মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস – পর্ব-১৪

muder on orient express

হাতে ধরা প্যাসেঞ্জার লিস্টের দিকে তাকিয়ে

এরকুল: এবার যে দেখছি রাজকুমারীর পালা।

বুঁঃ (এরকুলকে থামিয়ে) মনটা বড় খচখচ করছে। বোতামের ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেললে হয় না। মিশেলকেই একবার ডাকা যাক। বোতাম দিয়েই মনে হচ্ছে বেচারি ফেঁসে গেল।

ডাক পেয়ে মিশেল এসে হাজির হল।

এরকুল: (মিসেস হার্বাডের জমা দেওয়া বোতামটি হাতে নিয়ে) এই বোতামটা সম্ভবত তোমার। ইউনিফর্ম পোশাক থেকে খুলে গেছে। মিসেস হার্বাডের কূপে থেকে পাওয়া গেছে।

মিশেল: (নিজের বুকে ইউনিফর্মের উপর হাত রেখে) কখনো না। আমার তো কোনো বোতাম হারায়নি।

বুঁ: অদ্ভুত ব্যাপার, তবে রেল কর্মচারীর ইউনিফর্মের বোতাম ওনার কূপেতে এলো কিভাবে?

মিশেল: (দৃঢ়ভাবে জানান দিলেন) তা জানি না।

বুঁ: ওনার কামরায় যারা ঢুকেছিল তাদের ইউনিফর্ম থেকেই বোতাম খুলে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাদের মধ্যেই হয়তো কেউ হত্যাকারী।

মিশেল: আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি কাল রাত্রে ওনার কামরায় আর কেউই ঢোকেইনি। উনি হয়তো কোনো স্বপ্ন দেখেছেন।

বুঁ: না না, ওনার কল্পনা নয়। আমরা নিশ্চিত যে হত্যাকারী কাল ওনার কামরায় ঢুকেছিল এবং তাড়াহুড়োয় এই বোতাম ফেলে যায়। তা না হলে এই বোতাম এলো কিভাবে?

মিশেল: (বিচলিত হয়ে) বিশ্বাস করুন, আমি ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলছি আমি এর বিন্দুবিসর্গ জানি না। ঐ নিহত ভদ্রলোককে আমি জীবনে প্রথমবার দেখলাম, ওনাকে হত্যা করে আমার লাভটা কী?

এরকুল: মিসেস হার্বাড যখন ঘণ্টা বাজান তখন আপনি কোথায় ছিলেন?

মিশেল: আমি আগেও বলেছি আবারও বলছি আমি ঐ সময় পাশের কোচে গিয়েছিলাম। অন্য কন্ডাক্টরদের সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটাচ্ছিলাম। বিশ্বাস না হয় ওদের ডেকে জিজ্ঞাসা করুন।

এরকুল: ঠিক আছে, মসিয়ে বুঁ ওদের ডাকানোর ব্যবস্থা করুন। না না, মিশেল আপনার যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আপনি এখানেই থাকবেন।

মসিয়ে বুঁ অন্য কোচের কন্ডাক্টরদের ডাইনিং কামরায় ডেকে আনালেন। তারাও মিশেলের কথাকেই সমর্থন করলেন। এও জানালেন যে তাদের সঙ্গে বুখারেস্ট কোচের কন্ডাক্টরও ঐ সময় আড্ডা মারছিলেন। সেখানে উপস্থিত হওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যেই ইস্তাম্বুল ক্যালে কোচ থেকে তারা কলিং বেলের আওয়াজ পান। কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়া মাত্র আড্ডা ছেড়ে মিশেল ক্যালে কোচের দিকে রওনা দেন।

মিশেল (কাঁদো কাঁদো গলায়) দেখলেন তো, আমি সত্যি কথাই বলছি। আমাকে মিথ্যা সন্দেহ করছেন।

বুঁ: কিন্তু এই বোতাম—এই বোতাম মিসেস হার্বাডের কূপেতে এলো কিভাবে?

