গোড়ার কথা:
কুড়ি সেপ্টেম্বর, দু’হাজার তেইশ। এক সমুদ্র ঝামেলা-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ছেলের কাছে যাওয়া হচ্ছে। যাচ্ছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টাতে।
আমেরিকা যেতে আবার কিসের এত ঝামেলা-ঝঞ্ঝা? বলছি খোলসা করে!
আমাদের পুত্র শ্রীমান সুপর্ণ নন্দী, যাকে আমরা ডাকি বনি, দু’হাজার পনেরো সালের আগস্ট মাস থেকে আমেরিকার আইওয়া ইউনিভার্সিটিতে গবেষণারত। দু হাজার কুড়ির মে মাসে আমরা ছেলের কাছে আইওয়া যাব বলে মনস্থির করলাম। উপলক্ষ্য ছেলের কমেন্সমেন্ট সেরেমনি অ্যাটেন্ড করা। ও দেশে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার অনুষ্ঠানকে কমেন্সমেন্ট সেরেমনি বলা হয়। ওদিকে স্কুলের প্রি-প্রাইমারি থেকে প্রাইমারি সেকশনে উঠলে গ্র্যাজুয়েশন সেরেমনি হয়। হাই স্কুল পাশ করার পর আবার গ্র্যাজুয়েশন সেরেমনি। তার ধুমধাম দেখলে তো মনে হবে রাজ্য জয় করা হয়ে গেছে!
সে যাক্, এদিকে আমেরিকা যেতে গেলে তো ভিসা চাই। আমার কর্তা স্বপন যেহেতু আগেও অফিসের কাজে শিকাগো গেছে, তাই ওর ভিসা আগে থেকেই ছিল। ছিল না শুধু আমার। শুনেছিলাম আমেরিকার ভিসা পাওয়া একটু কঠিন। তবু গরজ বড় বালাই। কপাল ঠুকে দু হাজার উনিশে আমার ভিসার জন্য আমেরিকান কনসুলেটে আবেদন করলাম। কাগজপত্র সব তৈরি হল। আমেরিকান কনসুলেট থেকে বায়োমেট্রির জন্য ডেট দিল দু হাজার কুড়ির ফেব্রুয়ারি মাসের কুড়ি তারিখে। সেদিন স্বচ্ছন্দেই বায়োমেট্রির পর্ব মিটে গেল। এবার ইন্টারভিউ। ডেট পেয়েছি মাসখানেক পর, মার্চের সতেরো তারিখ। আমি স্কুল থেকে মাস দেড়েকের ছুটি মঞ্জুর করিয়ে নিলাম। স্কুলের নো-অবজেকশন সার্টিফিকেটও হাতে পেয়ে গেলাম। অপেক্ষা শুধু আমার ভিসাটি হাতে পাওয়ার। ওটি পেলেই প্লেনের টিকিট কাটব।
মার্চের ষোলো তারিখ ভোরবেলা ঘুম ভাঙল ফোনে মেসেজ ঢোকার পিং শব্দে। ঘুমচোখে ফোনটা হাতে তুলে নিলাম। পুত্রের মেসেজ। লিখেছে, আজ থেকে কলকাতার আমেরিকান কনসুলেট বন্ধ হয়ে গেল কোভিডের জন্য। ব্যাস্, সব শেষ। তীরে এসে তরী ডুবল আমাদের।
তখন করোনা ভাইরাস সবে থাবা বসাতে শুরু করেছে সারা পৃথিবী জুড়ে। এর ভয়াবহতা কতটা হতে পারে কারও কোনো আন্দাজ নেই। কনসুলেট বন্ধ হবার খবরে মন খারাপ হলেও ভেবেছিলাম, কিছুদিনের মধ্যেই সব আবার ঠিক হয়ে যাবে। নতুন ডেট পেয়ে যাব। কিন্তু সেই ধারণা যে কতটা ভুল ছিল তা আজ আর কারও অজানা নেই। পাক্কা দু বছর সারা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে রেখেছিল এই মহামারী। ছেলের কমেন্সমেন্ট সেরেমনিটা সশরীরে আর অ্যাটেন্ড করা হল না আমাদের। অনলাইনে অবশ্য উপস্থিত ছিলাম।
দু হাজার বাইশ থেকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনের চাকা গড়াতে শুরু করল আবার। আমেরিকান কনসুলেট খুলল। ভিসা ইন্টারভিউর জন্য নতুন ডেট খোঁজা শুরু করলাম। দু বছরের ব্যাকলগ থাকায় কনসুলেটে তখন প্রচুর আবেদনপত্রের পাহাড় জমে গেছে। তার ওপর ওদের বেশিরভাগ স্টাফ দেশে ফিরে যাওয়াতে নাকি কাজের গতি খুব ধীর হয়ে গেছে। বহুরকম চেষ্টাচরিত্র করে ভিসা ইন্টারভিউর নতুন ডেট পাওয়া গেল দু হাজার তেইশের কুড়ি জুন। তার আগে পনেরো জুন শেকসপিয়র সরণির জেসমিন টাওয়ারে আবার নতুন করে ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন আর বায়োমেট্রি হল। সেখানে আবার আরেক প্রস্থ ঝামেলা! আমার ভিসার আবেদন করার পর ইতিমধ্যে প্রায় চার বছর কেটে গেছে। এর মাঝে আমার পাসপোর্ট রিনিউ করার ফলে পাসপোর্ট নম্বর বদলে গেছে। চার বছর আগে ভিসার আবেদনপত্রে ছিল আমার আগেকার পাসপোর্ট নম্বর। নতুন পাসপোর্ট নম্বর আবেদনপত্রে ঢোকাতে আবারও কিছু হুজ্জত পোহাতে হল।
ভিসা ইন্টারভিউর পর আমেরিকান কনসুলেটের তরুণ সুদর্শন অফিসার যখন হাসিমুখে বললেন, ‘ইওর ভিসা ইজ গ্র্যান্টেড’—শব্দগুলো যেন কানে মধু বর্ষণ করল। মনে হল যেন পায়ে একজোড়া পাখনা গজিয়েছে। উড়ে গেলেই হয় এবার। দশ বছরের ছাড়পত্র পেয়ে গেলাম যে ছেলের কাছে যাতায়াত করার জন্য!
