এইরকমভাবে বাড়িটা ভেঙে পড়বে, কেউ ভাবতেই পারেনি। প্রায় দেড়শো বছর আগের পুরোনো দিনের চুন-সুরকির গাঁথনির বাড়ি। এক বিঘে জায়গার উপর এই বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন শ্যামাশিষ হালদার, দেবাশিষের ঠাকুরদা। তাঁর তখন সবে কন্ট্রাক্টরি বিজনেসে ভাল হাতযশ হয়েছে। শুধু বর্ধমানে নয়, আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় একচেটিয়াভাবে কনস্ট্রাকশনের কাজ করছেন। বর্ধমান শহর তখন পাশ ফিরে শুচ্ছে। খুব দ্রুত বেড়ে চলেছে শহরের পরিধি। গ্রামের মানুষ শহরে বাড়ি তৈরি করে বা পুরোনো বাড়িকে নতুন করে গড়ে শহরে চলে আসছে। অনেকে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ইত্যাদিতে কাজ করতে এসে বর্ধমানকেই বসবাসের যোগ্য ভেবে থেকে যাচ্ছে এই শহরে। শ্যামাশিষ হালদার এই সময়টাকে ধরে ফেলেছিলেন। ফলে তাঁর আর্থিক পরিধিও দ্রুত স্ফীত হয়ে উঠছিল। শহরের বিখ্যাত কৃষ্ণসায়েরের পাশে এই জায়গাটা কিনে মনের মতো করে দোতলা বাড়িটা তৈরি করেছিলেন তিনি। আজকের দিনের দোতলা বাড়ির থেকে অনেক বেশি উঁচু বাড়িটার দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে কৃষ্ণসায়েরের বিস্তীর্ণ জলরাশি চোখে পড়ত।
দেবাশিষ দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার কৈশোর, যৌবনে কত সময় যে কাটিয়েছে তার ঠিক নেই। চাঁদনি রাতে কৃষ্ণসায়েরের জলে যখন চাঁদের আলো পড়ে ঝলমল করত, তখন দেবাশিষ যেন স্বপ্নলোকে চলে যেত। আস্তে আস্তে কৃষ্ণসায়েরের পাড় ঘেঁষে অনেকগুলো বহুতল হয়ে যাওয়ায় বারান্দা থেকে আর সে দৃশ্য পরে দেখা যেত না।
বাড়িটার সামনে একটা বিশাল পোর্টিকো বা গাড়িবারান্দা। একসঙ্গে চারটে গাড়ি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। এক সময় চারটে গাড়িই থাকত। দেবাশিষের বাবা আর দুই কাকার একটা করে গাড়ি। বাড়ির বাকি লোকেদের জন্য একটা। দেবাশিষ নিজে চাকরি করতে দিল্লি চলে যাওয়ার আগেও দেখেছে তার অ্যাডভোকেট বাবা আর দুই কাকাকে তিনটে আলাদা গাড়ি নিয়ে বর্ধমান কোর্টে প্র্যাকটিস করতে যেতে। বাবা দুর্গাশিষ হালদারের তখন ক্রিমিনাল লইয়ার হিসাবে খুব নাম। প্রথম দিকে দুই কাকা সৌমাশিষ আর শিবাশিষ বাবার জুনিয়র হিসাবেই কাজ শুরু করে। পরে অবশ্য দুজনেই আলাদা আলাদাভাবে প্র্যাকটিস করত।
দোতলা বাড়িটায় নীচে ওপরে মিলে মোট আটটা ঘর। নীচে ঘরের সংখ্যা কম। মাত্র তিনটে। সঙ্গে একটা বিশাল ডাইনিং রুম। যতদিন একান্নবর্তী ছিল, ততদিন এই ডাইনিং রুমে দেবাশিষরা একসঙ্গে খেতে বসত। দেবাশিষ বাবা, মা, বড়কাকা, বড়কাকিমা, তুহিনা, ছোটোকাকা, ছোটোকাকিমা আর সৌরাশিষদের সঙ্গে একসঙ্গে এই টেবিলে খেতে বসেছে দিনের পর দিন। নীচের তিনটে ঘরের মধ্যে একটায় ছিল বাবার অফিস। কাকারাও সেখানে প্রথমদিকে বসত। বাকি দুটো ঘরে থাকত দেবাশিষরা। একটা ঘর সম্পূর্ণভাবে দেবাশিষের দখলে ছিল। ওপরের পাঁচটা ঘরের একটা ফাঁকা রাখা থাকত অতিথিদের জন্য। বাকি চারটে ঘরের দুটো করে ঘরে দুই কাকা থাকত। বড়কাকার মেয়ে তুহিনার ঘরেই ওদের তিন ভাইবোনের যত আড্ডা, যত খুনসুটি হত।
