আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরি – পর্ব ২

জর্জিয়া বেঙ্গলি ফোরামের প্রতিমা

আমেরিকার বারোয়ারি দুর্গাপূজো

দেখতে দেখতে দুর্গাপূজো এসে গেল। নাতি বাড়ি এসেছে। আমাদের সবার মনেই খুশির ছোঁয়া। এদেশে বারোয়ারি দুর্গাপূজো হয় লোকজনের সুবিধামতো। পাঁজি-পুঁথি দেখে নয়। পাঁজি অনুযায়ী তো ছুটি থাকে না, সেজন্য ছুটি অনুযায়ী পূজো হয়। তাই মহালয়া থেকে শুরু করে লক্ষ্মীপূজো পর্যন্ত প্রত্যেক উইকএন্ডে পুরো আমেরিকার এখানে-ওখানে দুর্গাপূজো চলতেই থাকে। আটলান্টাতেও একই নিয়ম। আসলে ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালি জনসংখ্যা কম, তাই এভাবে পূজো হলে সব পূজোয় অনেকের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত হয়। তাছাড়া দেশ থেকে যেসব শিল্পীরা আসেন, তাঁরাও একবার এসে অনেক জায়গায় অনুষ্ঠান করতে পারেন। উদ্যোক্তাদের খরচ একটু কমে। আসলে অর্থনীতিই তো সবকিছুর পেছনের মূল নীতি।
আটলান্টাতে বেশ অনেকগুলো দুর্গাপূজো হয়। কয়েকটা পূজো হয়ে গেছে মহালয়া যে রবিবার পড়েছিল সেই উইকএন্ডে। কয়েকটা হচ্ছে সপ্তমী-অষ্টমীতে। যেহেতু সেটা শনি-রবিবারেই পড়ে গেছে। আবার কিছু হবে পরের সপ্তাহে। এখানকার প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মন্দিরগুলোতে অবশ্য পাঁজি-পুঁথি মেনেই পূজো হয়, কিন্তু তাতে তো সবাই যোগ দিতে পারে না। দেশের মতো পূজোর ছুটি নেই কারও। তাই শুক্রবার রাত থেকে শুরু করে রবিবার সন্ধ্যের মধ্যে বারোয়ারি দুর্গাপূজোর পাট গুটিয়ে ফেলতে হয়। সোমবার সকাল থেকেই আবার যে যার কর্মক্ষেত্রে হাজির।
আমার পাঁড় বাঙালি মনে আবার ঠিকঠাক পূজোর দিন ছাড়া পূজো পূজো ফিলিংস আসে না। তাই ষষ্ঠী পড়তেই মন আনচান। খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেল সেই সপ্তাহেও দু-এক জায়গায় পূজো হচ্ছে। তার একটা জর্জিয়া বেঙ্গলি ফোরামের পূজো। সেটা হচ্ছে নরক্রস নামে একটা জায়গায়। আমাদের বাড়ি থেকে গাড়িতে মিনিট পনেরোর দূরত্ব। সারা পশ্চিমবঙ্গ যখন শনিবার গভীর রাতে সপ্তমীর জনজোয়ারে ভাসছে, তখন আমেরিকায় শনিবারের ভর দুপুর। সপ্তমী পূজো চলছে। ছেলের সাথে আমরা চললাম নরক্রসের গ্লোবাল মলে।
এখানে পূজো হয় মলে, স্কুলে, কমিউনিটি হলে। খোলা মাঠে প্যান্ডেল খাটিয়ে পূজো করার তো কোনো সুবিধে নেই, তাই। এখানে গ্লোবাল মলের বিশাল হলঘরে পূজোর আয়োজন হয়েছে। সিলিকনের তৈরি দুর্গামূর্তিটি বেশি বড় না হলেও ভারী সুন্দর। কোনো কায়দার বাহুল্য নেই। আমাদের চিরচেনা মাতৃমূর্তি যেন। মন ভরিয়ে দিল। পূজোর আয়োজনেও খামতি নেই কোনো। নাড়ু থেকে খিচুড়ি ভোগ—সব আছে। গোটা হলঘর জুড়ে তখন শুধু নানা রঙের ধুতি, পাঞ্জাবি, পাজামা আর শ্যাম্পু করা খোলা চুলের সুন্দরীদের রং-বেরঙের শাড়ির মেলা। দেশি পোশাকগুলো বছরে এই দু-একবারই হয়তো আলোর মুখ দেখার সুযোগ পায়।
