পাত পেড়ে না ঠ্যাং নেড়ে—
সত্যবাবুর বাড়িতে শুম্ভ নিশুম্ভের লড়াই বেধেছে। মেয়ের বিয়ের দিনধরা হয়ে গেছে, হেঁচোড়তি প্যাঁচোড়তি করে বিয়ে বাড়ির জোগাড়ও হয়েছে, এবার গোল বেধেছে ভোজবাজিতে; পাত পেড়ে টেবিল-চেয়ারি আথিতেয়তা না টেবিল সাজিয়ে ওঁ ব্যুফেনং নমঃ। সত্যবাবু এক কথার মানুষ। তিন ছেলের কোলে একমাত্র মেয়ে বুঁচকির বিয়েতে লোক নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে খাওয়ানোর নামে ওই বুফের ধাষ্টামো তিনি করতে পারবেন না। ছেলে-বৌ-মারা বেজায় নারাজ, ওসব সেকেলে পাত-পেড়ে খাওয়ানোর সাবেকি নষ্টামির কালচারে তাদের বেজায় আপত্তি। স্টেজে তারা মেয়ে-জামাই নিয়ে সাজুগুজু করে হুলো-মালা করবে। লোকে লাইন দিয়ে এসে মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে সেলফি, দুলফি, গ্রুপি তুলে হুল্লোড়ে মাতবে। তারপর যে যার মতো সাজানো ফুড কোর্টে গিয়ে চুরুক-চারুক কিংবা হুড়ুক-হাড়ুক যা ইচ্ছে খাক বা না খাক, তা অতিথির দায়; এটাই আধুনিক দস্তুর। তা নয় লাইনে লাইনে ঘরো রে, হাত জোড় করো রে ‘অতিথি দেব ভব’ করো রে; খাও অথবা আমার মাথা খাও গোছের চোখ-মুখ নিয়ে পাতা থেকে পাতান্তরে ঘোরা— আর এই জামানায় পোষায় না।
সে সব নিয়েই গোলমাল। এই ফাঁকে চলুন আমরা পাত পেড়ে আর বুফের ইকোনমিক্সের দিকে নজর ফেরাই। আমার এক পরিচিত ক্যাটারারের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম যে সাবেকি পাত-পেড়ে খাওয়ানোর পরিবর্তে ক্যাটারিং ও হসপিট্যালিটি ম্যানেজমেন্ট-এর নামে যা যা তরিকা আমদানি ঘটানো হয়েছে, আদতে তা হল সুকুমার রায়ের “খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না”-র আধুনিক সংকরণ। ব্যাপারটা একটু ভেঙেই আলোচনা হোক। যে-কোনো ভোজের মেনুতেই কিছু খাস আইটেম থাকে আর বেশির ভাগই আম আইটেম। ‘খাস আইটেম’-এর মধ্যে পড়ে মাছ ও মাংসের বিভিন্ন পদ এবং ‘আম আইটেম’ হল গিয়ে লুচি-কচুরি থেকে নান কিংবা বেবি নান হয়ে চাটনি-পাঁপড় ইত্যাদি।
ক্যাটারিং-এ এই প্লেট-প্রতি মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে খাস আইটেম-রকমসকমই মূল সূচক ও মূল্যনির্ধারক হিসেবে কাজ করে। পাত-পেড়ে চেয়ার-টেবিলি আথিতেয়তার ব্যাপার হলে মোট গেস্ট × ১.৫ ধরে ক্যাটারাররা খাস আইটেম-এর হিসাব ধরেন। প্রত্যেক পাতেই ওই আইটেম দিতেই হয়, আবার কেউ কেউ রিপিট চান। এটা পিক কিংবা অফ-পিক আওয়ারে, সবসময়ই গেস্টরা যেহেতু বসে পাত পেড়ে খান, তাই তাঁদের পাতে দেওয়াটা ক্যাটারারদের দায়ের মধ্যেই পড়ে।
অন্যদিকে বুফের ইকোনমি চলে ভিন্ন তালে। ‘অফ-পিক’ আওয়ারে যদিও বা গেস্টরা পছন্দের খাস আইটেম রিপিটের সুযোগ পান, ‘পিক আওয়ারে’ খাস আইটেম-এর টেবিলগুলোর সামনে এরকম বুথ জ্যাম হয়ে যায় যে হুল্লোড়ে নাছোড়বান্দারা ছাড়া অনেকেই ওদিকে ঘেঁষতেই পারেন না। তার উপর ওই আধ-সেরি চিনেমাটির প্লেট হাতে ধিনিকেস্ট সেজে হাঁটি হাঁটি পা পা করে—অর্থাৎ ঠ্যাং নেড়ে জুত করে—আর যা-ই হোক, পেটপূজো হয় না। বুফেতে দু-চারটি টেবিল-চেয়ার থাকে বটে, তবে তা না থাকারই নামান্তর। সে টেবিল আবার এমন ভাবে ভুক্তাবশেষে ভাগাড় হয়ে থাকে যে পিক আওয়ারে সেখানে বসে খাওয়ার কথা সুস্থ লোকে ভাবতেই পারে না।
