সফর : এক ব্যর্থ যাপনের আখ্যান

mohana majumder

মোহনা মজুমদার

“আমরা যেন জ্যামিতিক বিন্দু— অবস্থিতি আছে, বিস্তৃতি নেই। বিন্দুর সঞ্চারপথ যেমন মাত্র একটি হালকা রেখায় শেষ, তেমনি এই ধূসর আয়ুষ্কাল টুকুই আমার অতিবাহিত পথ। বিন্দুর মতো হালকাভাবে এখন পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে চাই— আলোয় ত্রসরেণুর মতো, অন্ধকারে জোনাকির মতো।”

—মণীন্দ্র গুপ্ত

আপনি যদি হঠাৎ একদিন অনুভব করেন, এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পরও আপনার ‘সরণ’-এর মান একেবারে শূন্য, আপনি কি নিজেকে ব্যর্থ মনে করবেন? অঙ্কের সমীকরণ মেলাতে মেলাতে যে মানুষ নিজের জীবনের সমীকরণটাই যখন আর মেলাতে পারে না, তুরীয় এক সুররিয়াল সন্ধ্যার বালুতটে সে পড়তে শেখে “সেদিকে যেতেছে লোক গ্লানি প্রেম ক্ষয়/ নিত্য পদচিহ্নের মতো সঙ্গে ক’রে;/ নদী আর মানুষের ধাবমান ধূসর হৃদয়/ রাত্রি পোহালো ভোরে— কাহিনীর কতো শত ভোরে/ নব সূর্য নব পাখি নব চিহ্ন নগরে নিবাসে;/ নব-নব যাত্রীদের সাথে মিশে যায়/ প্রাণলোকযাত্রীদের ভিড়;/ হৃদয়ে চলার গতি গান আলো রয়েছে, অকূলে/ মানুষের পটভূমি হয়তো বা শাশ্বত যাত্রীর।” এইখানে ‘শাশ্বত’ শব্দটি কি তবে মৃত্যুর পরবর্তী কোনো দৃশ্য রচনা করে? জীবনানন্দ বোধহয় এভাবেই নতুন নতুন সুররিয়াল পথে হাঁটতে শেখান। ক্লান্ত পথিক তখন নুড়ি কোরায়, শামুকের খোলসের সামনে দাঁড়িয়ে উদ্ভাষণ করে সত্তার গূঢ় সত্তা।
এই যেমন এখন ‘স্বপ্ন’-স্টেশনে এসে বসে আছি বিগত কয়েক শতাব্দী। ট্রেন লেট ঘোষণা করছেন অন্তর্যামী। এত মানুষ, এত তাদের বিচিত্র গন্তব্য। কেউ ছুটছে, কেউ অপেক্ষা করছে। এই অপেক্ষা করতে করতে একসময় ঠিক নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে নির্দিষ্ট ট্রেন আসে। মানুষের অপেক্ষায় দাঁড়ি পড়ে। তখন তার সামনে সত্যি হওয়া স্বপ্ন, কিংবা জলকেলি করে আসা গন্তব্য। কবিতার জন্যেও তো ঠিক এমন করেই অপেক্ষা করেন কবি। কবিতাও ঠিক আকস্মিকভাবে এসে মস্তিষ্কের ভেতর ধরা দেয়। তার জন্য থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা। এমনি এমনি সে আসে না। তাকে সাধনা করতে হয়। তবে সে আসে। নিরাবয়ব তার গঠন। বিমূর্ত তার ধারণা। এই বিমূর্ততা থেকে কবিতা হয়ে ওঠার পথে কবি রন্ধন করে শব্দ, ব্রহ্ম, দর্শন, গূঢ়তা। শিল্পের রহস্যময়তায় কি তাঁকে নিখুঁত করে গড়ে তোলেন কবি? শুধু শিল্প নয়, কবিতাকে ছুঁতে সবার প্রথম যা প্রয়োজন হয়, তা হলো নিভৃতযাপন। নিজেকে বোঝার জন্য, নিজের সঙ্গে, নিজের ভাবনার সঙ্গে সময় কাটাতে হয়। আমি এবং আমার সেসব অ-কবিতারা জীবনের আলো-আঁধারি নিংড়ে মুখোমুখি বসি কখনও। চারপাশে দেখি ছড়ানো আমার সব ব্যর্থ কবিতা। আমার দিকে তাকিয়ে তারা ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হাসে। যেন বলে ‘কবি হতে এসেছিস?’ কবি হতে চাইলেই কি কবি হওয়া যায়? মানুষ চেষ্টা করে গায়ক হতে পারেন, নৃত্যশিল্পী হতে পারেন, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেন কিন্তু ‘কবি হব’ এই ভাবনা নিয়ে কবি হওয়া যায় না। দু’লাইন লিখতে না লিখতেই মঞ্চের আলো, হাততালি, পুরস্কারের লোভে আমরা নিজেই নিজেদের কবির তকমা লাগিয়ে দিই, অথচ কবি হওয়ার পথ যে কী ভীষণ নিভৃতসাধনার, তা যিনি সত্যই কবিতার উপাসক, তিনিই একমাত্র উপলব্ধি করেন। নিজেকে কবি ভাবার স্পর্ধা আমার তাই এখনও তৈরি হয়নি। এইসব ব্যর্থ কবিতা লিখতে লিখতে কোনো একদিন নিশ্চয়ই একটি সফল কবিতা লিখতে পারব এই স্বপ্ন নিয়ে কি তবে লিখতে চাওয়া? আবার ভাবি কবিতার কি সফলতা, ব্যর্থতা হয়? সে তো স্বতঃপ্রণোদিত। কত সময় হয় এমন ফ্যালফ্যাল করে ওই শূন্যের দিকে চেয়ে থাকি, মাথার ভেতর কালো একটা শূন্যতা, সেই শূন্যে ক্লান্ত ধোঁয়ারা ইতিউতি এদিক ওদিক হেঁটে যায়, ক্লান্ত হলে শুয়ে পড়ে। আবার হঠাৎ কখন জেগে উঠে আমায় শব্দ দেয়, অক্ষর দেয়, জোনাকি দেয়, এলোমেলো। আমি একে একে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করি, খেতে দিই। তারপর একে একে সাজাই। এইভাবে বেশ কিছু কবিতা লিখলাম, বই আকারে প্রকাশিত হলো। অথচ বই হয়ে আসার পর যখন ওদের দেহের দিকে তাকাই, লজ্জা করে, মনে হয় ব্যর্থ সব কবিতা, কিচ্ছু লেখা হয়নি, ছিঁড়ে ফেলে দিই। অস্তসূর্যের আলোয় আত্মবিস্মৃত কতগুলি অদ্ভুতুড়ে চোখ। তারা করুণভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলে ‘আমাদের মেরো না, আমরা তো তোমারই সন্তান, তোমারই সৃষ্টি’। অসহায় বোধ হয়, ব্যর্থ হাতে ওদের সরিয়ে দিই টেবিলের এক কোণায়। কোনো বিকলাঙ্গ শিশু জন্মালে মা-বাবা যেমন তাদের বিসর্জন দিতে পারেন না, তাদের স্থান হয় ঘরের এক কোণায়। মাঝেমাঝে শুধু গিয়ে দেখে আসি, বুকে জড়িয়ে থাকি, হাত বুলিয়ে রেখে দিই যথাস্থানে। এভাবে দিন কাটে, রাত হয়। রাত কাটে, দিন হয়। আবার লিখতে বসি। অনুভব করি, এ এক অদম্য তাগিদ। একসময় মনে হতো, জীবনে আর কিছু করে উঠতে পারলাম না বলে কি লিখতে এলাম? লেখাই কি আমার একমাত্র অন্তিম আশ্রয়? ভার্জিনিয়া উল্ফ বলছেন “I rise from my worst disasters, I turn, I change.” মানুষ আঘাত খায়, মাটিতে লুটিয়ে পড়েও হয়তো কখনও। তবু সময়ের সাথে সাথে সে সকল ক্ষতে প্রলেপ পড়ে। আবার সে উঠে দাঁড়ায়। নিজেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। আর প্রস্তুতির সাথে সাথে ঋদ্ধ হয় মানুষের চেতনা, জীবনবোধ, দর্শন; জড়ো করে উপকরণ। এভাবেই কি তবে কবিতার কাছে আসে মানুষ?