চার বছর আগে দু হাজার উনিশের শেষদিকে যখন ভিসার আবেদন করেছিলাম, তখন আমার ছেলে থাকত আইওয়া শহরে। দু হাজার একুশের প্রথম দিকে ও চলে এসেছে আটলান্টাতে। আটলান্টার এমোরি ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে যোগ দিয়েছে। ইতিমধ্যে ওর বিয়ে হয়েছে। ওর স্ত্রী ঐন্দ্রিলা (রিমি) একই ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজি বিভাগের পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। সুতরাং এবার আমাদের গন্তব্য আটলান্টা।
জুনের শেষে ভিসা পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই বনি বলল, জুলাই বা আগস্টের শুরুতেই চলে এসো তোমরা। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কী সব ব্যবস্থা করা যায়? বেশ কিছুদিনের জন্য নিজের বাড়ি ছেড়ে যেতে গেলে অনেকরকম কাজ গোছাতে হয়, নানারকম লোকের ব্যবস্থা করে যেতে হয়—বাড়ির বাগান, গাছপালা, পোষ্যদের সবার দেখভাল করার জন্য। তাই হাতে একটু সময় নিয়ে কুড়ি সেপ্টেম্বরের টিকিট কাটা হলো। কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট। কলকাতা থেকে দোহা হয়ে মোটামুটি বাইশ ঘন্টায় আটলান্টা পৌঁছে দেবে। দেখলাম এই ফ্লাইটটাই সবচেয়ে কম সময় নেয় আটলান্টা পৌঁছাতে।
কুড়ি সেপ্টেম্বর রাত তিনটে পঞ্চাশে আমাদের ফ্লাইট। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের জন্য তিন-চার ঘন্টা আগে এয়ারপোর্টে রিপোর্টিং করতে হয়। আগের দিন গেছে বিশ্বকর্মা পুজো, সেদিন চলছে গণেশ পুজো। আর পুজো মানেই তো রাস্তা জুড়ে উৎসব, জ্যাম। কখন কী হয় বলা যায় না। সুতরাং হাতে যথেষ্ট সময় নিয়েই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। এয়ারপোর্টের সমস্ত ফর্মালিটিজ শেষ করতে করতে রাত সাড়ে বারোটা বাজল। সিকিউরিটি চেক হবার পর বারো নম্বর ডিপার্চার গেটের কাছে এসে যখন বসলাম বোর্ডিং হতে তখনও প্রায় আড়াই-তিন ঘন্টা দেরি। কী করে এত লম্বা সময় কাটাব ভাবছিলাম। মধ্যরাতে এয়ারপোর্টের ভেতর লোকজন তখন একটু কমই। কখনও একটু বসে, আবার কখনও এদিক-ওদিক উইন্ডো শপিং করে সময় কাটাচ্ছিলাম। একটা চমৎকার সিলিকনের দুর্গামূর্তি রাখা আছে এক জায়গায়। বিশ্ব বাংলা স্টলের সামনেও রাখা আছে আরেকটা ট্র্যাডিশনাল দুর্গামূর্তি। ঘুরে ঘুরে সেসব দেখছিলাম। আচমকা আলাপ হয়ে গেল আমার ছেলের বয়সী একটি মিষ্টি মেয়ের সাথে। নাম সংহিতা দাশগুপ্ত। রায়গঞ্জের মেয়ে। ইঞ্জিনিয়ার। এখন যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করছে। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে আমার কৈশোরের কিছু বছর কেটেছে। শুনলাম সংহিতাও ঠিক আমার মতই রায়গঞ্জ গার্লস স্কুল আর করোনেশন স্কুলে পড়েছে। মুহূর্তে ওকে খুব আপন মনে হতে লাগল। জানলাম ও যাচ্ছে লন্ডনে, ওর বরের কাছে, আড়াই মাসের ছুটি কাটাতে। দোহা পর্যন্ত আমরা এক ফ্লাইটেই যাব। তারপর ও অন্য ফ্লাইট ধরবে। এয়ারপোর্টের সেই মধ্যরাতে ওর সাথে গল্প করতে করতে মনে হচ্ছিল সময় এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল কেন?
