জানালার ধারে

forgotten library at twilight

শহরের পুরোনো অংশে লাইব্রেরিটা ছিল ঠিক যেমন কিছু মানুষ হয়—চোখে পড়ে না, কিন্তু হারিয়ে গেলে শূন্যতা তৈরি করে ঠিক তেমনই। একেবারে নির্জন স্থানে , বড় রাস্তার কোলাহল থেকে একটু ভিতরে ঢুকে, ভাঙা ফুটপাথ পেরিয়ে, একটা পুরোনো লোহার গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে হত। গেটটা খোলার সময় হালকা শব্দ হয়—যেন আগেই জানিয়ে দিত, ভেতরে ঢুকে কথা বলতে হবে কম, ভাবতে হবে বেশি।
লাইব্রেরির ভেতরে আলো কম ছিল না, কিন্তু তীব্রও নয়। বিকেলের দিকে জানালার কাঁচ ভেঙে যে আলো ঢুকত, সেটা চোখে লাগত না—মনে লাগত। সেই আলোয় বসে মানুষ শুধু বই পড়ত না, নিজের সঙ্গেও কিছুটা সময়ও কাটাত।
অরুণ প্রথম দিন লাইব্রেরিতে ঢুকে খুব সাধারণভাবেই বসেছিল। তার কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল না। অফিসের কাজ শেষ করে হঠাৎ মনে হয়েছিল—আজ বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না তার। জানালার ধারে একটা চেয়ার খালি দেখে সে বসে পড়ে সেখানে। ব্যাগ থেকে বই বের করলেও, পাতার শব্দ ছাড়া তার মন তখনও বাইরে রয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই নীলা ঢুকেছিল সেখানে। প্রথমে তারা কেউ কাউকে “দেখেনি”—এই কথাটাই সত্যি নয়। তারা দেখেছিল। শুধু নাম দেয়নি। অরুণ নীলাকে প্রথম নোটিশ করে, কারণ নীলা অন্যদের মতো পড়ে না। সে বইয়ের ভেতর ঢুকে পড়ে। পাতার পর পাতা উল্টে গেলেও তার মুখের ভঙ্গি বদলায় না। যেন সে পড়ছে না—থেকে যাচ্ছে। অরুণ নিজের অজান্তেই বুঝে ফেলে, এই মেয়েটা বই ব্যবহার করে নিজের সঙ্গে কথা বলে। সেই অভ্যাসটা তার নিজের খুব চেনা। নীলা অরুণকে প্রথম নোটিশ করে, কারণ অরুণ বই পড়ার মাঝেও জানালার দিকে তাকায়। সে বাইরে কিছু খোঁজে না—শুধু আলোটা দেখে। নীলার মনে হয়, এই মানুষটা বাস্তবের মধ্যে থেকেও কোনও একটা অসম্পূর্ণ জায়গা বয়ে নিয়ে চলছে। সে জানে, এমন মানুষ কথা বলার আগেই চোখে পড়ে। তারপর ছোট ছোট বিষয়। অরুণ খেয়াল করে—নীলা কখনও তাড়াহুড়ো করে না। নীলা খেয়াল করে—অরুণ কখনও বইয়ের শেষ পাতায় হঠাৎ পৌঁছে যায় না। এই খেয়াল করাগুলো কৌতূহল থেকে আসেনি।এসেছে মিল থেকে। দু’জনেই বুঝেছিল—এই টেবিলে বসে থাকা আরেকজন মানুষটা নিজের মতো করেই অসম্পূর্ণ,আর সেই অসম্পূর্ণতার ভাষাটা অদ্ভুতভাবে পরিচিত। তাই তারা একে অপরকে নোটিশ করে। প্রেমের জন্য নয়। প্রথমে শুধু—নিজেকে চিনতে পেরে। নীলা’র বয়স প্রায় সাতাশে’র কাছাকাছি। শহরের একটি সরকারি স্কুলে বাংলা পড়ায়। পড়ানো তার পেশা, কিন্তু লেখা তার অভ্যাস। সে বিশ্বাস করে—সব কথা বলা যায় না, কিছু কথা শুধু লিখে ফেলতে হয়, না হলে ভেতরে জমে থাকে। নীলার জীবন খুব নাটকীয় নয়। ছোট একটা ভাড়া বাড়ি, বইয়ের তাক, জানালার ধারে একটা টেবিল—এই নিয়েই তার দিন কাটে। সে বেশি কথা বলে না, কারণ সে জানে—সব কথা বললে শব্দের মূল্য কমে যায়। নীলা খুব জোরে হাঁটে না। তার চলার ভেতর একধরনের সাবধানতা আছে—যেন সে জানে, এই পৃথিবীতে সব জায়গায় সমানভাবে থাকা যায় না। লাইব্রেরির দরজা খুলে সে একটু থামকে দাঁড়ায়, চারদিকে তাকায়, তারপর