ঐতিহ্যের শহর বর্ধমান । পর্ব – ১

Maa Sarbamangala

বর্ধমান শহর – – –

curzon 1

কার্জন গেট সহিত বর্ধমান শহর।

বর্দ্ধমান বা বর্ধমান শব্দটি যেমনই হোক, আমি বর্ধমান শহরের কথা বলছি। পুরাতন সময় বর্দ্ধমান লেখা হত। প্রাচীনত্ব এবং ঐতিহ্যে সমান্তরাল এই বর্ধমান। অধুনা গলসি থানার মল্লাসারুল গ্রামে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে একটি তাম্রলিপি পাওয়া যায়। সেই তাম্রলিপিতে বর্ধমানের নামের উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যায়। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, জৈন ধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্করের নাম ছিল বর্ধমান। কালক্রমে সেই নামই বর্ধমান নামে রূপান্তর ঘটেছে। অজয় নদীর তীরে খনন কার্য চলাকালে কিছু প্রাচীন দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী পাওয়া যায়। ভূতত্ত্ববিদেরা মনে করেন, এখানে একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছিল যা ৫০০০ বছরের পুরাতন। মুঘল রাজত্বকালে এর নাম ছিল ‘শরীফাবাদ’। এখানকার রাজতন্ত্রও বেশ প্রাচীন। বর্ধমানের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রাজপরিবারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বর্ধমান রাজপরিবারের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় আপনাদের দিয়ে রাখি।

সঙ্গম রায় নামক এক ব্যবসায়ী পুরীতে তীর্থভ্রমণার্থে যান। ফেরার সময় ভুলক্রমে পথ ভুলে এই বর্ধমানে এসে পড়েন। সময়টা ছিল ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ। তৎকালে বল্লুকা নামক নদীর তীরে তিনি তাঁবু খাটান। অধুনা এটি গাংপুর অঞ্চল এবং বল্লুকা নদী এখন লুপ্ত। তারপর বৈকন্ঠপুর (বেলেরা) গ্রামে তিনি কাপড়, শাল এবং কম্বলের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যদিও তিনি পাঞ্জাবের বাসিন্দা ছিলেন, কিন্তু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ার পর আর তিনি পাঞ্জাব ফিরে যাননি। তার পরবর্তী বংশধর ক্রমে ক্রমে বর্ধমানের রাজপরিবার হয়ে ওঠেন। সঙ্গম রায়ের পুত্র ছিলেন বঙ্কু বিহারী রায়। বঙ্কু বিহারী মুঘল সম্রাটকে বিপদে সাহায্য করেন এবং বিশেষ প্রতিপত্তি লাভ করেন। পরবর্তীকালে এই বংশের সবচেয়ে প্রতাপশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন কীর্তিচাঁদ রায়। তিনি ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্র চিত্রসেন রাজা উপাধি লাভ করেন দিল্লির মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের কাছ থেকে। অর্থাৎ বর্ধমানের প্রথম রাজা নাম ধারণকারী – রাজা চিত্রসেন। তার পরবর্তী রাজবংশধর ছিলেন ত্রিলোক চাঁদ, প্রতাপ চাঁদ, মোহতাব চাঁদ, আফতাব চাঁদ, বিজয় চাঁদ এবং উদয় চাঁদ। উদয় চাঁদের শাসনকালে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আইনের মাধ্যমে ভারত সরকার জমিদারি প্রথা রদ করেন এবং রাজতন্ত্র শেষ হয়। সর্বশেষ রাজা প্রণয় চাঁদ ২০২৪ সালে মারা যান। তিনি ছোট রাজকুমার নামে পরিচিত ছিলেন। এই হল সংক্ষিপ্ত বর্ধমান রাজবংশ।

02

বর্ধমান রাজবাড়ি। এখন বিশ্ববিদ্যালয় কার্যালয়।

এবার ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য বর্ধমানের ঝুলিতে কী কী আছে জেনে নিন।

মাঁ সর্বমঙ্গলা মন্দির – – –

বর্ধমান শহরের প্রাণকেন্দ্র হল মা সর্বমঙ্গলা মন্দির। গুগল ম্যাপে ‘6VQ4+9RW’ সার্চ করুন, আপনাকে সর্বমঙ্গলা মন্দির পৌঁছে দেবে। স্টেশন থেকে দূরত্ব ৩ কিমি। অটো বা ট্যাক্সি ধরে ভিড় ঠেলে চলে আসুন দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে। সর্বমঙ্গলা মাতা বর্ধমান রাজাদের গ্রামদেবতা হিসাবে পূজিত হয়ে পরবর্তীকালে নগর অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এই দেবী অষ্টভুজা অসুরনাশিনী দুর্গামূর্তি। মূর্তিটি কত প্রাচীন তার নির্ণয় হয়নি, বা মূর্তির নিচে লিপিও উদ্ধার করা যায়নি। কোথায় এটি স্থাপিত ছিল প্রাচীনকালে তাও জানা যায় না। বর্ধমানের রাজাদের হাতে মূর্তিটি আসার একটি রোচক কিংবদন্তি আছে।

