এখানে আমাদের একটা ঠেক তৈরি হয়েছে। সামনেই একটা ক্ষেত পার করে, এদের বিরাট গোয়াল, তার চারপাশে সবুজ, ওখানে একটা লিচু গাছের ঘন ছায়ায় মাচা বাঁধা হয়েছে, কলকাতার ঠেকের মতো নিয়মিত না হলেও, ছুটিছাটার দিনে ওখানে আমারই কাছাকাছি বয়সের কিছু ছেলে জড়ো হয়। মুকেশ সিং, ধর্মেন্দ্র সিং, রোহিত সিং, সত্যেন্দ্র সিং, এরা সবাই। এরা সব এই বাড়িরই ছেলে। আমার বয়সটাই এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, বাকিরা ৩৫ থেকে ৪০-এর মধ্যে।
গোয়ালকে এরা বাথান বলে। বাথান শব্দটা অবশ্য বাংলাদেশেও পেয়েছি। বাংলাদেশ বলতে সবসময়ই আমার কাছে অবিভক্ত বঙ্গ, আমি সীমান্ত মানি না, মানিনি কোনোদিন।
এই বাথানেই এক ছুটির দিন দুপুরে মহুয়া খেয়েছিলাম। মুকেশ সিং নিয়ে এসেছিল, কাছেই মহুয়ার ঠেক, আগেও খেয়েছি, তবে পারিবারিক প্রভাবের ফলে এরা খাঁটি জিনিসটা পায়। খাওয়ার ঠিক পরপরই ওখানে এসেছিল শিবজী সিং, মহুয়া খাওয়ার কথা শুনে ভীষণ উল্লসিত হয়ে বলেছিল, “হম আপকো এক চিজ পিলায়েঙ্গে, পিনেকে বাদ বোলিয়েগা।” তার দিন দুয়েক পরেই আমার ঘরে সন্ধ্যেবেলা শিবজী সিং হাতে একটা বোতল নিয়ে উপস্থিত হয়, ভেতরে একটা স্বচ্ছ তরল, জানা গেছিল, আঙুর থেকে তৈরি ওই তরল শুধুমাত্র আমার জন্যই অর্ডার দিয়ে বানানো হয়েছে। এই বাড়ির পেছনেই একটু দূরে একজন বানায়, বাড়িটা ছাদ থেকে দেখা যায়, উঠোনে একটা ঘোড়া বাঁধা থাকে।
ওটা শুধু আমিই খেয়েছিলাম, এবং ভর সন্ধ্যেবেলাতেই। ঝাঁঝালো, স্বাদহীন। ধীরে ধীরে ওটা আমার স্নায়ুর ওপর দখল নিতে শুরু করলে এক তুরীয় আনন্দের অবস্থায় চলে গেছিলাম। যদিও কথা জড়ায়নি, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম স্টেপগুলো আরও দৃঢ়ভাবে ফেলা দরকার। নইলে সামান্য এদিক-ওদিক হতেই পারে।
ওটা খাওয়া শেষ হলে শিবজী সিং চলে গেছিল। এরা রাত সাড়ে আটটার মধ্যে সবাই খেতে বসে যায়। আমাকেও সেই সময়ই খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল এটা খাওয়ার পর ঘরে বসে থাকলে উপভোগ করাটা পুরোপুরি হবে না, তাই আমবাগানের পথে বেরিয়ে পড়ি, তখন রাত আটটা।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে কিছুটা গেলেই আমবাগান, যখন বেরিয়েছিলাম, তখন আমার এক ছাত্র, মনজিত সিংয়ের ছেলে পীযূষ, এদের উচ্চারণে পিয়ুষ আমাকে দেখেছিল। ওরা জানেই যে এই শহুরে মাস্টারমশাই মাঝেমাঝেই হুট করে বেরিয়ে পড়ে, আবার ফিরেও আসে, তাই ডেকে জিজ্ঞেস করেনি কোথায় চলেছি। আর আমি সরু একটা পায়ে চলা পথ পেরিয়ে, ক্ষেতের ওপর দিয়ে ওই পথে এগিয়ে যেতে যেতে দেখেছিলাম জোনাকির মেলা, মাথার ওপর বৃশ্চিক রাশি আর কালপুরুষ ঝুঁকে আছে, আমবাগানের ভেতর হাওয়ার কনসার্ট। ওই আমবাগান পার করে আরও এগিয়ে গেছিলাম, তারপর একটা খোলা জায়গা, সদ্য ফসল কাটা হয়েছে, ওখানে আলের ওপর গুছিয়ে বসেছিলাম, আর মনে হচ্ছিল, কী দরকার এসব শহরের? এত জটিলতার? এতকিছু জানার? এই যে জীবন, এই উন্মুক্ত প্রকৃতি, এইসব রাত, বড় প্রয়োজন এখন, ভীষণ দরকার মানুষের, ভীষণ।
কতক্ষণ কেটে গেছিল জানি না, ওই ক্ষেতের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ লেগে এসেছিল। মুখের ওপর টর্চের আলো এসে পড়ায় ঘুম ভাঙল, সামনে নগেন্দ্র সিং আর ধর্মেন্দ্র সিং, বলল “কঁহা কঁহা ঘুমতে রহতে হ্যাঁয় মাস্টারজি? অওর ইধর আকে সো ভি গয়ে? চলিয়ো, রাত দশ বজ রহা হ্যায়।” আমার কথা বলতে ইচ্ছা করল না, সবসময় কথা বলতে নেই।
ওদের সঙ্গে বাড়িতে ঢুকলাম, আমাকে খেতে দিতে আসে সুভাষ সিংয়ের মেয়ে, অল্পবয়স, বছর বাইশ তেইশ হবে। দেখলাম উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। এমনিতে এরা ভীষণ পর্দানশীনা, কিন্তু সেদিন ফাঁকা উঠোনে ও একাই দাঁড়িয়েছিল। বাড়ির অনেকখানি অংশ তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে যখন ওপরে উঠছি, বলল “কঁহা চলে গয়ে থে মাস্টারজি? ম্যায় খানা লেকে বয়ঠি হুঁ।”
আমি উত্তর না দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম।
(ক্রমশ)