ঢাক, ঢোল, কাঁসি, উলুধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ—সব চলছে নিয়ম মেনে। কাল শুক্রবার রাতে বোধন হয়েছে। আজ সপ্তমী আর অষ্টমীর পূজো পরপর হয়ে গেল। সন্ধিপূজো হবে রাতে। কাল নবমী আর দশমীর পূজো হয়ে দর্পণে বিসর্জন হবে। মা আবার সযত্নে কার্ডবোর্ডের বাক্সে বন্দি হয়ে ঠাঁই পাবেন হয় কারও বেসমেন্টের ঘরে বা গ্যারাজে আগামী এক বছরের জন্য।
আমরা পুষ্পাঞ্জলি দিলাম। চরণামৃত, যজ্ঞের টীকা নিলাম। এই পর্ব শেষ হতে না হতে অ্যানাউন্সমেন্ট হল, এখনই প্রসাদ বিতরণ হবে, লাইনে দাঁড়িয়ে যান। সুসজ্জিতা মহিলারা গ্লাভস পরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রসাদ বিতরণ করার জন্য। টেবিলে সাজানো সারি সারি প্রসাদের পাত্র। সুশৃঙ্খলভাবে কাগজের প্লেটে প্রসাদ বিতরণ হল। সাথে ছোট জলের বোতল। হলের প্রতিটি মানুষ প্রসাদ পেলেন। প্লেটে ছিল নানারকম ফল, লুচি, হালুয়া, মালপোয়ার টুকরো, সামান্য ভোগের খিচুড়ি আর দই-খই মাখা। দই-খই মাখা কেন দিল বুঝলাম না। এটা তো বিসর্জনের দিন দধিকর্মাতে হয় বলে জানতাম। যাই হোক, দিয়েছে যখন সবই কপালে ঠেকিয়ে খেয়ে নিলাম। অত প্রসাদ খেয়ে পেট ভরে গেল। তারপরেই আবার লাঞ্চের অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হল। আপাতত তাতে কান দিলাম না। ওদিকে তখন প্রতিমার সামনে ফটো সেশন শুরু হয়ে গেছে। জোড়ায় জোড়ায়, সপরিবারে, একলা—নানারকম ভঙ্গিতে অবিশ্রান্ত ফটো উঠছে তো উঠছেই। এই অধমেরও একটা-দুটো ছবি তোলার বাসনা যে হচ্ছিল না তেমন বললে মিথ্যাচার হবে। তবে আপাতত সে ইচ্ছে মুলতুবি রেখে চারদিকের কাণ্ডকারখানা পর্যবেক্ষণে মন দিলাম। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ তখন লাঞ্চের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন, এখানে লাঞ্চ খেয়েই আবার যেতে হবে অন্য কোনো পূজোয়। সেখানে বিকেলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখবেন। কেউ বা আড্ডায় মত্ত। কর্মকর্তাদের দু-তিনজন ডোনেশন বক্সের টেবিলের সামনে বসে আছেন। জর্জিয়া বেঙ্গলি ফোরামের পূজোটা প্রধানত বাংলাদেশের বাঙালিরা পরিচালনা করেন। অন্যান্য জায়গায় শুনেছি লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য জনপ্রতি কমপক্ষে কুড়ি ডলারের কুপন কিনতে হয়। এখানে তা নয়। সবটাই বিনামূল্যে। কিন্তু এত বড় একটা পূজোর যাবতীয় খরচ শুধু সদস্যদের চাঁদায় কুলিয়ে ওঠাও দুষ্কর। তাই স্বেচ্ছায় কেউ ডোনেশন দিলে ওঁরা তা গ্রহণ করেন। আমরাও দিলাম।
বেঙ্গলি ফোরাম ‘নবদুর্গা’ নামের একটা স্যুভেনির বার করেছেন। দামি কাগজে ছাপা পাতলা ম্যাগাজিন। উল্টেপাল্টে দেখলাম বেঙ্গলি ফোরামের সব লেখাই ইংরেজিতে। বাংলা লেখা একটিও নেই। হয়তো সবার কাছে যাতে গ্রহণযোগ্য হয় তাই এই ব্যবস্থা। তিন থেকে তেরোর যে বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি করছিল, খেলাধুলো করছিল, নিজেদের মধ্যে তারা একটাও বাংলা শব্দ উচ্চারণ করছিল না। যদিও সাজপোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছিল ওরা সবাই বাঙালি। আমাদের নাতির ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলাম ওদের মধ্যে।
