তোমাকেই আমি অতিক্রম করলাম
আজ রাস্তা পেরোতে পেরোতে হঠাৎ যেন মনে হল, তোমাকেই আমি অতিক্রম করলাম। সেইসব দিনে কেমন অকুণ্ঠ আগুন সর্বদা তোমাকে আমাকে ঘিরে জ্বলত, সেই অকুণ্ঠ আগুন আজ আর কোথায়? কত দরদালান এরমধ্যেই উঠে গেছে আকাশের কাছাকাছি। কত জলাধার স্থির হয়ে আছে নক্ষত্রের নীচে। কত নতুন আকৃতির পাখি উড়ে এসেছে দুর্লঙ্ঘ্য পাহাড় পেরিয়ে। গলির রাস্তায় কত পথবাতি জ্বলে উঠেছে রক্ষীর মতো। আমাদের নিয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে কৌতুক করা সেইসব কূট অন্ধকারও আর নেই। আজ কিছুটা আবছায়ার মধ্যে যেন মনে হল, তোমাকে আমি অতিক্রম করলাম। নিকটেই একটি বাড়ির সমুজ্জ্বল জানালা। সেই জানালার কাছাকাছি কিছুটা আবছায়ার মধ্যে যেন মনে হল, তোমাকেই আমি অতিক্রম করলাম। মনে হল যেন তুমি একটি জৌলুস হারানো সুতির পোশাক পরে আছ। মনে হল যেন, মাথার চুলে হামা দিচ্ছে জবজবে তেল। মনে হল যেন তোমার মুখ গলা ভাঙা প্রতিমার মতো সামনে ঝুলে আছে। হয়তো মনের ভুল, তবু মনে হল যেন একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছ। একটি মৃদু বাঁশির সুর ভেসে আসছিল কাছাকাছি কোনো বাড়ির পেট থেকে। সেই বাঁশির সুর সে- বাড়ির কোষ্ঠের পরিচ্ছন্নতা বোঝায়। বোঝায় বারান্দার টবে হয়তো চন্দ্রমল্লিকা ফুটেছে পরপর। বোঝায় সিঁড়ির পাশে কোথাও গুছিয়ে রাখা আছে বহুবর্ণের চপ্পল। বোঝায় পুরোনো কলতলা ঘেঁষে একটি বয়েস উত্তীর্ণ করবীর ঝোপ আছে, পেচ্ছাপের গন্ধ আছে
আহা, সেইসব দিন হলে আজ আমরা মুখোমুখি থমকে যেতাম। যেতাম না? তখন তোমাকে আমাকে ঘিরে এক অকুণ্ঠ আগুন সর্বদা জ্বলছে। এমন দরদালান তখন তো উঠে যায়নি আকাশের কাছাকাছি। ফলত সেই আকাশ তখন বাঁক- নেওয়া এক নদীর মতো কলস্বরা। আমি তোমাকে অতিক্রম করে একটি চৌমাথার সামনে এসে ভাবলাম। আমি তোমার নতমুখ একটি হাত হয়তো মুঠোয় নিতাম তখন। অন্ধকারে দৃষ্টি বিনিময় হত কোনো সুগন্ধের মতো। একটি অক্টোপাসের মতো চৌমাথায় দাঁড়িয়ে আজ যেন সেইসব অলঙ্কৃত দিনের কথা ভেবে নিজেকে খুব ফাঁকা, খুব নিঃস্ব মনে হল। এখন আমার লতাপাতার বিস্তার নিজের শিশ্নের কাছে এসে মৌন হয়েছে। এই তো, এই যে রক্ষীর মতো পথবাতিগুলি, এখন সেসব পেরোব। একটি এঁদো নালার পাশে আমার গন্তব্যের পথ, সেই পথে পা রাখব। একটি কণ্টকিত স্তনের কুকুর এসে কিছুক্ষণ আমাকে দেখে কোথাও দৌড়ে যাবে। হয়তো ভাববে, এ হল সেই মানুষ, যে নিজের দাহকার্য সেরে ভিজে গায়ে ঘরে ফিরল। তুমি ভাব, এই ভাবনার মধ্যে কোনো চাতুর্য আছে বা ছিটেফোঁটাও কোনো অতিরঞ্জন? আমি এখন আমার নিরক্ত একটি ঘরে যাব। জামাকাপড় খুলে ছড়িয়ে রাখব একটি ঊষর, বালুকাময় চাঁদে। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে একটি ছায়ামূর্তি বেরিয়ে আসবে বারান্দায়। তার পেছন পেছন আরও একটি ছায়ামূর্তি। তাদের চোখ স্থির। ঠোঁটে হিংস্র শ্বাপদের মতো গরগরানি