জানালার উল্টো দিকের চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়ে। দু’জনের মাঝখানে ছিল একটা পুরোনো কাঠের টেবিল। টেবিলটার গায়ে ছিল বহুদিনের আঁচড়, কালি দাগ, কফির গোল চিহ্ন। যেন সে বহু গল্প শুনে ফেলেছে,আর এখন সে কোন কিছুতেই অবাক হয় না। প্রথম দিন তারা কেউ কারোর সাথে কথা বলেনি। দ্বিতীয় দিনও না। তৃতীয় দিনের বিকেলে অরুণ যখন কথা বলবে বলে ঠিক করে তখন দেখে নীলা বই পড়ার সময় আঙুল দিয়ে লাইনের নিচে হালকা চাপ দেয়। খুব সাবধানে, যেন শব্দগুলো পালিয়ে না যায়। অরুণ নিজেও জানত না কেন এই ছোট্ট ব্যাপারটা তার চোখে পড়ল। একই দিনে নীলা বুঝে ফেলল—অরুণ পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে জানালার বাইরে তাকায়। তখন তার চোখে কোনও তাড়া নেই, কোনও লক্ষ্যও নেই। শুধু আলোটা যেন তাকে কিছু মনে করিয়ে দেয়। কথা হল না। তবু দু’জনেই বুঝে গেল—এই নীরবতা অস্বস্তিকর নয়। দিনের পর দিন তারা একই সময়ে আসতে লাগল। লাইব্রেরির কর্মচারীও খেয়াল করত—দু’জনেই একই টেবিলের আশেপাশে বসে। রেজিস্টারে নাম দুটো প্রায় পাশাপাশি লেখা হত। কালি শুকিয়ে গেলে মনে হত, নাম দুটো আরও কাছাকাছি সরে এসেছে। অরুণ বুঝতে শুরু করল—নীলা খুব বেশি কথা বলে না। কিন্তু সে যখনই বই বন্ধ করে ব্যাগে রাখে, তার মুখে একটা ক্লান্তি আসে—যেন বইয়ের ভেতরের জীবনটা ছেড়ে বাস্তবে ফিরতে তার ভালো লাগে না।

নীলা বুঝতে শুরু করল—অরুণ মানুষটা বাইরে থেকে খুব সহজ। কিন্তু তার ভেতরে কিছু কথা আছে, যেগুলো সে নিজেও ঠিকমতো বলতে জানে না। অরুণের বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে। কাজটা সে খারাপবাসেও না, ভালোবাসেও না—শুধু করে যায়। কলেজে পড়ার সময় সে লেখালিখি করত, কবিতা নয়, ছোট ছোট গদ্য—যেগুলো কাউকে দেখানো হয়নি কখনও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে শিখে গেছে, দায়িত্ব আর স্বপ্ন একসঙ্গে সবসময় হাঁটে না। জানালার ধারে বসে থাকা, আলো দেখতে থাকা—এই অভ্যাসগুলো তার তখনও যায়নি। দু’জনের জীবনেই কোনও বড় অভাব ছিল না। আবার কোনও বড় পূর্ণতাও ছিল না।
এইখানেই তারা একে অপরকে চিনেছিল—
অভাবের জন্য নয়,পূর্ণতার আশাতেও নয়, শুধু নীরবতার ভেতরে পরিচিত হয়ে ওঠা দু’টি মানুষের মতো। একদিন বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। অপ্রস্তুতভাবে। বাইরের রাস্তা ভিজে গেল, লাইব্রেরির ভেতর আলোটা আরও নরম হয়ে এল। নীলা উঠে দরজার দিকে যেতে যাচ্ছিল। তখন অরুণ প্রথম কথা বলল—“বৃষ্টি থামা পর্যন্ত বসবেন?”নীলা থামল। এক মুহূর্ত। তারপর মাথা নাড়ল। এইটুকুই। সেদিন তারা একসাথে বৃষ্টি দেখল। কথা হল খুব কম। কিন্তু সেই কম কথার ফাঁকে ফাঁকে একটা অদ্ভুত স্বস্তি ছিল। যেন বহুদিনের চেনা কাউকে পাশে পেয়ে গেছে। এরপর কথা বাড়ল ধীরে ধীরে। কখনও বই নিয়ে। কখনও লেখালিখি নিয়ে। কখনও একেবারেই কিছু না নিয়ে। অরুণ বলল,” সে ছোটবেলায় অনেক কিছু লিখতে চেয়েছিল, কিন্তু চাকরি আর দায়িত্বের ভিড়ে সেটা আর হয়ে ওঠেনি।” নীলা তার উত্তরে বলল ,”সে এখনও লেখে, কিন্তু কাউকে পড়তে দেয় না—কারণ লেখা একবার পড়ে ফেললে, সেটা আর পুরোপুরি নিজের থাকে না। “একদিন নীলা অরুণকে নিজের লেখা পড়তে দিল। খুব ছোট একটা গল্প। অরুণ পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল—”এই গল্পে কেউ কাউকে ধরে রাখে না। তবু ছাড়তেও পারে না।”