আমাদের কথা – ভাষাদিবস

bengali school lesson in the courtyard

রান্নায় মশলার পরিমাণ বেড়ে গেলে যেমন স্বাদ তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে তেমন নিরন্তর আবেগ অযৌক্তিকভাবে বয়ে গেলে মানুষের অন্তরে তার আঁচ লাগে না। বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির আবেগ খানিক এই প্রকৃতির।
সমস্যা হল এই যে বাঙালি নিজেকে মাতৃভাষার মাথা আর লেজ কেটে শরীর নিয়ে যত্ন করে। সেই যত্ন নিয়ে বিস্তর কথা হয় বটে, বিস্তর ভাবনা হয় বটে কিন্তু মায়োপিক দৃষ্টিভঙ্গির বদল হয় না বলে মস্তকহীন শরীর নিয়ে যাবতীয় যত্ন সাময়িক ফেস্টুন এর মতো বাঙালির মাথায় একটি তারিখ হয়ে ঝুলে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে ২১ শে ফেব্রুয়ারি একটি তারিখ। ভাষাদিবস অর্থে ভাষণ এবং কয়েক গুচ্ছ কবিতা। ভাষার সংস্কারসাধন নয়। মাতৃভাষার প্রতি বাঙালির যত্ন যদি তারিখ ডিঙিয়ে যেতে পারত তবে প্রথম দর্শনে বাংলা মিডিয়ম স্কুলগুলো কিছু বাড়তি যত্ন পেত। বাড়তি যত্ন অর্থে মিড-ডে মিলে ডিমের ব্যবস্থা নয়, স্কুলের সার্বিক উন্নতি সাধন।
যে ব্যক্তি নিজের ঘরের ছেলেমেয়েদের বাংলা মিডিয়মে পড়ানোর সাহস পায় না সে কী করে মাতৃভাষা নিয়ে তারস্বরে কথা বলে? প্রাণের কবিতা লেখে? সে নিজে কতখানি বাঙালি তাই নিয়ে বারফাট্টাই করে?
বিবিধ ভাষাশিক্ষা এক বিশেষ গুনের আত্তিকরণ। বিবিধ ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান বাড়ে। আর শব্দের ব্যুৎপত্তি ঘাটতে গেলে দেখা যায় বিবিধ ভাষার সংমিশ্রণ রয়েছে সব ভাষাতেই। সুতরাং কথ্য ভাষায় বাংলা বলতে বলতে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বা হিন্দি শব্দের মিশে যাওয়া নিয়ে কৌতুক হতে পারে কিন্তু গোঁড়ামি থাকলে তা ভাষার উন্নতিসাধনে রতি পরিমাণ ভূমিকা রাখে না। যে প্রজন্ম বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করে না, যে প্রজন্ম বাংলা ভাষা স্কুলজীবনে মাত্র দু’বছর পড়ে সে প্রজন্ম বাংলা ভাষাকে কতখানি বহন করবে? যেখানে একটি বাংলা শব্দের চাররকম বানান বহন করে চারটি অভিধান সেখানে নিখাদ বাংলা ভাষা কতখানি মজবুত থাকতে পারে? আর ভাষাশিক্ষা কোনো চারটি মানুষের সম্মিলিত উদযাপন নয় এর পিছনে দীর্ঘ সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাঠামো ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে মূলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা বংশ থেকে, যা বিবর্তনের ধারায় মাগধী প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মাধ্যমে খ্রিষ্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বাংলা রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পূর্ব মাগধী অপভ্রংশ থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। একথা বলার অর্থ ভাষার বিবর্তন অনস্বীকার্য। কালের নিয়মে, জনজাতির প্রভাবে বিবিধ ভাষার প্রভাবে বাংলা ভাষার বদল হয়েছে। আগেও হবে। সুতরাং মুল সমস্যায় ঢিল না ছুড়ে বাংলার সঙ্গে হিন্দি মিশছে কেন, ইংরেজি মিশছে কেন এ প্রশ্ন অবান্তর। যুগে যুগে ভাষার অভিযোজনে অন্য আঞ্চলিক ভাষাই মূল ভূমিকা গ্রহণ করে। কিন্তু বাঙালির সমস্যা সেটা নয়। বাঙালির সমস্যা হল বাংলা ভাষার ব্যবহারের জন্য যে মাধ্যম, বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য যে মাধ্যম তার অনুন্নত এবং অবহেলিত অবস্থা। এখনো ছেলেমেয়েরা বাংলা অনার্স নিয়ে পড়বে শুনলে মায়েরা ঘাবড়ে যান। শুধু বাংলা ভাষায় শিক্ষিত হওয়া ছেলেমেয়েদের জন্য চাকরি তলানিতে। শুধু বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে তাদের দিকে আপনি আড়চোখে তাকান। সফিস্টিকেশনের মাত্রা হিসেবে ইংরেজী যোগ করেন। নিজের ভিতর থেকে অন্ধকার দূর না করলে, বাইরের আলো জ্বালব কী করে।
বাংলা ভাষা নিয়ে যারা গর্ব করেন তারা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মশাল তুলে দিন বাংলা ভাষার। নতুন প্রজন্মের ভিতরে বাংলা ভাষার ঔদ্ধত্য জাগিয়ে তোলা দরকার। বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে গেলে বাঙালি ঘুম ভেঙে ওঠা দরকার। আমরা অপেক্ষা করছি সেই নতুন দস্তুরের।
আবর্ত পরিবারের পক্ষ থেকে বাংলা ভাষাকে সেলাম!


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top