“We squander health in search of wealth;
We scheme and toil and save;
Then squander wealth in search of health,
But only find a grave.
We live, and boast of what we own;
We die, and only get a stone.”
এই ছড়াটা আমরা অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম, কিন্তু এর প্রতিটা কথা আজও অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। সারাটা জীবন-যৌবন আমরা অর্থ, আরও রোজগারের আশায় ছুটে বেড়াই, শরীর-স্বাস্থ্য-মনকে নিংড়ে, পিষে, ছোবড়া করে ফেলি—নিজের শরীর-মনের কোনও যত্ন করা বা খেয়াল রাখার তোয়াক্কা করি না। কিন্তু একটা বয়স আসে, যখন এই শরীর আর মনকে সুস্থ-সবল-কার্যকরী রাখতে আমাদের উপার্জিত অর্থই জলের মতো ব্যয় করতে বাধ্য হই। কিসের জন্য, কী সেটা, আমরা অনেকেই বুঝি না—গাড়ি-বাড়ি-চাকরি আহরণ করতে সমস্ত বুদ্ধি-মেধা-শক্তিকে নিয়োজিত করি। কিন্তু বিনিময়ে কিছুই হাতে থাকে না একদিন, একটা বয়সে। এই উপলব্ধিটা যদি সময় থাকতে, যৌবন থাকতে আমরা করতে পারি, তাহলে শরীর-স্বাস্থ্যের অপচয় অনেকখানি বন্ধ করা যায়, জীবনকে অনেক বয়স পর্যন্ত উপভোগ্য রাখা যায়।
মানুষ তো আর ছকে ফেলে তৈরি বস্তু নয়। প্রত্যেক মানুষ শারীরিক এবং মানসিকভাবে যেমন ভিন্ন, তেমনই তার বুদ্ধি-বিবেচনা-জ্ঞান এবং জীবনবোধও একক। ফলে মানুষের শারীরিক সমস্যার রকমফের যেমন আছে, তার প্রতিকারের পথও পুরোপুরিভাবে নির্দিষ্ট নয়।
চিকিৎসার পিছনে খরচ বেড়ে যাবার কতকগুলি নির্দিষ্ট কারণ আছে। প্রধানত বাড়তি বয়স, দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক অসুখ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য নিত্যনতুন খরচ সাপেক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার চাহিদা বৃদ্ধি, বাজারের সাধারণ মূল্যবৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত জীবনচর্চা, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি—এই ধরনের অনেকগুলি নির্ণায়ক ফ্যাক্টর চিকিৎসার খরচের অঙ্ক স্থির করে। এর মধ্যে অনেক গুলির ওপরেই আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা, সাধারণ চিকিৎসাপ্রার্থীরা, ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা খরচের শুধুমাত্র ভুক্তভোগী। ফলে নিজেকে কীভাবে যথাসম্ভব সুস্থ রাখা যেতে পারে, কীভাবে অসুস্থতার পেছনে অযৌক্তিক খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে, সেই সিদ্ধান্ত আমাদেরকেই নিতে হবে। কাজটা খুব সহজ নয়, আবার একেবারেই অসম্ভব তাও নয়।
আমরা যারা শহরে বসবাস করি এবং সরকারি কিংবা বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ যাদের হাতে আছে, তারা সক্রিয় রোগ প্রতিরোধের পথে হাঁটতে পারি। অর্থাৎ, নিয়মিত চেক-আপ করানো, স্ক্রিনিং টেস্টগুলির সাহায্যে নিজেদের স্বাস্থ্যের স্থিতি বিষয়ে সময় থাকতে অবগত হতে পারি। এই বিষয়ে আমাদের পারিবারিক চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে এগোনোটাই বিবেচনার কাজ হবে। এছাড়াও বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধাকে কার্যকর ভাবে ব্যবহার করবার অভ্যাস আয়ত্ত করতে হবে, প্রয়োজনে শিখে নিতে হবে এগুলির ব্যবহার। স্বাস্থ্য বিমার সঠিক নির্বাচন এবং ব্যবহারের বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে সেই মতো পরিকল্পনা করে পলিসি নির্বাচন হবে। স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টা নামে পরিষেবা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখন ক্রয়যোগ্য পণ্য। ফলে তার যথাযোগ্য নির্বাচন আর ব্যবহার দুইই করতে হবে অত্যন্ত সচেতন ভাবে।
স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যাপারটাকে আর হাল্কাভাবে নেওয়ার দিন শেষ হয়ে এসেছে। অসুস্থতা মানেই রোজগারে বাধা। অসুস্থতা মানেই জমানো পুঁজিতে হাত। আমাদের ছোট-ছোট, বিচ্ছিন্ন সব সংসারে অসুস্থ মানুষকে দেখার কেউ নেই। ফলে দীর্ঘ জীবন পর্যন্ত যারপরনাই ভাবে সুস্থ শরীর ধরে রাখাটাই প্রাথমিক শর্ত। দীর্ঘমেয়াদি ভারি খরচের চাপ এবং মানসিক টানাপোড়েনের অনেকখানি এই সব পদ্ধতিতে সামলে রাখা সম্ভব।
অবশ্যই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রধান নির্ধারক হল প্রয়োজন। অসুস্থ না হলে কেই বা অসুখ নিয়ে কথা বলে বা খোঁজখবর করে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, চিকিৎসার খরচকে সাধ্যের মধ্যে ধরে রাখার জন্য আরেকটা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হল সঠিক তথ্য সংগ্রহে রাখা। আপৎকালীন ব্যবস্থাপনার জন্য অপেক্ষা না করে পরিকল্পনা মাফিক ব্যবস্থা করা থাকলে, নিজের বিপদ যেমন অনেকখানি এড়ানো যায়, পরিবারের অন্য সদস্যদের হয়রানিও কম করার উপায় থাকে। যে সকল নাগরিকের মধ্যে সেই শিক্ষা, সচেতনতা এবং তথ্য আদান প্রদান করার উপায় আছে, অন্তত তাদের ক্ষেত্রে সঙ্কটকালীন জরুরি ব্যবস্থা করা কিংবা খোঁজ খবর করার থেকে কিছু বিষয়ে অন্তত আগে থেকে ওয়াকিবহাল থাকলে ভালো। প্রয়োজনের সময় মিথ্যে হয়রানি আর অযথা অর্থব্যয় এতে কিছুটা সামলানো যেতে পারে। নিজের শহরে বা গঞ্জে স্বাস্থ্য পরিষেবার কেমন বন্দোবস্ত, কোথায় কী সুবিধা-কী অসুবিধা, কোথায় কেমন খরচ, কোথায় কেমন উপভোক্তা-প্রতিক্রিয়া—এইসব তথ্য জোগাড় করা আজকাল ঘরে বসেই অনেকখানি সম্ভব।