এই নিয়েই কথাবার্তা বলছিলাম এলাকার এক নামজাদা ক্যাটারারের সঙ্গে। “বিশ্বাস করেই বলছি ভাই, পাঁচ কান করো না”-গোছের মুখ নিয়ে ভাঁড়ারের গোপন কথাটা জানালেন। খাস আইটেম বুফের বেলায় নাকি ধরা হয় গেস্ট × ১। পিক আওয়ারের ভিড়ের সময় অনেক নাছোড়বান্দা হুল্লুড়ে পাবলিক খাস আইটেম-টেবিল ঘিরে এইসা তাণ্ডব মচায় যে, অনেক নন-হুজুক পাবলিক আম আইটেম দিয়েই আথিতেয়তা রেখে এলাকা ছাড়েন। তার পর মাঝে মাঝেই দেখা যায় খাস আইটেম-এর বুফে টেবিলের পাত্র পূরণের তোড়জোড়ে মিষ্টি বিলম্ব। সেই বিলম্বে সামনে বাড়তে থাকা ভিড় দেখেও অনেকের খাস আইটেম রিপিটের ইচ্ছে উবে যায়, অন্য কিছু দিয়ে মানিয়ে নেন। সব মিলিয়ে চাহিদা-যোগানের গ্যাপে পকেটে তো কিছু বাঁচে। তবে তা বেশির ভাগ সময়ই ক্যাটারারের, গেরস্ত যা পকেট ওল্টানোর তা আগেই মগলবে উল্টেছে।
কানে কানে আরও তিনি যা জানালেন, বেশ শিহরণ জাগায়। বুফে টেবিলের সামনে নাম-কা-ওয়াস্তা কিছু গোল টেবিল-চেয়ারের ব্যবস্থা থাকে বটে, তবে তা কিছুতেই নিমন্ত্রিতের ২০%-এর বেশি নয়। চেয়ার এদিক-ওদিক দু-চার পিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা রাখা হলেও টেবিল নৈব নৈব চঃ। আধ-সেরি চিনেমাটির প্লেটটার যে মহিমা, ওটাকে ঠেকান দেওয়ার জায়গা কিছুতেই দেওয়া যাবে না, খাওয়া বেড়ে যাবে। ওটা আটকাতেই যে এই হসপিট্যালিটি বিজ্ঞানের আমদানি ভাই; খাওয়ানো হবে, কিন্তু গেলানো যাবে না। সারসকে চেটানো থালায় স্যুপ অফারের শৃগালীয় ধূর্তামি।
আরও একটা তথ্য খোঁজ-পাতায় উঠে এলো। গবেষণা চলছে নিরন্তর, পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। পাত-পেড়ে সাবেকি খাওয়াদাওয়ায় ‘প্রথম পাতে’ বলে একটা ব্যাপার ছিল বাড়াবাড়ি রকমের। সেই প্রথম পাতকে এখন হসপিট্যালিটি বিজ্ঞান মেনে শিফট করা হয়েছে মুখোরোচক স্টলে, যার অনুপানের অন্যতম কাবাব ও ফুচকা। পাবলিকের অর্ধেক আকাশ অর্থাৎ প্রমিলাকূল সেই ফুচকাযাপনেই অর্ধেক আউট, মেন কোর্সে নিতান্তই গাছাড়া ভাব নিয়ে নামেন; উনো কাজে দুনো লাভ। অনেকে কাবাব একটু বেশি টানেন। সে-বাবদেও এই বিজ্ঞান ভেবেছেন কাবাবকে হঠাৎ দেখি স্টল থেকে তুলে সুবেশ, মাথায় পাগড়ি ওয়েটারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সেই কাবাববরদার হেঁটে বেড়াচ্ছেন জমায়েতের অলিগলিতে। স্টলে হলে আপনি পাশে রাখা বাটি ভর্তি করে নিয়ে মনের সুখে কাবাবযাপন করে রিপিটের ধান্দায় আবারও লাইন লাগাতে পারতেন, এখানে কাবাবদানির পাশে রাখা টুথপিকে দু-এক পিস তোলা ছাড়া আপনার গতি নেই। সেটা শেষ করে আপনি পিছন ফিরে রিপিটের জন্য হাত বাড়াতে গিয়ে দেখবেন সতত সঞ্চারমান কাবাববরদা বেশ খানিক দূরে।
নিতান্তই আদেখলা ছাড়া কে আর ভিড়ের মাঝে কাবাব তাড়া করে ফিরবে! অগত্যা বিজ্ঞানেরই জয়, পকেটের সাশ্রয়।
তবে হ্যাঁ, বুফে অর্থাৎ ‘ঠ্যাং নেড়ে’ পদ্ধতির কি সুবিধা কিছুই নেই? আলবৎ আছে, ওয়েটিং টাইম কম। হুড়ো-আমন্ত্রিতদের পক্ষে বেশ ভালো, কতকটা ভিনি-ভিসি-ভিডি-গোছের, অ্যাপিয়ার টু ডিসঅ্যাপিয়ার—অর্থাৎ এলাম, খেলাম, কেটে পড়লাম।
সত্যবাবুদের বাড়িতে লড়াই চলছে চলুক। কী চিন্তায় পড়লেন? সামনে বাড়িতে ভোজ, কী করবেন? পাত পেড়ে না ঠ্যাং নেড়ে? উঁহু, এটাও বুফে করে দিলাম, চয়েস আপনা-আপনা। ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।
ক্রমশ




বেশ ভালো লাগলো।