মুজঃফরপুরের দিনগুলো ৪র্থ পর্ব

morning calm at the ashram

এখানে এক বাঙালি সাধক ছিলেন। একটু দূরে নির্জন জায়গায় আশ্রম। তপোবনের মতোই শান্ত। লিচুগাছে ছাওয়া, মূল মন্দিরকে ঘিরে তিনটে ঘর। মন্দিরে হর-পার্বতী।

আমি খবরটা শুনেছিলাম মনজিত সিংয়ের কাছে। মনজিত শিবজী সিংয়ের আরেক ছেলে। ম্যাথমেটিক্সে এম. এ করে বি. এড পড়ছে। পারিবারিক সামন্ততান্ত্রিক প্রভাবের থেকে বাইরে, একটু আলাদা।

ওই আশ্রমে একাই গিয়েছিলাম, এসব জায়গায় একাই যেতে হয়। রাস্তায় বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞেস করতে করতে পৌঁছে গেলাম, তখন দুপুর ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে এগিয়ে চলেছে।

সেই মহাত্মার ছবি দেখলাম, শীর্ণ, সমকায় শিরোগ্রীব, কাঁধে এসে পড়েছে কাঁচাপাকা চুল, হালকা দাড়ি-গোঁফ, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত, সিদ্ধাসনে বসে আছেন, নাম স্বামী রামানন্দ। মনে হলো আরো কিছুদিন আগে যদি দেখা পেতাম!

আশ্রমে চারজন থাকেন, শুনলাম এক ব্রহ্মচারী পরিব্রাজনে। মহন্ত অল্পবয়সী এক দিব্যকান্তি যুবক, মিতভাষী, সদাহাস্যময়। বাকিদের মধ্যে আরো দু’জন বর্ষীয়ান সন্ন্যাসী।

শুনলাম রামানন্দ এখানে এসেছিলেন ষাটের দশকে। নির্জনে একটা ঝুপড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করেন। অষ্টসিদ্ধির কিছু কিছু প্রকাশ পেতে শুরু করলে স্থানীয় মানুষেরা এই আশ্রমটা বানিয়ে দিয়েছিল। বেশকিছু শিষ্যও হয়ে যায়।

রামানন্দ নাদসাধক ছিলেন। এঁরা অনাহত নাদের সাধনা করে হংসযোগের পথে আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করেন। যেখানে নাদসাধনা নিয়মিত হয়, সেখানে মাটিতে এবং দেওয়ালে কান পাতলে সমুদ্রের গর্জন, ওঁকার, শঙ্খধ্বনি ইত্যাদি শোনা যায়। ‘তপোভূমি নর্মদা’য় এই সাধনসংক্রান্ত বিশদ আলোচনা আছে।

ওঁরা আমাকে আশ্রমের গরুর ঘন দুধ খাওয়ালেন, সঙ্গে কিছু ফল। সকলেই চুপচাপ। আমিও কথা না বলে চুপ করেই ছিলাম। তারপর মন্দিরে গিয়ে হর-পার্বতীর সামনে মাটিতে কান পাতলাম। দেখলাম মাটির মধ্যে থেকে উঠে আসছে সমুদ্রের গর্জন, মনে হচ্ছিল আশ্রমটা যেন সমুদ্রের পাড়েই। এতটা আশা করিনি, ভেবেছিলাম গুরুর তিরোভাবের পর এখন এই আশ্রমে নাদসাধনার ধারা ক্ষীয়মান হয়ে এসেছে, যেমন হয়। কিন্তু ওই সমুদ্রগর্জন শোনার পর মহন্তের দিকে ভালো করে তাকালাম। হাত-পায়ের আঙুল, বুক, চোখ, ইত্যাদিতে সাধকের লক্ষণ সুস্পষ্ট। আমার ওই খুঁটিয়ে দেখা লক্ষ করে মহন্ত মৃদু হাসলেন। মোহ না অন্ত হলে মহন্ত হওয়া যায় না, বললাম, “আভাস ক্যায়সা হ্যায়?” কাছে ডেকে কানে কানে বললেন, “ত্রিকুটির পার।” বুঝলাম ইনি জ্যোতি দর্শন করেন। তারপর আরো কিছু গূঢ় কথা হলো। বললেন, আপনাকে দেখেই বুঝেছিলাম আপনি এই পথের একজন অনুসন্ধিৎসু। তাই আপনাকে অনুভূতির কথাটা বললাম। না হলে জানেনই তো, “আপন সাধন কথা, না কহিও যথা তথা।”

ওখানে আরো কিছুক্ষণ ছিলাম। সন্ধ্যে নেমে এলে ওঁরা আরতি করলেন। বলা হয় আরতি দর্শনে কামনা হ্রাস হতে থাকে। তারপর সন্ধ্যার ওই ব্রাহ্মমুহূর্তে ওঁরা দরজা দিলেন, এখন থেকে দীর্ঘক্ষণ ধ্যান-জপের সময়।

আমি ওই আশ্রম থেকে বেরিয়ে পথে নামলাম। আকাশ ভর্তি তারার নিচে এই আমার গরিব দেশ, এখানকার মানুষ, এই অবারিত প্রকৃতি এক অনন্তের সাধনায় চিরকালই আত্মনিয়োগ করেছেন। মনে হলো গাছ গুলোও যেন ধ্যানমগ্ন। জোনাকির আলোয় পথ চলতে চলতে মনে হলো চরাচর ব্যাপী এক অনাহত ধ্বনি উঠছে। সে কথা মুখে প্রকাশ করতে পারি— এ সাধ্য আমার নেই। এরকম কত অখ্যাত সাধক আজও তাঁদের সাধনায় মগ্ন হয়ে আছেন। কত মহাত্মার, কত ভক্তের পায়ের ধুলোয় ভরে আছে এই দেশের কত অজানা, দুর্গম পথ। সে-সব পথের ধুলো অবনত মস্তকে গ্রহণ করি। ওই মহন্ত, ওঁর কাছে আবারও আসতে হবে। ভক্তসঙ্গ দুর্লভ।

ক্রমশ

মুজঃফরপুরের দিনগুলো ৩য় পর্ব


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top