আস্তে আস্তে কাকাদের প্র্যাকটিস বেড়েছে। নিজেদের কাজের তাগিদেই তারা কোর্টের কাছাকাছি টাউন হল পাড়ায় জায়গা কিনে বাড়ি করে চলে গেছে। তখন দেবাশিষের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষের মুখে। বাবার শরীর প্রায়ই খারাপ হত। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ভুগত বাবা। কাকাদের মতো তারা অন্য কোথাও বাড়ি কিনে বা তৈরি করে চলে যায়নি। এত বড় বাড়িটায় তারা তিনটে প্রাণী বসবাস করত। বাবা বলত— বাবার হাতে গড়া এই ঘর। এটা আমার কাছে ইঁট-কাঠ-পাথরের কোনো বাড়ি নয়, এটা আমার ঘর। স্বর্গতুল্য। তখন দেবাশিষ বাড়ি আর ঘরের পার্থক্য বুঝত না। বুঝত না, সব বাড়ি ঘর হয়ে উঠতে পারে না।
ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে সে যখন চাকরি নিয়ে দিল্লি চলে গেল, তখনও বাবার শরীর খুব খারাপ। বাবা বারবার বলেছিল— কী দরকার এত দূরে যাওয়ার? এখানেই কিছু না কিছু পেয়ে যাবি ঠিক। দেবাশিষ বলেছিল— এখানে এত ভাল সুযোগ পাব না বাবা। ওখানে জয়েন করি। এক্সপেরিয়েন্স বাড়ার পর এখানে ভাল অফার পেতে পারি। তখন না হয় চলে আসব। বাবা হেসে বলেছিল— দ্যাখ ভেবে। তবে কী জানিস, প্রবাসে থাকার একটা নেশা থাকে। তা থেকে মুক্তি পাওয়া খুব কঠিন।
দেবাশিষ দিল্লিতে চাকরি নিয়ে চলে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল, ওখানে জয়েন করে খুব তাড়াতাড়ি একবার ফিরে আসবে। বাবা-মার সঙ্গে দু-এক দিন কাটিয়ে তারপর আবার চাকরিতে ফিরে যাবে। তা আর হয়নি। মাস তিনেক পরে বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিল। বাড়ি ফিরতেই মায়ের তাকে জড়িয়ে ধরে সেই কান্না আজও মনে পড়ে। মা বলেছিল— তোর বাবা বার বার বলত, ছেলেটা আর ফিরবে না, দেখো তুমি। ও আর ফিরবে না। মায়ের আবেগটা অনুভব করতে পেরেছিল দেবাশিষ। বাবার জন্য তার কি বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়নি? একটা অপরাধবোধে যে সে শেষ হয়ে যাচ্ছে! সেই এল বাড়িতে, আর কয়েকদিন আগে কেন এল না? তাহলে বাবা অন্তত আক্ষেপ নিয়ে মারা যেত না! সারাজীবন তাকে এই অপরাধবোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