মিশেল: বিশ্বাস করুন। জানি না। একেবারেই জানি না। অন্য কন্ডাক্টররাও জানালেন যে তাঁদের কারোরই কোনো বোতাম খোয়া যায়নি। তাছাড়া তাঁরা ওদিক মাড়ানও নি।

বুঁ: (কন্ডাক্টরদের আশ্বস্ত করে) ঠিক আছে। আচ্ছা মিশেল এবার ঠিকঠাক মনে করে বলুন দেখি—আপনি যখন ঘণ্টির আওয়াজ পেয়ে মিসেস হার্বাডের কামরার দিকে যাচ্ছিলেন তখন কি করিডোরে কাউকে লক্ষ্য করেছিলেন?

মিশেল: না মসিয়ে বুঁ, আমি কাউকেই লক্ষ্য করিনি।

বুঁ: অদ্ভুত ব্যাপার! লোকটি তাহলে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।

এরকুল: কিছুই অদ্ভুত নয়। গোটা ব্যাপারটাই সময়ের কারসাজি। মিসেস হার্বাড লোকটিকে দেখে চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো দু-তিন মিনিট পড়েছিলেন। এরপর তিনি কলিং বেল বাজাতে শুরু করেন। সেই ফাঁকেই হয়তো হত্যাকারী দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়ে আসে এবং পালিয়ে…।

বুঁ: কিন্তু পালিয়ে কোথায় যাবে? বাইরে তো এখন তুমুল স্নো-স্টর্ম চলছে।

এরকুল: দুটো সম্ভাবনা আছে। হয় সে বাথরুমে ঢুকে যায়, নয়তো অন্য কোনো কূপে।

বুঁ: কিন্তু কাল রাত্রে তো সব কামরাই ভর্তি ছিল। তবে কি সে নিজের কূপেই ঢুকে পড়ে?

এরকুল: হুঁ। মসিয়ে বুঁ, তেমন সম্ভাবনা।

বুঁ: তা দাঁড়াচ্ছে এই। কন্ডাক্টরের অনুপস্থিতিতে হত্যাকারী নিজের রূপে বের হন, র্যাটচেটের কূপের করিডোরের দিকের দরজাটাকে বন্ধ করে দুটি কূপের মাঝখানের দরজা দিয়ে মিসেস হার্বাডেরটায় আসেন। সেখান দিয়ে আবার করিডোরে বের হয়ে নিজের কূপে ফিরে যান।

এরকুল: সে ক্ষেত্রে এটাও ধরে নিতে হয় যে মার্ডার হওয়ার জন্য প্রাণভয়ে ভীত হুমকি চিঠি পাওয়া র্যাটচেট নিজের কূপের দরজা হত্যাকারীর জন্য হাঁ করে খুলে রেখেছিলেন, অথবা হত্যাকারীর হাতের মৃদু টোকায় দরজা খুলে দিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত শান্তভাবে কোনো রকম বাধা না দিয়ে মার্ডার হতে সাহায্য করেছিলেন। ব্যাপারটা কি এতোটাই জলবৎ তরলং মনে হচ্ছে?

বুঁ হতাশভাবে সামনের টেবিলে হাত উল্টে বসে রইলেন। হাতের ইশারায় কন্ডাক্টরদের চলে যেতে বলে এরকুল পোয়ারো আবার প্যাসেঞ্জার লিস্টের দিকে চোখ বোলাতে লাগলেন।

এরকুল: এখনো আটজন যাত্রীর জবানবন্দি নেওয়া বাকি। পাঁচজন ফার্স্ট ক্লাসের: প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফ, কাউন্ট ও কাউন্টেস আন্দ্রেনি, কর্নেল আবার্থনট ও মিসেস হার্ডম্যান। তিনজন সেকেন্ড ক্লাসের: মিস ডেবেনহ্যাম, ইতালীয় আন্দ্রেলিও ফসকারেলি এবং রাজকুমারীর পরিচারিকা মিসেস শ্মিট।

বুঁ: এরাই তাহলে। ইতালীয়টিকে ডাকা হোক, ঐ ব্যাটাই তো আসলে…

এরকুল: আপনি তো দেখছি ওর উপর বিশাল চটে আছেন, বেচারির ওপর! না না একদম উপর থেকেই শুরু করা ভালো। প্রিন্সেসকে ডেকে পাঠান। উনি যদি আসতে না চান, আমাদেরকেই ওনার কাছে যেতে হবে। মসিয়ে বুঁ গলা তুলে মিশেলকে ডাকলেন। এবং মিশেলকে দিয়ে প্রিন্সেসকে এখানে আসার জন্য অনুরোধ করে পাঠালেন।