ঘণ্টাখানেক পর আমরাও লাঞ্চের জন্য নির্দিষ্ট হলে গেলাম। বুফে স্টাইলে খাওয়াদাওয়া। সাধারণ নিরামিষ খাবার। বিনামূল্যে বলেই হয়তো আয়োজনের তেমন বাহুল্য নেই। থাকবেই বা কী করে! বিনামূল্যে এত লোকের জন্য শুক্রবার রাতের ডিনার থেকে রবিবার দুপুরের লাঞ্চ পর্যন্ত সবটাই আয়োজন করা সহজ কথাও তো নয়।
খাওয়াদাওয়ার পর প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুলে আমরাও বেরিয়ে পড়লাম গ্লোবাল মলটা ঘুরে দেখতে। নামে গ্লোবাল মল হলেও যতটুকু দেখলাম, নব্বই ভাগ শোরুম ভারতীয়, বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানিদের। পণ্য সবই ভারতীয় উপমহাদেশের। দাম ডলারের হিসেবে সস্তা মনে হলেও টাকার হিসেব করতে গেলে বিষম লাগে। ফেরার পথে ওখানেই সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির দর্শন করে সপ্তমীর দিনটা কেটে গেল।
প্রবাসের এইসব পূজোয় উদ্যোক্তাদের সারা বছরের কতখানি আবেগ, পরিশ্রম, চিন্তাভাবনা মিশে থাকে তা হয়তো এই ঝাঁকি দর্শনে আমাদের কাছে সেভাবে পুরোটা ধরা পড়ে না, তবু অনুভব করা যায় শত ব্যস্ততার মাঝেও এঁরা দেশের পূজোর সেই সুঘ্রাণটুকু উপভোগ করতে চান তাই যতটুকু পারা যায়, যেভাবে পারা যায় মায়ের আরাধনার ব্যবস্থা করেন। তাতে নাই বা মিশে থাকল শিউলি, স্থলপদ্মের সুবাস। জিনিয়া, সূর্যমুখীরা তো আছে। প্রবাসের মাটিতে ওরাই হাসিমুখে কাজ চালিয়ে নেয়।
এ বছর আমরা দুবার দুর্গাপূজোয় অংশগ্রহণ করলাম। আগেই বলেছি, এদেশে পাঁজি-পুঁথি মেনে দুর্গাপূজো হয় না। দেশে বিসর্জনের পর বিজয়া দশমী সেরে যেদিন সবাই লক্ষ্মীমায়ের আরাধনায় ব্যস্ত, সেদিন বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ গ্রেটার আটলান্টা (BAGA) দুর্গাপূজোর আনন্দে মেতে উঠেছে লরেন্সভিলে।
লরেন্সভিল জায়গাটা আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় তেত্রিশ মাইল দূরে। এখানে মাইলে দূরত্ব মাপা হয়। কিলোমিটারে হিসেব করলে দূরত্বটা হবে প্রায় চুয়ান্ন কিলোমিটার। ছেলের গাড়িতে যেতে আমাদের সময় লাগল চল্লিশ মিনিটের কাছাকাছি। তাও রাস্তায় তখন হেভি ট্র্যাফিক ছিল। নয়তো আধঘণ্টার কম সময়ে পৌঁছে যাওয়া যেত। ফ্রিওয়ে দিয়ে দারুণ স্পিডে চলে গাড়িগুলো।
আটলান্টার দুর্গাপূজো গুলোর মধ্যে BAGA-র পূজোর বেশ নামডাক আছে। সেই ১৯৭৯ সাল থেকে এরা দুর্গাপূজো করছে আটলান্টাতে।
ওদের পূজো হচ্ছে মাউন্টেন ভিউ স্কুলে। অসাধারণ সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের ভিতর ঝকঝকে বিশাল স্কুল বিল্ডিং। বেশ মন ভালো করা। স্কুলের ভিতরটাও, যতটুকু দেখা গেল, খুব সাজানো-গোছানো।
