পায়ের পেইন পেরিয়ে

inflamed ankles and medication close up

পায়ের ব্যথা। প্রায় প্রতিটি মাঝবয়সী মেয়ে জীবনের কোন না কোন সময়ে পায়ের ব্যথায় ভোগে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে ব্যথাটা বারোমেসে হয়ে দাঁড়ায়।  

পায়ের কোথায় ব্যথা? সে বিভিন্ন জায়গায় হতে পারে। কোমরের নীচ থেকে, ঊরূসন্ধি থেকে, হাঁটু হয়ে, নিচের পায়ের পেশী, গোড়ালি হয়ে পায়ের পাতা পর্যন্ত। তবে গোড়ালি আর পায়ের পাতার ব্যথায় ভোগে ভাল সংখ্যক মহিলা আর সবচেয়ে মুশকিল ব্যাপার হয় এই ব্যথাগুলির কোন নির্দিষ্ট নিরাময় নেই। অনেকেই লাগাতার ব্যথা কমাবার ওষুধ কিনে কিনে খেতে থাকেন। পরিণাম? ব্যথার হাত থেকে আরাম পেতে গিয়ে অনেক সময়ে কিডনি, লিভার বা হার্টের মতন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলি বিকল হতে শুরু করে ব্যথার ওষুধের প্রকোপে।

এটা জেনে রাখা খুব জরুরি যে হাঁটুর তলা থেকে পায়ের পাতার যাবতীয় ব্যথার জন্য আমাদের অনেক ভুল অভ্যাস বা কুঅভ্যাস দায়ী। এবং এটাও জানা জরুরি যে এই ব্যথাগুলি থেকে সম্পূর্ণ আরাম না মিললেও, ব্যথাকে বাগে রাখার জন্য কিছু কিছু প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে চললে উপকার পাওয়া যায়।

পায়ের যে কোন প্রকারের ব্যথায় মহিলারা বেশি কষ্ট পান তার কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে। গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন হরমোনের ক্রিয়া প্রক্রিয়ার ফলে পায়ের পেশি, গ্রন্থি, নানান টিস্যু কমজোরি হয়ে পড়ে। ফলে পায়ের ব্যথা দেখা দিতে পারে আরেকটু বয়স বাড়লেই। মেয়েদের শরীরের ইস্ট্রোজেন হরমোন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এবং বিশেষ করে মেনোপজের দিনগুলিতে পায়ের পেশি, লিগামেন্ট এবং অন্যান্য টিস্যুর শিথিলতা বাড়িয়ে কমজোরি করে দেয়। মেনোপজের পরে মেয়েদের অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হলে পায়ের হাড় পাতলা হতে শুরু করে, তখন দেহের ভার রাখতে ব্যথা যন্ত্রণা শুরু হতে পারে। চওড়া এবং ভারী নিতম্বের জন্য শরীরের Q-angle বৃদ্ধি পাবার দরুণ পায়ের ব্যথা যন্ত্রণা দেখা দিতে পারে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েদের মধ্যে স্থূলতার প্রবণতা বাড়ে এবং এটিও পায়ের ব্যথার অন্যতম কারণ। আবার পায়ের গোড়ালির পিছনের হাড় বাড়ে অনেক মহিলার। শারীরিক গঠনগত ভাবেও মেয়েদের পায়ের গ্রন্থিগুলোর স্থিতিশীলতা কম থাকে ফলে খুব অল্পেই পা মচকে যাবার মতন দূর্ঘটনা ঘটে। আর জীবনচর্যার কিছু বেঠিক অভ্যাস এই সমস্ত সমস্যাকে জটিলতর করে দেয়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ বা রান্না করা, ছুটোছুটি করে কাজ করা এবং অল্প বয়স থেকে টাইট বা হাই হিল জুতো পরার অভ্যাস পায়ের ওপরে প্রকৃতি বিরুদ্ধ অত্যাচার করে পা-কে কমজোরি, অপোক্ত করে দেয়।