একটু পরেই দৃঢ় পদক্ষেপে প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফ ডাইনিং কোচে প্রবেশ করলেন। সটান গিয়ে বসলেন টেবিলের উল্টোদিকে এরকুলের মুখোমুখি চেয়ারে। কুৎসিত থপথপে বেঁটে খাটো চেহারা। রংচটা বিবর্ণমুখ, কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। চোখে মুখে ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাস উপচে পড়ছে। গলার স্বর গমগমে, কিন্তু একই সঙ্গে কথাবার্তার ধরনটাও বেশ ক্যাটকেটে।

প্রিন্সেস আসতেই মসিয়ে বুঁ একরাশ সংকোচ প্রকাশ করে ডেকে পাঠিয়ে বিব্রত করার জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন।

রাজকুমারী: (হাতের মুদ্রায় সে সব থামিয়ে বললেন) আপনাদের এত করে ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই। আপনারা আপনাদের কর্তব্য তো করবেনই। ট্রেনে এরকম একটা বিশ্রী মার্ডার ঘটে গেছে, তদন্ত তো আপনাদের করতেই হবে। তদন্তে আমি সব রকম সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এখন বলুন কী জানতে চান?

এরকুল: আপনার পুরো নাম ও ঠিকানাটা যদি এখানে একটু দয়া করে লিখে দেন।

রাজকুমারী: (বাড়ানো কাগজ-কলম সরিয়ে) লিখে নিন। নাতালিয়া দ্রাগোমিরফ। সতেরো ক্লেবার অ্যাভিনিউ, প্যারিস।

বুঁ: ম্যাডাম, আপনি বোধহয় কনস্টান্টিনোপল থেকে প্যারিস ফিরছেন?

রাজকুমারী: হ্যাঁ। আমি ও আমার মেড কনস্টান্টিনোপলে অস্ট্রিয়ান দূতাবাসের আতিথ্যে ছিলাম, ওখান থেকেই প্যারিস ফিরছি।

এরকুল: গতকাল রাত্রে ডিনারের পর আপনার গতিবিধি সম্পর্কে যদি বলেন?

রাজকুমারী: ডিনার করার সময়ই আমি কন্ডাক্টরকে আমার বিছানা রেডি করে দিতে বলি। ডিনার শেষে কামরায় ফিরেই শুয়ে পড়ি। আন্দাজ এগারোটা পর্যন্ত একটু পত্রপত্রিকা নাড়াচাড়া করছিলাম। রাত্রে বাতের ব্যাথাটা বাড়ায় সাড়ে বারোটা-পৌনে একটা নাগাদ কন্ডাক্টরকে দিয়ে মেডকে ডেকে পাঠাই। সে এসে মালিশ করে দেয়। আমার তন্দ্রাভাব চলে এলে তাকে চলে যেতে বলি। সে হয়তো আধঘণ্টা-চল্লিশ মিনিটের মতো ছিল।

এরকুল: ম্যাডাম, একটু কি মনে করতে পারেন? আপনার মেড যখন চলে যায় তখন ট্রেন চলছিল না থেমে ছিল?

রাজকুমারী: না, না, তেমন কিছু মনে পড়ছে না।

এরকুল: আপনার পরিচারিকার নাম?

রাজকুমারী: ইংগ্রিড শ্মিট, জার্মান।

এরকুল: কতদিন আছেন আপনার কাছে?

রাজকুমারী: তা বছর পনেরো তো হবেই।

এরকুল: বিশ্বাসভাজন?

রাজকুমারী: একশো ভাগ। আমার স্বামীর খাস তালুকের প্রজা ছিল ওর বাবা।

বুঁ: আপনি নিশ্চয় আমেরিকা গেছেন?

