‘পৃথিবীর কান্না মেঘ হয়ে উপর দিকে ছুটছে। তাই মনে হচ্ছে বৃষ্টি উপরের দিকে চলে যাচ্ছে। এ আর কিছু নয় ,মাধ্যাকর্ষণের শোক।’ স্মৃতি অস্ফুটে কথাগুলো বলে গেল।
এনট্রপি বৃদ্ধের চোখে জল।
‘ নিয়মের বিশ্বাস ভেঙ্গে যাচ্ছে।ধীরে ধীরে
সব বল এককহীন হয়ে যাচ্ছে। স্পেস টাইম কার্ভেচার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। আমরা প্রবেশ করছি নতুন ঘটনা দিগন্তের মধ্যে।’
পরিসংখ্যানবিদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খাতার সাদা পাতায় একের পর এক সমীকরণ লিখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর নিজেই সেগুলো কেটে দিলেন।
—”সংখ্যাগুলো যেন আর আমার কথা শুনছে না। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো জায়গা বদলাচ্ছে।”
এনট্রপি বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন,
—”সংখ্যা কখনও অবাধ্য হয় না। তারা কেবল নতুন ব্যাকরণ শিখে ফেলে। ব্যাকরণ বদলালেই গণিতকে পাগলামি মনে হয়।”
ধীরে ধীরে তীব্র বিপুল তরঙ্গের ভৈরবীর নিনাদে ভেসে যাচ্ছে ট্রেনের কামরা। সংখ্যার ভিতর সুর প্রবেশ করছে,সবকিছুকে আচ্ছন্ন করছে সুর।
সমীকরণের চিহ্নগুলো যেন স্বরলিপিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। যোগ, বিয়োগ, সমান—সবকিছু এক অদৃশ্য রাগের আলাপে গলে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যানবিদ বিস্ময়ে দেখলেন, তাঁর খাতায় লেখা সংখ্যাগুলো আর স্থির নেই। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান বদলে এক একটি সুরের বিন্দু হয়ে উঠছে। তিনি আতঙ্কিত গলায় বললেন,
—”এ কী! সংখ্যা কি গাওয়া শুরু করল?”
এনট্রপি বৃদ্ধ মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
—”মহাবিশ্বের আদিভাষা হয়তো গণিত নয়, সুর। গণিত তার অনুবাদ মাত্র। কখনও কখনও অনুবাদ ভেঙে পড়ে, তখন মূল ভাষা নিজের পরিচয় দেয়।”
ভৈরবীর আলাপ আরও গভীর হল। ট্রেনের লোহার গায়ে, জানালার কাঁচে, এমনকি যাত্রীদের শ্বাস-প্রশ্বাসেও একই কম্পন।
স্মৃতি চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হল, বহু লক্ষ বছর আগে কোনো নক্ষত্রের জন্মমুহূর্তে সে এই একই সুর শুনেছিল। আবার মনে হল, পৃথিবীর শেষ সন্ধ্যাতেও এই সুরই বাজবে।
যন্ত্রণা ধীরে বলল,
—”তাহলে সুরও কি স্মৃতি বহন করে?”
এনট্রপি বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—”স্মৃতি সময়কে ধরে রাখে, আর সুর ধরে রাখে সময়ের স্পন্দন। তাই কিছু রাগ শুনলে মানুষের মনে এমন কিছু জেগে ওঠে, যার কোনো ব্যক্তিগত ইতিহাস নেই। যেন মহাবিশ্ব নিজের অতীতের কথা মানুষের হৃদয়ে ফিসফিস করে বলে।”
ঠিক তখনই ট্রেনের চাকা থেকে কোনো শব্দ এল না।
তবু ট্রেন চলছিল।
আক্রোশ বললো,’ তার রাগ পিছলে পিছলে যাচ্ছে।দানা বাঁধছে না।’
উদ্বেগের সাথে স্মৃতির দূরত্ব তৈরি করছে ভৈরবী,ধীরে ধীরে টোড়ি প্রবেশ করেছে
আর উদ্বেগের জমাট বাঁধা অবস্থা যেন
গলছে।
এনট্রপি বৃদ্ধ বললেন,’ এবার আমরা ধীরে ধীরে ঘটনা দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
ভৈরবী তার বিশৃঙ্খলার করুণা দিয়ে আর
টোড়ী তার নতুন সাম্যের সন্ধানী চোখ নিয়ে প্রবেশ করিয়ে দেবে আমাদের ঘটনা দিগন্তের মধ্যে। যাকে তোমরা ‘ফেজ ট্রানজিশন’ বলো সেটাই আসলে ‘আলাপ’।
যন্ত্রণা বললো,’ বিজ্ঞান যাকে সংকট বিন্দু বলে ,সঙ্গীত তাকে আলাপ বলে। আর আলাপের জন্ম মুহূর্তে জন্মেছিলাম আমি আর জন্মেছিল আনন্দ।’
ট্রেনের ভেতরে হঠাৎ কেউ আর নিজের ছায়া দেখতে পেল না।
জানালার বাইরে আকাশ নেই, পৃথিবী নেই। কেবল অসীম বক্রতা। যেন স্থান নিজেকেই ভাঁজ করে ফেলছে।
পরিসংখ্যানবিদ ফিসফিস করে বললেন,—”সমীকরণগুলো… সব অসীমে চলে যাচ্ছে। কোনো মানই আর সংজ্ঞায়িত নয়।”
এনট্রপি বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—”সংজ্ঞার এখানেই মৃত্যু। ঘটনা দিগন্ত ছিল শেষ অভিধান। এর ওপারে ভাষা টেকে না।”
ভৈরবীর শেষ স্বরটি দীর্ঘ হতে হতে এমন এক কম্পনে পৌঁছাল, যেখানে তাকে আর শোনা যায় না—শুধু অনুভব করা যায়।
টোড়ীও নীরব।
নীরবতাই যেন নতুন রাগ।
স্মৃতি হঠাৎ চমকে উঠল।
—”আমার অতীত কোথায়?”
যন্ত্রণা উত্তর দিল,
—”সিঙ্গুলারিটির কাছে অতীত ও ভবিষ্যৎ একই বিন্দুতে সংকুচিত হয়। সেখানে স্মৃতি আর ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।”
ট্রেনের চাকা তখনও ঘুরছে, অথচ দূরত্ব শূন্য।
সময় প্রবাহিত হচ্ছে, অথচ কোনো মুহূর্ত জন্ম নিচ্ছে না।
পরিসংখ্যানবিদ শেষবারের মতো একটি সংখ্যা লিখলেন—’১’।
সংখ্যাটি ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে ঢুকে একটি বিন্দু হয়ে গেল।
তারপর বিন্দুটিও অদৃশ্য।
এনট্রপি বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত দীপ্তি।
—”দেখলে? সিঙ্গুলারিটি কোনো অসীম ঘনত্বের স্থানমাত্র নয়। এটি সেই বিন্দু, যেখানে সংখ্যা নিজের গণনা ভুলে যায়, সুর নিজের শ্রোতাকে হারায়, মাধ্যাকর্ষণ নিজের শোকের কারণ ভুলে যায়, আর অস্তিত্ব নিজেকে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়।
সম্ভবত মহাবিশ্বের প্রথম আলাপ এখানেই শুরু হয়েছিল। আর প্রতিটি কৃষ্ণগহ্বর সেই আদিস্বরের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি অসমাপ্ত চেষ্টা।”
(ক্রমশঃ)
আগের পর্বঃ দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ৮)