এরপর তোমাকে আমাকে
রোদের মধ্যে সরীসৃপের মতো ধোঁওয়ার নকসা। এমন রোদের মধ্যে এই যে সম্মুখে সমুদ্রের মতো পথ পড়ে আছে, সেই পথ তোমাকে আমাকে মিলে পাড়ি দিতে হবে। এবারের শীতে আমরা কেউই কুয়াশা ভেঙে পাহাড়ে উঠিনি কোথাও। আদিম কোনো দোকানে বসে মৃত চায়ে চুমুক দিইনি। দেখিনি শতায়ু পাইনের শীর্ষে কেমন হাওয়ায় হাওয়ায় জটলা বেঁধেছে। দিনগুলি কেটে গিয়েছে মৃদু শব্দে। যেন একটি রোমশ শরীর থেকে জলস্রোত বেরিয়ে মিশে যাচ্ছে আরও বহুবিধ জলে। আজ সেইসব পরিত্যক্ত দিনের পর আমরা এখানে। চারপাশে লতাগুল্ম, ফুল। অত্যন্ত প্রাচীন ভেঙে পড়া একটি কাঠের সাঁকো। চারপাশে আমাদের যেসব নৈসর্গিক গাছ, তাদের কারও কারও শাখায় বীজ ভেঙে গড়িয়ে আসা আগুনের ঢল, কেউ- বা করজোরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আজ এখানে আমরা অনেক বিচ্ছেদ, অনেক সন্তাপ পেরিয়ে এসেছি। আজ আমরা দুজন পাশাপাশি হাঁটছি। অনেকদিন পরে টুকরো টুকরো কথা বলছি এ অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে। আজ চারপাশে হাওয়া আছে। ঠিক হাওয়া হয়তো নয় বরং বলা ভাল বায়ু আছে লাল বেলুনের মতো। আর আছে রোদের মধ্যে সরীসৃপের মতো ধোঁওয়ার নকসা। চিরচেনা দৃশ্যাবলী তাই কিছুটা অস্পষ্ট লাগে। আর আছে দ্যাখো, ঔই যে দুজনের সম্মুখে গাঢ় সমুদ্রের মতো পথ। সেই পথ তোমাকে আমাকে মিলে পাড়ি দিতে হবে
এখানে তেমন আদিম দোকান নেই, পাকদণ্ডী পেরিয়ে যেখানে পৌঁছলে অমর্ত্যলোক খুব কাছ থেকে দেখা যায়। দেখা যায় তার ডুমো ডুমো স্থাপত্য, সিঁড়ির ধরন আর নীলে বুঁদ হয়ে ভেসে থাকা মেঘ। এখানে ঝকঝকে সব আসবাব আছে, বর্শা হাতে নিয়ে দাঁড়ান কঙ্কাল আছে তবু এসো এখানেই কোথাও আজ বহুদিন পর পাশাপাশি বসি। সবার অলক্ষ্যে আমাদের ফিতের মতো আঙুলগুলি আঙুলে জড়াই। পায়ের উদ্ভিদ পা দিয়ে স্পর্শ করি। আরও একবার স্মরণে রাখি যে, আজ এখানে আমরা অনেক বিচ্ছেদ, অনেক সন্তাপ পেরিয়ে এসেছি। পেরিয়ে এসেছি অনেক ঘোড়ার মৃত্যু আর আর্তনাদ। আজ তোমার গাল ছুঁয়ে যে চুলের গুচ্ছ দোল খাবে তাকে এমন রোদের মধ্যে স্মিত ঈশ্বরের মতো দেখাবে। আজকের ইতিহাসে হয়তো কোথাও রক্তপাত আছে, গুলিতে লুটিয়ে পড়া বহু মানুষের দেহ আছে বা আছে হয়তো দেশনায়কের মূল্যবান উক্তি বা হুংকার, সেইসব ছেঁড়া কাগজের মতো আমরা পাশে সরিয়ে রাখব। দেখব বাইরের দৃশ্য। একটি পোয়াতি অটো পাখির মতো তীক্ষ্ণ শব্দ করে কোথাও চলে গেল। নিকটে যেসব বশংবদ গাছ, পাইন বা বয়স্ক শিরীষ নয়, তাদের গায়ে হাওয়ার ফালি উড়ে এসেছে। দ্যাখো ওই যে বনভূমি চিরে যাওয়া পথ গাঢ় সমুদ্রের মতো, সেই পথ তোমাকে আমাকে মিলে এরপর পাড়ি দিতে হবে। ফের হয়তো কোনো সূর্যের বাহু ভেঙে পড়বে সশব্দে, তবুও তবুও
অনিত্যের আশ্চর্য নিয়ম
