আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্টেটের ছোট এক শহরের সামান্য চিকিৎসক আমি। ভার্জিনিয়ায় গত কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা ভয়ংকরভাবে কমে গেছে— মাইনাস ৭ থেকে ১২ ডিগ্রির মধ্যে। সন্ধ্যা হলেই চারদিক অস্বাভাবিক রকম অন্ধকার আর জমাট ঠান্ডা। এত ঠান্ডার কারণে বাইরে দুই মিনিটের বেশি দাঁড়ানোই অসম্ভব, সবচেয়ে ভারী কোট আর টুপি পরেও না। ফলে আমাদের ক্লিনিকে রোগীর সংখ্যাও ছিল খুব কম, সেদিন দুপুরটা বেশ নিরিবিলি ছিল।

ঠিক সেই সময় আমি অবাক হয়ে গেলাম, যখন একজন রোগী তার ৭৪ বছর বয়সী বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ক্লিনিকে এলেন। রুমে ঢুকেই ভদ্রমহিলা বললেন, তিনি বরফ জমে থাকা ফুটপাত পরিষ্কার করতে গিয়ে পা মুচড়ে ফেলেছেন। তারপর থেকেই তার পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। তার ধারণা, হয়তো গোড়ালি বা হাঁটু মচকে গেছে— বা “আরও ভেতরের কিছু” —তাই তার এক্স-রে দরকার।

আজকাল এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার— রোগীরা নিজেরাই বলে দেন আমাদের কী করতে হবে। গুগল, সোশ্যাল মিডিয়া, আর এখন তো ChatGPT-ও আছে। অনেক সময় মনে হয় রোগীরাই সব জানে, আমরা না জানলে তারা প্রশ্ন তোলে কেন আমরা তাদের চাওয়া টেস্ট লিখছি না। তখন সত্যিই মনে হয়— মেডিকেল স্কুল, রেসিডেন্সি, দশ বছরের পড়াশোনার মানে কী? শুধু ChatGPT পড়লেই তো ডাক্তার হওয়া যেত!

কিন্তু না— সেদিনের এই রোগীই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আমি তর্ক করিনি। হাসিমুখে বললাম, “অবশ্যই এক্স-রে করব। তবে তার আগে একটু আপনার পা টা দেখি।”


আমি তাকে জুতো-মোজা খুলতে বললাম, প্যান্ট হাঁটুর ওপর পর্যন্ত তুলতে বললাম— আমি হাঁটু, পা, আর বিশেষ করে পায়ের পেছনের অংশটা দেখতে চেয়েছিলাম। কারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা সেখানেই।
যেই মুহূর্তে আমি তার পায়ের পেছনে হাত দিলাম, বুঝে গেলাম— ওটা ইটের মতো শক্ত, গরম, আর ফুলে আছে।
সেই মুহূর্তে আমার মাথার ভেতর পুরানো রেকর্ডের মত বেজে উঠল আমার রেসিডেন্সির প্রিয় (এবং ভয়ংকর) শিক্ষক ডা. স্টাইনের কণ্ঠ। আমরা সবাই তাকে ভয় পেতাম। তিনি প্রতিদিন আমাদের ‘হ্যারিসন’ (ইন্টারনাল মেডিসিনের অভিধান) থেকে ১০ পৃষ্ঠা পড়তে দিতেন। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, প্রায় অজ্ঞান হওয়ার অবস্থায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতেন।
একদিন তিনি এই লক্ষণগুলোর কথা শেখাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন,

“যদি তোমার চেম্বার থেকে একজন রোগীও এই রোগ নিয়ে বেরিয়ে যায়, আর তুমি সেটা ধরতে না পারো —তাহলে কখনো বলবে না তুমি আমার ছাত্রী ছিলে। তুমি ডাক্তার হওয়ার যোগ্য নও।”
অদ্ভুত ব্যাপার— ডক্টর স্টাইনের সব প্রশংসা আমি ভুলে গেছি, কিন্তু সেই কঠিন কথাটা ১৪ বছর ধরে আমার মনে গেঁথে আছে।
আমি তখনই বুঝে গিয়েছিলাম— এই রোগীর এক্স-রে নয়, আল্ট্রাসাউন্ড দরকার। তবুও বাস্তবে মাঝেমধ্যে একটু সমঝোতা করতে হয়। আমি গোড়ালির এক্স-রে করালাম, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা করলাম তার মেয়েকে— পরিবারে কারও রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা আছে কি না। সে বলল, —না।
তবুও আমি ভেনাস ডুপ্লেক্স আল্ট্রাসাউন্ডের অর্ডার দিলাম।
পরের দিন সকালে অফিসে ঢুকেই দেখি— আল্ট্রাসাউন্ড ডিপার্টমেন্ট থেকে সাতটা ফোন। রোগীর পায়ে বিশাল রক্ত জমাট (extensive clot) ধরা পড়েছে। তাকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে পাঠাতে হবে।
এই রোগটার নাম ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (DVT)— একটা নীরব ঘাতক। যদি এটা ধরা না পড়ে, রক্ত জমাটটা ফুসফুসে চলে গিয়ে জীবন শেষ করে দিতে পারে।
ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস (DVT) হলো শরীরের গভীর শিরায়, সাধারণত পায়ে, রক্ত জমাট বাঁধার একটি গুরুতর অবস্থা। এর ফলে পা ফোলা, ব্যথা, লালভাব এবং চামড়া গরম হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকা, সার্জারি বা নির্দিষ্ট রোগের কারণে এটি হতে পারে। প্রধান চিকিৎসা হলো রক্ত পাতলা করার ওষুধ।
- প্রধান লক্ষণ :
- পায়ে বা পায়ে অসহ্য ব্যথা ও খিঁচুনি
- আক্রান্ত স্থানে অস্বাভাবিক ফোলাভাব (সাধারণত এক পায়ে)
- ত্বকের রং পরিবর্তন (লাল বা কালচে) এবং স্পর্শে উষ্ণ অনুভব হওয়া ।
- কারণ ও ঝুঁকির কারণ :
- দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয়তা : দীর্ঘ ভ্রমণে বা শয্যাশায়ী থাকলে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়
- সার্জারি বা আঘাত : হিপ বা পায়ের অস্ত্রোপচারের পর
- অন্যান্য ঝুঁকি : ক্যান্সার, গর্ভাবস্থা, কিছু ওষুধ, এবং স্থূলতা
- জটিলতা : যদি জমাট বাঁধা রক্ত ফুসফুসে চলে যায়, তবে তা পালমোনারি এম্বোলিজম (PE) নামক জীবনঘাতী অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে, যার লক্ষণ হলো বুক ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, এবং মাথা ঘোরা।
- রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা :
- সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ড বা ডি-ডাইমার (D-dimer) টেস্টের মাধ্যমে এটি নির্ণয় করা হয়।
- চিকিৎসা : রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন: হেপারিন, ওয়ারফারিন) দিয়ে রক্ত জমাট বাধা রোধ করা হয়
আমি অনেক কিছু নিয়ে গর্ব করি না জীবনে, কিন্তু এই একটা জিনিস নিয়ে করি— সেটা হল বিপদের ঝুঁকি শনাক্ত করার অদ্ভুত ক্ষমতা। বিশেষ করে আমার ভারতীয় বন্ধুদের বাবা-মায়েরা, যারা ২৩ ঘণ্টা ভ্রমণ করে ভারতে থেকে এখানে আসেন। দু-একদিন পর এসে বলেন, “পায়ে একটু ব্যথা। তেমন কোন ব্যপার নয়, এদেশে আপনাদের বড্ড পুতুপুতু বাই, ছেলে-মেয়েরা ভাবে— অযথা চিন্তা, একটা আইবুপ্রোফেন দিলেই হবে।”