অঙ্ক নিয়ে কারিকুরি করতে ভালো লাগতো। তাই এইচএসে ভালো নম্বর আসলো। বাবা-মা ভাবলেন আমার মতো শান্ত স্বভাবের মেয়ের দ্বারা কর্পোরেট জব হবে না, তাই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পেয়েও গেলাম না। এসে পড়লাম মাঝ সমুদ্রে। এ তো অঙ্ক নয় যেন পাতার পর পাতা প্রবন্ধ। কোনো রকমে এমএসসির গণ্ডি পাস করে একটি স্কুলে পড়ানোর চাকরি পেলাম। আমাদের মধ্যবিত্ত সংসারে মেয়েদের মূলত পড়ানো হয়, সম্বন্ধ করে বিয়ের সময় যাতে ভালো পাত্রের গলায় মেয়েকে ঝুলিয়ে দেওয়া যায়। ফলে ‘সু-পাত্র’ পেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো। অচেনা স্বামীর হাত ধরে চললাম ভিনরাজ্যে চাকরি ছেড়ে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন সংসার। নতুন মানুষগুলোর সামনে শুধু নিজেকে যোগ্য করে তোলার বিফল চেষ্টায় ভুলে গেলাম ইনফ্যাক্ট ভুলে যেতে চাইলাম আমার ছেলেবেলা, আমার পড়াশোনা, আমার অতীত, আমার প্রেম। এভাবে কেটে গেল বেশ কিছু বছর। কোলে এল কন্যাসন্তান। স্বামীর চাকরিসূত্রে কলকাতায় ফেরার পর ঠিক করলাম আবার চাকরি করব। কিন্তু ততদিনে অনেকটা কেরিয়ার গ্যাপ আর কোলের সন্তান। চাকরি আর করা হলো না। হয়তো সেইভাবে চেষ্টাও ছিল না। বাবা সিইএসসি-র উচ্চপদস্থ কর্মী ছিলেন। কোনোদিন অভাব কি টের পাইনি। তাই পড়াশোনা করেছি ঠিকই, কিন্তু চাকরি করার তাড়না কখনও অনুভব করিনি। কিন্তু আজ বুঝি কতটা ভুল ছিলাম। যত দিন গেল নিজেকে অপদার্থ আর ব্যর্থ মানুষ ভাবতে শুরু করলাম। এত ব্যর্থতা নিয়ে যাব কোথায়? কি করব? ততদিনে বন্ধুরা যে যার মতো ওয়েল এসট্যাবলিসড। অথচ ট্রেন এসে গেছে, ট্রেনে উঠে যখন পড়েছি, সামনে এগিয়ে যেতেই হবে, ফিরে আসার পথ নেই। এই ট্রেনে উঠে পড়া সকল যাত্রীর গন্তব্য স্টেশন কি তবে ‘মৃত্যু’? সেখানেই ট্রেন থামবে। তার আগে নয়। তাহলে দুঃখ, আনন্দ, হতাশা, লাঞ্ছনা— এগুলো কি? এগুলো এক একটা হল্ট। এসব স্টেশনে ট্রেন থামে না। এগুলোর মধ্যে দিয়ে মানুষ যখন নিজেকে অতিক্রম করায় শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে তার রূপ, রং, গঠন। তারা জীবনে এগিয়ে চলার পথে অভিজ্ঞতা দেয়, সবুজ-ধূসর পাতায় ভরিয়ে তোলে জীবনের এক্স-ওয়াই-জেড। কিন্তু আমি তো নিজের জীবনটাকে শুধু সবুজ করেই রাখতে চেয়েছিলাম, প্রত্যেকটা মানুষই তেমনটাই চায়, অথচ চোখ খুলে বুঝলাম ধূসর পাতায় ভরে উঠেছে আমার গোটা ঘর। ধূসর পাতার গায়ে লেগে থাকে মর্মর মায়া-ক্কাথ। ফেলে দিতে পারি না তাদের। ঠিক করি