মনার্ক প্রজাপতির কথা
উত্তর আমেরিকার এক মহারাজার গল্প বলি এবার। এই মহারাজ শীত মোটে সহ্য করতে পারেন না। তাই শীতের শুরুতেই দলবল নিয়ে পাড়ি জমান দূরদেশে, গরমের খোঁজে। নাম এদের মনার্ক।
প্রজাপতি নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহের কথা আমার বন্ধুরা সবাই জানে। আমেরিকায় আসার আগে থেকেই আশা ছিল এখানে এসে মনার্ক প্রজাপতি দেখব। কারণ এই মহারাজদের দেখাসাক্ষাৎ সাধারণত এখানেই পাওয়া যায়।
এখানে এসেছিলাম সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে। তখন সবে শীতের পরশ লাগতে শুরু করেছে। শীতে প্রজাপতিরা কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তার ওপর মনার্ক প্রজাপতিদের তখন মাইগ্রেশনের সময়। সেপ্টেম্বরের শেষে বেশিরভাগ প্রজাপতিই উত্তর থেকে উড়ে যেতে শুরু করে দক্ষিণে, পশ্চিমে। তাই মনে ইচ্ছে থাকলেও দেখতে পাব কিনা সে নিশ্চয়তা ছিল না। উজ্জ্বল কমলা আর কালোতে মেশানো বেশ বড় আকারের এই মনার্ক প্রজাপতি অনেকগুলো কারণে অন্যদের থেকে একদম আলাদা। তার মধ্যে একটা হল এদের মাইগ্রেশন হ্যাবিট।
প্রজাপতি সমাজে মনার্কই একমাত্র সঠিক অর্থে পরিযায়ী প্রজাপতি। হেমন্তের শুরুতে মানে অগাস্ট সেপ্টেম্বর মাসে দল বেঁধে ওরা উত্তর আমেরিকার শীত প্রধান অঞ্চলগুলো থেকে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে মানে দক্ষিণের মেক্সিকো আর পশ্চিম উপকূলের ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে চলে যায়। এই মাইগ্রেশান একটা দেখার মত জিনিস। দল বেঁধে ঝাঁকে ঝাঁকে মনার্ক প্রজাপতি শঙ্কু আকৃতির উড়ানে পাড়ি দেয় প্রায় তিন হাজার মাইল। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছি। তিন হাজার মাইল! ভাবা যায়, এই ছোট্ট তুলতুলে নরম পতঙ্গগুলো কিনা অনায়াসে তিন হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, প্রতিবছর এই যাত্রাপথ একেবারে নির্দিষ্ট। এমনকি চলার পথে কোন পাথরের খাঁজে বা কোন গাছে বসে রাত্রিবেলা ওরা বিশ্রাম নেবে সেটাও একেবারে নির্দিষ্ট। সেই সমস্ত গাছের গোড়া থেকে পাতা ছেয়ে থাকে হাজার হাজার মনার্ক প্রজাপতিতে। সকাল হলে রোদের তাপে ডানায় শক্তি সঞ্চয় করে আবার ওদের সদলবলে উড়ান শুরু হয়।
গ্রীষ্মকালের শেষ দিকে যে মনার্ক প্রজাপতিরা জন্মায় তাদের পেটে কিছুটা বাড়তি চর্বি সঞ্চিত থাকে। সেই চর্বি থেকেই ওরা এতটা ওড়ার শক্তি পায়। এই চর্বিটুকুই শীতকালে ওদের বেঁচে থাকারও রসদ। কারণ শীতকালে ফুল ফোটে কম। ওদের খাবার যোগানে টান পড়ে। তাছাড়া শীতের শুরুতে জন্মানো এই প্রজাপতিরা আরও একটি কারণে বিশেষ। এরা দীর্ঘজীবী। আগস্ট সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আট ন মাস পর্যন্ত বাঁচে। আর কোনো প্রজাপতিই এত বেশি দিন বাঁচে না। অথচ গ্রীষ্মের শুরুতে যে মনার্ক জন্মায় তারা কিন্তু মাত্র তিন চার সপ্তাহ বাঁচে। তাই বলছিলাম, প্রজাপতি সমাজের সম্রাট এই অনন্যসাধারণ মনার্ক।