অবশেষে আমরা একটি নমিত চাঁদের নীচে ফসলের ক্ষেতে এসে দাঁড়াতে পেরেছি। গা থেকে মাছের জাল সরিয়ে, দূরে ছুড়ে দিয়ে এই ফসলের ক্ষেতে দাঁড়াতে পেরেছি। হয়তো- বা ক্লান্তির জন্যেই তোমাকে একটি প্রেতের মতো লাগছে। হয়তো আমাকেও লাগছে। তবু অবশেষে আমরা যে নমিত চাঁদের নীচে ফসলের ক্ষেতে এসে দাঁড়াতে পেরেছি, তা তো আনন্দের। দ্যাখো, কী অফুরন্ত হাওয়া হচ্ছে আজ। দ্যাখো, ফসলের ক্ষেত কেমন সহর্ষে দুলছে। যে ক’দিন আমরা এ অন্যের পায়ের শব্দকে ভয় পেয়েছি, মাছির মতো উড়ে গিয়েছি আবছায়ায়, অন্ধকারে- আজ এই ফসলের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে চল সেইসব ভুলে যাই। চল, এ অন্যের গাল ছুঁয়ে দেখি। ঘামের বিন্দু ছুঁয়ে দেখি। ছুঁয়ে দেখি আমাদের অবয়ব, এ মুহূর্তে আর করণীয় কী? প্রেত থেকে মানুষে বদলে যেতে হয়তো আমাদের সময় লাগবে। এ কঙ্কালে লতাপাতা পেঁচিয়ে উঠতে সময় লাগবে। ততক্ষণ যারা হাতে লণ্ঠন নিয়ে আমাদের খুঁজতে আসবে, চল তাদের কথা বলি। তারা হয়তো কোথাও নৌকো থেকে নেমে পড়েছে পাড়ের কাদায়। কাদায় তাদের পদচ্ছাপ দেখে হয়তো কোনো অলংকরণের কথা মনে পড়বে। এ-ও এক অনিত্যের আশ্চর্য নিয়ম। তারা আসবে সাপ ও বাঘের দেশ পেরিয়ে অথচ কেউ অদৃশ্য হবে না। কারও কাঁধের গামছা পড়ে থাকবে না ঘাসে। কারও একাকী চপ্পলে এসে বিদগ্ধ জোনাকিরা বাসা করবে না। এ-ও এক অনিত্যের আশ্চর্য নিয়ম
আহ, কী অফুরন্ত হাওয়া হচ্ছে। এমন হাওয়ার মধ্যে, এই ফসলের ক্ষেতে চাইলে তুমি আমি বহুদিন পর মিলিত হতে পারি। কতদিন তোমাকে স্পর্শ করিনি। তোমার স্তনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর কীভাবে আরও বিচ্ছেদ আসে- তা নিয়ে গল্প করিনি। গল্প শব্দটি এখানে এভাবে হয়তো বলা অনুচিত, তবু বললাম। একদা তোমার আমার গল্প শব্দটি ভীষণ অপছন্দের ছিল। যেন তা ব্যক্তিগত পৃথিবীর দৈন্য মনে করায়। কাঁটাতার মনে করায়। এসো, এসো মিলিত হই। তুমি তোমার খসখসে আঙুলগুলি দিয়ে আমার পিঠ আঁকড়ে ধর। আমি ভাঙা একটি সাঁকোর মতো তোমার শরীরে খসে পড়ি। আজ এই ফসলের ক্ষেতে এভাবেই হোক। আগেই বলেছি, প্রেত থেকে সুদৃশ্য মানুষে বদলে যেতে হয়তো আমাদের সময় লাগবে। সময় লাগবে মজবুত পেশী ও ভাবনায় পঙ্খের কাজ ফিরে পেতে। মানুষের ইতিহাস এমনই ইতিহাস। যারা হাতে লণ্ঠন নিয়ে আমাদের খুঁজতে আসবে, তারা সব এই ইতিহাসের কুশীলব। আজ এই ফসলের ক্ষেতে, এমন অফুরন্ত হাওয়ার মধ্যে তুমি হয়তো না- ও ভাবতে পার কিন্তু আমি ভাবছি গায়ে মাছের জাল এসে পড়ার আগে আমরা পাহাড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতাম। জানালায় দাঁড়াতাম পাশাপাশি। তোমার চুল উড়ত নক্ষত্রের গা ঘেঁষে। আমাদের প্যাগোডার মতো একটি বাড়ি ছিল। ছিল একটি সিংহের পায়া- দেওয়া আলমারি। তাতে ঠাসা ছিল তোমার আমার পোশাক আর শষ্য ও আত্মার অসংখ্য টুকরো
স্থপতি