কলকাতা থেকে দোহার ফ্লাইট ছাড়তে মিনিট কুড়ি দেরি হলেও সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পরে ঠিক সময়মতোই পৌঁছে গেলাম দোহাতে। পারস্য উপসাগরের কোল ঘেঁষে ঝাঁ-চকচকে দোহার হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। মনে হচ্ছিল, একটু ঘুরে দেখতে পারলে মন্দ হত না, কিন্তু হাতে একদম সময় নেই। ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আটলান্টার প্লেনে উঠতে হল। নামা-ওঠা আর সিকিউরিটি চেক করতেই সময়টুকু ফুরিয়ে গেল। দোহা এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেকিং-এর খুব কড়াকড়ি।
এবার সোজা আটলান্টা। মাঝের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো ঘন্টা সময় প্লেনে বসে কাটানোই মুশকিল। তবে তাও কেটে গেল অবিশ্রান্ত খানাপিনা করে আর সিনেমা দেখতে দেখতে। এয়ারহোস্টেসরা এতবার করে এত বিভিন্ন রকম খাবার পরিবেশন করে যাচ্ছিল যে শেষদিকে ট্রলি ঠেলে সামনের দিকে ওদের আসতে দেখলেই মনে হচ্ছিল, ‘এই রে! আবার!’ আমি স্বল্পাহারী। বেশি খেলে অস্বস্তি হয়। তবে প্লেনের খাবার খেয়ে কোনো অস্বস্তি বা অসুবিধে হয়নি। ছেলে বারবার বলে দিয়েছিল প্লেনে যথাসম্ভব ঘুমিয়ে নিতে, তাহলে জেট ল্যাগ কম হবে। কিন্তু চেষ্টা করেও তেমন একটা ঘুম হল না।
নির্দিষ্ট সময়ের কিছু আগেই প্লেন আটলান্টার মাটি ছুঁয়ে ফেলল। তখন ওখানে ঝকঝকে বিকেল। সবে সাড়ে তিনটে। পূর্ব গোলার্ধ থেকে রওনা হয়েছিলাম কুড়ি সেপ্টেম্বর ভোরবেলা, যখন পৌঁছালাম তখন পশ্চিম গোলার্ধে কুড়ি সেপ্টেম্বরের বিকেল। আপাতভাবে মনে হয় সময় লাগল সাড়ে এগারো ঘন্টা। যদিও আসলে সময় পেরিয়ে গেছে একুশ ঘন্টার বেশি। কলকাতার সময় থেকে আটলান্টার সময় সাড়ে নয় ঘন্টা পিছিয়ে।
ঘন্টা দেড়েক লাগল ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে লাগেজ সংগ্রহ করতে। পাঁচটা নাগাদ বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখা হল বনি আর রিমির সাথে। বছর দেড়েক পর। প্রাথমিক আনন্দ-উচ্ছ্বাসের রেশ কাটলে বনির লাল টুকটুকে হোন্ডা অ্যাকর্ড গাড়ির চাকা গড়াতে শুরু করল ওর বাড়ির দিকে।
শুরু হয়ে গেল আমাদের কয়েক মাসের প্রবাস জীবন।
প্রথম দর্শনে আটলান্টা:
এটা সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। ভোরে আর রাতের দিকে হালকা শীত লাগে। আরামদায়ক শীত, যদিও। অনেকটা আমাদের নভেম্বর শেষের মতো। এখন এখানে সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ সূর্য ওঠে, আবার সন্ধে নামে সাড়ে সাতটা নাগাদই। বনি আর রিমি বলল, গ্রীষ্মকালে রাত সাড়ে নটায় সন্ধে হত। দিন ছিল পনেরো-ষোলো ঘন্টা লম্বা। যত শীতকালটা এগিয়ে আসবে, এখনকার এই বারো ঘন্টার দিনের আলোও ক্রমশ আরও কমতে থাকবে। আমরা সূর্যের দেশের মানুষ। রোদ-আলো না পেলে মন খারাপ হয়।
আটলান্টিকের স্ত্রীলিঙ্গ নাকি আটলান্টা। তথ্যটা এখানে এসে জানলাম। আটলান্টাতে আমরা আছি নর্থ ড্রুইড হিল (Druid Hill) অঞ্চলে। পাঁচ স্কোয়ার কিলোমিটার আয়তন ড্রুইড হিলের। প্রায় শ-দুয়েক বছর আগে সমুদ্রতল থেকে হাজার ফিট উঁচুতে ড্রুইড হিলের ওপর গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চলটা। বেশ উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো চমৎকার জায়গা। তবে তা বলে মোটেই উঁচু উঁচু পাহাড় নেই আশেপাশে। চারদিকে উইলো, জুনিপার, ম্যাপেল, ওক, পপলার, পাইনের সমারোহ আছে। খুব সবুজ চারদিকটা। আটলান্টা বেশ বড় এবং অত্যন্ত ব্যস্ত শহর হলেও, নাগরিক সভ্যতার চাপে প্রকৃতি হারিয়ে যায়নি ড্রুইড হিলে। বরং প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই সেজে উঠেছে চারদিক। সবুজবিলাসী আমি, তাই প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেল জায়গাটাকে।
এই ড্রুইড হিল অঞ্চলটা সেজে উঠেছিল এখানে বসবাসকারী কিছু বিখ্যাত লোকের হাত ধরে। তার মধ্যে কোকাকোলা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা আসা গ্রিগস ক্যান্ডলারও ছিলেন। ১৮৮৬ সালে এই আটলান্টাতেই কোকাকোলার প্রথম গ্লাসটি ভরা হয়েছিল। প্রথম দিকে নাকি দিনে ন’ গ্লাসের বেশি বিক্রি হত না। তারপর তো এর ফেনিল উচ্ছ্বাস সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। কোকা-কোলা এখন সারা পৃথিবী জুড়ে সর্বাধিক বিক্রীত ঠান্ডা পানীয়।
