গিবস গার্ডেন
এর মধ্যেই আমরা একদিন ঘুরে এলাম গিবস গার্ডেন। জিম গিবস নামে এক সাহেবের বাগান। আচ্ছা, আন্দাজ করুন তো, একজন লোকের বাড়ির চারদিক জুড়ে নিজের তৈরি একটা ফুলবাগান কত বড় হতে পারে? এক বিঘা? দু-বিঘা? পাঁচ বিঘা? থাক, বলতে হবে না। পারবেন না। জিম গিবস সাহেব তাঁর নিজের বাড়ির চারপাশে বানিয়েছেন ৩৭৫ একরের ফুলবাগান। হ্যাঁ, ঠিক পড়ছেন, ৩৭৫ একর! মানে ১১৭৫ বিঘা।
কে এই জিম গিবস? বলছি শুনুন। জর্জিয়ার বাসিন্দা এই ভদ্রলোক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন বাগানের নেশা। ওঁর দুই ঠাকুমা, এক পিসি— সবার ছিল দুর্দান্ত সব বাগান। ছোটবেলায় জিম পিসির ঝরনা, ফুল আর সুদৃশ্য গাছে ঘেরা বাগানে ঘুরতে ঘুরতে বলতেন, “বড় হলে আমিও ঠিক এমন সুন্দর একটা বাগান বানাব।”
কথা রেখেছিলেন জিম। পড়াশোনা করেছিলেন হর্টিকালচার আর গার্ডেন ল্যান্ডস্কেপিং নিয়ে। বাগান ছিল তাঁর রক্তে। বড় হয়ে নেশা-পেশা সব এক করে বিশাল এবং বিখ্যাত এক গার্ডেন ল্যান্ডস্কেপিং কোম্পানি খুলে বসলেন। নাম গিবস ল্যান্ডস্কেপ কোম্পানি। তাদের কাজ হল বড় বড় প্রপার্টির চারপাশের পরিবেশের সৌন্দর্যবর্ধন করা। এতটাই নামকরা এই কোম্পানি যে জিম গিবস দু-দুবার হোয়াইট হাউসে গিয়ে প্রেসিডেন্টদের হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছেন। তাছাড়াও ওঁর ঝুলিতে পুরেছেন আরও তিনশো অ্যাওয়ার্ড।
এখন কথা হল, যাঁর কাজ অন্যের প্রপার্টির সৌন্দর্য বাড়ানো, তাঁর নিজের একটা দেখনসই বাগান না থাকলে চলে? তাই তিনি চললেন সারা পৃথিবী ঢুঁড়ে বিখ্যাত সব বাগান দেখতে। প্রায় পনেরো বছর ধরে পৃথিবী-বিখ্যাত সব বাগান দেখে ফিরে এসে বাড়ির চারদিকের পাহাড়ি ঢালে ঢালে প্রায় তিন-চারশো একর জমি কিনে ফেললেন। সেই জমিতে ছোট্ট নদী আছে, অনেকগুলো ঝরনা আছে। সেটা ১৯৮০ সাল। তারপর ৩০ বছর ধরে একটু একটু করে সাজিয়ে তুললেন দুর্দান্ত এক বাগান। ২০১২ সালে সম্পূর্ণ হল বাগান। নিজের পরিবারের জন্যই বানালেন যদিও তবু সুন্দর জিনিস দশজনকে না দেখালে কী মন ভরে? তাই জনসাধারণের জন্যও খুলে গেল বাগানের দরজা। বিনামূল্যে নয়, অবশ্যই। হাজার হোক, ব্যবসায়ী মানুষ। ২৫ ডলারের টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। বাগান দেখার পর অবশ্য মনে হতে বাধ্য যে টাকাটা কিছুই নয়।
কী আছে সেই বাগানে? কেন ছুটে যায় এত মানুষ?