পায়ের পাতার গঠনগত ত্রুটির জন্য পায়ের ব্যথা হতে পারে। আমাদের স্বাভাবিক হাঁটাচলার
মেকানিক্সটাই যদি বদলে যায়, তার থেকে পায়ের পাতা, গোড়ালি বা নিচের পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়বে। পায়ের পাতার আকার দু রকম হতে পারে।      

ফ্ল্যাট ফুট হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পায়ের ভেতরের খিলান বা আর্চ থাকে না বা আর্চ ভেঙে যায় এবং পুরো পায়ের পাতাদুটো মাটিতে সমানভাবে লেগে থাকে। জন্মগত ত্রুটি হোক বা অর্জিত সমস্যা, ফ্ল্যাট ফুট সাধারণত পায়ের যন্ত্রণার একটা প্রধান কারণ। শরীরের ওজন বা বয়স বাড়ার সঙ্গে তাল রেখে ব্যথা যন্ত্রণাও বাড়তে থাকে। ফ্ল্যাট ফুট এর আরেকটা বিপদ হল এক্ষেত্রে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতেও সমস্যা হতে পারে এবং এর ফলে উলটে পড়ার প্রবণতা বাড়ে।  ফ্ল্যাট ফুট এর কারণে অসহ্য পায়ের ব্যথার পরিত্রাণের জন্য সাধারণত বিশেষ খিলানযুক্ত জুতো, ব্যায়াম আর বরফের সেঁক দিয়েই আরাম খুঁজতে হয়। প্রাপ্ত বয়সে যাদের ফ্ল্যাট ফুট ধরা পড়ে তাদের খালি পায়ে হাঁটাচলা করা একেবারেই চলবে না এবং জুতোর সোল হতে হবে নরম, কুশনযুক্ত এবং আর্চ দেওয়া। এতে কৃত্রিম ভাবে হলেও পায়ের স্বাভাবিক খিলান তৈরি হবে। তবে এগুলি সাময়িক উপশমের জন্য ভাল। সমস্যার প্রতিকার যদি করতে হয় তাহলে পায়ের ছোট ছোট হাড়, পেশি, গ্রন্থি কাজে লাগিয়ে ব্যায়াম করতে হবে নিয়মিত। পরিণত বয়সেও ব্যায়াম শুরু করলে উপকার হয়, শিশু বয়স থেকে সমস্যা ধরা পড়লে ব্যায়ামের মাধ্যমে তা পুরোপুরি নিরাময় হয়ে যায়।

বিপরীত দিকে যাদের পায়ের খিলান অতিরিক্ত উঁচু তারাও অসমান ভার বিন্যাসের কারণে পায়ের ব্যথায় কষ্ট পান। তাদের পায়ের পাতার নমনীয়তা কম থাকার দরুণ পায়ের সামনে আঙুলের নীচের দিকে আর পেছনের গোড়ালির তলায় অসহ্য ব্যথা হতে পারে, চামড়া শক্ত হয়ে কড়া পড়তে পারে। এমনকি অতিরিক্ত চাপে ছোট হাড়ে চিড় ধরাও অসম্ভব নয়। দেহের ভারসাম্য রক্ষাতেও সমস্যা হয়। পায়ের পাতার ব্যথা ওপরের দিকে উঠে কোমর অব্দি ছড়িয়ে যেতে পারে। এই ত্রুটির ক্ষেত্রেও পায়ের পাতার এবং অন্যান্য ব্যায়াম দীর্ঘস্থায়ী উপশমের উপায় হতে পারে। তার সঙ্গে উপযুক্ত জুতো এবং বিশ্রাম খুব জরুরি।

গঠনগত বা শারীরিক ত্রুটির জন্য পায়ের সমস্যা আরও অনেক রকমের হতে পারে তবে খুব সাধারণ দুটির আলোচনা হল। এর মধ্যে কোন একটা সমস্যা নিজের আছে জানলেও একবার অস্থি বিশেষজ্ঞ একজনকে দিয়ে পরীক্ষা অবশ্যই করিয়ে নিতে হবে।

