আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরি – পর্ব ৯

whatsapp image 2026 06 27 at 12.23.44 pm

কার্লোস মিউজিয়াম ও এমোরি ইউনিভার্সিটি

একদিন দুপুরে তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া সেরে বেলা একটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম মিউজিয়াম দেখতে। আট ডলার করে টিকিট। তাও আবার প্রতি মাসের প্রথম রবিবার কোনো দর্শনী লাগে না। আটলান্টার দ্রষ্টব্যগুলোর মধ্যে এখানেই দেখলাম সবচাইতে কম দামের টিকিট। বেশির ভাগ জায়গাতেই জনপ্রতি কুড়ি থেকে পঞ্চাশ ডলারের মত টিকিটের দাম। মানে প্রায় ষোলশ থেকে চারহাজার টাকা।
তখন নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। দীপাবলী আসতে আর ক’দিন বাকি। গরম তো একেবারেই নেই। শীতটাও তখনও আরামদায়ক। বিশেষত দুপুরে। ঘুরে বেড়ানোর আদর্শ সময়। তার ওপর মিউজিয়াম দেখতে আমি বেশ ভালোবাসি। অতীত সভ্যতার নিদর্শনগুলো যেন এক লহমায় অন্য জগতে পৌঁছে দেয় আমাকে।
এই মিউজিয়ামে গ্রীস, রোম, প্রাচীন আমেরিকা, ইজিপ্ট, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া এমনকি ভারতীয় সভ্যতার নানা সুন্দর সুন্দর দর্শনীয় জিনিস সাজানো আছে। মিশরীয় সভ্যতার অজস্র নিদর্শন আছে এখানে। এই বিভাগটাই আমার সবচাইতে সমৃদ্ধ মনে হল। সবচাইতে নজর কাড়ে পাঁচটি মমি আর মমি রাখার সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা (আসলে হায়ারোগ্লিফিক লিপি) বাক্সগুলো। এখানেই আমি প্রথম মানুষ ছাড়াও মাছ, পাখি, কুকুরের মমি দেখলাম। এখানে ফারাও প্রথম রামেসিসের মমিও ছিল একসময়। যদিও ওই মমির পরিচয় তখন জানা ছিল না। একজন অজ্ঞাতপরিচয়ের মমি হিসেবেই রাখা ছিল এখানে। পরে এমোরি ইউনিভার্সিটির কিছু অধ্যাপক এবং বিশেষজ্ঞের সন্দেহ হওয়াতে ভালো করে পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ওঁরা নিঃসন্দেহ হন যে সেটা প্রথম রামেসিসের মমি। শেষ পর্যন্ত সেই মূল্যবান মমি এমোরি ইউনিভার্সিটির তরফ থেকে কায়রো মিউজিয়ামের হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
সেদিন মিউজিয়ামে দীপাবলী উপলক্ষ্যে নানা অ্যাক্টিভিটি চলছিল। রিসেপশানে যে ভদ্রমহিলা বসেছিলেন তিনি দর্শনার্থীদের ভারতীয় দীপাবলীর পৌরাণিক কাহিনী আর প্রথা সুন্দর করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন ঢোকার মুখে। কথা বলতে বলতে আমাদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, আমার বলায় কোনো ভুল থাকলে শুধরে দিও। বুঝতে পারলাম, সেদিন যেহেতু আমি শাড়ি পরে গিয়েছিলাম তাই সহজেই দলের মধ্যে উনি আমাকে ভারতীয় বলে চিনতে পেরেছিলেন।