বর্ধমানের বাহির সর্বমঙ্গলা পাড়া অঞ্চলে এক সময় (১৭০০ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকে) বর্গ ক্ষত্রিয়দের (বাগদিদের) বাস ছিল। তারা সাধারণত মৎস্যজীবী ছিল। ওই অঞ্চলে খালে-পুকুরে তারা মাছ ধরত। একদিন তাদের জালে একটি শিলা উঠলো। বাগদীরা ওই শিলাকে সাধারণ পাথর ভেবে সেটির উপরে শামুক-ঝিনুক ভাঙতো। ওই ঝিনুক-শামুকের খোলা চুনারিরা নিয়ে গিয়ে চুন তৈরি করতো। একদিন ওই শিলাটি খেলার ছলে চুনারিরা নিয়ে যায়। এরপর একদিন রাজবাড়ির লোক ওই চুনারিদের কাছে যায় এবং বলে, ‘তোমাদের বাড়িতে একটি পাথরের মূর্তি আছে, যেটি নিয়ে যাওয়ার জন্য দেবীর স্বপ্নাদেশ হয়েছে’। চুনারিরা তখন বলে, শিলাখন্ডটি বেগুট গ্রামের ব্রাহ্মণ পরিবারের লোক এসে নিয়ে গেছে। রাজা তখন নিরুপায় হয়ে বর্ধমানের বেগুট গ্রামে যান। শিলাটি চাইতেই ব্রাহ্মণেরা বলে, তাদেরও দেবী স্বপ্নাদেশ করেছেন, তাই তারা সেই মূর্তিটি পূজার্চনার জন্য নিয়ে এসেছেন চুনারিদের কাছ থেকে। মূর্তিটি দিতে তারা প্রবল অনিচ্ছা প্রকাশ করলে রাজা বলেন, ‘আমি মন্দির নির্মাণ করে দেবীকে প্রতিষ্ঠিত করব, দেবীর এরকমই নির্দেশ। এই মূর্তির পূজার ভার তোমরাই নেবে। সমস্ত ব্যয়ভার আমি গ্রহণ করব’। ব্রাহ্মণেরা তখন এই শর্তে সম্মতিদানে দেবীর মূর্তি রাজাকে সমর্পণ করেন। রাজা কীর্তিচাঁদ তখন নিজের জমিতে ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে মায়ের নবরত্ন মন্দির, নাটমঞ্চ এবং নাটমঞ্চের দক্ষিণ দিকে মিত্রেশ্বর মহাদেব মন্দির নির্মাণ করেন। এরপর রাজা তেজচাঁদ ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন আরও চারটি মন্দির। সেগুলি হল কমলেশ্বর, রামেশ্বর, ইন্দ্রেশ্বর এবং চন্দ্রেশ্বর শিবমন্দির। মন্দিরের আঙিনায় পৌঁছতে হলে পূর্ব দিকে মূল ফটক এবং দক্ষিণ দিকে আরও একটি ফটক আছে।

03

মা সর্বমঙ্গলা মন্দির এবং সর্বমঙ্গলা মায়ের মূর্তি

১৯৯৪ সালে মা সর্বমঙ্গলা মন্দির ট্রাস্ট বোর্ড গঠিত হয়। ট্রাস্ট বোর্ডের দায়িত্বে সকল মন্দিরগুলি পুনরায় সংস্কার হয় নবরূপে। নতুন করে তৈরি হয় মায়ের ভোগঘর, নাটমন্দির, যাত্রীনিবাস, নহবত খানার ভিতরে অফিসঘর এবং মন্দিরের পশ্চিম দিকে সুন্দর একটি ছোট্ট পার্ক, যেখানে কিছুক্ষণ বসলেই মন এবং দেহে শান্তির স্পর্শ লাগে। মন্দির সংস্কারের পর মন্দিরের প্রাচীন কলেবর নষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু দর্শনার্থীরা অনেক সুবিধা পেয়ে থাকেন এই ট্রাস্ট বোর্ডের মাধ্যমে। সারা বছরই ভক্তরা মায়ের পূজার্চনার জন্য মন্দিরে আসেন। পূজা সেরে মায়ের ভোগ খেয়ে তারা ফিরে যান। যারা এখানে একদিন বা দুদিন থাকতে চান, তারা ট্রাস্ট বোর্ডের অতিথিশালা, অফিসে এসে বুকিং করতে পারেন। ছয় বেডের একটি ঘর ভাড়া একদিনে ৭০০/- টাকা। খাবারের জন্য কুপন কাটতে হয় সকাল দশটার মধ্যে, এবং কুপন মূল্য জন প্রতি ৫০/- টাকা। পূর্ব দিকে মূল ফটকের বাইরে পূজার সামগ্রী পাওয়া যায়। মন্দির খোলা হয় সকাল ছয়টা থেকে দুপুর বারোটা এবং বিকেল চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। শারদীয় দুর্গাপূজাই হলো মন্দিরের বার্ষিক প্রধান উৎসব। আগে নবমীর পূজার দিন মহিষ বলিদানের প্রথা ছিল। অষ্টমী, নবমী, সন্ধিপূজার সূচনা রাজাদের প্রতিষ্ঠিত কামান দাগার মাধ্যমে সকলকে অবগত করা হতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৯৭ সালে খ্যানের সময় কামানটিতে বিস্ফোরণ হয়ে কামানটি ধ্বংস হয়। তখন থেকে কামান দাগা বন্ধ হয়ে যায়। এখন মন্দিরের বাইরে রাস্তার পাশে যে কামানটি রয়েছে, সেখানেই পুরাতন কামানটি ছিল। স্মারক হিসাবে এই কামানটি রাখা আছে।

04

সর্বমঙ্গলা মন্দিরের যাত্রীনিবাস এবং স্মারক কামান।

ক্রমশঃ – – >>

প্রথম পাতা


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top