এক-এক ঋতুতে গিবস সাহেবের বাগান সেজে ওঠে এক-এক রূপে। মার্চ-এপ্রিলে একশো একর জায়গা জুড়ে ফুটে ওঠে দু-কোটির বেশি ড্যাফোডিল, তাছাড়াও ফোটে লক্ষ লক্ষ টিউলিপ, চেরি ব্লসম, আরও হাজার রকমের ফুল। এছাড়া নানারকম সুদৃশ্য ও মূল্যবান গাছ তো আছেই। বাগানের কুড়িটা সুদৃশ্য পুকুরে ফুটে থাকে রং-বেরংয়ের শালুক। মে, জুন, জুলাইয়ে রডোডেনড্রন, লিলি, হাইড্রেঞ্জিয়া, অ্যাজেলিয়া, ক্যামেলিয়া, ডগউড, স্যালভিয়া, প্যানসি, গোলাপে একরের পর একর রঙিন হয়ে থাকে। আবার আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জাপানিজ ম্যাপেল, বীচ, জিঙ্কগো, অ্যাসপেন গাছের পাতারাই এমন রঙিন হয়ে থাকে, যেন মনে হয় পুরো গাছটাই ফুলে ভরা। তাছাড়া পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢাল জুড়ে যতদূর চোখ যায় শুধু নানা রংয়ের কসমস আর জিনিয়া— যেন রঙিন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। হালকা বাতাসে মাঝে মাঝে দুলে ওঠে সেই ফুলের রঙিন সমুদ্র। রঙিন ঢেউ খেলে যায় সবুজ পাহাড়ের বুকে। অসংখ্য প্রজাপতি উড়ে বেড়ায় ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এই অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না।
এই বাগানে নানারকম প্রজাপতির সঙ্গে মোনার্ক প্রজাপতিও আসে। মোনার্ক প্রজাপতি আর পাঁচটা প্রজাপতির থেকে বেশ আলাদা। এই পরিযায়ী প্রজাপতিদের আচার-ব্যবহারে অনেক বিশেষত্ব আছে। জিনিয়া আর কসমসের বাগানে দু-জোড়া কমলা-কালোতে মেশানো মোনার্ক প্রজাপতি দেখতে পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা। শীত আসছে, এই সময় ওরা আরও দক্ষিণে গরমের জায়গায় চলে যায়। কয়েকটা প্রজাপতির হয়তো বাগান ছেড়ে এখনই যেতে ইচ্ছে করছে না। ওরা মাইগ্রেশনের শেষতম দলের যাত্রী হবে হয়তো। তাই দেখা পেলাম ওদের।
বাগানের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় ম্যানর হাউস। গিবস সাহেবের প্রাসাদোপম ইউরোপিয়ান স্টাইলের বাড়ি। প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে ঢোকার লোহার গেটখানিও মানানসই ডিজাইনের। ঠিক যেন ফুল-পাতাসহ জংলি গোলাপের লতা দিয়ে তৈরি গেট। বাড়ির চত্বরে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে চোখে পড়ে দূরে নীল রঙের ঢেউ খেলানো ব্লু রিজ মাউন্টেন। চোখের সামনে সাতটি ধাপে নেমে গেছে ঘন সবুজ ঘাসের লন, নানারকম রঙিন ফুলের কেয়ারি, পুকুর, ঝরনা, রঙিন গাছপালা। বাড়িটা যেন স্বর্গোদ্যানের মাঝখানে একটা দ্বীপ। গিবস সাহেব মারা গেছেন ২০২১ সালে। এখন ওই বাড়িতে তাঁর ছেলেরা থাকেন।
গোটা বাগানটা মোটামুটি ভাবে ঘুরে দেখতে গেলেও ঘণ্টা চারেক অন্তত হাঁটতে হবে। আমরা গিয়েছিলাম অক্টোবরে। তখন ফুলের পিক সিজন নয়। ফল-কালারটাও ভালো করে আসেনি তখনও। তা সত্ত্বেও আদিগন্ত কসমস, জিনিয়ার সমুদ্র, গোলাপ, আর নানারকম বাহারি ফুলের শোভা আমাদের মন ভরিয়ে দিয়েছিল। আক্ষরিক অর্থেই ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স। এই বাগানের প্ল্যানটাই এমনভাবে করা, যাতে প্রচণ্ড শীতের মাস দুটো ছাড়া সারা বছরটাই বাগান ফুলে ভরে থাকে। কখনই দর্শক নিরাশ হয়ে ফিরে যাবেন না।
আটলান্টা থেকে একশো কিলোমিটার দূরে নর্থ জর্জিয়ার ইয়েলো ক্রিক রোডের ধারে এই বাগান। গাড়িতে যেতে ঘণ্টাখানেকের একটু বেশি সময় লাগল। যাওয়া-আসার পথে দেখতে পেলাম আমেরিকার গ্রামের রূপ। বিশাল সবুজ প্রান্তরের মাঝে মাঝে দাঁড়ানো গাছপালা ঘেরা এক-একটা বিচ্ছিন্ন বাড়ি। তার চারপাশে নিচু বেড়া দিয়ে ঘেরা র্যাঞ্চ। ভেলভেটের মতো সবুজ বিশাল বিশাল র্যাঞ্চে ঘুরে বেড়ানো ঘোড়াগুলোকে দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন হলিউড মুভির দৃশ্য। গিবস গার্ডেনে ঢোকার আগে প্রায় পনেরো কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে দুপাশে সবে রঙ লাগতে শুরু করা ঋজু গাছের সারি, যেন গার্ড অফ অনার দেবার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। নির্জনতা আর সৌন্দর্য মিলেমিশে মনকে এমন মোহাচ্ছন্ন করে তুলছিল যে, মনে মনে বলছিলাম, “এই পথ যদি শেষ না হয়…”।











ক্রমশ




স্বল্প পরিসরে এই বিশালাকার বাগানের সৌন্দর্য নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানেই লেখিকার কলমের যাদু।