সুস্থতা কি এবং কেমন? – পর্ব ১

স্বাস্থ্য1

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। ইওরোপের দেশগুলির অধিকাংশ পুরুষ জনসংখ্যা উজাড় হয়ে গেছে। বিপুল এই ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়েও বিশ্ব ঘুরে দাঁড়াতে চাইল। ১৯৪৮ এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সুস্বাস্থ্যের সংজ্ঞা প্রকাশ করল। কি বলা হল সেখানে? বলা হল সুস্থতা বা সুস্বাস্থ্য এমনি একটি অবস্থা যেখানে কোনপ্রকারের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অসুস্থতা কিংবা স্থবিরতার উপস্থিতি নেই। “স্বাস্থ্য হল সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি অবস্থা, এবং কেবল রোগ বা দুর্বলতার অনুপস্থিতি নয়”। এই প্রথম স্বাস্থ্যের প্রতি একটা অনেক বড় সামগ্রিক দৃষ্টি দেওয়া হল যেমন আগে কেউ ভাবেনি। মানসিক বা সামাজিক সুস্থতার দিকটা ইতিপূর্বে সেভাবে আলোচনায় উঠে আসেনি, ববং সে বিষয়গুলিকে ঘিরে বেশ কিছুটা ট্যাবু কাজ করত।
কিন্তু এই সংজ্ঞাও কি সম্পূর্ণ হল? গত শতকের শেষ দিক থেকে এই শতকের প্রথম চতুর্থাংশ সময়ের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মানুষের চিন্তা ভাবনার গতি প্রকৃতি যে ধারায় এবং যে গতিতে বদলেছে তাতে সুস্বাস্থ্যের এই সংজ্ঞাকে আর সম্পূর্ণ বা নির্ভুল বলা চলে না।
একটা উদাহরণ দিলে বোঝাতে সুবিধা হবে। ধরা যাক একজন ডাউন সিনড্রম আক্রান্ত কিশোরী চমৎকার গানের অনুষ্ঠান করছে, ইউ টিউবে তার চ্যানেলে প্রচুর সাবস্ক্রাইবার। কিংবা ব্রেস্ট ক্যানসার সারভাইভার একজন স্কুল শিক্ষিকা যিনি নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন, পরীক্ষার খাতা দেখছেন, সংসার সামলাচ্ছেন। আবার নিয়মিত কিছু সময় অন্তর তিনি কেমো থেরাপি নিচ্ছেন। বা একজন বাইপোলার ডিসঅর্ডার আক্রান্ত গবেষক যিনি ওষুধের সাহায্যে নিজের সমস্যাগুলো কব্জা করে নিয়মিত কাজ এবং পাবলিকেশন করে চলেছেন। এদের প্রত্যেকে কিন্তু সুস্থ মানুষ, যদিও প্রত্যেকেই সাংঘাতিক রোগের সঙ্গে মোকাবিলা করে সুস্থ থাকার লড়াইয়ে জিতে চলেছেন প্রতিদিন।
অতএব আজকের এই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে সুস্থতা সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে বাধ্য। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে পেনিসিলিন এবং অন্যান্য এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পরে এককালীন সংক্রামক অসুখগুলিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওষুধের সাহায্যে সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করার ঘটনা বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করে দিয়েছে জীবনধারা রোগের মহামারী বা লাইফস্টাইল ডিজিজ। প্রেশার, সুগার, সিওপিডি বা ক্যান্সারের মতন সব দীর্ঘমেয়াদি বা জীবনব্যাপী অসুখ যাদের আমরা সম্পূর্ণরূপে সারাতে পারিনা কিন্তু চিকিৎসা পদ্ধতির দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারি। তাহলে কি এই দ্বিতীয় দলের মানুষজনকে কি আমরা বাতিলের পর্যায়ে ফেলে দেব? আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতায় প্রত্যেকের পরিবার বা পরিচিতের মধ্যে বহু মানুষ আছেন যাদের শরীরে এই সব অসুখ বাসা বেঁধে থাকলেও তারা খুব স্বাভাবিক গতিতেই প্রতিদিনের জীবন যাত্রা পালন করে চলেছেন, নিয়মিত ওষুধ এবং সঠিক জীবন শৈলীর সাহায্যে।