আটলান্টা শহরটা কিন্তু বেশি পুরোনো না হলেও একটা সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। কালো মানুষদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছিলেন মার্টিন লুথার কিং। সিভিল রাইটস মুভমেন্ট নামে যা বিখ্যাত। সেই মার্টিন লুথার কিং এই শহরের মানুষ।
এছাড়া পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ নামের বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাসের লেখিকা মার্গারেট মিচেল ও এই শহরেরই মানুষ। এখানেই তাঁর জন্ম ও মৃত্যু। সদ্য যৌবনে পড়েছিলাম ওঁর লেখা ওই বইটা। তারপর দেখেছিলাম ভিভিয়ান লে আর ক্লার্ক গেবল অভিনীত সিনেমা ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’। আজও মাঝেমাঝেই দেখি সিনেমাটা।
এখানে আসার পরপরই আমেরিকাবাসী আমার ফেসবুক বান্ধবী অমৃতা মুখার্জী জানালেন মার্গারেট মিচেলের বাড়িটা এখনও আছে আটলান্টাতে। মিউজিয়াম হয়েছে। গিয়ে যেন দেখে আসি। গুগল করে লোকেশন দেখে নিয়েছি। অবশ্যই যাব একদিন।
সকালে হাঁটতে গিয়ে দেখেছি, এখানে অনেক গাছ আর সবুজ লন দিয়ে ঘেরা সুন্দর সুন্দর বাংলোর মতো বাড়ি আছে আমাদের আশেপাশে। বনি জানাল, কিছু কিছু বাড়ি নাকি একশো-দেড়শো বছরের পুরোনো। দেখলে অবশ্য তা বোঝা যায় না, এতটাই সুন্দরভাবে রাখা।
ওদিকে আবার স্বয়ংসম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সও প্রচুর আছে। অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সগুলোও ভারি সাজানো-গোছানো। আমরা আছি দ্য লেগ্যাসি নামের এক প্রপার্টিতে। এতে বিরাট অঞ্চল জুড়ে উঁচু-নিচু পথের বাঁকে বাঁকে এক-একটা রাস্তার ওপর এক-একটা ব্লক। ব্লকগুলোতে তিনতলার চেয়ে বেশি উচ্চতার কোনো বিল্ডিং নেই। প্রত্যেকটা বিল্ডিং-এ পঞ্চাশ-ষাট, কোথাও আবার সত্তর-আশিটা করে অ্যাপার্টমেন্ট। প্রত্যেকটা ব্লকের মাঝখানে বিরাট চওড়া রাস্তার মাথার ওপর বড় বড় গাছেরা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে যেন সবুজ চাঁদোয়া টানিয়ে রেখেছে। প্রচুর ফাঁকা জায়গা। এত গাছ থাকার কারণে রাস্তায়, গাড়ির ওপরে শুকনো পাতা ঝরে পড়ে। দু-তিনজন লোক ব্লোয়ার নিয়ে এসে মাঝেমাঝে সেসব পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। রাস্তাঘাট আবার ঝকঝকে হয়ে ওঠে।
প্রতিটা বিল্ডিং-এর সামনের রাস্তায় সাদা দাগ দিয়ে প্রত্যেকের গাড়ি রাখার জায়গা মার্ক করা আছে। সকলে সেখানেই গাড়ি রাখে। আলাদা কোনো গ্যারেজ নেই।
আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলো যে এরিয়াতে, তার নাম উইলো লেক ড্রাইভ। কারণ সামনেই আছে একটা সুন্দর ঝিল। চারদিকে অনেক উইলো, ম্যাপেল, পাইন, ম্যাগনোলিয়া ছাড়াও কত রকমের অচেনা গাছ। আবার নয়নতারা, ল্যান্টানা, গোলাপের মতো চেনা ফুলরাও ছড়িয়ে আছে চারদিকে। ঝিলে সারাদিন অজস্র রাজহাঁস চরে বেড়ায়। মানুষ দেখলেই তারা জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে আসে।
খাবারের লোভে ছোট ছোট কচ্ছপও সাঁতার কেটে চলে যায় এদিক থেকে ওদিক। ঝিলের চারদিক দিয়ে হাঁটার রাস্তা, বাচ্চাদের খেলার পার্ক, সুন্দর বসার জায়গা। তাছাড়া পোষ্য কুকুর-বেড়ালদের খেলাধুলা করার, গা ঘামানোর জন্যও একটা বিরাট বড় ঘেরা জায়গা আছে। সেখানে ওদের খেলার সরঞ্জামও আছে কিছু। এছাড়া ঝিলের ধারেই আছে টেনিস কোর্ট, সুইমিং পুল, জিম, লন্ড্রি লাউঞ্জ। লন্ড্রি লাউঞ্জে সারি সারি ওয়াশিং মেশিন আর ড্রায়ার তো আছেই, তাছাড়া আছে জামাকাপড় ইস্ত্রি করার জায়গাও। ওয়াশিং মেশিনে কাচতে দিয়ে সেই সময়টা ওখানে পেতে রাখা সোফায় বসে বইপত্র পড়ে সময় কাটানো যায়। অথবা চাইলে লাগোয়া জিমে গিয়ে খানিকটা ওয়ার্ক আউট করেও আসতে পারে কেউ। সোফায় বসে সময় কাটানো ছাড়া লন্ড্রি লাউঞ্জের আর কোন সুবিধাই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। রীতিমত ডলার গুনতে হয় কাপড় কাচা আর শুকানোর জন্য। দেখতে পাই, শনি-রবিবারগুলোতে লন্ড্রি লাউঞ্জের সামনে লিকুইড ডিটারজেন্টের বোতল আর জামাকাপড়ের মোটা মোটা ব্যাগ নিয়ে লোকজন অনবরত গাড়ি থেকে ওঠানামা করছে।
