এখনকার দিনগুলো
এক কোলিগের নেপালে ব্যবসা, মাঝেমাঝেই যেতে হয়। কাঠমাণ্ডুতে বাড়িও আছে। আমার নেপাল যাওয়ার ইচ্ছা শুনে প্রস্তাব দিলেন কোনো এক ছুটিতে বেড়িয়ে পড়ার। আমি সঙ্গেই সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলাম। তবে শর্ত একটাই, আমার ঘুরে বেড়ানো এবং বাড়িতে আসার ব্যাপারে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা চলবে না। ভদ্রলোক হেসে বললেন যে আমাকে উনি কিছুটা চিনেছেন, কানাঘুষোও কিছু কানে এসেছে, আমার কবিতার বইয়ের কথাও তিনি জানেন, অতএব নেপালে আমি চাইলে নেপালিদের মতো করেই ঘুরে বেড়াতে পারি। উনি সে ব্যবস্হাও করে দেবেন।
আমার যাওয়ার ইচ্ছা পশুপতিনাথ মন্দির হয়ে কিছু প্রাচীন তান্ত্রিক মঠের সন্ধানে। তন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন অপতান্ত্রিকদের কারণে সবার মধ্যেই একটা ভীতি আছে, কিন্তু তন্ত্র মূলত অশেষ কল্যাণপ্রদ, মোক্ষদায়িনী। তনুকে ত্রাণ করেন যিনি, তিনিই তন্ত্র।
একটা সময় বহু সাধুসঙ্গ করেছি, কিছু লুপ্ত বিদ্যাও সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখানে কোনো লুপ্ত বিদ্যার খোঁজে যাওয়ার ইচ্ছা নেই, ভক্তিলাভের পথে যদি সামান্য অগ্রসর হতে পারি, এবং কোনো মহাত্মার দর্শন লাভ হয়, সেই কারণেই যাওয়া। আর হিমালয় বহু সাধকের আবাসস্হল। প্রথম যখন হিমালয়কে দেখেছিলাম, তখন দূর থেকেই সেইসব সাধক এবং নগাধিরাজের প্রতি প্রণাম করেছিলাম।
সামনে পুজোর ছুটি, বেনারসেরও একটা প্ল্যান আছে, বেনারসে যখন ছিলাম দু’বেলাই পান খেতাম আর ঘুরে বেড়াতাম, এবং সকাল সন্ধ্যা রাবড়ি খেয়ে বেড়াতাম। এখন দেখি, জীবন যেদিকে নিয়ে যায়!
আপাতত স্কুল শেষ হলে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে, কারণ সকলেই আমার হুট করে এদিকে সেদিকে চলে যাওয়াটা লক্ষ্য করে চোখে চোখে রাখতে শুরু করেছে, কিন্তু অত সহজে অ. রা. চৌকে আটকানো যায় না, সে আজন্ম পলাতক।
স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা ওষুধের দোকানে থেমে একদিন আড্ডা হচ্ছিল। সঙ্গে আরেক মাস্টারমশাইও ছিলেন, শুনলাম এখানে নাকি ডাইনি আছে। তারা ডাইনিদের নিয়ম অনুযায়ীই বিশেষ বিশেষ রাতে নির্বস্ত্র হয়ে ডাকিনীবিদ্যা চর্চা করে, তাদের বাণ মারা অব্যর্থ, এবং একটা বিশাল গাছের নীচে দুর্গাপুজোর সময় এক রাতে তাদের জমায়েত হয়। এখানকার লোকজন তাদের বেশ সমীহ করেই চলে। আপাতত ওই গাছটার দিকে যাওয়াই আমার লক্ষ্য, এবং সেই বিশেষ রাতটার অপেক্ষায় আছি।
ডাইনি ব্যাপারটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাম্য রাজনীতির নোংরা অত্যাচার। তবে ব্ল্যাক ম্যাজিক আছে, এবং তাতে কাজ হয় সেটা আমি দেখেছি এবং মানি। ইশিতা রায় চৌধুরী ( ইপ্সিতাও হতে পারে, বহুদিন আগের কথা, মনে নেই ) ছিলেন বিখ্যাত এক ডাইনি, এলিট ক্লাসে মেলামেশা ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর বন্ধু ছিলেন। তাঁকে নিয়ে নব্বইয়ের দশকে সানন্দা একটা প্রতিবেদন বার করেছিল, অপর্ণা সেন তখন সম্পাদিকা। আবার ছোটোনাগপুর অঞ্চলে রাতে এক ট্রাক ড্রাইভারের পাশে বসে ওইরকম আকাশের পোশাকের ডাইনিও দেখেছি। এদের দেখলে কিভাবে নিস্তেজ করে দিতে হয় সেটাও একজন শিখিয়েছিল, কাজেই আমি এসব নিয়ে ভাবি না। আপাতত একটা অভিজ্ঞতা লাভই এর উদ্দেশ্য। আর কে বলতে পারে? দেখা গেল সত্যিকারের কোনো ডাইনির সঙ্গে গলায় গলায় বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এই উপমহাদেশের ডাইনিরা ঝাঁটায় করে না, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় পড়েছি আকাশপথে গাছ উড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়। যদি একবার এই বিদ্যাটা কোনোরকমে শিখে নিতে পারি, তাহলে পোয়া বারো। বিকেলে টি.এস. সি তে আসিফ মিয়া আর জামানের সঙ্গে আড্ডা মেরে, রাতে লীনার বাড়ি মাটন খেয়ে ফিরে আসা যাবে।
( ক্রমশ )
আগের পর্বঃ মুজঃফরপুরের দিনগুলো ( পর্ব ১১ )




সুন্দর