মুজঃফরপুরের দিনগুলো ৫ম পর্ব

rainy night reflection by the window

এখনকার দিনগুলো

আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি, যদিও বৃষ্টি শুরু হলো ভোর তিনটে থেকে। আমার ঘরে খাটের পাশেই বিরাট একটা জানলা আছে, জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যায়, জ্যোৎস্না এসে বিছানায় পড়ে, আমি জ্যোৎস্নার চাদর পেতে শুয়ে থাকি। জানলাটা রাতে খোলাই থাকে। ভোরের দিকে শীত করলে একটা পাতলা কম্বল জড়িয়ে নিই।

যখন বৃষ্টি এল, ঘুমের মধ্যে বৃষ্টির ছাট এসে চোখে-মুখে লাগল। খাটটা বিরাট, ওপাশে গড়িয়ে চলে গেলে অসুবিধা হতো না, কিন্তু আমার পাশেই রাখা ছিল চশমা, সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, অ্যাশট্রে; পাওয়ার ব্যাঙ্কে ফোন চার্জ হচ্ছিল, তাই উঠতেই হলো। দেখলাম সব ভিজে গেছে। ওগুলো সরিয়ে রেখে জানলা বন্ধ করে বাইরে এসে দাঁড়ালাম।

অন্ধকার এক দিগন্ত, গাছের মাথাগুলো আন্দোলিত হচ্ছে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে বারান্দা, ছাদ। অনেক দূর থেকে ছুটে আসছে হাওয়ার আওয়াজ। একটা ঘোড়া ডেকে উঠল। বারান্দা থেকে ছাদে গিয়ে দেখি, আদিগন্ত ক্ষেতের ওপর ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ, আর রাত্রি যেন ভুজঙ্গপ্রয়াতের অনুষঙ্গে বারবার দুলে উঠছে। বিস্তীর্ণ ক্ষেতের ওপর থেকে বৃন্দগানের মতো উঠে আসছে বৃষ্টির আওয়াজ। নেপাল সীমান্তের দিক থেকে একটা কনকনে হাওয়া আরও কিছু বৃষ্টি নিয়ে আমাকে ঘিরে ধরল, আর আমি পাঞ্জাবিটা খুলে ছাদের ওপর শুয়ে পড়লাম। দূরে একটা বাজ পড়ল, আর আমার কানে ভেসে এল জহরব্রতের আগে রাজপুত রমণীদের সেই আগুনকে ডেকে আনার সম্মিলিত গান। শুধু সে গানে আগুন নেই, এক অনাস্বাদিত শীতল স্পর্শ সমস্ত চরাচর মথিত করে ছড়িয়ে পড়তে লাগল আমার সমস্ত শরীর জুড়ে। মনে হতে লাগল, এই সুর, এই ছন্দ শিখতে পেরেছি কখনো? প্রতিটি মাত্রা মাপে মাপে বসতে লাগল, কোথাও কোনো ফাঁক নেই, কোনো ছন্দপতন নেই। যেন এক নিমগ্ন সাধক, সমস্ত বিশ্বের সুরকে একত্র করে এক মহাসঙ্গীতের ধ্যানে নিমজ্জিত। সেই সুর আমার শ্রবণকে পবিত্র করে তুলেছে।

এই অঞ্চলের বৃষ্টিও এখানকার প্রকৃতির মতো প্রবল। যখন হয় না, তখন প্রকৃতি সেই দারুণ অগ্নিবাণ যজ্ঞ সাজান। যখন শুরু হয়, তখন পবনদেব পৌরাণিক মত্ত মাতঙ্গযূথ সহ গগনমণ্ডল আচ্ছাদিত করে মুহুর্মুহু হুংকারে দিগন্তে এক সাড়া ফেলে দেন। আমি বিমুগ্ধতায় দেখতে থাকি সেই প্রবল নটরাজকে। তাঁর নৃত্যের ছন্দে ধূর্জটির মতো মেলে ধরেছেন জটাজাল; বৃষ্টি যেন ধেয়ে আসে প্রবল হূন সৈন্যের মতো। বিধ্বংসের ললিত লাবণ্যকে অন্তরে ধারণ করে মগ্ন হয়ে থাকি।

এইসব বৃষ্টিস্নাত রাতের প্রবল বরিষণধারায় সিক্ত হতে হতে মনে হতে থাকে, অনন্ত থেকে ছুটির চিঠি এল। দূরে এক মহাসমুদ্র তার প্রবালদ্বীপের দরজা খুলে দেয়। বুকের ভেতর তার শব্দ শুনতে শুনতে সম্মোহিত এক পথে হেঁটে যেতে থাকি। এই বৃষ্টি যেন শেষ হয়েও অলক্ষ্যে কোথাও নিরবচ্ছিন্ন অঝোর ধারায় পড়তে থাকে, পড়তেই থাকে। আর বেজে ওঠে সেই সুললিত ছন্দের আত্মনিবেদন—

“উন্মদ পবনে যমুনা তর্জিত, ঘন ঘন গর্জিত মেহ।
দমকত বিদ্যুত, পথতরু লুন্ঠিত, থরহর কম্পিত দেহ।
ঘন ঘন রিম্‌ঝিম্‌ রিম্‌ঝিম্‌ রিম্‌ঝিম্‌ বরখত নীরদপুঞ্জ।
শাল-পিয়ালে তাল-তমালে নিবিড়তিমিরময় কুঞ্জ।”

—ভানুসিংহের পদাবলী

বরিষণমুখরিত রাত্রি অথবা দিন, আমার যাপনের অনুষঙ্গে চিরায়ত এক ধ্যানের আসন পেতে বসেছে। সেখানে ছন্দ আছে, সুর, আর অপার্থিব সৌন্দর্যের উদ্ভাস। আমি তার কাছে চিরপ্রণত হয়ে থাকি।

বহুক্ষণ পরে ঘরে এলাম। ওই বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে নিয়েই তলিয়ে গেলাম ঘুমে। ঘুমের মধ্যে ভেসে উঠল দূরের সুনীল পাহাড়, আর এক চপল বালিকা; তার সর্বাঙ্গে মেঘের আভরণ, আমাকে দিগন্তের দিকে ডেকে চলে গেল।

বহু বহু দূরে এক আনন্দময় জগৎ আছে, সেখানে এক অপূর্ব পথ অনন্তকাল ধরে আমারই অপেক্ষায় বসে। জন্মজন্মান্তর ধরে এরকম বহু বৃষ্টিরাতে সে পথের আভাস আমি পেয়েছি। একদিন সেখানে পৌঁছে যাব ঠিক। ফেরা নেই, আমার আর ফিরে আসা নেই কোথাও।

ক্রমশ

মুজঃফরপুরের দিনগুলো ৪য় পর্ব


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top