দেখ, পাখিটি নিশ্চুপ হয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। পাখিটিকে আমরা কোনোদিন এর আগে দেখেছি কি? মনে পড়ে না। এমন নিকষ কালো পাখি এর আগে কোনোদিন এভাবে জানালার সহোদর গাছটিতে উড়ে এসে বসেনি। তোমার দিকে এভাবে নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকেনি। তুমি গালের ব্রণের রূপ আয়নায় দেখে শুকনো পোশাক নিয়ে বাথরুমে যাবে। খুট করে একটু শব্দ হবে ছিটকিনি তোলার। দরজার বাইরে কতগুলি ডলফিন জল থেকে লাফিয়ে উঠে স্থির হয়ে যাবে। বারান্দার অপরূপ গ্রিলে দোল খাবে কুমারি লতা। দড়িতে শুকোতে দেওয়া তোমার সোনালি মোড়কের মতো ব্রা হাওয়ায় উড়বে। কালো অচঞ্চল পাখিটি এইসব একমনে লক্ষ্য করে যাবে। একবারও ডেকে উঠবে না সঙ্গিনীর খোঁজে। পরমাত্মার মতো শুধু নিশ্চুপে লক্ষ্য করে যাবে। নিভৃত বাথরুমে তখন কল থেকে হিরন্ময় জল খসে পড়ছে। তোমার স্তনে অসংখ্য পাতার মতো সাবানের ফেনা। তোমার বোজা চোখের মধ্যে এক দীর্ঘতনু ঈশ্বর। তোমার একটি হাত এঁকেবেঁকে পৌঁছে গেছে যোনিফুলে। সেই নিকষ কালো পাখি এই রমণীয় দৃশ্যটি কিন্তু দেখতে পাবে। দেখতে পাবে সিঁড়িতে তোমার আমার চপ্পলগুলি পাশাপাশি ভেসে আছে। ঘরের মেঝেয় আমার কিছু পরিত্যক্ত খোলস, হাড়গোড়
আমি হয়তো তখন একটি সাপ হয়ে একটি গাছের বাকল বেয়ে উঠছি আকাশের দিকে। আকাশ তখন পরিপূর্ণ নীল। গির্জার ঘণ্টার মতো সে আকাশে একটি সূর্য। সময়ে সময়ে তা ঢং ঢং করে বেজে উঠে মানুষকে তার জীবনধর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় লোহার খাঁচার মতো সংসার, তাতে কিছু ছায়ামূর্তি পাহাড়ি খাদের মতো হাঁ করে আছে। মনে করিয়ে দেয়, গাছের যে কোটরে খাদ্য, তা এখন আমার থেকে মাত্র কয়েকহাত দূরে। মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীতে পাপপুণ্য সবই লতিয়ে ওঠে ভাল থাকার দিকে। যে রমণীয় দৃশ্যটি বাথরুমে রেখে তুমি এখন নির্ভার হয়ে বেরিয়ে আসবে, গোল গোল ফুলের একটি পোশাক শরীরে গলিয়ে ফের একবার আয়নায় দাঁড়াবে, কিছু একটা মনে করে দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরবে- তা কিন্তু নিষ্পলক চোখে লক্ষ্য করবে সেই যে পরমাত্মার মতো অচঞ্চল পাখি। সন্ধ্যের পর যখন আমি একটি ইঁদুরের দেহ মুখে করে এনে দরজায় ঘা দেব, কাছির মতো আমার দেহ পড়ে থাকবে খানিকটা উঠোনে, খানিকটা লতাগুল্মে, তখন সেই নিকষ কালো পাখিটি ডানা ঝাপটে উড়ে যাবে। তুমি স্মিত মুখে দরজা খুলে দেবে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত আমি মুখের ইঁদুরটিকে থপ করে ফেলে বিছানায় পড়ে সংজ্ঞা হারাব। তুমি ওপরে তাকাবে
দেখবে আকাশের ছিদ্র দিয়ে সেই ঈশ্বর ফিরে চলেছেন। তাঁর কাধে সেই নিকষ, কালো, অচঞ্চল পাখিটি
বারান্দা