এতবড় একটা জায়গা, তবে রাস্তায় লোকজন বেশ কমই দেখা যায়। বিকেলে ছোট ছেলে-মেয়েরা পার্কে খেলতে আসে, সকালে কিছু মর্নিং ওয়াকার কুকুর নিয়ে হাঁটে। বাকিরা সকাল হলেই একে একে গাড়ি নিয়ে হুস হুস করে কর্মক্ষেত্রে বেরিয়ে যায়। বিকেল বা সন্ধে নাগাদ সবাই বাড়ি ফিরে আসে। সারাটা দিন নানারকম পাখির ডাক, কাঠবেড়ালিদের ছটফটে আনাগোনা আর বাতাসে পাতা খসে পড়ার শব্দ নির্জনতা আরও বাড়িয়ে তোলে। জানালা দিয়ে নির্নিমেষ চেয়ে চেয়ে দেখি রোদ ঝলকানো পাইনের পাতার ঝিরিঝিরি কাঁপন, শুকনো ম্যাপেল পাতার হাওয়ায় ভেসে ভেসে মাটিতে নেমে আসা, ছোট্ট ছোট্ট পাখিদের লাফিয়ে লাফিয়ে ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে খাবার খোঁজা। খুব ভালো লাগে।
এই সমস্ত পরিবেশটা মর্নিং ওয়াকের পক্ষে একেবারে আদর্শ। আমার মতো হাঁটার ব্যাপারে জন্মকুঁড়েরও সকালে উঠে হাঁটতে যেতে না পারলে মন খারাপ হয়। কোনো কোনো দিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তার পাশের ফুটপাথ ধরে অনেকটা এগিয়ে যাই। পদচারী-পথচারী কদাচিৎ চোখে পড়ে। সার সার রঙ-বেরঙের নানা আকার-আকৃতির গাড়ি অবিশ্রান্ত ছুটে যায় শুধু।
রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলো দেখতে ভারী ভালো লাগে। রাস্তা থেকেই সবুজ লন, পোর্টিকো, ফুলগাছ ঘেরা বাড়িগুলোকে দিব্যি দেখা যায় আগাপাশতলা। সবচেয়ে ভালো লাগে ঝকঝকে তকতকে পরিচ্ছন্নতা। বাড়ির ফ্রন্ট ইয়ার্ড আর ব্যাক ইয়ার্ড পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাটা কিন্তু বাধ্যতামূলক। ঘাস ছেঁটে, শুকনো পাতা পরিষ্কার করে ঝকঝকে তকতকে না রাখলেই শহর কর্তৃপক্ষকে ফাইন গুনতে হবে। বোঝা গেল, ঘাড় ধ’রেই নিয়ম মানাতে হয় সব দেশেই। ভালো কথায় কেউ কান দেয় না। না স্বদেশে, না বিদেশে। ভাবছিলাম আমাদের দেশেও এমন নিয়ম চালু করতে পারে পৌরসভাগুলো।
এখানে দেখি অনেক একতলা বা দোতলা বাড়িকে ঘিরে কোনো বাউন্ডারি ওয়াল নেই। আমাদের তো আবার বাড়ি হতে না হতেই তাকে ঘিরে ফেলার বন্দোবস্ত করতে হয়। তা নাহলেই গরু, ছাগল, কুকুর, বেড়াল এমনকি চোর-ছ্যাঁচড়ের উপদ্রবে তিষ্ঠোনো দায় হবে।
এখানে আমাদের কমপ্লেক্সটাতে গাছপালার আড়ালে কিছু বেড়ালকে ঘুরে বেড়াতে দেখি। ওরা মানুষের কাছাকাছি খুব একটা আসে না। নিজের মনে থাকে। হয়তো পাখির ছানা, ইঁদুর বা ছোট পোকা-মাকড় শিকার করে খায়। বনি বলল, কী করে এরা এখানে এসেছে কেউ জানে না। হয়তো কেউ পুষতো, ছেড়ে দিয়ে গেছে। তারপর ওরা বংশবৃদ্ধি করে থেকে গেছে এখানেই। কেউ ওদের বিরক্ত করেনি। তবে এখানে সাধারণভাবে রাস্তায় বেওয়ারিশ পশুরা ঘুরে বেড়ায় না। কেউ যদি পুষতে অপারগ হয়ে পড়ে, তবে অ্যাডপশন সেন্টারে দিয়ে আসে। সেখান থেকে অন্য কেউ চাইলে নিয়ে গিয়ে পুষতে পারে। তবে পোষ্য রাখাও খরচসাপেক্ষ ব্যাপার। প্রথমেই চারশো ডলার দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে হাউজিং কমপ্লেক্স অথরিটির কাছে। তারপর আবার প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অ্যামাউন্টের ডলার পে করতে হবে মেনটেন্যান্সের জন্য।
হাঁটার পথের দুধারে লোকের বাড়ির বাগানে কত যে চেনা-অচেনা ফুল ফুটে থাকতে দেখি! কলাবতী, দোলনচাঁপা, নয়নতারা ল্যান্টেনারা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে চেনা সুরে ‘গুড মর্নিং’ বলে। ইতিউতি লাল-হলুদ লিলিদের দেখে মনে হয়, আমাদের বাড়ি থেকে আমাদের সাথে সাথে ওরাও বেড়াতে চলে এল নাকি? পাতায় পাতায় জমে থাকে ঝকমকে শিশিরবিন্দু। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় হাঁসের ঝাঁক। জানান দিয়ে যায় হেমন্ত আসছে। যাকে এ দেশে বলে ফল। এ দেশের ফল আমাদের দেশের হেমন্তের মতো ধূসর বিবর্ণ নয়। পাতা ঝরে যাবার আগে শেষবারের মতো তীব্র লাল, হলুদ, বাদামি রঙে সেজে ওঠে। চারদিকে রঙের আগুন লাগে তখন। এখনও অবশ্য তার একটু দেরি আছে।
একদিন সকালে হাঁটতে হাঁটতে চমকে থেমে গেলাম। রাস্তার ধারে ওটা কী? গন্ধরাজ ফুল মনে হচ্ছে? কাছে গিয়ে দেখি, ঠিক তাই। সমান করে ছাঁটা ছোট ঝোপালো গাছগুলোতে বেশ অনেকগুলো ফুটফুটে সাদা গন্ধরাজ ফুটে আছে। তেমনি তার মনমাতানো গন্ধ। কী যে ভালো লাগল! প্রায়ই দেখি কাশের ঝোপ রাস্তার ধারে, কারো বাড়ির বাগানে। না, একেবারে আমাদের দেশের মতো কাশ নয়, তবে কাশই। হয়তো বা অন্য প্রজাতির। তবু পুজো-পুজো গন্ধটা তাতে ঠিকই লেগে থাকে। মনে করিয়ে দেয়, পুজো আসতে বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। মা এখানেও আসবেন, মহাসমারোহেই আসবেন। বাঙালি থাকবে আর দুর্গাপুজো থাকবে না—তা কী হয়?