মাছ, পাখি, তিমি এরকম অনেক প্রাণীই পরিযায়ী। শীতকালে যে মাছ, পাখি বা তিমিটি যায় উষ্ণ অঞ্চলের দিকে গরমকালে ফেরার সময় সেই প্রাণীটিই আবার ফিরে আসে তার সন্তান সন্ততি সহ। অর্থাৎ আসা যাওয়ার পথের হদিশ ওরা জেনে নেয় ওদের পূর্বসূরীদের কাছ থেকে। কিন্তু মনার্ক প্রজাপতির ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না। যে প্রজাপতি মেক্সিকো বা ক্যালিফোর্নিয়াতে গেল দীর্ঘ শীতকাল কাটাতে, বসন্তকাল এলে মার্চ এপ্রিলে মিল্কউইড গাছের পাতায় ডিম পেড়ে রেখে সে মারা যায় সেখানেই। একমাত্র মিল্কউইড গাছের পাতাই মনার্কের শুঁয়োপোকারা খায়। আর সেই গাছ বসন্তকালের আগে জন্মায় না। তাই এই দীর্ঘ অপেক্ষা। সেই শুঁয়োপোকা নতুন প্রজাপতি হয়ে ফিরতি পথের যাত্রা শুরু করে। তিন হাজার কিলোমিটার তো কম পথ নয়। অনেকটা সময় লাগে পৌঁছাতে। তাই যে প্রজাপতিরা ফিরতে শুরু করে মেক্সিকো বা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে তাদেরও আর ফেরা হয় না। পথেই মারা যায় তারা। তাদের নাতি পুতিরা গ্রীষ্মকালে এসে পৌঁছায় উত্তরের প্রদেশগুলোতে। পরের বছর যখন আবার উত্তরের শীত থেকে দক্ষিণের গরমের দিকে যাত্রা শুরু হবে সেটাও করবে যারা ফিরে এল তাদের এক বা দুই প্রজন্ম পরের প্রজাপতিরা। প্রজাপতির জীবনচক্র তো খুব অল্প সময়ের, তাই এমন হয়।
কি অদ্ভুত তাই না? ভাবলে অবাক লাগে যে প্রজাপতির এই নতুন দলগুলো পথের সন্ধান পায় কী করে! তাও আবার একেবারে খুবই সুনির্দিষ্ট পথে প্রতি বছর এদের চলাচল, বিশ্রাম সব। প্রতি বছর একই গাছে বিশ্রাম, মেক্সিকোর একই পাহাড়ের একটা নির্দিষ্ট খাঁজে শীতযাপন! কে চিনিয়ে দেয় ওদের? বিজ্ঞানীরা এখনও মনার্ক প্রজাপতির মাইগ্রেশানের এইসব ধাঁধাঁর রহস্য সমাধান করতে পারেননি।
রকি মাউন্টেন রেঞ্জের পশ্চিমে থাকে যে মনার্ক প্রজাপতিরা তারা সাধারনত বেশি যায় ক্যালিফোর্নিয়াতে। আর রকি মাউন্টেনের পূর্ব দিকের প্রজাপতিরা মেক্সিকোতে যায়। থাকার জায়গার ব্যাপারে এদের বাছবিচার প্রবল। উঁচু পাহাড়ের ঢালে, নির্দিষ্ট কিছু গাছপালা, বা পাথরের খাঁজেই এরা শীত কাটায়। তাই খুব অল্প জায়গায় অজস্র প্রজাপতি থাকে। সেটাও একটা দেখার মত দৃশ্য।
আগেই বলেছি, গিবস গার্ডেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেবল ফুলের মেলা। বাটারফ্লাই গার্ডেনও আছে। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দু জোড়া মনার্ক বাটারফ্লাইকে উড়ে বেড়াতে দেখে কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম। উড়ে উড়ে বসে কসমস, জিনিয়া ফুলের মধু খাচ্ছিল। আমার ছেলে বনি ক্যামেরার জুম লেন্স ব্যবহার করে কয়েকটা সুন্দর ছবি তুলে দিয়েছিল।
মনার্ক প্রজাপতি স্বচক্ষে দেখার আমার বহুদিনের আশা পূর্ণ হল।


ক্রমশ




অসাধারণ লাগলো মনার্ক মহারাজাদের জীবনের চালচিত্র জানতে পেরে। খুব ভালো হয়েছে লেখাটা। ঝরঝরে, একনাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়।