলায় ঠোকা মারছি, হঠাৎ দেখি জানালা দিয়ে ভগীরথ সরদার আসছেন, ছবিদিকে গান শেখানোর জন্য। এই দেখে আমি উঠে এক দৌড়ে পগার পার, ছবিদিকে তারপরে ভগীরথ কাকা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কে বাজাচ্ছিল? ছবিদি’ বলে ও তো মলয়, পন্ডিতমশাই-এর ছেলে। তখন ভগীরথ মাস্টারমশাই ছবিদিকে বলেছিলেন, ভালোই তো তাল আছে, এখন ভাবি আদৌ কি আমার তাল আছে?

(ক্রমশ)

আগের পর্বঃ ভাঙা দিনের ঢেলা – পর্ব ৪


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top