নতুন অতিথি
আমরা আসার এক সপ্তাহ পরেই যা ঘটে গেল, তার জন্য আমরা একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। পুত্রবধূ রিমি সন্তানসম্ভবা ছিল। ডাক্তার নভেম্বরের মাঝামাঝি ডেট দিয়েছিলেন। গর্ভাবস্থার পুরো সময়টাতে রিমি একেবারে সুস্থ ছিল। কোনো অসুবিধে ছিল না। ডাক্তার প্রতিবার বলেছেন, সবকিছু একদম স্বাভাবিক আছে। সবাই নিশ্চিন্ত। ইচ্ছে ছিল, ওখানে পৌঁছে অক্টোবরের মাঝামাঝি রিমির সাধের আয়োজন করব।
এদিকে আমরা আটলান্টা পৌঁছাবার পরের সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বনি আর রিমি আমাদের নিয়ে স্মোকি মাউন্টেন বেড়াতে যাবে বলে হোটেল বুক করে রেখেছিল। আমরা বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। ঠিক দুদিন আগে মঙ্গলবার থেকে রিমির পেটব্যথা শুরু হল। ডাক্তারের কাছে যেতে তিনি বললেন, ওটা মাসল পেন। ওষুধ দিলেন। রেস্ট নিতে বললেন। ওষুধে ব্যথা অল্প কমলেও পুরোটা গেল না। বুধবার রাত থেকে অল্প অল্প ব্লিডিং শুরু হল। বৃহস্পতিবার সকালে, অর্থাৎ যেদিন আমাদের স্মোকি মাউন্টেন যাওয়ার কথা ছিল, সেদিন রিমি ডাক্তার দেখাতে গেলে ডাক্তার ওকে এমোরি মিডটাউন হসপিটালে ভর্তি করে নিলেন। বললেন, অবজার্ভেশনে রাখবেন। তখনও ডেলিভারির ডিউ ডেট আসতে ছয় সপ্তাহ বাকি। আমরা বিকেলে রিমিকে দেখতে গিয়ে শুনলাম, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেই রাতেই সিজার করার কথা ভাবছেন ডাক্তাররা। ওদেশে ডাক্তাররা সহজে সিজার করতে চান না। নর্মাল ডেলিভারির ওপরেই জোর দেন। রিমিকেও গত আট মাস যাবত ডাক্তার বলে আসছিলেন, নর্মাল ডেলিভারিই হবে। কিন্তু হঠাৎ পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে গেল। এই অবস্থায় নর্মাল ডেলিভারির ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সিস্টার মুহূর্মুহূ এসে রিমির ভাইটাল প্যারামিটার মাপছেন, বেবির হার্টবিট, পালস মনিটরিং চলছে সারাক্ষণ। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতভম্ব! বেশ খানিকটা চিন্তিতও। এত আগে শিশুটির ফুসফুসের গঠন কী সম্পূর্ণ হল? ওটাই তো শুনেছি, সবচেয়ে দেরিতে পূর্ণতা পায়। আরও তিনটে সপ্তাহ কোনোরকমে পার হলে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত!
সব হিসেব নস্যাৎ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার রাত শেষ হওয়ার আগেই শিশুটি পৃথিবীর আলো দেখল। ক্যালেন্ডারের হিসেব অনুযায়ী সেদিন শুক্রবার, ২৯শে সেপ্টেম্বর। আমরা যেমন খুশি, তেমন চিন্তিত।
প্রিম্যাচিউর বেবি, ওজন হয়েছে দু কেজি একশ গ্রাম। যদিও জন্মের পর জোরেই কেঁদেছে, ডাক্তারও চেক করে বলেছেন বেবি সুস্থই আছে, তবু নিকুতে রাখতে হবে কিছুদিন।
রিমি দুদিন পর বাড়ি ফিরে এল, আর বেবি থেকে গেল নিকুতে। আমাদের মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই। রিমি আর বনি পরদিন থেকেই রোজ সকাল ন’টা থেকে সন্ধে ছ’টা, সাতটা পর্যন্ত হসপিটালে গিয়ে বেবির সাথে থাকে। আমরাও যাই মাঝেমাঝে। সিস্টাররা রোজ বেবির ওজন, প্রতিবারের ফিডের পরিমাণ—সব কিছু জানিয়ে দেন। আশ্বস্ত করেন যে বেবির সব কিছু একদম নর্মাল চলছে। ওজনটা একটু বাড়লে রিলিজ করবেন। বিরাট হাসপাতাল। সমস্ত ব্যবস্থা নিখুঁতভাবে চলতে থাকে। আমরা গেলে আমাদের নাম-ধাম সব এন্ট্রি করে ভিজিটর স্লিপ আটকে দেওয়া হয় আমাদের পোশাকে। তাতে আমাদের নাম লেখা থাকে। একঘন্টা থাকার পারমিশন পাই আমরা। ঠিক একঘন্টা পর থেকে গোলমত চাকতিটার রং বদলাতে শুরু করে। সাদা থেকে আস্তে আস্তে গোলাপি হয়ে যায় কাগজটা। মনে করিয়ে দেয়, আমাদের সময় শেষ। কেউ এসে তাড়া লাগায় না, চলে যেতে বলে না। গোলাপি রঙটাই আমাদের বলে দেয়, এবার এসো হে, সময় শেষ। ভারী মজার ব্যবস্থা।
জন্মের একুশ দিনের মাথায়, দুর্গাপঞ্চমীর দিন বিকেলে আমাদের নাতি বাড়ি এল। মা-বাবার কোলে চেপে বাড়ি এল—বলতে পারলেই ভালো লাগত। কিন্তু এদেশের নিয়মকানুন অন্যরকম। বাচ্চা এল কার সিটে বসে। এখানে গাড়িতে বাচ্চাকে আলাদা বেবি কার সিটে সিটবেল্ট বেঁধে বসাতে হয়। কোলে নিয়ে বসতে দেখলেই পুলিশ ফাইন করবে। সেটা বাচ্চার জন্য নিরাপদ নয়, তাই। ওকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করার আগে হসপিটাল স্টাফ এসে গাড়ি চেক করে দেখে গেল যে কার সিট ঠিকমতো বসানো হয়েছে কিনা। তাছাড়া একটানা দেড়-দুই ঘন্টার বেশি যেন কার সিটে বেবিকে না রাখা হয়, সে বিষয়েও সাবধান করে দিয়েছে।