কিন্তু আমাদের সমাজেই একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ আছেন, যাদের কাছে এই ধরনের তথ্য সংগ্রহের সুবিধা একেবারেই নেই। এরা সেই সব মানুষ, যাদের অবস্থান সমাজের নীচের দিকে। তাদের না আছে শিক্ষার, না অর্থের, না প্রযুক্তির জোর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের জীবনে অসুস্থতা একটা অভিশাপ হিসেবে দেখা দেয়। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে তাদের ঘটিবাটি বিক্রির উপক্রম হয় এবং বহু পরিবার এইভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়। এই শ্রেণি প্রধানত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরেই নির্ভরশীল, কিন্তু সেই পরিষেবা সঠিকভাবে না পেলে তাদের পথে বসার উপক্রম হয়। অথচ এদের অধিকাংশ অসুখবিসুখ কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য। হয় সঠিক পুষ্টি বা সুষম খাদ্যের অভাব, বা অপরিচ্ছন্নতা এবং অজ্ঞতা জনিত সংক্রমণ এদের বিভিন্ন বয়সে অসুস্থ করে তোলে।
এই সমস্ত ব্যাধিকে হাতে সময় থাকতে অনেক কম খরচে আয়ত্তে রাখা সম্ভব। সেই ব্যবস্থা করলে যেমন দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর চাপ কমে, তেমনি ব্যক্তিগত স্তরের খরচ, হয়রানি এবং অবশ্যই বৃহত্তর ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। আমাদের মতো দেশের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা গুলির রূপরেখা প্রধানত এই শ্রেণির মানুষজনের কথা ভেবেই করা উচিত। পর্যাপ্ত সংখ্যার সরকারি হাসপাতাল, চিকিৎসক এবং নার্স, অল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে যথাসম্ভব শীঘ্রতার সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা, বিভিন্ন অস্ত্রপ্রচার এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিস্থাপনের যথাযোগ্য ব্যবস্থা থাকাটাই কাম্য। তবে বাস্তব চিত্রের সঙ্গে আদর্শগত অবস্থার ব্যবধান যে সাংঘাতিক, এটা লুকিয়ে রাখার কোনও জায়গা নেই। যতদিন না এই ফাঁক পূরণ করার মতো ক্ষমতা রাষ্ট্র অর্জন করতে পারছে, ততদিন অন্তত স্বাস্থ্য সচেতনতা শিবির, স্কুল হেল্থ প্রোগ্রাম, মাদার-চাইল্ড ক্লিনিক, টিকাকরণ, নেশামুক্তি সহায়তা কেন্দ্র—এই ধরনের প্রতিরোধ মূলক কর্মসূচিতে জোর দিয়ে যেতেই হবে। তাতে কিছুটা হলেও রোগ-ব্যাধির বোঝা কমানো সম্ভব হবে।
সমাজের চাহিদা এবং চাপ বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যেও হাই প্রেশার, ডায়াবিটিস, ফ্যাটি লিভার, কিডনির অসুখ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নেশা এবং শরীরচর্চার অভাব এক্ষেত্রে সাংঘাতিক ত্রুটি। প্রধান কারণ সচেতনতার অভাব। তাই উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা দেবার যদি ঘাটতি থাকেও, বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে মানুষকে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য এবং শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা অসাধ্য কাজ নয়। এই সামান্য সুপরিকল্পিত পন্থা আন্তরিকতার সঙ্গে যদি কার্যকর করা যায়, তাহলে অভাবনীয় ফলাফল হতে পারে। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে জনস্বাস্থ্যের দুর্বিষহ ছবিটা আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব, যদি রোগ প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গুলিকে অন্তত জোরদার করা যায়। হতাশার জায়গা এই খানেই যে স্বাস্থ্যপরিষেবা ব্যবস্থা এমনই এক অসাধু ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং বৃহৎ পুঁজি নিয়ে তারা সমস্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এমনভাবেই প্রভাবিত করছে যে তুচ্ছতম-দরিদ্রতম মানুষদের বেঁচে থাকার অধিকারই যেন বাতিল করার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রের আকার নিচ্ছে দিনে দিনে।
আমরা স্বাস্থ্যের সঠিক সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করলাম। স্বাস্থ্যরক্ষার উপকারিতা এবং উপায় নিয়ে কিছু কথা জানলাম। “স্বাস্থ্যই সম্পদ”—এই আপ্ত বাক্যের সত্যতা বুঝলাম। এর পরে আমরা কিছু প্রাথমিক শারীরিক সমস্যা-সংক্রান্ত বিষয়ে জানার চেষ্টা করব।
(চলবে)