যত্ন করে তাদের গুছিয়ে এমন অবয়ব দেব যারা আর হারিয়ে যাবে না, ছেড়ে যাবে না। লিখতে শুরু করলাম ভ্রমরকলা। শুরুর দিকে যা মনে আসত লিখতাম, কোনোটা ‘অকবিতা’, কোনোটা ‘অনু’, আবার কোনোটা ‘পরমানু’ আবার কোনোটা এগুলোর কিছুই না, একেবারে পাতে ফেলার অযোগ্য। আচ্ছা রান্না করতে পারি না বলে কি রান্না করা ছেড়ে দেব? তবে খাব কি? থুরি এত ভাবনা, অবচেতন, তার ক্লেদ, সুষমা নিয়ে রান্না করতে ভালো লাগতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে তা গলাদ্ধকরণ করার যোগ্য মনে হতে লাগলো। সম্পাদক মহাশয়দের প্রশ্রয় ও প্ররোচনায় লেখা পত্রিকায় ছেপে বেরোতে লাগলো। এইভাবেই কোনোটা কবিতা হলো, কোনোটা গল্প হলো, মুক্তগদ্য হলো, ব্যক্তিগত গদ্য হলো, আবার কোনোটা কিছুই হলো না।
হলো না এই বেগুনী ধানক্ষেত বরাবর হেঁটে গিয়ে পঞ্চম বিশ্বের সেই গ্লানিহীন গ্রামে পৌঁছনো, যেখানে বোদলেয়ার এবং রবিঠাকুর মায়া ও মেঘের চাদরে বিছিয়ে দিচ্ছেন শূন্যের চোরাকুঠুরি। এক আকাশের না বলা সংলাপ লেখা হলো না, যেখানে হারিয়ে যাওয়ার গান লিখতে লিখতে একদিন ঘুমিয়ে পড়েছিল অন্ধ জোনাকি। ফ্রিডা কাহলো তার ‘self portrait with Cropped Hair’ ছবিতে কতটা যন্ত্রণা নগ্ন করলেন আর কতটা শূন্যতা তলিয়ে দিলেন গর্ভে, তার অনুপাত, তার সীমারেখা ছুঁয়ে দেখা হলো না। কত কি বলার ছিল, কত কি করার ছিল… অথচ কিছুই করা হলো না। লাতিন ভাষায় একটি উক্তি আছে “কারপে ডিয়েম” অর্থাৎ এই মুহূর্তে বাঁচো, বর্তমানকে উপভোগ করো। হাতে সময় কমে আসছে। এই পোড়া জীবনের থ্যাতলানো মাংস, হাঁড়, রক্ত লিখে যেতে হবে। একে একে কাছের মানুষরা চলে যাচ্ছে, চলে যাবে, জানি। ফাঁকা হয়ে যাবে আমার চারপাশ। যাকে ভালোবেসে একটা গোটা স্বপ্ন অপেক্ষা-পুষ্পে পূর্ণ করেছি, সেও চলে যাবে একদিন, আরও একা হয়ে উঠব আমি। তারপর আমিও চলে যাব টুপ করে একদিন। কোথায় যাব? কোলের মেয়েটাকে কে দেখবে তখন? মায়ায় আটকে যায় মানুষ। সেই জাল কেটে বেরোতে বেরোতে সে দেখে গন্তব্য স্টেশন এসে যায়। কাউকে নেমে যেতে হয়। কেউ আরও এগিয়ে যায় অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। তবে নামতে হয় সকলকেই একদিন। যতদিন সে এই সফরে থাকে তার অবস্থা যেন ওই ভাস্কর চক্রবর্তীর কথায় ‘কিছুই করে উঠতে না পারা’ জীবনে ‘ঠিক একটা ওল্টানো আরশোলার মতো শুঁড়দুটো যার ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে আর পা ছুঁড়ছে অনবরত’…


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top