যেন আমার পেছনে এসে দাঁড়াচ্ছ না তুমি। ভারী শাড়ির উসখুস ও চাপা সুগন্ধে ছোট ছোট ঢেউ তুলছ না কালো হাওয়ায়। এ বারান্দা থেকে আকাশের অনন্ত নক্ষত্রগুলি দেখা যায়, দেখা যায় সমতল পৃথিবীর পথবাতিগুলি। দেখা যায় পিঁপড়ের মতো অসংখ্য চলমান মানুষ। তারা একটি অলীক টিলার চূড়োয় উঠছে। আমি একা এই বারান্দার অন্ধকার থেকে এইসব দেখি। কোনো স্মূতি বা কোনো ভাবনা পিছু নেয় না আমার। আমি হাতের মৃতপ্রায় চায়ে চুমুক দিই আর টের পাই আমার পোশাকের খোলে আমার শরীর খাটো একটি গাছের মতো স্থির হয়ে আছে। কালো হাওয়া তার কৌশলে একধরনের টুংটাং শব্দ তুলছে কোথাও। হয়তো আমার পেছনে যে দরজা, তার গায়ে ঝিনুক- শঙ্খের অলংকার আছে। মাথায় ক্ষুদ্র কোনো মাঙ্গলিক ঘণ্টা আছে। মানুষের প্রত্যাশা কত বড়ো বড়ো দৈর্ঘ্য নিয়ে পাহাড়ে- মাটিতে দৈব ড্রাগনের মতো ওড়ে! তুমি আমি হয়তো এখনো নিকটে আসিনি। হয়তো- বা সেভাবে আর আসবও না। আমি দরজার এপারে এমন অন্ধকার বারান্দায় খাটো গাছের মতো একাকী দাঁড়িয়ে থাকব। আকাশের নক্ষত্র দেখব, সমতলের পথবাতিগুলিকে বীতস্পৃহ হয়ে জ্বলতে দেখব আর দেখব পিঁপড়ের মতো অসংখ্য মানুষ কেমন এ ওর পিঠ বেয়ে অলীক টিলার চূড়োয় উঠে যাচ্ছে। এ দৃশ্যে তুমি হয়তো ঝর্ণার মতো হেসে উঠতে কিন্তু এই নীরব, অন্ধকার বারান্দায় তুমি নেই দেখে কেউ- ই হেসে উঠছে না। শুধু কালো হাওয়া তার কৌশলে একধরনের টুংটাং শব্দ তুলছে কাছেই কোথাও
তুমি আছ দরজার ওপারে। বর্তুল আলোর মধ্যে। হয়তো বসে বসে সংলগ্ন বাথরুমটির দিকে তাকিয়ে রয়েছ। হয়তো আমারই মতো তুমিও কল্পনায় দেখছ আকাশের অনন্ত নক্ষত্রজগৎ, সমতলে পথবাতির আলো আর তৃপ্ত, সুখী মানুষের ঢল। এইসব মানুষের ঢল পিঁপড়ের মতো উঠে যাচ্ছে না কোনো অলীক টিলার চূড়োয়। সংঘাতে উল্টে পড়ছে না। এরা এক সরোবরের তীরে অথবা প্রচ্ছন্ন সমুদ্রের ধার ঘেঁষে হাটছে। জল এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তাদের নগ্ন পা বা পোশাক। তুমি কল্পনায় দেখছ। অন্যরকম একটি ড্রাগনের মতো তোমার একটি গাঢ় নিঃশ্বাস পাঁজর থেকে বেরিয়ে আলোর দিকে উড়ে যাচ্ছে কী? আমি একা এই নীরব অন্ধকার বারান্দায় কখনো দু- এক পা হাঁটি। হাতের মৃতপ্রায় চা শেষ। শূন্য কাপ রেখে দিই কোথাও। তোমার আমার তেমন দূরত্ব কোথায়? একটি মাত্র গায়ে ঝিনুক- শঙ্খের গহনা দেওয়া দরজা। এটুকুই তো দূরত্ব। তুমি চাইলে অনায়াসে পুরু বিছানা ছেড়ে উঠে আলনা থেকে টেনে নিত পার জংলা ছাপের একটি ভারী শাড়ি। দাঁড়াতে পার আয়নার সামনে। ওড়া পাতার মতো সুগন্ধ তোমার অন্ধকারে, দুর্গমে ছড়িয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসত পার দরজা পেরিয়ে। এসে দাঁড়াতে পার আমার পেছনে। তুমি জান, আমার পেছনে তুমি এসে দাঁড়ালে আমি স্বয়ম্প্রভ হয়ে যাই। আমার শরীর যেন স্ফটিকের মতো হয়ে যায়। কত ছোট ছোট ঢেউয়ে কালো যে হাওয়া সকলের থাকে, তা দুলে ওঠে। তখন আকাশের অদ্ভুত একটি নক্ষত্র পৃথিবীর অত্যন্ত কাছে এসে পড়ে



