বিবাহ কী? ধাতুগত অর্থে ‘বিশেষরূপে বহন’। তা কে কাকে বহন করে? নাথিং অফিসিয়াল অ্যাবাউট ইট। দাম্পত্য রসায়নে যে যাকে গছাতে পারে বহনের নিমিত্ত, সেই বহন করে; সে আলোচনার ক্ষেত্র এটি নয়।
ব্যাপারটা হল এই যে, বহনের যে চুক্তি, তার একটা বৈধতা থাকা দরকার। না হলে তো বিবাহ আর বিবাহের ‘প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই’-র মধ্যে কোনো তফাত থাকে না। সেই বৈধতা দিতে গিয়ে অবধারিত ভাবে চলে আসে ধর্ম এবং পাপ-পুণ্যের হিসাব-নিকাশ।
যে-কোনো ধর্মেই লক্ষ্য করা যাবে যে নারী-পুরুষ কিংবা সমলিঙ্গের লোকেরা তাদের বিশ্বাসের ঈশ্বরকে স্মরণ করে সাক্ষী রেখেই এই বহন-চুক্তি সম্পন্ন করছেন। মাঝরাস্তায় কেটে পড়লে কিংবা এক সিম রেখে অন্য সিমে রিচার্জ করলে সব চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও ওমনি প্রেজেন্ট, অর্থাৎ সর্বত্র বিরাজমান ঈশ্বরের নজরে তা পড়বেই। সেই সুবাদে পাপ ও পাপের বেতন, ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং ধর্মসাক্ষী সেই আবহমান কাল থেকেই বিবাহের অঙ্গ, তা সে যে ধর্মই হোক না কেন। এর সঙ্গে এসেছে নাগরিক স্বার্থ রক্ষায় আইনের রক্ষাকবচ, অর্থাৎ রেজিস্ট্রি বিবাহ কিংবা ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন। দেশের আইনমোতাবেক এই বহনকার্যের স্বীকৃতি; বেচাল হলেই কোর্টে টানা-হ্যাচড়া আদায়-উশুলের গুজরানি।
অনেকে আবার বন্ধনকে পোক্ত করতে ডবল প্রোটেকশন লাগান। ধর্মসাক্ষীর সঙ্গে সঙ্গে আইনি দড়ির পাকেও পোক্ত করে নেন—অর্থাৎ কিনা সাত-দুগুনে চোদ্দ পাকে সম্পর্ককে বেঁধে ভার বহনে অগ্রণী হন। আবার সরকারি অফিসে বিবাহের সরকারি স্বীকৃতি ছাড়া তা গ্রহণযোগ্যই নয়। এই তো দিন কয়েক আগে বাবার রিটায়ারমেন্ট, মায়ের ফ্যামিলি পেনশনের ব্যবস্থার্থে বিবাহের সরকারি স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়ে পড়ল। অগত্যা রেজিস্ট্রি অফিসে দাঁড়িয়ে থেকে সেই আপাত অসম্ভব কাজটি সারতে হল; ‘বাপের বিয়ে দিতে হল’—অথচ এটাই সাধারণ্যে গালি হিসাবেই পরিচিতি পেয়ে এসেছে।
বন্ধনের এই পারস্পরিক স্বীকৃতি তো কেবল দুজন বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তিরা দিলেই হবে না, দুটো পরিবারকে বন্ধনে বাঁধতে হয়। রাক্ষস-খোক্কস কিংবা গন্ধর্ব বিবাহ হলে অন্য ব্যাপার। খামচে তুলে নিয়ে গিয়ে অথবা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে ফুসলে নিয়ে গিয়ে বিবাহই সেখানে দস্তুর। পালালেও বাং-কানা, অর্ধমই সেখানে দস্তুর। কেষ্টর জীবেরা নিতান্তই সমাজবদ্ধ গেরস্থ; বাড়ি পালিয়ে অসামাজিক বিয়েতেও খানকতক ইয়ার-বন্ধু না থাকলে ঠিক জোশ পায় না।
সেই কারণেই বিবাহের সময় ভগবান, আল্লা কিংবা চার্চকে সাক্ষী রেখে যেমন কিছু ক্রিয়াকর্মের ব্যবস্থা আছে, তেমনই দুটো পরিবারকে বন্ধনের বন্ধনীতে আবদ্ধ করার জন্যও কিছু ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন ঘটানো হয়েছে। ধর্মসাক্ষীর ব্যাপারটাকে যদি আমরা বলি বিবাহের ধর্মাচার, তবে পরিবার-বন্ধনের প্রক্রিয়াকে আমরা বলতেই পারি বিবাহের লোকাচার।
অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে সঠিক অভিজ্ঞতা নেই; রসিকজনেদের সন্ধানে থাকলে জানাবেন, তবে হিন্দুধর্মে ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। এই যেমন ধরুন, অগ্নি সাক্ষী রেখে মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে ‘যদি তং হৃদয়ং মম’ যদি ধর্মাচরণ হয়, তবে ছাতনাতলা, বাসরজাগরণ কিংবা জামাইয়ের হস্তবন্ধনী-মূলক প্রক্রিয়া অবশ্যই লোকাচারের অংশ। এখন তো আবার ‘সংগীত’, ‘মেহেন্দি’ ইত্যাদি কালচার অন্য প্রদেশ থেকে বাংলা প্রদেশে এসে জাঁকিয়ে বসেছে। ‘আইবুড়ো’ ভাতের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে। এগুলো সব লোকাচার। বিবাহ-উদ্যোক্ত পরিবারগুলোকে একত্রিত করার বাসনায় সবার অংশগ্রহণের উপায় বিশেষ—অর্থাৎ লোকাচার।
আগের পর্বে বিবাহের দিন-তারিখের লগ্ন নিয়ে যে আক্রার আলোচনা আমরা করেছিলাম, তাতে দেখা গিয়েছিল লগ্নের দিনক্ষণ না বাড়লে ষাঁড়ে-সর্বনাশ। নিতান্তই পাঁজিকার গণ অপারগ হলে এই ধর্মাচার-লোকাচার ডিসিশন প্রক্রিয়া ছাড়া গতি নেই। ইনফ্যাক্ট, বিয়েবাড়ি সময় না পেয়ে অনেক সময় এখন তা করতে হচ্ছে। পাত্র-পাত্রীকে বাড়তি কালরাত্রি যাপন করিয়ে প্রীতিভোজ এক-দুই দিন আগুপিছু করতে হচ্ছে অনেককেই।
পরিকাঠামোগত আক্রা-গন্ডার দিনে পাঁজি মেনে বিবাহের ধর্মাচারটুকু সেরে রাখা যেতে পারে—অর্থাৎ উজুগ্য করে রাখা হল। তার পর পরিকাঠামোগত সুবিধাপ্রাপ্ত হলে লোকাচারগত ফুর্তি-আপ্তি। আর এই বঙ্গে সে সুবিধা-পালুনির সংস্কৃতির পথ তো তিনি দেখিয়েছেন। সুকুমারবাবুর লব্জ ধার করে বলাই যায়—ডেট-এর আমি, ডেট-এর তুমি, ডেট দিয়ে কী যায় চেনা? ডেট কি কারুর বাপের কেনা? সুতরাং মহাজন গতে: যো পন্থা—
আজ এই পর্যন্ত। সকলে ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
ক্রমশ