আমি তাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পা ছুঁয়ে দেখি। আমি সেই নীরব ঘাতককে অনুভব করতে পারি। তার পরিকল্পনা বুঝতে পারি— ধীরে ধীরে উপরে উঠে ফুসফুসে যাওয়ার।
ডিভিটির সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো— ১০–১২ ঘণ্টার বেশি সময় একটানা বসে থাকা, যেমন লম্বা ফ্লাইটে। এছাড়া হতে পারে :
- রক্ত জমাট বাঁধার জেনেটিক সমস্যা (যেমন ফ্যাক্টর ফাইভ)
- দীর্ঘদিন হাসপাতালে শুয়ে থাকা
- সার্জারির পর
- ভ্যারিকোস ভেইন
- পায়ে আঘাত
সবচেয়ে সাধারণ জায়গা হলো হাঁটুর পেছন। সেখানে হাত দিয়ে যদি শক্ত, গরম, আর ফুলে থাকা অনুভব করেন— এক মুহূর্তও দেরি করবেন না। কাছের হাসপাতালে গিয়ে আল্ট্রাসাউন্ড করান।


একদম ভাববেন না যে শুধু বয়স্ক লোকেদের ই হয়। কম বয়সী কোনো মেয়ে বা ছেলে যদি বলে বুকের পাঁজরের মাঝখানে একটা তীব্র ব্যথা। অবহেলা করবেন না। তাদের ক্ষেত্রে আরো মারত্মক যেটা হয় তার নাম স্যাডেল এম্বোলাস। ঘোড়ার জিনের মত দুমুখো ব্লাড ক্লট শিরা কে ব্লক করে দেয়। প্রেগন্যান্সির পর খুব দেখা যায়।
বয়স্কদের যাদের এই ক্লট বারবার হয় তাদের ফিমোরাল, পায়ের থাই এর জায়গায় একটি আই ভি এফ ফিল্টার দিয়ে দেওয়া হয় যাতে ক্লট উপরে ফুসফুসের দিকে না যেতে পারে।
সবশেষে বলি যে সবচেয়ে আশঙ্কার তাদের নিয়ে যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, ব্যালেন্স সমস্যায় ভুগছেন এরকম ষাট বছরের বেশি বয়সের মানুষজন। এরা প্রায়শই পড়ে যান আর মাথায় আঘাত লাগে। সেই ব্লিডিং বন্ধ করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং ব্যপার।
যারা দেশ থেকে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হবে বলে ২৩ ঘন্টা ফ্লাই করে আসেন, প্লেনের মধ্যে প্লীজ হাঁটাচলা করবেন। বসে বসেও পায়ের পাতা, পা নাড়াবেন।
আর ডাক্তারের কাছে যখন যাবেন সব সমস্যা খুলে বলবেন। বলা যায়না ডক্টর স্টাইনের আমারই মত কোন ছাত্র বা ছাত্রী হয়তো কান খাড়া করে শুনছে। স্যার বলতেন প্লীজ শোনো রোগী কি বলছে। দ্য স্টোরি টেলস ইউ অল। যদি পেশেন্ট ঠিক চিকিৎসা না পায় তবে হু লুকস স্টুপিড? নান বাট ইউ। মনে করবে আমি বন্দুক নিয়ে তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছি। ভুল করার কোন অপশন নেই তোমার।
আর হ্যাঁ, ডক্টর মুখার্জী প্লীজ এক্সকিউজ মী ফ্রম ইয়োর ব্রিটিশ শেখানোর অভ্যাস অনুযায়ী স্যার বলা টু মী। নো স্যার। জাস্ট ডক্টর স্টাইন।
মনে থাকবে স্যার।