বাবার পারলৌকিক কাজ সাঙ্গ করে মাকে নিয়ে দিল্লি ফিরে গিয়েছিল দেবাশিষ। দিল্লি যাওয়ার আগে দেবাশিষ তুহিনা আর সৌরাশিষের সঙ্গে বাড়ি নিয়ে আলোচনা করেছিল। কেউ না থাকলে, দেখাশোনা না করলে যে বাড়িটা নষ্ট হয়ে যাবে, তাতে কারোরই সন্দেহ নেই। তখনই বাড়িটার অনেক জায়গা থেকে চাপড়া খসে পড়ছে। ঘরে আলো-বাতাস না ঢুকলে এমনই হয়। কিন্তু মুশকিল হল, কে দেখাশোনা করবে? তুহিনা আর সৌরাশিষকে বলেছিল দেবাশিষ—মাঝে মাঝে একবার করে এসে সব ঘরের জানলা-দরজাগুলো খুলে দিস। ঘরে আলো, বাতাস না ঢুকলে ঘর নষ্ট হয়ে যায়। সৌরাশিষ বলেছিল—ঠিকই বলেছিস। তবে আসাটাই তো মুশকিল। কলকাতা থেকে শুধু এই কাজের জন্য আসা যায় বল? তুহিনা আর সৌরাশিষ দুজনেই তখন মেডিকেলের স্টুডেন্ট। তুহিনা আরজি করে আর সৌরাশিষ এনআরএসে। তুহিনার ফাইনাল আর সৌরাশিষের থার্ড ইয়ার। ওদের পক্ষে সত্যিই কলকাতা থেকে আসা মুশকিল। তুহিনা একটা উপায়ের কথা বলেছিল—দাদা, তুই বরং বাবা আর কাকাকে একবার বলে যা। ওদের অনেক চালাচামুণ্ডা আছে। তাদের পাঠিয়ে কাজ করিয়ে নেবে।
দেবাশিষ বড়কাকাকেই বলেছিল।—তুমি কাউকে একটু বলে রাখো না বড়কা। বাড়িটা নাহলে নষ্ট হয়ে যাবে।
—তুই চিন্তা করিস না। আমি কাউকে না কাউকে মাঝে মাঝে পাঠিয়ে দোব।
বড়কাকা ব্যবস্থা করবে বলেছিল। কিন্তু আদতে যে তা হয়নি, তা বাড়ি ভেঙে পড়া দেখেই বোঝা যায়। ছোটকা অবশ্য অন্য একটা প্রস্তাব দিয়েছিল। জায়গা সমেত বাড়িটা কোনো প্রমোটারকে দিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল।
—এখন বর্ধমানেও ফ্ল্যাট কালচার চালু হয়েছে। বাড়িটা ভেঙে প্রমোটার বিল্ডিং তৈরি করার দায়িত্ব নেবে। যতগুলো ইউনিট হবে, তা ফিফটি-ফিফটি ভাগ হবে। মানে, যদি দশটা ফ্ল্যাট হয়, তাহলে পাঁচটা আমাদের। এবারে আমরা তা নিজেদের জন্য রাখতে পারি, আবার বিক্রিও করে দিতে পারি।
দেবাশিষের মা আর বড়কাকা পত্রপাঠ সে প্রস্তাব খারিজ করেছিল। মা বলেছিল— আমাদের এমন কিছু দুরবস্থা হয়নি ছোটদা যে, বাস্তু বিক্রি করতে হবে। বাস্তু বিক্রি করা মানে বাড়িতে অশান্তি ডেকে আনা। ওসব চিন্তাভাবনা মাথায় এনো না। বড়কা মাকে সাপোর্ট করেছিল। ব্যাপারটা তখনকার মতো ধামাচাপা পড়েছিল।

দিল্লিতেই খবরটা পেয়েছিল দেবাশিষ। পাড়ার মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ফোন করে তুহিনাকে জানিয়েছিল। তুহিনা এখন বর্ধমানেই প্র্যাকটিস করে। গাইনোকোলজিতে এমডি করে চাকরি না নিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নেমে পড়েছে সে। তার হাজব্যান্ডও ডাক্তার। বর্ধমানের বিখ্যাত নিউরোসার্জন। খোসবাগানে ওদের বিশাল তিনতলা বাড়ি। সৌরাশিষ অবশ্য এমএস করে ইংল্যান্ডে চলে গেছে। ওখানকার মেয়ে বিয়ে করে সেই দেশেই সেটেলড হয়ে গেছে। বর্ধমানে আসেই না। তুহিনা দেবাশিষকে বাড়ি ভেঙে পড়ার কথা জানিয়েছিল। দেবাশিষ তুহিনাকে বলেছিল—সৌরকে বলেছিস?