সুস্থতা অথবা অসুস্থতা—এই বাইনারি থেকে মুক্ত হবার সময় এসেছে আমাদের। অসুখকে সঙ্গী করেও কার্যক্ষম জীবন চালাচ্ছেন অনেক মানুষ। ফলে এখন সুস্থতার একটা বিস্তৃত পরিসর বা স্পেট্রাম নিয়ে কথা বলা হয়। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত অপরিহার্য পরিবর্তনের ফলে সুস্থতার সংজ্ঞাটাই ক্রমে বদলে যেতে থাকে। সেটা উপলব্ধি করেই সম্ভবত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার আগের সংজ্ঞাটি যে নিতান্তই একটা চূড়ান্ত আকাঙ্খা বা কষ্টকল্পনা ছিল সেটা বুঝতে পারছিল। ফলে ১৯৮৬ আর ২০০১ এ সংজ্ঞার পরিমার্জন করা হয়। ১৯৮৬ এ স্বাস্থ্যকে বলা হয় প্রতিদিনের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ, বেঁচে থাকার একমাত্র অভীষ্ট নয়। আর এই সম্পদের ধারণা থেকেই স্বাস্থ্যকে সযত্নে রক্ষা করা বা প্রতিপালন করার অভ্যাসগুলি মানুষের তৈরি হতে থাকে। স্বাস্থ্যকর খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, সম্পূরক আহার, নেশা বর্জন ইত্যাদির মতন বিষয়গুলি নিয়ে সচেতনতা আর চর্চা আরম্ভ হল। এরপরে ২০০১ এর সংজ্ঞায় স্বাস্থ্যকে শারীরিক সক্রিয়তা এবং অক্ষমতা থেকে স্বতন্ত্র করে দেখার সময় এল। এখানেও একটা সামগ্রিক ছবি তুলে ধরা হচ্ছিল এবং স্বাস্থ্য যে বিভিন্ন গুণকের ছাতার তলায় এক বিশেষ অবস্থান সেই কথা তুলে ধরার চেষ্টা ছিল।
তবু যেন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য বিষয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষের এবং সরকারগুলির চিন্তাভাবনা আর সামগ্রিক অবস্থানের কোথাও তালমিলের অভাব হচ্ছিল। আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে স্বাস্থ্য বিষয়টির ধারণা সম্পূর্ণ করতে পর পর আরও কিছু সংজ্ঞা উঠে এসেছিল। যেমন ২০০৬ তে সার্টোরিয়ার্স স্বাস্থ্যকে সুস্থতা আর অসুস্থতার মাঝামাঝি একটি কার্যকরী স্থিতাবস্থা বলে উল্লেখ করলেন। ২০০৯ তে বিখ্যাত ল্যান্সেট পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে বলা হল বিভিন্ন প্রকারের শারীরিক বা মানসিক পীড়নের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে একটি কার্যকর স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসার জন্য যে সমন্বয় প্রয়োজন সেই গতিশীল অবস্থার নামই স্বাস্থ্য। ২০১৬ তে গবেষক হুবার এবং তার দল যথেষ্ট নতুনত্ব নিয়ে এলেন তাদের বিবেচনায়। তারা বললেন সুস্থতার দায়িত্বটা মূলত ব্যক্তিগত পর্যায় পড়া উচিত। একজন ব্যক্তি কতদূর পর্যন্ত অসুস্থতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে নিজের কাজের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেকে সুসংগঠিত করতে পারবেন সেই ক্ষমতা বা শক্তিকেই স্বাস্থ্য বলা উচিত। এই ক্ষমতা যেমন শরীরের, ততটাই মনের এবং দৃষ্টিভঙ্গির এবং অবশ্যই সমাজবদ্ধ কার্যকলাপে অংশ নেওয়ার শক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করল তারা।