হসপিটালের স্টাফরা বেবিকে ছাড়ার আগে ওর মা-বাবা সহ আমাদের কর্তা-গিন্নি দুজনকেও সিপিআর ট্রেনিং দিয়েছে হাতেকলমে। যাতে বাচ্চার ব্রিদিং প্রবলেম হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করতে পারি। আমাদেরকে বারে বারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আমরা বাচ্চাকে নিজেদের বিছানায় নিয়ে না শুই। তাকে আলাদা ক্রিবে শোয়াতে হবে। বালিশ, ব্ল্যাংকেট—এসব কিছুই সেখানে থাকবে না। বাচ্চার নাকে-মুখে চেপে যেতে পারে। ওখানে এসব কারণে বাচ্চাদের SID অর্থাৎ সাডেন ডেথ অফ ইনফ্যান্ট নাকি খুব সাধারণ ঘটনা। তাই এত সতর্কতা। কে জানে বাবা, আমাদের দেশে তো কখনও এমন হতে শুনিনি। তবে কিনা যস্মিন্ দেশে যদাচার। বুঝলাম, আমাদের দেশের মতো কাঁথা, বালিশ, পাশবালিশ কিছুই এখানে ব্যবহার করা চলবে না।
নাতির নাম রাখা হয়েছে কিয়ান। এই একুশ দিনে কিয়ানের ওজন হয়েছে তিন কেজি। ঠিকঠাক খাচ্ছে। একদম সুস্থভাবে বড় হচ্ছে। দেখে আমরা সবাই খুব খুশি আর নিশ্চিন্ত। আমাদের সাময়িক প্রবাস জীবন কিয়ানের আগমনে পরিপূর্ণ আনন্দে ভরে উঠল।
ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে পৃথিবী এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। ইন্টারনেটের দৌলতে সারা পৃথিবী এখন বন্দী হয়েছে মুঠোফোনে। তাই হয়তো ‘কালচারাল শক’ কথাটাও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীর উল্টো দিকে পৌঁছেও জাগতিক কোনো কিছুই আমাদের আর তেমন একটা অবাক করতে পারে না। সিনেমা, সিরিজ দেখে, বইপত্রের বর্ণনা পড়ে সব কিছুই যেন চেনা-চেনা ঠেকে। তবু মানুষের কিছু কিছু স্বভাব-চরিত্রগত পার্থক্য খেয়াল করে দেখলে মাঝে মাঝে একটু হলেও আশ্চর্য হই বৈকি। হয়তো এমনটা আমরা নিজের দেশে অহরহ দেখতে পাই না বলেই!
হসপিটাল যাতায়াতের সূত্রে দেখা দুটো ঘটনার কথা বলি এখানে। একদিন রাত প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ এমোরি মিডটাউন হসপিটাল থেকে বেরিয়েছি বাড়ি যাওয়ার জন্য। বনি বলল, চলো, হসপিটালের টপ ফ্লোর থেকে রাতের আটলান্টা দেখবে। ভাবলাম লিফটে করে যেতে হবে। লিফটের দিকে এগোতে যাচ্ছি, ছেলে বললো, গাড়িতে বসো। গাড়িতেই যাওয়া যাবে টপ ফ্লোরে। প্রথমে অবাক হলেও পরে বুঝলাম, প্রত্যেকটা ফ্লোরে পার্কিং এরিয়া আছে। ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে একেবারে টপ ফ্লোরের ছাদ পর্যন্ত। ছাদে উঠে দারুণ লাগল। পুরো শহরটা চোখের সামনে। দূরে দেখা যাচ্ছিল World of Coca Cola বিল্ডিং-এর লাল সাইনবোর্ড জ্বলজ্বল করছে। হসপিটালের পাশেই আটলান্টার সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং ব্যাংক অফ আমেরিকা প্লাজা। রাতের আলোয় ভারী সুন্দর লাগছিল দেখতে। তার কাছেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিল্ডিং ট্রুইস্ট প্লাজা। কাছাকাছিই দেখা যাচ্ছিল ম্যারিয়ট হোটেল, ওয়েস্টিন হোটেল, এমোরি উইনশিপ ক্যান্সার ইনস্টিটিউট। এসব দেখতে দেখতেই কানে আসছিল উচ্চগ্রামে মিউজিকের শব্দ। ঘুরে তাকিয়ে দেখি, ছাদের ওপর আরেকটা উঁচু জায়গায় জনা দুই অল্পবয়সী আফ্রো-আমেরিকান ছেলে মিউজিকের তালে তালে জগৎ ভুলে নেচে যাচ্ছে। অন্য আরেকটি ছেলে দর্শক। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দেখলাম ওদের নাচ। ছোট্ট একটা ভিডিও করার লোভও সামলাতে পারলাম না। ভাবছিলাম, হসপিটালের ছাদের ওপর চড়ে বিনা কারণে এমনভাবে নাচতে হয়তো এরাই পারে। সবসময় বেশ আনন্দে থাকতে জানে এরা।
আটলান্টাতে প্রচুর আফ্রো-আমেরিকান মানুষের বাস। সেটা টের পেয়েছিলাম প্রথমদিন এয়ারপোর্টে নেমেই। আমরা হুইলচেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্স নিয়েছিলাম নতুন দেশের এয়ারপোর্টে অযথা হয়রানি এড়াতে। আমাদের মতো আরও অনেকেরই হুইলচেয়ার যে অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েরা ঠেলে নিয়ে আসছিলেন, তারা সবাই আফ্রো-আমেরিকান ছিলেন। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের লাইনে অপেক্ষা করার সময় দেখছিলাম, ওরা নিজেদের মধ্যে অনবরত হাসি-ঠাট্টা, মজা-তামাশা করে যাচ্ছে। একে অন্যের সাথে জোর গলায় গল্প করছে। ওদিকে সাদা চামড়ার ইমিগ্রেশন অফিসাররা গম্ভীর মুখে বসে চুপচাপ নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন। বৈপরীত্যটা বেশ চোখে লাগছিল। কেন কে জানে ‘তাসের দেশ’ মনে পড়ে যাচ্ছিল।