নীলা সেদিন কিছু বলেনি। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেখা হওয়াটা যেন অভ্যাসে পরিণত হল। অরুণ বুঝে গেল—নীলা খুব কম হাসে, কিন্তু হাসলে চোখের কোণে আলো জমে। নীলা বুঝে ফেলল—অরুণ সবকিছু সহজভাবে মেনে নেয়, শুধু নিজের অনুভূতি ছাড়া। একদিন অরুণ বলল,“আমরা কি লাইব্রেরির বাইরে কোথাও যাব?”নীলা একটু ভেবে বলেছিল,
“ভালোবাসা কি বাইরে গেলেই টেকে?”এই প্রশ্নটার উত্তর অরুণের কাছে ছিল না। তারপরই খবর এল—লাইব্রেরি বন্ধ হবে। জায়গাটা ভেঙে নতুন বিল্ডিং উঠবে। খবরটা যেন হঠাৎ করে বাস্তবকে টেনে আনল। এতদিন তারা যে নীরবতার ভেতর নিজেদের গুছিয়ে রেখেছিল, সেটা ভেঙে যেতে শুরু করল যেন। শেষ কয়েক দিন তারা আগের চেয়ে বেশি সময় বসত। কম কথা বলত। যেন জানত—এই মুহূর্তগুলো আর ফিরবে না। শেষ দিনের বিকেলে জানালার আলো আগের মতোই ছিল। কিন্তু ভেতরের নীরবতা আর আগের মতো শান্ত ছিল না। অরুণ বলল,”এরপর কী হবে?”নীলা বলল,
“এরপর আমাদের আলাদা করে বাঁচতে হবে।” তারা জানত—এই প্রেম অভ্যাসে বেঁচেছিল। হঠাৎ বাস্তবের সামনে পড়লে, সে নিজের জায়গা খুঁজে পায় না। লাইব্রেরি বন্ধ হল। দিন চলল। নীলা ও অন্য পাড়ায় চলে গেল ।লেখালিখি চালিয়ে গেল। কিছু লেখা ছাপা হল, কিছু হারিয়ে গেল। অরুণ চাকরির কারণে শহর বদলাল। জানালার ধারে বসার অভ্যাসটা তবু গেল না। তারা যোগাযোগ রাখেনি। ইচ্ছে করেই নয়—স্বাভাবিকভাবেই। তিন বছর পর, এক বইমেলায় তারা আবার মুখোমুখি হয় হঠাৎই। ভিড়ের মধ্যে প্রথমে কেউ কাউকে চিনতে পারেনি। তারপর বইয়ের ষ্টল ঘুরতে ঘুরতে নীলার চোখ পড়ে অরুণের দিকেI তখন দেখে
হাতে ধরা বইটার ওপর। সেই একই লেখক। অরুণ ও নীরা’র চোখাচোখি হয়। অরুণ তাকিয়ে দেখল—নীলার আঙুলের ভঙ্গি বদলায়নি। তারা হাসে না একে অপরকে দেখে। চমকায় ও না।
অরুণ প্রশ্ন করে,”ভালো আছ?”নীলা মাথা নাড়ল।“আছি।”তারা একসাথে চা খেল। কথা কম, স্মৃতি বেশি। বিদায়ের সময় অরুণ বলল,
“আমরা যদি তখন একটু সাহসী হতাম—”
নীলা থামিয়ে দিল।“আমরা তখন ঠিক যতটা দরকার ছিল, ততটাই ছিলাম।”তারা আলাদা পথে হাঁটল। ভালোবাসা সব সময় একসাথে থাকার নাম নয়। কিছু প্রেম মানুষকে বদলায়, কিন্তু ধরে রাখে না। কিছু প্রেম জানালার আলোর মতো—থাকে, ছুঁয়ে যায়, কিন্তু ধরা যায় না। অরুণ আর নীলার প্রেমও তেমনই। নীরব। কিন্তু সম্পূর্ণ।

আলাদা হয়ে যাওয়ার পরেও, কিছু কিছু বিকেলে নীলার মনে হত—কেউ যেন জানালার ধারে বসে আছে, বই খোলা, চোখ আলোয় আটকানো। অরুণও অনেক সময় বুঝতে পারত না, কেন কোনও কোনও বিকেলে কফির কাপটা নামিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে, অর্ধেক ভরা অবস্থাতেই। তারা আর একে অপরের জীবনে নেই—এই সত্যিটা পরিষ্কার। তবু কিছু স্মৃতি সম্পর্কের চেয়ে দীর্ঘজীবী হয়। তারা ঠিক সেটুকুই হয়ে রইল—একটা সময়, একটা আলো, একটা টেবিল। যে প্রেম পাওয়ার ছিল না, কিন্তু হারিয়েও যায়নি।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top