এইভাবে গত এক শতকে স্বাস্থ্যের মতন একটা অতি অপরিহার্য অতি পরিচিত ধারণার সংজ্ঞা অদল বদল হয়ে কল্পনায় ধরতে চেষ্টা করে চলেছে তার সামগ্রিক চেহারাটা। মামুলি রোগ ব্যধি অঙ্গহানির জ্বালা যন্ত্রণার উর্ধে উঠে মানসিক সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবং স্বাস্থ্য যে ব্যক্তিগত সম্পদ এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতার উৎস এবং প্রকাশ সে কথাও বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যের অধিকার যেমন মৌলিক অধিকারের তকমা পেয়েছে তেমনি সুস্থ থাকার শর্ত হিসেবে ব্যক্তির দায়িত্ব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে।
পর পর সংজ্ঞার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরও যে নতুন ধারণাগুলির গুরুত্ব বোঝা যেতে আরম্ভ করল, সেগুলির মধ্যে একটি হল জনস্বাস্থ্য। সুস্থ থাকার জন্য স্বাস্থ্যকে যে ব্যক্তিগত পরিসরে আটকে রাখা যায় না, এবং আমরা যে আমাদের সুস্থতার জন্য পরস্পরের ক্রিয়াকলাপের ওপরে নির্ভর করি সেই যোগসূত্রগুলি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। যেমন কারখানার বর্জ্য রাসায়নিক নদীর জলে মিশে নিম্নধারায় বসবাসকারী মানুষজনের অসুস্থতার কারণ হয়ে ওঠে। কিংবা প্যাসিভ স্মকিংয়ের এক কারণে ধূমপানকারীর পরিবারের অন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। আরেকটি বিষয় যার অপরিসীম গুরুত্ব বেড়ে গেল তা হল প্রিভেন্টিভ মেডিসিন। শিশুবয়সে শেখা একখানা শিক্ষা যেন মূর্তিমান সত্যের মত সামনে এসে দাঁড়াল। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। খুব পরিষ্কার ভাবেই রোগ প্রতিরোধের গুরুত্ব বোঝা যেতে লাগল এবং অধিকাংশ অসুখই যে যথাযথ আগাম ব্যবস্থা নিলে প্রতিরোধ করা সম্ভব সে সত্যটা অস্বীকার করার উপায় থাকল না। জনমুখী সরকারগুলিও সম্যক উপলব্ধি করতে আরম্ভ করল যে যথার্থ প্রতিরোধমূলক নীতি আরোপ করতে পারলে জনস্বাস্থ্যে ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। ব্যক্তিগত স্তরে, স্কুল বা অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও সুস্বাস্থ্য রক্ষা করার তাগিদে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপরে জোর দেওয়া শুরু হল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন স্বাস্থ্যের সংজ্ঞা প্রকাশ করেছিল তখন সে ছিল একটা যুগান্তকারী ঘটনা। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু কিছু ভ্রান্তি পরিষ্কার হতে লাগল। সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থা মানে সব ধরণের অসুস্থতা নাস্তি। এই অবস্থায় পৌঁছতে গেলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকের উপরে নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে হবে। স্বাস্থ্যের অধিকার বা দায়িত্ব তখন আর ব্যক্তির হাতে থাকল না। গত এক শতকের মধ্যে মানুষের গড় আয়ু অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকখানি বয়স অব্দি একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে রোগ মুক্ত থাকবে এই আশা করাটা অনেকখানি অবাস্তব। বরং পরিবর্তিত পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজের শরীর মনকে সচল এবং কার্যকরী রাখার ব্যাপারটা অনেকখানি বাস্তব সম্মত। যথার্থভাবে দৈহিক, মানসিক, সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলিকে মোকাবিলা কোরতে পারাটাই আজকে স্বাস্থ্যের সূচক।

অনেক বেশী বাস্তবসম্মত, প্রাসঙ্গিক এবং লাভজনক একটি ধারণা নির্ধারণ করতে গেলে আমাদের শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির নিজস্ব বা জনগোষ্ঠীর আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা, স্থিতিশীলতা, মানিয়ে নেবার ক্ষমতা, নতুন চিন্তা ভাবনা বা নতুন জীবন চর্চায় অভ্যস্থ হয়ে ওঠার ইচ্ছেশক্তি কিংবা অনিশ্চিত পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার জোর — এই বিষয়গুলিকে নিয়েই আরও চর্চা করতে হবে। সাম্প্রতিক কোভিড অতিমারির সময়ে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন প্রকারের অবস্থা দুরবস্থা, আবার সামলে ওঠার লড়াই প্রত্যক্ষ করেছি। প্রত্যক্ষ করেছি কিভাবে কোনরকম ওষুধের আশ্বাস ছাড়া আমাদের শূন্য হাতে লড়তে হয়েছে একমাত্র ব্যক্তিগত প্রতিরোধের অস্ত্রকে ভরসা করে। তারপরে এসেছে টিকা , সেও আরেক ধরণের প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এত অতর্কিত এবং ব্যাপক আক্রমণের পরেও কিন্তু মানুষ উজাড় হয়ে যায়নি। অনেক অসুখ অনেক মৃত্যুর ধাক্কা সামলে নিয়েও সামগ্রিক ভাবে সে জিতে গেছে।

স্বাস্থ্য এমন একটা অবস্থা বা স্তর যেখানে পোঁছতে এবং পাকাপাকিভাবে অবস্থান করতে অভিলাষী আমরা সবাই। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের পরিবেশ পরিস্থিতি ভিন্ন প্রকৃতির এবং প্রতিটা ক্ষেত্রেই তা যেন ভাল মন্দের, সহজ এবং কঠিনের অনন্য এক একটি একক সংযোগ। শেষ পর্যন্ত আমরা প্রত্যেকে কিভাবে এই সমস্ত পরিস্থিতি মানাতে, সামলাতে এবং অতিক্রম করতে পারছি সেটাই হবে আমাদের সুস্থতার নির্ণায়ক।

(চলবে)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top