আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরি – পর্ব ৫

hollowing 10

হ্যালোউইন

পুজো চলে যেতেই দেখতে দেখতে এসে পড়ল হ্যালোউইন। ৩১শে অক্টোবর আজকাল প্রায় সারা পৃথিবী জুড়ে পালিত হয় হ্যালোউইন। যদিও প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই।
আমাদের বাড়ির কাছাকাছিই এক চৌমাথার মোড়ে সুন্দর একটি চার্চ আছে। পিচট্রি ব্যাপটিস্ট চার্চ। তৈরি হয়েছিল 1847 সালে। ঠিক এই জায়গাটিতেই। চার্চের সামনের রাস্তার পাশেই একটা বেশ বড় ফাঁকা মত জায়গা। আসতে যেতে দেখি সেখানে ছাউনি খাটিয়ে তিন চার থাক কাঠের তাকের ওপর সারি সারি সাদা, কমলা রঙের ছোট বড় কুমড়ো সাজিয়ে রাখা আছে। কুমড়োর দুপাশে চট, কাঠি পিচবোর্ড দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি দেখতে ক’টা ভূত তৈরি করে সাজিয়ে রেখেছে। ওখানে দেখি সাইজ অনুযায়ী কুমড়োর বিভিন্ন রকম দাম। লিস্ট টানানো আছে। তার সাথে কুমড়ো কাটার ছুরি, মোমবাতি আরও হরেক রকম জিনিসের হরেক রকম দাম লেখা আছে লিস্টে। এগুলো দিয়ে তৈরি হবে ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’।
আমাদের দোল, দেওয়ালি উপলক্ষ্যে পাড়ার রাস্তার মোড়ে মোড়ে যেমন বেশ কিছুদিন আগে থেকেই অস্থায়ী ছাউনির দোকানে পিচকিরি, রং, আবির,বাজি ইত্যাদি বিক্রি হয় এও প্রায় তেমনই। হুজুগের ফায়দা তুলে টু পাইস কামিয়ে নেওয়া!
টার্গেট,ওয়ালমার্টেও দেখেছি ইতিমধ্যেই হ্যালোউইন এ সাজানোর নানা রকম জিনিস, কার্ড, হ্যালোউইন পর্টির জন্য থিম বেসড প্লেট, গ্লাস, বালতি, জামাকাপড় সব হাজির হয়ে গেছে। দেশ, মহাদেশ যতই আলাদা হোক ব্যবসা বাণিজ্যের রীতি নীতি সব জায়গায় একই রকম। তবে এখানেও রাস্তার ওপর ত্রিপল খাটিয়ে এইসব বিক্রি হবে এতটা ভাবিনি।
জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন এর বিষয়ে আয়ার্ল্যান্ডের কেল্টিক জনগোষ্ঠীর লোকেদের মধ্যে একটা প্রাচীন গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটা এইরকম।
কঞ্জুস জ্যাক নামে একটা লোক ছিল। সে কিনা ছিল ভারি কেপ্পন, তাই লোকে তাকে ওই নামে ডাকত। সেই জ্যাক একদিন শয়তানকে নেমন্তন্ন করল তার সঙ্গে বসে মদ খাওয়ার জন্য। লোভে পড়ে শয়তানও রাজী হয়ে গেল। দুজনে মিলে মদ টদ খেয়ে যখন পয়সা দেবার সময় হল তখন জ্যাক শয়তানকে বলল, “আমার কাছে তো পয়সা নেই। এক কাজ কর, তুমি একটা সোনার কয়েন হয়ে যাও। আমি মদের দোকানিকে ওটা দিয়ে বেরিয়ে গেলেই তুমি তোমার আসল রূপ ধরে চলে যেও।” উপায়ান্তর না দেখে শয়তান রাজি হল। শয়তান সোনার কয়েন হবার সাথে সাথেই জ্যাক ওটা নিজের পকেটে পুরে রূপোর ক্রসের সাথে রেখে দিল। শয়তান আর তার আসল রূপ ধরতে পারে না। অনেক কাকুতি মিনতি করার পর জ্যাক বলল, “তোমাকে ছাড়তে পারি, তবে শর্ত হলো, আমি যতদিন বেঁচে আছি তুমি আমার কাছে আর আসবে না। আর মরে গেলে আমার আত্মাকে নরকে নিতে পারবে না।” শয়তান আর কী করে! বাধ্য হয়ে সে প্রতিজ্ঞা করল, জ্যাকের আত্মাকে নরকে রাখবে না।
এর কিছুদিন পর জ্যাক তো সত্যি মারা গেল। দেবতারা এরকম দুষ্টবুদ্ধি লোককে স্বর্গে ঢুকতে দিলেন না। জ্যাক গেল নরকে থাকতে। শয়তান তো তার প্রতিজ্ঞা ভোলেনি। সে জ্যাককে দেখেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল। জ্যাক তখন কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “এবার আমি কোথায় যাব?” শয়তান নরক থেকে একটুকরো জ্বলন্ত অঙ্গার তুলে জ্যাকের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এই আলোতে তোমার জায়গা খুঁজে নাও।”
জ্যাক একটা শালগম কেটে গর্ত করে তার ভেতর অঙ্গারের টুকরোটা রেখে দিল। আর সেই থেকে ওটা হাতে নিয়ে পৃথিবীর কোণায় কোণায় নিজের জন্য জায়গা খুঁজে বেড়াতে লাগল।
