পৃথিবীটা এখন ভাঙা কাঁচের মতো। যেখানে তার হাত রাখি, সেখানে শব্দ চিরে যায়;
যেখানে পা ফেলি, সেখানে স্মৃতি খসে পড়ে।
টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে সব—দূরত্ব, মুখ, সকাল, এমনকি আশ্বাসের অভিধানও।
আর সেই ভাঙাচোরা জিনিসগুলোর মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি—বুকের ভেতর একখানা অনন্ত ব্যথা, কাঁধের ওপর এমন এক ভার, যার কোনো নাম নেই, তবু ওজন আছে; যার কোনো ভাষা নেই, তবু শ্বাস আটকে দেয়।
আমি আর বইতে পারি না—এই কথাটাও আমার ঘাড়ে আরেকটা বোঝা। কারণ “আর পারি না” বললেই কেউ বুঝতে চায়, এর পরে কী হবে; অথচ আমার ভিতরে “এর পরে” বলে কিছু নেই—
আছে শুধু “এখন”—একটা দীর্ঘ, নীরব, ঘন বর্তমান।
ব্যথা এখানে সময়ের মতো: ঘড়ি ধরে না, থামে না, দয়া করে না। সে কেবল জমে। স্তরে স্তরে। রাতের পর রাত। দিনের আলোর ভিতরেও।
আমার ভাগ্যে আরও ব্যথা বাকি আছে—আমি জানি। যেন কোথাও একটা অদৃশ্য দপ্তরে, আমার নামে আরও প্রহার সিল মারা আছে।
একেকটা দিন শুধু সেই অনুমোদনের কাগজ। আমি চুপ করে সই করে দিচ্ছি—কারণ প্রতিবাদ করলেও শরীরের ভিতরে যে ক্ষরণ চলছে, তা থামে না।
আমি দেখেছি: কিছু ব্যথা প্রশ্নের উত্তর দেয় না, কেবল প্রশ্ন বাড়ায়। “কেন?”—এই শব্দটা এখানে এতটাই ক্লান্ত যে, সে আর উচ্চারিত হয় না; শুধু চোখের কোণে জমে থাকে।
আমি মুক্তি চাই সান্ত্বনা চাই না;
কাঁধের ওপর থেকে এই পৃথিবীটাকে নামিয়ে রাখতে চাই এক পাশে—যেভাবে কেউ বৃষ্টিভেজা জামা খুলে রাখে, না শুকোলে আর পরে না।
আমাকে ফিরিয়ে দাও আমার আকাশ—সেই আকাশ, যে একসময় ছিল নিছক ওপরের নীল; এখন সে আমার থেকে দূরে সরে গেছে, এমনভাবে, যেন আমি আকাশের ঋণ খেলাপি।
আমাকে দাও কুচো ফুল—কিন্তু গন্ধের জন্য নয়, শুধু ভাঙা থাকার প্রতীক হিসেবে।
আমাকে দাও ঘাটের জল—কিন্তু স্নানের জন্য নয়, শুধু বোঝার জন্য যে জলেরও একদিন তীর লাগে; আর আমার ব্যথার কোনো তীর নেই।
সময়—এই মিছিলে হাঁটা ছায়া—আমাকে ঘিরে ঘুরছে। তার শাখা থেকে একটি পাতা ঝরে যাক আমার নামে, যেন প্রমাণ থাকে: আমি ছিলাম; আমি ভাঙলাম; আমি ভার নিলাম; আমি নিঃশব্দে পুড়লাম।
তারপর আমি হেঁটে যাব—কোথাও নয়, কারও কাছে নয়; শুধু হেঁটে যাওয়া। কারণ আমার ভিতরে এখন গন্তব্য নেই, আছে কেবল গতি—ব্যথার দিকে, ভারের দিকে, আরও ভারের দিকে।
শোকের আগুনে জন্মানো অন্ধকার—সেখানে আলো নেই, কিন্তু তাপ আছে; সেই তাপে আত্মা পোড়ে। আর আত্মা পোড়ার শব্দ হয় না—হয় শুধু এক ধরনের স্থিরতা, যাকে বাইরে থেকে “সমাহিত” মনে হয়, অথচ ভিতরে তা কেবল গভীর ক্ষয়।
আমাকে সকালের পাখির মতো মুক্ত করো না—পাখির মুক্তি গান জানে। আমার মুক্তি গান জানে না।
আমাকে ঝরে পড়া ফুলের মতো সান্ত্বনা দিও না—ফুলের পতনে সৌন্দর্য থাকে। আমার পতনে আছে শুধু ভারের টান।
আমাকে সমুদ্র দিও— ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাঙুক সে জল। ভাঙনই হোক আমার একমাত্র পরিচয়:
প্রতিটি ঢেউ এসে আমার নামটা ভেঙে দিয়ে যাক, আবার পরের ঢেউ এসে সেই ভাঙা নামকে আরও ছোট করে দিক—এমন ছোট, যে শেষ পর্যন্ত নামও থাকে না, শুধু ব্যথার আকারটা থাকে।
আমি চাই—এই লেখাটা শেষ না হোক। কারণ শেষ মানেই কোথাও একটা সমাপ্তি; আর আমার ভিতরে কোনো সমাপ্তি নেই। আছে শুধু ভার। আছে শুধু ব্যথা। আছে শুধু পৃথিবীর টুকরো টুকরো শব্দ—যা রাতে ঘুমোতে দেয় না, দিনে বাঁচতে দেয় না, আর তবু—চুপচাপ কাঁধে চেপে বসে থাকে, ঠিক যেমন নির্দয় নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে বসে থাকে, আলোর নাম করে দূরত্ব বাড়ায়।