নানান আরথ্রাইটিস গোত্রের অসুখে পায়ের পাতা বা পাতা সংলঘ্ন এলাকায় ব্যথা হয়। খুব সাধারণ ভাবে  রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে গাউট অসুখটা বুড়ো আঙ্গুলের গোড়ায় ব্যথা ফোলা দিয়ে শুরু হয়। তীব্র যন্ত্রণা হয় এই রোগে। অনেকের ক্ষেত্রে আবার গোড়ালিতে ব্যথাও হয়। পায়ের পাতা ফুলে গরম আর লালচে হয়ে থাকতে পারে। তাই পায়ের এই সব জায়গায় ব্যথা হলে ডাক্তারের পরামর্শে রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা পরীক্ষা করিয়ে ওষুধ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করতে হবে।  ব্যথা খুব বেশি থাকলে প্রাথমিক ভাবে ইউরিক এসিডের ওষুধের সঙ্গে কিছুদিন ব্যথার ওষুধ খেতে হবে। অতিরিক্ত প্রোটিন যুক্ত খাবার, এলকোহল এড়িয়ে চলতে পারলে গাউট নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব যদিও সম্পূর্ণ নিরাময় প্রায় হয় না, মাঝে মাঝেই জানান দেবে।  

পায়ের পাতায় অষ্টিও আরথ্রাইটিস হয়। এই অসুখ সাধারণত অনেক ধিরে ধিরে বয়সের ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে তাল রেখে বৃদ্ধি পায়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যথায় পেন কিলার, তাছাড়া ফিজিওথেরাপি, ব্যায়াম এবং বিশেষ ধরণের জুতো ব্যবহার করলে শারীরিক অক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি অবস্থায় ডাক্তারবাবুরা প্রয়োজন বুঝে হাড়ের সন্ধিতে স্টেরয়েড ইনজেকশনের পরামর্শ দিতে পারেন।  

একই ভাবে রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস কিংবা পুরনো চোট আঘাত জনিত কারণে পোস্ট ট্রমাটিক আরথ্রাইটিস লক্ষ্য করা যায় পায়ের পাতায়। তবে চিকিৎসা মূলত ফিজিওথেরাপি, ব্যায়াম এবং বিশেষ ধরণের জুতো। কোন নিরাময় নেই। এমনও দেখা গেছে যে পায়ের শুধু বুড়ো আঙুলটাই ব্যথা, ফোলা আর আড়ষ্ট হয়ে গেছে। কখনও জোড়ের কাছে ছোট্ট এক কুচি হাড় বেড়ে গেছে ধরা পড়ে এক্স রে করালে। এই সবই বয়সজনিত কারণে হাড়ের ক্ষয় থেকে হয়ে থাকে। এখানেও নিরাময় বলতে মূলত ফিজিওথেরাপি, ব্যায়াম এবং বিশেষ ধরণের জুতো ছাড়া অতিরিক্ত কষ্টকর ক্ষেত্রে অপারেশন করাতে হতে পারে।

পায়ের পাতায় বিশেষ অসুখগুলি মূলত বয়স এবং দেহের ভার জনিত কারণে হয় সেটা আমরা জেনেছি। আমাদের পায়ের গঠন যথেষ্ট জটিল আবার তাকে এক কাঠামোগত বিস্ময় হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। একটি পাতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারের ২৬ টি করে হাড় থাকে। এবং সেগুলি সাজান থাকে ৩৩ টি জটিল গাঁটে র মাধ্যমে গাঁথা দুটি খিলানের মতন গড়নে, যাকে আমরা পায়ের “আর্চ” বলে থাকি। এই আর্চের ওপরে আমাদের  সম্পূর্ণ শরীরের ওজন চাপানো থাকে। আমাদের সোজাভাবে খাড়া থাকার ভঙ্গিতে শরীরের ওজন সবচেয়ে বেশী পড়ে পায়ের ওপরে । ফলে এই সমস্ত গাঁট বা হাড় বা সংযোগকারী লিগামেন্ট, ছোট ছোট পেশি বা টেন্ডনের কোনটাতে কোন টান বা আঘাত বা প্রদাহ ঘটলেই তার থেকে শুরু হবে ব্যথা যন্ত্রণার কষ্ট।  অসমানভাবে ওজনের বিন্যাস হবার ফলে পায়ের তলার চামড়া মোটা আর স্ফীত হয়, প্রদাহ শুরু হয়। এই অবস্থাগুলি অত্যন্ত কষ্টকর।  Plantar Fasciitis, Bunions, Tendinitis এই জাতীয় সমস্যা । এগুলির স্থায়ী চিকিৎসা সেভাবে নেই, অন্তত ওষুধ খেয়ে প্রতিকার হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ছোট বড় অস্ত্রপ্রচার লাগতে পারে। তবে প্রতিটা ক্ষেত্রেই ব্যথা কমাবার জন্য RICE Treatment (Rest, Ice, Compression, Elevation)  এর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। ব্যথার কিছুটা উপশম হলে পায়ের পেশির সঠিক ব্যায়াম, উপযুক্ত জুতো, শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং কাজ কর্মের ভুল পদ্ধতির দিকে নজর দিতে হবে।