ঘন্টা তিনেকের বেশি সময় নিয়ে মিউজিয়াম দেখা শেষ করে একটা বড় হলে গিয়ে দেখি সেখানে দীপাবলীতে ঘর সাজানোর জন্য নানারকম সরঞ্জাম বিভিন্ন বাস্কেটে রাখা আছে। যে যার মত এসে সেখান থেকে উপকরণ তুলে নিয়ে নানারকম ঘর সাজানোর জিনিস বানাচ্ছে। আমি ঘুরে ঘুরে দেখছি লক্ষ্য করে এক বিদেশিনী মহিলা আমাকে ডেকে তিনটে সাজানোর জিনিস দেখিয়ে বললেন এর মধ্যে কোনটা বেশি ভালো হয়েছে? যদিও সবগুলোই সুন্দর ছিল তবু একটাকে আমি ভালো বলাতে সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলা সেটা আমাকে দিয়ে বললেন, “এটা তোমার জন্য।” আমি তো অপ্রস্তুত হয়ে “না, না, সে কী? তুমি বানিয়েছো, তুমি রাখো” ইত্যাদি বলতে শুরু করেছি। উনি আমার হাতে জোর করে ধরিয়ে দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, “এটা তোমাকে আমার গিফ্ট।” খুশি হলাম বলাই বাহুল্য। যতটা না গিফ্ট পেয়ে তার চাইতেও বেশি ওঁর ব্যবহারে। সদ্য পরিচিতা ওই ভদ্রমহিলার সাথে এক দুটো ছবি তুললাম। দেখা হয়ত আর কোনদিনই হবে না, কিন্তু উনি থেকে গেলেন আমার মনের ভেতর।
মিউজিয়াম থেকে যখন বেরোলাম তখন বিকেল ঢলে পড়ছে। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়েই বাইরে প্রকান্ড এক সবুজ লনে এসে দাঁড়ালাম। লনের চারদিক ঘিরে আছে সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি ইউনিভার্সিটির অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং, লাইব্রেরী, কনভোকেশন হল, মিউজিয়াম ইত্যাদি। সেজন্য এই জায়গাটার নাম ইউনিভার্সিটি কোয়াড্র্যাঙ্গেল। চারদিকে প্রচুর গাছগাছালি। ঘন সবুজ ঘাসের ওপর আলগা হাওয়ায় ঝরে পড়া খাঁজ কাটা বাদামী রংয়ের ওক গাছের পাতাগুলো দেখতে বেশ লাগছিল। লনের মধ্যে কিছু চেয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাতা। সেখানে কেউ বসে ল্যাপটপে মন দিয়ে কাজ করছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ বা দল বেঁধে ফ্রিসবি খেলতে খেলতে হাসি মজায় মেতে উঠেছে। আমরা দুটো খালি চেয়ার দেখে একটু বসে জিরিয়ে নিলাম। মিউজিয়ামে প্রচুর হেঁটেছি। পা ব্যথা হয়ে গেছিল। যদিও মিউজিয়ামের ভেতরেও অনেক বসার জায়গা আছে তবে বিরাট লনের খোলামেলা সুন্দর পরিবেশে বসতেই বেশি ভাল লাগছিল। বেশ কিছুক্ষণ বসার পর উঠে হাঁটতে হাঁটতে ইউনিভার্সিটির রাস্তায় কিছুক্ষণ বেড়ালাম। একটা বড় ক্লক টাওয়ারের মাথায় তখন পড়ন্ত সূর্যের আলো পড়ে চমৎকার দেখাচ্ছিল। বেশ কিছু গাছের পাতা আপাদমস্তক রঙিন পাতায় নিজেকে মুড়ে রেখেছে। কী যে ভালো লাগে দেখতে! হাঁটতে হাঁটতে মেডিক্যাল স্কুলের বিরাট বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছে গেলাম। এমোরি ইউনিভার্সিটির মেডিকেল স্কুলের খুব সুনাম আছে। ওখান থেকে হালকা শীত মাখানো সন্ধ্যার মুখে ছেলের সাথে গাড়িতে চেপে বাড়ির পথ ধরলাম।

(ক্রমশ)

whatsapp image 2026 06 27 at 12.23.45 pmwhatsapp image 2026 06 27 at 12.23.44 pm (2)whatsapp image 2026 06 27 at 12.23.44 pm (1)whatsapp image 2026 06 27 at 12.23.45 pm (2)whatsapp image 2026 06 27 at 12.23.45 pm (1)

আগের পর্বঃ আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরি – পর্ব ৮


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top