—কী হবে বলে? সেবার ছোটকা যখন খুব অসুস্থ হল, কত করে বললাম একবার আসতে। এলই না।
—ছোটকা আবার কবে অসুস্থ হল রে? আমাকে কিছু বলিস নি তো?
—তোকে বিব্রত করে কী হবে? সেরকম দরকার হলে বলতাম। আমি নীলাদ্রি মিলে ম্যানেজ করে নিয়েছি।
—কী হয়েছিল ছোটকার?
—একটা মাইল্ড অ্যাটাক হয়েছিল। ওসব ছাড় না দাদা! বাড়িটার কী হবে ভাব।
—ছোটকা কী বলছে?
—বলছে, ভেঙে পড়বে জানাই ছিল। ছাদে, দেওয়ালে এত বড় বড় গাছ গজিয়ে গিয়েছিল।
—হুঁ, তা ঠিক। তোর বাবা? বড়কা কী বলছে?
—বাবার ওসব ভাবার মতো সেন্স নেই এখন। টোটালি শয্যাশায়ী। খাওয়া, বাথরুমে যাওয়াও নিজে করতে পারে না। তাই বাবাকে কিছু বলিনি।
—ঠিক আছে। তবে বাড়িটার এবারে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
—তুই আয়। সবাই মিলে বসে ঠিক করা যাবে।
দেবাশিষ সেইদিন রাতের কলকাতার ফ্লাইট বুক করেছিল।
বাড়িটার একটা সাইডের দেওয়াল শুধু দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ঐতিহাসিক বাড়ির ছবিতে যেমন থাকে, ঠিক তেমন। বাকি পুরো বাড়িটাই ভেঙে পড়ে গেছে। কিন্তু পুরো বাড়িটা এইভাবে ভেঙে পড়াটা বেশ আশ্চর্যজনক।

দেবাশিষ চুপ করে ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়িয়েছিল। অনেক কিছু মনে পড়ছিল তার। এক সন্ধ্যায় এই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েই সুমনা তাকে বলেছিল—দেবাদা, আমাকে তোমার কেমন লাগে? সুমনাদের বাড়ি সামান্য দূরে ঝাপানতলায়। সুমনার বাবা আর ছোটকা সেই ছোট্টবেলা থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে। সেই সূত্রেই তার এই বাড়িতে যাতায়াত। সুমনার দাদা, সোমেন সৌরাশিষের সমবয়সী। একসঙ্গে পড়ে। সুমনা পড়াশোনায় ভাল। ভাল গান করে। দেখতেও বেশ সুন্দর। ভাল লাগে সুমনাকে দেবাশিষের। বেশি না ভেবে উত্তরে সেই কথাই বলেছিল সে।
—ভাল লাগবে না কেন? খুব ভাল লাগে।
হঠাৎই দেবাশিষকে জড়িয়ে ধরেছিল সুমনা। তার বুকে মুখে রেখে বলেছিল— আমি ঠিক জানতাম, তুমি আমাকে খুব ভালবাসো। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়েই করব না।
দেবাশিষ অবাক হয়েছিল। সে এতটা ভাবেনি। সুমনাকে ভাল লাগে নিশ্চয়ই, কিন্তু এতদূরের কথা সে এখন চিন্তাই করে না। সুমনাকে এত কিছু তখনই বলা হয়নি। সুমনা আনন্দে লাফাতে লাফাতে চলে গিয়েছিল। কয়েকদিন পরে আর এক সন্ধ্যায় সুমনা দেবাশিষকে বারান্দাতেই আবার ধরেছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়েছিল। দেবাশিষের সেই প্রথম চুমু খাওয়ার অভিজ্ঞতা। তার কি ভাল লাগেনি? নিশ্চয়ই ভাল লেগেছিল। তবুও সুমনাকে বলেছিল— কী যে পাগলামি করিস! কেউ দেখে ফেললে কী হবে? সুমনা হেসে বলেছিল—বলে দোব, আমরা বিয়ে করব।
ক্রমশ



