আজকাল চোখ বন্ধ করলেই দৃশ্য গুলো এক এক করে মনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারা দিন আপন মনে ফেলে আসা দিন গুলোর কথা মনে করি।
সেদিনের পর থেকে কঙ্কা আমাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে চলছিল। যে কোন প্রশ্নের খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছিলো কখনো বা না শোনার ভান করে উত্তর না দিয়েও চলে যাচ্ছিল। সেই রাতে প্রথম ও আমার সঙ্গে বসে খেল না । আমার খাওয়ার আগেই খেয়ে নিয়ে রান্না ঘরে শেকল তুলে দিয়ে শুতে চলে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার! যেন আমিই চোর দায়ে ধরা পড়েছি!ওর ওপর রেগে গিয়ে আমিও ঠিক করেছিলাম গায়ে পড়ে ওর সঙ্গে কথা বলব না। তারপর ধীরে ধীরে ও আমার শাশুড়ির দেখভালে ঢিলে দিল। ঠাকুর ঘর, রান্নাবান্নার ওপর একা হাতে রোগীর সেবা যত্ন করা অসম্ভব তাই একদিন ওকে ডেকে ধমকের সুরে বললাম, “মায়ের দেখাশোনা করা একেবারে ছেড়ে দিয়েছো কেন বলতো?”
ও উদ্ধত জবাব দিল, “কেন, এত কাল আমি বাড়ি সুদ্ধ সবার সেবা করছি এবারে তুমি এসেছো তুমি কর! আমি কি এবাড়ির ঝি যে জুতো সেলাই থেকে চন্ডী পাঠ আমাকেই করে হবে? কেন আমি তোমার শাউরির গু মুত ঘেঁটে বেড়াব বলতে পার? কত ট্যাকা মাইনে দাও তোমরা?”
আমি সাধারণত কাউকে কোন কটু কথা বলি না। কিন্তু ওর কথা শুনে ক্ষেপে গেলাম। বললাম, “তুমি কে, কেন তুমি এত দিন এ বাড়ির সবার সেবা যত্ন করছ সে তো জানি না। কে তোমাকে কাজে রেখেছে তাও জানি না। এ বাড়ি এসে অবধি তোমাকে এসব কাজ করতে দেখছি। আর রইল রোগীর সেবা, আজকাল সে কাজ তো তুমি একা কর না। আমিও তো হাত লাগাই নাকি? সঙ্গে ঠাকুর ঘরের কাজ, রান্না ঘরের কাজ এসব তো আমি একাই করি। এখন তুমি মায়ের কাজ করা একেবারে ছেড়ে দিলে আমার পক্ষে এত কাজ করা সম্ভব? এ বাড়িতে থাকবে অথচ তুমি কোন কাজ করবে না কেন তার উত্তর দাও?”
কঙ্কা আমার দিকে সোজা চেয়ে ধমকে বলল,”দেখ সেজবউ, তুমি খামোখা আমার পেছনে লাগতে এস না, আমি কিন্তু মানদা নই। কোন সুবিধে হবে না। মনে রেখ আমি তোমার খাইও না পরিও না।”
ও যে এতটা কলহ প্রিয় আর উদ্ধত আগে বুঝিনি। কঠোর ভাবে বললাম, “বেশ, আমার না খেলেও যার খাও পর অন্তত তার মায়ের সেবা যত্নে হাত লাগাও। আমাকে সাহায্য কর। নইলে তোমার এসব গরম গরম কথা তার কানে তুলব।”
ও মাথা নিচু করে গজগজ করতে করতে চলে গেলেও পর দিন থেকে আবার আগের মতো কাজ কর্ম শুরু করে দিল।
মৃত্যরও দিন ক্ষণ থাকে, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম এবার যেন তিনি শাশুড়িকে নিজের কাছে টেনে নেন। গলা দিয়ে জল টুকু পর্যন্ত গলছিল না, কষ বেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। দেহের বর্জ্য নিষ্ক্রমন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবুও মরণ ওঁকে দয়া করছিল না। সত্যি বলতে গেলে আমার আর কঙ্কার কাজ অনেক কমে গিয়েছিল , শুধু ওই গন্ধটা … বড় উৎকট পচা গন্ধ! ভরা পেটে ও ঘরে ঢোকা দায়। ঘা পরিষ্কার করতে গিয়ে সেদিন চমকে উঠলাম, হে ভগবান! ছোট ছোট সরু সাদা কেঁচোর মতো কয়েকটা পোকা কিলবিল করছে!