সেই স্মৃতিতে আইরিশরা শালগমের ভেতর আলো জ্বালিয়ে বানাত জ্যাক অফ ল্যান্টার্ন। সংক্ষেপে জ্যাক ও ল্যান্টার্ন (Jack O Lantern) ।
এর বহুদিন পর আইরিশরা এল আমেরিকায় বসবাস করতে। সঙ্গে নিয়ে এল তাদের প্রাচীন প্রথা। কিন্তু এখানে এসে দেখল শালগমের থেকে এই সময় আমেরিকায় কমলা রঙের বড় বড় কুমড়ো পাওয়া যায় বেশি। তাই কুমড়ো দিয়েই বানানো হতে লাগল জ্যাক ও ল্যান্টার্ন। কালক্রমে সেটা হয়ে গেল হ্যালোউইন এর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
31শে অক্টোবর, হ্যালোউইন এর দিন মৃত আত্মারা জেগে ওঠে এমন একটা বিশ্বাস ছিল তাদের। হাজার বছর আগে থেকে শুরু করে আজও দোসরা নভেম্বর রোমান ক্যাথলিকরা অল সোলস ডে পালন করেন মৃত আত্মীয় স্বজনদের শ্রদ্ধা জানাবার জন্য।
আমাদের দেশেও ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো হয়। মনে করা হয় অপদেবতারা চোদ্দ প্রদীপের আলোতে ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না। কোনো কোনো জায়গায় তাদের জন্য বাইরে জল বাতাসাও রাখা হয়। আরও কত পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত আছে ভূত চতুর্দশী নিয়ে!
ভূত চতুর্দশীও পালিত হয় সাধারণত অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরের শুরুতেই।
আবার ইসলাম ধর্মের সবেবরাত এর জন্যও নির্দিষ্ট আছে এই মাসটাই। সেও তো মৃত আত্মাদের শ্রদ্ধা জানাবার দিন। অক্টোবর নভেম্বর মাসটাই মৃত আত্মাদের এত পছন্দের মাস কেন জানা নেই!
এখানে এসে দেখলাম হ্যালোউইন এর এক দেড়মাস আগে থেকেই আলো জ্বলা ভূত মুখো কুমড়োই শুধু নয়, নানারকম কঙ্কাল, ভূত পেত্নী নানা কায়দায় অনেকেই বাড়ির সামনের লনে, দরজার সামনে সাজিয়ে রেখেছে। কোথাও কঙ্কালরা পার্টি করছে, কোথাও যুদ্ধ করছে। কোথাও বা ভূতেরা গাছ থেকে ঝুলছে, দরজার সামনে দুলছে, আবার কোথাও বা মাটির ভেতর থেকে হাত পা বাড়িয়ে উঠে আসতে চাইছে। ভুতুড়ে আলোক সজ্জা এর সাথে সমান তালে সঙ্গত করে।
বেশ মজাদার ব্যাপার। যেন ভূত তাড়ানোর জন্য ভৌতিক ঝুলন সজ্জা। এক সময় এর ধর্মীয় অনুষঙ্গ যাই থেকে থাক না কেন আজকাল এটা বিশুদ্ধ মজার ব্যাপার হয়েই দাঁড়িয়েছে সব দেশে।
৩১শে অক্টোবর সন্ধের মুখে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা নানারকম সাজে সেজে বাবা মায়েদের সাথে বেরিয়েছিল ‘ট্রিক অর ট্রিট’ বলে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে চকোলেট সংগ্রহ করতে। বাবা মায়েরাও কম যান না। তারাও অনেকে নানা রকম সাজে সেজেছিলেন। ওদের আনন্দ দেখে ভীষণ ভালো লাগছিল। প্রতিবেশীরাও চকোলেট বোল, কুমড়ো ইত্যাদি দিয়ে টেবিল সাজিয়ে, আর শুধু টেবিল সাজিয়েই বা বলি কেন, অনেকে আবার নিজেরাও রীতিমত নানারকম সাজে সেজে বসেছিলেন বাইরে ছোটদের অপেক্ষায়। চকোলেট দিতে পেরে ওরাও শিশুর মত খুশি হয়ে উঠছিলেন। ছোটখাটো বাক্য বিনিময় সেরে ছোটরা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি দৌড়ে বেড়াচ্ছিল।
বহুদিন আগে আমাদের ছোটবেলায় বিজয়া বা লক্ষ্মীপুজোর পরেও অনেক ছোট ছেলেমেয়েরা এভাবেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাড়ু, মোয়া খেত, সংগ্রহ করত। বড়রাও সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন ছোটদের জন্য। সেকথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার।
দেশ কাল জাতি যতই আলাদা হোক না কেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মানুষের রীতি নীতি, আনন্দ উৎসবের একটা কোথাও ভীষণ মিল থেকেই যায় এ বিশ্বাস আমার বরাবরই ছিল। আজকাল যত দেখছি, সেই বিশ্বাসটাই আরও দৃঢ় হচ্ছে।

ক্রমশ

আমেরিকা প্রবাসের ডায়েরী – ৪


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top