যে জায়গায় পূজোটা হচ্ছে সেটা সম্ভবত স্কুলের ক্যান্টিন। পেল্লায় তার সাইজ। একধারে পূজো হচ্ছে, মাঝখানে খাবার জায়গা। একসাথে হেসে-খেলে শ-তিনেক লোক বসে খেতে পারে সেখানে। হলের আরেক ধারে স্টল সাজিয়ে জামাকাপড়, শাড়ি, জুতো, গয়না, শোপিস ইত্যাদি বিক্রিবাটা চলছে। নানা প্রদেশের ভারতীয় পুরুষ-মহিলারাই বিক্রেতা। বলা বাহুল্য, ক্রেতাও সব ভারতীয় বা বাংলাদেশিরাই। দাম মোটামুটি দেশের চাইতে দেড়-দু গুণ বেশি। সেটা আশ্চর্যের কিছু নয়। প্লেনে করে নিয়ে যাওয়ার খরচ তুলে তারপর তো প্রফিট!
এখানেও শুক্রবার বোধনের পর শনিবার সপ্তমী আর অষ্টমী পূজো হল। ঢাকাই জামদানীর কোবাল্ট ব্লু পাঞ্জাবি আর স্কাই ব্লু ধুতি পরা পুরোহিত সম্ভবত কোনো হাই-প্রোফাইল চাকুরে। তিনি অঞ্জলির মন্ত্র বলে সেসব আবার ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে দিচ্ছিলেন। ইয়ং জেনারেশন বাংলাই ভালো বোঝে না, সংস্কৃত তো দূর অস্ত। পূজোর পর ফল, মিষ্টি, খিচুড়ি প্রসাদ সবাইকে দেওয়া হল। এখানে লাঞ্চে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ করেছে। কুপন মূল্য তিরিশ ডলার। সন্ধ্যায় এদের মঞ্চে গাইবেন “আইলো উমা বাড়িতে” গান গেয়ে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া অন্তরা নন্দী। রবিবার আসবে ভূমি ব্যান্ড। তার সাথে সদস্যদের নিজস্ব অনুষ্ঠান, স্থানীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান এসব তো আছেই।
পূজোর মঞ্চ সাজানো থেকে শুরু করে পূজোর যোগাড়, এত লোকের রান্নাবান্না—সবটাই এখানে নিজের হাতে সবাই মিলে করতে হয়। দেশের মতো ঠাকুর-চাকর হাতের কাছে চাইলেই মেলে না। তবু এই বিশাল ব্যবস্থার বহর দেখলেই বোঝা যায় ‘লেবার অফ লাভ’ (ভালোবাসার শ্রম) কাকে বলে।
তবে এত মানুষ একসাথে কিছু করবে আর দলাদলি থাকবে না তাই কখনো হয়! স্থানীয় পরিচিত বাঙালিদের সাথে কথায় কথায় জানা গেল দলবাজি, পিএনপিসি, কাঁকড়াবৃত্তি ইত্যাদি সব কিছুর দেশীয় ঐতিহ্য এই দূর বিদেশে এসেও পূর্ণ মাত্রায় ধরে রাখা গেছে। কোথাও কিছু কম পড়েনি। চিত্র পরিচিতি

চিত্র পরিচিতি

১। জর্জিয়া বেঙ্গলি ফোরামের প্রতিমা
২। স্যুভেনির ‘নবদুর্গা’
৩। প্রসাদ
৪। BAGA র প্রতিমা
৫। নৈবেদ্যর আয়োজন
৬। প্রসাদ গ্রহণ
৭। বিকিকিনির পসরা

ক্রমশ

আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরী – ১


3 thoughts on “আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরি – পর্ব ২”

  1. স্বপন কুমার নন্দী

    ঝরঝরে লেখা।
    ভালো লাগলো ‘আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরি ‘-২।
    পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

    1. Maitreyee Nandi

      অসংখ্য ধন্যবাদ। আগামী শনিবার আসছে পরের পর্ব।

  2. অসংখ্য ধন্যবাদ। আগামী শনিবার আসছে পরের পর্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top