সব আলোচনার শেষে আরেকবার জোর দিতে চাই পায়ের ছোট ছোট পেশী আর গ্রন্থিদের সবল সতেজ রাখার জন্য ব্যায়ামের ওপরে। Foot gymnastics আর কিছুই নয়, পায়ের বিভিন্ন অংশের পেশি এবং অন্যান্য প্রতিপোষক টিস্যুকে মজবুত করার ব্যায়াম। আমাদের অলস শহুরে জীবন, আমাদের বিভিন্ন বদ অভ্যাস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে তার ছাপ ফেলতে থাকে। অল্প বয়সের স্বাভাবিক শক্তি আর হরমোন ভারসাম্য যখন কমে আসে তখন দেহের আত্মবিশ্বাসেও চিড় ধরে। সব থেকে নড়বড়ে অবস্থা হয় পা দুখানির—আমাদের প্রধান বল ভরসার জায়গাতে। যাইহোক, Foot gymnastics কিন্তু ছেলেবেলায় আমরা না জেনেই করে ফেলেছি অনেক। আজকালকার বাচ্চারা সে সুযোগ পায় না। আমরা খালি পায়ে মাঠে ঘাটে উঁচু নিচু জমি মাড়িয়ে, নুড়ি পাথর কাঁকড় পেরিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি। ফলে বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করতে করতে পায়ের হাড়, গ্রন্থি আর লিগামেন্টের অনেক ব্যায়াম হয়েছে। এখনকার বাচ্চাদের সবসময় পায়ে জুতো ফলে মাটির সঙ্গে যোগ নেই। আবার জুতো স্টাইলের হলে তা অরিরিক্ত এবং অসমান চাপ দিতে পারে যা বিজ্ঞান সম্মত নয়। হাই হিল জুতোর ক্ষতিকারক দিকগুলি নতুন করে আলোচনার কিছু নেই।  

ফলে পায়ের ব্যথাকে পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হলে আর ব্যথায় কাতর হয়ে অপেক্ষা করা চলবে না। মনে রাখতে হবে better late than never. সাময়িক ওষুধ খেয়ে ব্যথার নিরাময় হলে ফিজিওথেরাপিস্ট এর পরামর্শে কিংবা You Tube দেখে পায়ের প্রয়োজনীয় ব্যায়ামগুলি শুরু করা যেতে পারে। তাতে শুধু আরাম মিলবে তাই নয়, অযথা অপারেশন এড়াতে পারা বা অন্তত বিলম্বিত করা যেতে পারে।

আর বাচ্চাদের খালি পায়ে ঘুরে বেড়াতে দিতে হবে। অন্তত জুতোর বদলে চপ্পল অনেক ভাল। চপ্পল পরে চলাফেরা করতে শিখলে পায়ের পাতার গ্রিপ আর আর্চ অনেক ভাল হয় এটা গবেষণা করেও দেখা গেছে। যত স্বাভাবিক ভাবে, প্রাকৃতিক আবহে বড় হতে পারবে ভবিষ্যৎ তত সুস্থ হবে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top