এগুলো ওঁর শরীর থেকে ছাড়াব কিভাবে!
সেদিন দুবেলাই খেতে পারিনি। দুপুরে ভাত মাখতে গিয়ে বমি উঠে এসেছিল। থালায় জল ঢেলে উঠে পড়েছিলাম। কঙ্কা আবার আমার সঙ্গে খেতে শুরু করেছিল। ও বলল, “তোমার আবার কী হল? পেট খারাপ হল নাকি? হজম হয়নি? হজম না হলে খেও না। আমি মুখ আঁচিয়ে জোয়ান আর বিট নুন দিচ্ছি। তিন বার খাও, পেট হালকা হয়ে যাবে। আজ সারা দিন উপোস দাও।”
আমি তখন বললাম, “তুমি হয়তো খেয়াল করনি, মায়ের ঘায়ে পোকা ধরে গেছে। হাড় দেখা যাচ্ছে।”
আমার কথা শুনে নিস্পৃহ স্বরে বললো, “ও সেই জন্য ঘেন্নায় বমি আসছে? আমি ভাবলাম তোমার বদ হজম হয়েছে। পোকা ধরেছে, হাড় বেরিয়ে গেছে এসব আমি আগেই দেখেছি। আমাদের আর কী করার আছে বল। যার যত দিন ভোগ আছে ততদিন তো বাঁচবেই। ভগবানকে ডাক যেন তাড়াতাড়ি তুলে নেয়। উনিও বাঁচেন, আমরাও বাঁচি। আর যেন পারছি না। আর কত কাল যে এদের জন্য মুখে রক্ত তুলে খাটতে হবে!”
পেটে কিছু পড়েনি বলেই বোধহয় সেদিন রাতে ঘুম আসছিল না। শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবছিলাম। এই তো মানুষের শেষ পরিণতি, তবুও এই শরীর আর সম্পদ নিয়ে তার কত অহঙ্কার। কয়দিন আগেও রোগ শয্যায় শুয়ে থাকা সত্বেও আমার গয়না গুলো উনি হাতছাড়া করতে চান নি। রসগোল্লার টাকার জন্য যাচ্ছেতাই অপমান করেছেন, আমার এক বেলার দু মুঠো ভাতের হিসেব করেছেন। অথচ এখন আর আজ এ জগতের কোন কিছুতেই আর তাঁর কিছুই যায় আসে না।
শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলাম হটাৎ যেন কিছু পতনের শব্দ পেলাম আর সেই সঙ্গে একটা গোঙানি। হ্যারিকেনটা নিয়ে বাইরে এলাম, শাশুড়ির ঘরের দরজা কঙ্কা ভেতর থেকে বন্ধ করে রাখে। ওর নিজের ঘর আর শাশুড়ির ঘরের মধ্যে একটা দরজা আছে। কান পেতে শুনলাম একটা গোঙানির আওয়াজ আসছে বটে। কঙ্কাকে ডাকতে গিয়ে ওর দরজায় হাতের তালু দিয়ে আঘাত করতে ভেজানো দরজা খুলে গেল। ঢুকে দেখি ও ঘরে ঘুমিয়ে নেই, শাশুড়ির ঘরেও নেই। সম্পূর্ণ অচেতন রোগী কিভাবে যেন দুমড়ে মুচড়ে মেঝেতে পড়ে গোঙাচ্ছে। ছুটে তুলতে গিয়ে দেখলাম একা পারবো না। কঙ্কা কি কলঘরে গেছে? ডাকতে গিয়ে দেখি নেই, কোত্থাও নেই। কোথায় গেল মেয়েটা? জোরে জোরে ওর নাম ধরে ডাকলাম কিন্তু কোন উত্তর নেই! নাহ , এবার তো শৈলেন বাবুকে ডাকতেই হবে, ওঁর দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলাম। ভেতর থেকে অশ্রাব্য কিছু গালিগালাজ ভেসে এলো আর কঙ্কার করুন মিনতি ভরা নিচু স্বর, “পায়ে পড়ি ছোট দাদা বাবু এখন দরজা খুলবেন না!”
ক্রমশ
আগের পর্বঃ পাপ – পর্ব ১৪