হসপিটালে আরেকদিন দেখা আরেকটা দৃশ্যের কথাও ভুলতে পারি না। সেদিন হসপিটাল থেকে বেরিয়ে উবারের জন্য পার্কিং এরিয়াতে অপেক্ষা করছি, দেখলাম একজন আফ্রো-আমেরিকান বৃদ্ধা পার্কিং এরিয়ার পাশে চেয়ারে বসে আছেন। চেহারা দেখে মনে হল, বৃদ্ধা ঠিক সুস্থ নন। পা থেকে গলা পর্যন্ত একটা পাতলা সাদা চাদরে ঢাকা। একাই বসে আছেন। উবারের জন্য আমাদের মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। এর মধ্যেই দেখলাম, একটা গাড়ি এসে থামল আমাদের সামনে। এক ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে একটা হুইলচেয়ার নিয়ে এসে বৃদ্ধার সামনে রাখলেন। তখনই চাদর একটু সরে যেতে লক্ষ্য করলাম, হাঁটুর একটু ওপর পর্যন্ত বৃদ্ধার ডানপাটা নেই। অনেক পুরোনো ক্ষত বোঝাই গেল। বৃদ্ধা বসার পর হুইলচেয়ার ঠেলে গাড়ির সামনে রেখে ভদ্রলোক একটু সরে দাঁড়ালেন। শুরু হল এক পায়ে বৃদ্ধার হুইলচেয়ার থেকে উঠে গাড়ির সামনের সিটে বসার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। কিছুতেই ধরে ওঠার জন্য ব্যালেন্স করতে পারছিলেন না। গাড়ির সামনের দরজা ধরে শরীরটাকে সিটের ওপর রাখতে গিয়ে একবার ব্যালেন্স হারিয়ে ধপ করে সিটের ওপর উল্টে পড়লেন। তারপর অনেক কষ্টে নিজেকে গুছিয়ে তুলে সিটে বসলেন। এতক্ষণের এই চেষ্টায় সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোক একবারও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন একপাশে। বৃদ্ধা গাড়িতে উঠে বসার পর তিনি হুইলচেয়ারটা সরিয়ে রেখে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
মনে মনে ভাবছিলাম, ভদ্রলোকের এইরকম ব্যবহারের কারণ কী? ওঁকে ঠিক উবার ড্রাইভার মনে হল না। মনে হল আত্মীয় বা পরিচিত কেউ। তাছাড়া উবার ড্রাইভার হলে বৃদ্ধা হয়তো সামনের সিটে বসতেন না। যাই হোক, এমন হতে পারে যে বৃদ্ধাটি হয়তো প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাহায্য নেওয়া পছন্দ করেন না। হয়তো বা ভদ্রলোকটিও অযাচিত সাহায্য করা পছন্দ করেন না। এখানে সবার ব্যক্তি স্বাধীনতাবোধ বড় প্রবল। কারণ যাই হোক, ঘটনাটা মনে বেশ দাগ কেটে গেল।





চিত্র পরিচিতি
ওপর থেকে নীচে (বাম দিকে)
১। লেকের জলে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে লেগ্যাসির জিম
২। ব্যাংক অফ আমেরিকা প্লাজা, আটলান্টার সবচাইতে উঁচু বাড়ি
৩। সংহিতার সাথে কলকাতা এয়ারপোর্টে
ওপর থেকে নীচে (ডান দিকে)
১। লেগ্যাসি কমিউনিটির ভেতরের রাস্তা
২। কানাডিয়ান রাজহাঁস, লেকের সামনে




আমেরিকা ভ্রমণ মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। তারসাথে নবজাতকের গল্প। ভারী সুন্দর।
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।
মৈত্রেয়ী নন্দীর ‘আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরী’ বেশ ভালো লাগলো। প্রথম দেখার অনুভূতি গুলো ছোট ছোট শব্দ চয়নের মাধ্যমে ছবির মতো সুন্দর হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।
আশাকরি লেখিকার ডায়েরীর পাতার লেখাগুলো পরবর্তীতে আমরা পড়ার সুযোগ পাব।
পরবর্তী পর্বগুলোতেও সঙ্গে থাকলে খুশি হব। অজস্র ধন্যবাদ।
Mam you have written such wonderfully that I could imagine the whole scenario infront of my eyes. I am eager to read more such beautiful experience of your journey to different places.
I am delighted to know that you are eager to read more about my journeys. I shall certainly share more such experiences very soon—each place has its own story, colours, sounds, and emotions waiting to be unfolded.
Please keep reading and sharing your thoughts; they make my journey even more meaningful.
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।