চন্দ্রাণী গোস্বামীর কয়েকটি কবিতা

কফি হাউসে বসে

পূর্বাশ্রম 

কফি হাউসে বসে একদিন খুব বিদ্রুপ করেছিলে
আমি দেরিদা পড়িনি, ইউলিসিস কার লেখা বলতে পারিনি
—অবন ঠাকুরকে দেখলেই বুড়ো আঙলার জন্য কেঁদে বুক ভাসাই।
এখন বিকেলবেলা তুমি বৃষ্টি এলে জলের ভেতর ছপছপ করে একা হেঁটে যাও
চুপ করে দাঁড়িয়ে মেট্রো সিটি তোমায় দেখে— মাঝে মধ্যে দুলে ওঠে
আমি রোজ আটটা তেত্রিশের ডাউন ট্রেন ধরে ঘরে ফিরে মুড়ি বাদাম খাই
হার্টের অসুখ নেই কোনো, আর
কাঁপা আলোয় দেখি বউয়ের নাকফুলে তোমার মুখ জোনাকের মতো জ্বলে—
                  আমি কি তোমায় তখন চিনেছিলাম সঠিক?

যে অঙ্ক বুঝিনি

ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ মুখে জ্বলন্ত সিগারেট, জ্বলে গিয়ে নিভে যাচ্ছি সূর্যের ছাইয়ের মতন।
মনোবিদের কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলে—
এসবই বলেছিলাম। ফলে আমার জটিল অভ্যাস থেকে তোমাকে খানিকটা ছেঁটে দিতে চাইলেন ডাক্তারবাবু।
কিন্তু এখানে তো বৃষ্টি পড়ে বারোমাস। ভোর থেকে রাতভর শুধু অন্ধকার।
গমের ক্ষেত, আর মিউনিসিপ্যালিটির স্কুলের বাথরুমে ঝুঁকে থাকে একটা পুরুষ গাছ।

সেদিন খুব গান গাওয়া হয়েছিল। এবং টিফিনবক্স খুলে লুচি, হাঁসের ডিম আর বোঁদে—
হয়তো এমন কিছুই হয়নি, তবু এইসব পথ ধরে তোমার কাছে পৌঁছনো
হয়তো স্বপ্নেরই ভেতর—

একটা পূবমুখী জানালা খোলা— পাশে ঝাঁকড়া জামগাছ আর একটা কালো বেড়াল বিরস মুখ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। 

অনুরাগ 

কি দ্যাখো তুমি আয়নার মধ্যে?
কি এতো কথা বলো সোয়েটের টিপের সঙ্গে?
আমি যে এতক্ষন ধরে চেয়ে আছি তোমার দিকে
তার কোনো দাম নেই?
আমার চেয়ে থাকা আমার চোখ বুজে ফেলা
কিংবা আমার চিরকালের জন্য চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া—
কোনো দাম নেই?
তুমি কেমন স্ত্রীলোক? কোন পুরুষের সঙ্গে ঘর করো?
সে কি আমার চেয়েও সক্ষম পুরুষ?
ইচ্ছে করে একদিন তোমার আয়না হব আর লাঠি তুলে দেব
তোমার হাতে; তুমি আঘাত করে কাঁচ ভাঙবে
ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে, আর আমি
সেই রাতে জাপটে ধরে তোমায় শতেক চুমু খাব
বশ মানা কুকুরের মতো গুটিয়ে আসবে আমার বুকে
তোমার স্তনে মুখ দিয়ে চাঁদ ধরব হাত দিয়ে
জ্যোৎস্না! আহা জ্যোৎস্না
হরিণ! আহা হরিণী
মিলন! আহা রতি সুখ
বালাই ষাট, আয়না আর ভাঙবে না
মুখ দেখবে তুমি আমাতেই
দূরে, খানিক দূরে 
এক উন্মাদ শিকারী তার অস্ত্র নামিয়ে
মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।

দ্বিধার শেষে

কোনদিকে তাকালে, ঈশ্বর না প্রজাপতি!
কাকে বিষাদ জানালে, ইতর নাকি আগরবাতি!
দূরে দূরে নৌক’র পর চেয়ে মেয়েটিকে ভালো লাগলে
অনির্দিষ্ট ছপ ছপ শব্দ করে ঘরেই না — হয় ফিরলে
ঘড়া দিয়ে জল ঠেলে দিলে তারই তো শব্দ ওঠে ছলছল 
কী ভাবছো, পূর্ণতা চাও নাকি শূন্যতার দোলাচল!

এসো, মধ্যাহ্নে প্রকৃতি দেখি, দেখবে দুই কি একটা পাখি ডাকে
ওকে ভালোবাসো, তারপর প্রিয়তম অপমানগুলো মৌমাছির
গুনগুন বাতাসে ভাসিয়ে নিয়ে ভাত খাও, আপন ছন্দে
       মায়ের মমতায় প্রিয় পুরুষকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও

হৃদপদ্মে।

রবীন্দ্রনাথ ও আত্মহত্যা

রবীন্দ্রনাথ এসেছেন শহরের সবচাইতে সরু গলিতে
ঠিক করেছি
এ’বার একা যাব

আমাদের গানের ইস্কুলের বন্ধুদের
এখন সন্ধেবেলা—
সবাই চপ মুড়ি ও চা খাচ্ছে, অতএব
ওদের ডাকা বৃথা

তোমার গানের শরীরের ভেতরে আমার শরীর ঢুকেছিল—-
গেয়েছিলাম,
“চরণ ধরিতে দিও গো আমারে…”

ট্রামলাইনে দাঁড়িয়ে ভদ্র এক মহিলার চোখে বালি

ওমা! আমার দিকে অমন তাকাচ্ছ কেন?
তোমার পায়ের চটিটা ঠিক আছে কিনা
দেখব বলেই তো 
নিচু হয়েছি

আমাদের শহরে রবীন্দ্রনাথ এসেছেন, আর তুমি এসময়
তোমার পা লুকিয়ে নিচ্ছ!
চরণ ধরিতে…. শুনবে না বলে!

তুমি গানের ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছ আটশো তেত্রিশ দিন
শুধু কুয়াশা ঢাকা 
তোমার অস্পষ্ট বোবা শরীর
কিন্তু সুর তোমার খাসা
দিগন্তের মতো সব, সব ছুঁয়ে দেয় আজও—

রবীন্দ্রনাথ’ই তো আমাকে বলেছেন একথা 

এসব ভেবে ভেবেই আটশো তেত্রিশ দিন চলে গেল—

আমি আজও আত্মহত্যা করিনি।


1 thought on “চন্দ্রাণী গোস্বামীর কয়েকটি কবিতা”

  1. Nikhil Kumar Chakrobarty

    চন্দ্রাণীর কবিতা আমার খুব প্রিয়। প্রত্যেকটা কবিতা আলাদা আবেদন রেখে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top