দ্বন্দ্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব – পর্ব-৩

mathematics of entropy in the office

—কিছু একটা ঘটবে। তুমি নিশ্চিত থেকো, অনিশ্চিত কিছু ঘটবে। হঠাৎ মৃত্যু বা চাকরি চলে যাওয়া, হঠাৎ করে ভূমিকম্প বা সুনামি, অগ্ন্যুৎপাত—যা কিছু ঘটতে পারে। আতঙ্কে দিন কাটানো অভ্যাস করতে হবে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফিরতেও পারো, নাও ফিরতে পারো। আজ তোমার কাজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। যে—কোনো ধরনের বিপদ আগে, পিছে, ডাইনে, বাঁয়ে তোমায় ঘিরে রয়েছে। তুমি নিজেকে এই বিপদের জেলের মধ্যে ভর্তি করিয়েও আতঙ্ককে আপন করতে না পারলে পঁচে যাবে—জাস্ট পঁচে যাবে।

—আপনি কে? হঠাৎ ট্রেনে উঠে এমন এলোমেলো কথা বলছেন মশাই? বাই-দ্য-ওয়ে, আমি সংশয়।

—আমার ভালো নাম রাজনৈতিক নেতা। ডাক নাম আতঙ্ক। আমার কাজ বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলার মতো করে দেখানো। আমার কাজ এনট্রপি তৈরি করা, যাতে শক্তির কাজে পরিণত হওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। আরে বাবা, আমার ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ তোমাদের অস্তিত্বের কারণ—ভুললে চলবে না ভাইয়া। আমি সূঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়েই বের হই।

—আমার ডানার ঝাপটেও ঝড় আসে আতঙ্ক মশাই। ভুলে যাবেন না, আমার নাম সংশয়।

—আমার ডানার ঝাপটেও ঝড় আসে, আমি আক্রোশ।

—আমি তো নিজেই ঝড়ের কারণ, আমি যন্ত্রণা। আপনি নিজেকে একটু বেশি চালাক ভাবছেন রাজনৈতিক নেতা ওরফে আতঙ্কবাবু।

—আহ্! তোমরা ঝগড়া থামাবে! তোমাদের ‘আমি’—র চলন সিউডোপোডিয়ার অ্যামিবয়েড গমনের মতো। ভবিষ্যৎকে গিলতে গিলতে চলছো।

—মিস্টার পরিসংখ্যানবিদ, আপনি ভুলে যাবেন না বর্তমান পৃথিবী আমার বশ—মানে আতঙ্কের ভাষার বশ। আমি ধর্ষক এবং শাসক। আমি শোষক এবং শাসক। যন্ত্রণা, আক্রোশ, সংশয় এরা যতই উৎপাত করুক, এদের উৎসব আর মড়কের চাবিকাঠি আমার হাতে মশাই।

—হা হা হা হা হা হা!

—আরে, এমন করে বোকার মতো হাসছেন? আধপাগল বৃদ্ধ! আপনি কে মশাই?

—আমি এনট্রপিবৃদ্ধ। আমি পর্যবেক্ষক, আমি ইতিহাস, আমি বিজ্ঞান।

—আমি প্রলাপ, ভুতুড়ে জ্ঞান। (মুখ বেঁকিয়ে)

—আরে চটছ কেন আতঙ্ক ভাইয়া? তোমার পাকা ধানে তো আমি মই দিই নি। তুমি ঘটনাকে ভাষা দাও, ভরসাকে ভয় বানাও, ভয়কে ভরসা। তুমি তোমার ডানার ঝাপটায় ঝড়ের ইঙ্গিত দাও, কিন্তু বাতাসের ইঙ্গিত বোঝো না।

—আপনি বোঝেন বোদ্ধা মশাই? এমনিই তো বিশৃঙ্খলা তৈরি করে বসে আছেন।

—এনট্রপি মানে বিশৃঙ্খলা ঠিকই। কিন্তু সেই বিশৃঙ্খলাই নতুন বিন্যাসের সম্ভাবনা বহন করে। তুমি যে একটু আগে বোকার মতো বললে, তোমার কাজ বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলার মতো দেখানো। তার মানে তুমি মোটেও এনট্রপি তৈরি করতে পারো না বাপু। সেটা তো মহাজগতের কাজ। তুমি তার মধ্যে বিন্দুর বিন্দু। তোমরা আতঙ্কে যত বেশি বলো, তত ভুল বলো আর আমরা হাসি। ঠিক কিনা পরিসংখ্যানবিদ দাদা?

—সম্ভাবনার কথা বলতে পারি, ঠিক হবার সম্ভাবনা। এর থেকে বেশি বলা যায় না।

—আমি ভুল? আপনি তো পরিসংখ্যানবিদ, আপনি সঠিক বিশ্লেষণ করে বলুন—আমি মানে আতঙ্ক ভুল না ঠিক?

—আপনি ভুলও নন, আর সর্বশক্তিমান বলে নিজেকে যে দাবি করছেন, সেটাও নন আপনি। আপনি ‘কনফিডেন্স ইন্টারভাল’কে চূড়ান্ত সত্য বানিয়ে দেন।

—শালা মহা হারামজাদা! আক্রোশের ওপর টেক্কা দিতে চায়!