রাজকুমারী: (বিস্মিত হয়ে) হঠাৎ এ প্রশ্ন? যাইহোক গেছি বহুবার।

বুঁ: আমেরিকায় আর্মস্ট্রং পরিবারকে কি আপনি চিনতেন? ঐ ডেইজি আর্মস্ট্রং-এর পরিবারের কথা বলছি।

রাজকুমারী: (বেদনাহত কণ্ঠে) মসিয়ে, চিনব না আবার? ওনারা আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। কর্নেল আর্মস্ট্রং-কে অবশ্য তেমন চিনতাম না। তবে ওনার স্ত্রী সোনিয়া ছিলেন আমার মেয়ের মতো। আসলে সোনিয়ার মা লিন্ডা আর্ডেন ছিলেন আমার প্রিয় বান্ধবীদের অন্যতমা।

এরকুল: আচ্ছা, লিন্ডা আর্ডেন কি এখনো বেঁচে আছেন? তেমন আর খবর পাই না আজকাল।

রাজকুমারী: না না, বেঁচে আছেন। তবে একপ্রকার জীবিত মৃত। চরম একাকীত্বে কাটছে লিন্ডার জীবন। শুনেছি আজকাল আর তেমন চলাফেরাও করতে পারেন না (হতাশা ঝরে পড়ে)।

এরকুল: শুনেছি ওনার আর একজন মেয়ে ছিল।

রাজকুমারী: ঠিকই শুনেছেন। তবে সে সোনিয়ার থেকে অনেকটাই ছোট।

এরকুল: সে মেয়ে নিশ্চয় জীবিত আছেন?

রাজকুমারী: অবশ্যই।

এরকুল: বলতে পারবেন তিনি এখন কোথায় আছেন?

রাজকুমারী: (তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে) একটা প্রশ্ন করতে পারি। এসব প্রশ্নের সাথে এই হত্যাকাণ্ডের কী সম্পর্ক?

এরকুল: সম্পর্ক আছে ম্যাডাম। যিনি মার্ডার হয়েছেন তিনি ছিলেন ডেইজি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি।

রাজকুমারী: কিছু মনে করবেন না। যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক, কিন্তু ডেইজি আর্মস্ট্রং-এর হত্যাকারী নিহত হয়েছে শুনে আমার বড়ই আনন্দ হচ্ছে।

এরকুল: না না, এতে মনে করার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক। আপনাদের পারিবারিক বন্ধু। তাদের পরিবারকে ছারখার করেছে যে, তার মৃত্যু আপনার কাছে আনন্দদায়ক হতেই পারে। ম্যাডাম, দয়া করে যদি লিন্ডা আর্ডেন-এর ছোট মেয়ের বর্তমান ঠিকানা সম্পর্কে আমাদের একটু অবহিত করেন।

রাজকুমারী: সত্যি বলতে কী… ওদের সাথে আমার বহুদিন যোগাযোগ নেই। বিশেষ করে পরের প্রজন্মের সাথে তো নয়ই। তবে শুনেছিলাম একজন ইংরেজ ভদ্রলোকের সাথে ছোটটির বিয়ে হয়েছে এবং ওরা ইংল্যান্ডে থাকেন। আর কী কী জানতে চান?

এরকুল: আর একটি প্রশ্ন ম্যাডাম। আপনার ড্রেসিং গাউনের রং?

রাজকুমারী: (একটু হেসে) অদ্ভুত প্রশ্ন। নীল রেশমের।

এরকুল: আপনার সহযোগিতার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

রাজকুমারী: (উঠে দাঁড়ালেন, হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে) আপনাকে খুব চেনা লাগছে। যদি কিছু মনে না করেন, আপনার নামটা কী জানতে পারি?

এরকুল: না না, মনে করার কী আছে—আমার নাম এরকুল পোয়ারো।

প্রিন্সেস দ্রাগোমিরফ প্রায় মিনিট খানেক পোয়ারোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে

রাজকুমারী: (স্বগতোক্তি) এরকুল পোয়ারো! সবই নিয়তি, নিয়তিকে কেন বাধাতে?

এরপর ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে গেলেন।

বুঁ: চমৎকার ভদ্রমহিলা মশাই, কি রয়্যাল অ্যাটিচুড! আভিজাত্য চুঁইয়ে পড়ছে।

এরকুল: (চিন্তিত ভাবে) সবই তো বলে গেলেন, কিন্তু অস্পষ্টভাবে শেষটায় কী যেন বলে গেলেন, ‘নিয়তিকে কেন বাধাতে?’ চিন্তায় ফেলল মশাই।

(ক্রমশ)

আগের পর্বঃ মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব-১৩


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top