ভোটের নান্দনিকতা এবং ক্ষমতার মায়াজাল: ব্যালট বাক্সের উত্তর-আধুনিক পাঠ

afternoon gathering

​১. ভূমিকা: কার্নিভাল ও উৎসবের আঙিনায় ভোট

​নৈঃশব্দ্যের বুক চিরে হঠাৎ একটা চেনা সুর বেজে ওঠে মাইকে। শান্ত দুপুরের আলসেমি ভেঙে পাড়ার মোড়ে জটলা বাড়ে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘ভোট’ তো কেবলই সরকার পরিবর্তনের একটা শুকনো আইনি প্রক্রিয়া নয়, এ এক অদ্ভুত কার্নিভাল, এক সুপরিকল্পিত উৎসব। চারপাশের দেওয়ালে দেওয়ালে রঙের খেলা, চুনকাম করা স্মৃতির ওপর চড়া দাগের স্লোগান, আর মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা রিলস ও মিমের সুনামি—সব মিলিয়ে ভোট এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। কিন্তু এই দৃশ্যমান জাঁকজমক আর উৎসবের রোশনাইয়ের নিচে যে গভীর বিষাদ আর মন কেমন করা একাকীত্ব লুকিয়ে থাকে, তাকে ক’জন ছুঁতে পারে? ফরাসি দার্শনিক জঁ বদ্রিলিয়ার বা মিশেল ফুকোর তত্ত্বের আড়ালে আসলে লুকিয়ে আছে এক নাগরিক দীর্ঘশ্বাস।

​২. Political Aesthetics (রাজনৈতিক নান্দনিকতা): যখন প্রচারই সত্য

​একসময় রাজনীতি ছিল তর্কের, দর্শনের, কিংবা এক বুক আদর্শ নিয়ে রাজপথে নামার দিন। কিন্তু আজ উত্তর-আধুনিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতি আর যুক্তি খোঁজে না, সে খোঁজে শুধু একটা ঝকঝকে প্রতিচ্ছবি।

​চিহ্নের রাজনীতি: 

ভোটের হাটে প্রার্থীর অন্তরের সততার চেয়ে অনেক বেশি দামি হয়ে ওঠে তাঁর দলের প্রতীক, তাঁর উত্তরীয়র রঙ, কিংবা জনসভায় দেওয়া তাঁর চড়া গলার প্রতিশ্রুতির নান্দনিকতা।

হাইপার-রিয়েলিটি (Hyper-reality):

বদ্রিলিয়ারের তত্ত্বের দিকে তাকালে মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে। আমরা এক এমন অবাস্তব মায়ায় বাস করছি, যেখানে আসল সত্যের চেয়ে তার রঙিন বিজ্ঞাপনটাই বেশি সত্য বলে মনে হয়। political দলগুলো সুকৌশলে এমন এক দৃশ্যমান মায়াজাল বুনে দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের রোজকার থালার শূন্যতা, বেকারত্বের গ্লানি কিংবা চড়া বাজারের বাস্তব কষ্টগুলোকে কয়েকটা দিনের জন্য একটা রঙিন চাদরে ঢাকা দিয়ে দেয়। ভোটের এই উৎসব আসলে এক মনস্তাত্ত্বিক আফিম, যা আমাদের অবশ করে রাখে, ভুলিয়ে রাখে নিজের আসল ক্ষতগুলোকে।

​সেই মোহাচ্ছন্নতার আবহে vote তখন এক বিষাদগ্রস্ত কোলাজ হয়ে ওঠে, যেখানে মিশে যায় নাগরিকের নীরব ক্ষোভ আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের নস্টালজিয়া। এই দৃশ্যপটকেই যেন এসে ছুঁয়ে যায় সুরের এক আকুল আর্তি—

​“স্লোগানে স্লোগানে ঢাকা দেয়ালে দেয়ালে
সলিল চৌধুরীর ফেলে আসা গানে
কোন্ কবেকার অনুরোধের আসরে
তোমাকে চাই…” (কবির সুমন)

​ভোটের বাজারে যখন চারপাশের চেনা দেওয়ালগুলো স্লোগানের পর স্লোগানে ঢাকা পড়ে যায়, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে। সলিল চৌধুরীর সেই যে প্রতিবাদের গান, যা একসময় মানুষের অধিকারের কথা বলত, আজকের কর্পোরেট ভোট তাকেই যেন এক পণ্যায়িত ‘অনুরোধের আসরে’ বদলে দিয়েছে। এই চটকের মাঝেও মানুষ আসলে এক আদিম সুর, এক খাঁটি মানবিক আশ্রয়ের খোঁজ করে চলে অবিরত।

​৩. ক্ষমতার মায়াজাল (The Illusion of Power):
 শাসিত যখন নিজেকে শাসক ভাবে

​ভোটের সবচেয়ে বড় মায়াবী ম্যাজিক হলো, এটি সাধারণ মানুষকে অন্তত একটা দিনের জন্য এই মরীচিকার মুখোমুখি দাঁড় করায় যে—”আমিই এই দেশের ভাগ্যবিধাতা।” কিন্তু এই ক্ষমতা কি সত্যি, নাকি এক সুনিপুণ ছলনা? পাঁচ বছরের নীরবতা, একদিনের চিৎকার: ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুশোর সেই পুরনো আক্ষেপ আজ বড় বেশি সত্যি বলে মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, মানুষ কেবল ভোট দেওয়ার দিনটিতেই স্বাধীন থাকে, আর ভোট দেওয়া শেষ হলেই সে আবার শৃঙ্খলিত, আবার একাকী।