—আহা, এসব ভাষা কেন আবার? ভালো করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো। যেমন— আতঙ্কবাবু পাঁচ শতাংশ বিপদের সম্ভাবনাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করবেন যেন বিপদ আসছেই, সেখানে পঁচানব্বই শতাংশ নিরাপত্তার চান্স আপনাকে উনি দেখতেই দেবেন না।

—ধুর বা*ল! ভুলভাল বোঝাবে না তো বুড়ো! আমি কোনো সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করি না। আমি যা বলি সেটাই হয়। এই যে ট্রেনের মধ্যে যতজন আছে, তাদের এক্কেবারে চোঁ করে গিলে খেয়ে নেব। তখন এনট্রপিবুড়ো আর তুমি বিস্ময়ের বিশৃঙ্খলা মাপতে থেকো।

—তুমি যে ক্ষমতার আস্ফালন দেখাচ্ছ, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে আত্মহত্যার বীজ। তুমি আমাদেরকে যত গিলে খেতে চাইবে, ক্ষমতার আস্ফালন তোমাকে আরও গিলে খেয়ে নেবে। ক্ষমতাই তোমার হত্যার কারণ হবে, কিন্তু তুমি বুঝে উঠতে পারবে না। এই যে সুপারনোভা! নক্ষত্রের বিস্ফোরণ—তা শুধু ক্ষমতার আস্ফালন নয়, বরং অন্তিম আর্তনাদ। অতিরিক্ত ভরের কারণে আত্মহত্যা। ঠিক বলছি তো পরিসংখ্যানবিদবাবু?

—যথার্থ, যথার্থ। চশমাটা খুলে একটু মুছে নিই আগে। ক্ষমতা যখন নিজেকে শূন্য ত্রুটির সমীকরণ মনে করে, তখনই তার স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন বাড়তে থাকে।

—আরে উদ্বেগ! এস এস। তোমাকে ছাড়া আমি কেমন কোণঠাসা হয়ে গেছি। কোন স্টেশন থেকে উঠেছ? ওদিকে ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিলে বুঝি?

—আমি তো আপনার সামনেই থাকি আতঙ্কদা। আপনি খেয়াল করেন না সবসময়। আপনার সাথেই ‘যদি’ স্টেশন থেকে উঠেছি। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আপনার কথাবার্তা শুনছিলাম।

—তুমি ভুল বলছ উদ্বেগ। আমি তো ‘নিয়তি’ স্টেশন থেকে উঠেছি, ‘যদি’ স্টেশন কোথায়?

—আপনার সামনে প্ল্যাটফর্মে লেখা ছিল হয়তো ‘নিয়তি’, আমার সামনে লেখা ছিল ‘যদি’। আমাদের ঘড়ির মতোই প্ল্যাটফর্ম তো একেক জনের কাছে একেক নামে আসে, তাই না?

—বটেই তো, বটেই তো। প্ল্যাটফর্ম তো সময়ের মতোই প্রবাহের ঘূর্ণির মধ্যে দাঁড়িয়ে, ভাষার ব্যাখ্যার মধ্যে দাঁড়িয়ে, আছে আর নেই—এর মধ্যে দোদুল্যমান।

—এই এনট্রপিবুড়োর কথা শুনতে শুনতে আমার কবির কথা মনে পড়ে গেল। কবি আমাকে পেলে অনেকক্ষণ তার বুকে জড়িয়ে রাখে। জীবনের সঙ্গে বিভূতির যোগ হয়—তার যন্ত্রণাকে পেলে, মানে আমাকে পেলে। কবির কাছে অন্যদের মতো আমি ব্রাত্য নই। কবি আর আমার মধ্যে স্তব্ধ হয়ে থাকে নীরব বোঝাপড়া। রাত বদলের পালার কবিতায় চাঁদের কান্না চুঁইয়ে পড়ে। কবি বলে, যন্ত্রণা ছাড়া সৃষ্টি অসুন্দর। আমার যমজ ভাই শোক দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কবি তাকে না ডাকলেও কখনো কখনো ও এসে ফালা ফালা করে দিয়ে কবিকে বেরিয়ে যায়। তখন আমি কবির পাশে বসে প্রকৃতির গোপন হাহাকার দেখাই। আকাশের বেদনা আর পাখিদের বিহ্বলতা মিশে অপার্থিব হয়ে ওঠে। আমি তার হাত ধরে বসে তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে থাকি একের পর এক বিস্ময়।

—তুমি তো সুপারনোভা যন্ত্রণা। তুমি শুধু অন্তিমের আর্তনাদ নও, ভরের আস্ফালনও নও। তার পরবর্তীতে নতুন মৌলের খোঁজ তুমি। তুমি তো উপাদানের পুনর্বিন্যাস। তুমি এমন এক অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে কবিকে নিয়ে যাও, যাতে কবি তোমার কাছ থেকে অনর্থ কিনতে বাধ্য হয়। কিন্তু তুমি যদি কবিকে ‘আমিত্ব’ ফ্রি-র লোভ দেখাও, তো কবি শেষ।

—আমি কবিকে কিছু বিক্রি করি না এনট্রপি মশাই। ব্যথানগরীতে বিকিকিনি বন্ধ হলে আমি কবির কাছে গিয়ে বসি।

(ক্রমশ)

দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ২)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top