কথায়, আলাপে ডাক্তার অনির্বাণ মজুমদার
প্রশ্ন : শীতকালে দূষণ কেন অন্য ঋতুর তুলনায় বেশি ক্ষতিকর?
উত্তর : শীতকালে “temperature inversion” নামক একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটে, যেখানে ঠান্ডা বাতাস নিচে আটকে যায় এবং তার ওপরে উষ্ণ বাতাসের স্তর তৈরি হয়। এর ফলে দূষিত বাতাস ছড়াতে পারে না। বিশেষ করে PM2.5 নামের অতিক্ষুদ্র কণাগুলি নাক ও গলার প্রাকৃতিক ফিল্টার এড়িয়ে সরাসরি ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়। সেখানে এগুলি প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং অক্সিজেন গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
প্রশ্ন : দূষিত বাতাস ফুসফুসে ঢুকলে ঠিক কী ঘটে?
উত্তর : দূষণ শ্বাসনালীর ভেতরের আবরণে জ্বালা সৃষ্টি করে। এর ফলে শ্বাসনালীর দেওয়াল ফুলে যায়, অতিরিক্ত কফ তৈরি হয় এবং বাতাস চলাচলের পথ সংকুচিত হয়। কফ জমে যায় শ্বাসনালীর ক্ষুদ্র অববাহিকায় যার ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং অল্প পরিশ্রম বা কাজ করেই হাঁপ ধরে যায়।
এই কফ নিকাশি ব্যবস্থা / স্লেষ্যা অপসারণ প্রক্রিয়ার (mucociliary clearance) কার্যকারিতা কমে যায়। (বিশেষত যারা ধূমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি প্রকট। ) যার ফলে কফ জমতে জমতে গাঢ় হয়ে যায় এবং কফ বহিষ্কার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই কফ প্রায়শই গলার কাছে এসে আটকে পড়ে (mucosal plug) এবং তার থেকে কাশির দমক চলতে থাকে। ঠাণ্ডা হাওয়ার ফলে শ্বাসনালীর অববাহিকাগুলি সংকুচিত হয়ে পড়ে (bronchoconstriction) যার ফলে কাশি ও শ্বাস কষ্ট বেড়ে যায়। হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর আকার নিতে পারে।
প্রশ্ন: শীতকালে কাশি ও সংক্রমণ কেন বেশি হয়?
উত্তর : ঠান্ডা বাতাস শ্বাসনালীর ভেতরের আর্দ্রতা কমিয়ে দেয় এবং শ্বাসনালীর স্বাভাবিক পরিষ্কার করার ব্যবস্থা দুর্বল করে। দূষণ এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
প্রশ্ন: সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও কি দূষণ ক্ষতিকর?
উত্তর : হ্যাঁ। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকলে ফুসফুসের ক্ষমতা কমে যায়, ফুসফুস দ্রুত বুড়িয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে হাঁপানি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দূষণের কণা রক্তে প্রবেশ করে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
প্রশ্ন: শীতকালে ফুসফুস সুস্থ রাখার কি উপায়?
উত্তর : কফ কে জমতে না দেওয়া বা জমা স্লেষ্যা কে তরল করে বের করার সব থেকে কার্যকরী উপায় হল ধূমায়িত গরম জলের ভাপ নেওয়া (vapour / steam inhalation)। গরম জলে একটু লবণ ফেলে দিলে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় কারণ লবণাক্ত জলে আর্দ্রকরণ বেশি (humidifying effect)। দিনে দু তিন বার করে ভাপ নিলে পুরো শীতকাল জুড়ে ফুসফুস কে পরিষ্কার রাখা যায়। তাপের ফলে শ্বাসনালীর অববাহিকাগুলিরও প্রসারণ ঘটে শ্বাস নেওয়া সহজতর হয়।
প্রশ্ন: মাস্ক কি সত্যিই কার্যকর?
উত্তর: N95 বা FFP2 মাস্ক সঠিকভাবে পরলে PM2.5 কণার বড় অংশ ছেঁকে ফেলতে পারে। কাপড়ের মাস্ক সম্পূর্ণ সুরক্ষা না দিলেও কিছুটা উপকার করে।
প্রশ্ন: ঘরের ভেতরের বাতাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ঘরের ভেতরের বাতাসও অনেক সময় দূষিত হয়ে পড়ে—রান্নার ধোঁয়া, হিটার, ধূপ বা মশার কয়েল এর কারণ হতে পারে। সঠিক বায়ু চলাচল ও এক্সহস্ট ফ্যান ব্যবহার জরুরি।
প্রশ্ন: খাদ্যাভ্যাস কীভাবে ফুসফুস ভালো রাখে?
উত্তর: ভিটামিন C ও E ফুসফুসের ক্ষতি কমায়, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং জিঙ্ক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। গরম পানীয় কফ পাতলা করতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন: শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম কি সত্যিই উপকারী?
উত্তর: হ্যাঁ। নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায়, শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি শক্তিশালী করে এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা উন্নত করে।শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মধ্যে খুব সহজে যেটা সবাই করতে পারে সেটি হল অনুলোম বিলোম / নাদিশোধন প্রাণায়াম (alternate nostril deep breathing)।
প্রশ্ন: কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
উত্তর: বিশ্রাম অবস্থাতেও শ্বাসকষ্ট, দুই-তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, শোঁ শোঁ শব্দে শ্বাস বা বারবার সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসক স্পাইরোমেট্রি বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।
উপসংহার:
শীতকালীন দূষণ শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি ফুসফুসের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। সচেতনতা, সঠিক অভ্যাস ও সময়মতো চিকিৎসাই পারে আমাদের শ্বাসযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে।