​ক্ষমতার বিকেন্দ্রেীকরণ বনাম কেন্দ্রেীকরণ: মিশেল ফুকো আমাদের মনে করিয়ে দেন, আধুনিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা কোনো একজন রাজার সিংহাসনে বসে থাকে না; সে লুকিয়ে থাকে আইনি খেরোখাতায়, পুলিশের পোশাকে, ব্যুরোক্রেসির অলিন্দে আর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের জটিল রন্ধ্রে। ভোট দিয়ে আমরা কেবল পাঁচ বছরের জন্য একজন নতুন ম্যানেজার বা শাসক বেছে নিই, কিন্তু যে ব্যবস্থা আমাদের প্রতিদিন নিঃস্ব করে, সেই কাঠামোর গায়ে একটা আঁচড়ও পড়ে না।

​ব্যালট বাক্সে বোতাম টেপার আনন্দ তাই একটা মায়াজাল মাত্র, যা মানুষকে এই সান্ত্বনা দেয় যে সে বুঝি ব্যবস্থার চালক, অথচ সে আসলে ব্যবস্থার দ্বারা চালিত এক পুতুল।

​রাজনীতির এই সুউচ্চ ইমারত আর ক্ষমতার পালাবদলের খেলা যতই চলুক না কেন, দিনের শেষে সাধারণ মানুষের ভাঙা বেড়া আর ক্লান্ত চোখের কোণের জলটা একই থেকে যায়। ভোটের উৎসব যেন সেই ক্লান্তিতে এক মুহূর্তের পলায়নবাদ বা একটুখানি চোখ বুজে থাকা। নাগরিক জীবনের এই চিরন্তন বিষাদকে মনে করিয়ে দেয় সেই অতি চেনা সুর—

​“পুরোনো নতুন মুখ ঘরে ইমারতে
অগুন্তি মানুষের ক্লান্ত মিছিলে
অচেনা ছুটির ছোঁয়া তুমি এনে দিলে
নাগরিক ক্লান্তিতে তোমাকে চাই” (কবীর সুমন)।

​পাঁচ বছরের চেনা মুখের ভিড়ে যখন নতুন কোনো মুখ ইমারতের বারান্দায় ক্ষমতার দাবি নিয়ে আসে, সাধারণ মানুষ তখন এই ক্লান্ত মিছিলের মধ্যেই এক পশলা ‘অচেনা ছুটি’ বা মুক্তির স্বাদ খোঁজে। ভোট তখন আর কেবল রাজনৈতিক অধিকার থাকে না, তা হয়ে ওঠে নাগরিক ক্লান্তি থেকে সাময়িক নিষ্কৃতির এক অবচেতন, একাকী আকুলতা।

​৪. ভোটার মনস্তত্ত্ব: 
স্বাধীন ইচ্ছা নাকি পণ্যায়ন?

​আজকের কর্পোরেট দুনিয়ায় ভোট দেওয়া আর বাজার থেকে সাবান-তেল কেনার মধ্যে তফাতটুকু মুছে গেছে। বিজ্ঞাপনের আলোয় যেভাবে একটা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে শ্রেষ্ঠ বলে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, ঠিক একইভাবে ডেটা অ্যানালিটিক্স আর অ্যালগরিদমের অদৃশ্য সুতোয় আমাদের অবচেতন মনকে নাচানো হচ্ছে।

​মানুষ ভাবছে সে নিজের ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ (Free Will) দিয়ে নিজের মনের মানুষকে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সোশ্যাল মিডিয়ার ফিড আর টার্গেটেড ক্যাম্পেইন তার মগজধোলাই করে সিদ্ধান্তটা অনেক আগেই ঠিক করে রেখেছে। ভেবে বুকটা কেমন হাহাকার করে ওঠে—আজকের ভোটার আর কোনো রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী নয়, সে নিজেই এই মায়াবী বাজারের এক মস্ত বড় উপভোক্তা, এক নিঃসঙ্গ ক্রেতা।

​৫. উপসংহার:
মায়াজাল ছিন্ন করার দর্শন

​ভোটের এই চোখ ধাঁধানো নান্দনিকতা আর ক্ষমতার মায়াজালকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সাধ্য আমাদের নেই। কারণ এর বাইরে গিয়ে কোনো সুন্দর, মানবিক বিকল্পের রূপরেখা আজও মানুষ তৈরি করতে পারেনি। তবে এই মায়াজালকে চিনে নেওয়াটাই বোধহয় একটা বড় দার্শনিক পদক্ষেপ।

​ভোটের উৎসবের আলোতেও যখন একজন ভোটার তার ভেতরের একাকীত্ব আর প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে বাঁচিয়ে রাখে; যখন সে বোঝে যে দেওয়াল লিখনের এই চটকদার স্লোগান আসলে এক ধরনের ‘সিমুলেশন’ বা অবাস্তব প্রতিচ্ছবি, তখনই এই মায়াজাল কিছুটা হলেও আলগা হয়। ভোটকে কেবল একদিনের ক্ষমতার অহংকার না ভেবে, প্রতিদিন রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অবিরত মায়াময় প্রক্রিয়াই হলো প্রকৃত গণতন্ত্রের দর্শন। দিনশেষে ব্যালট বাক্সটা তো শুধু একটা কাঠের বা লোহার বাক্স নয়, ওটা আসলে কোটি কোটি মানুষের না-বলা আশা আর কান্নার এক নীরব সাক্ষী।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top