পাপ- পর্ব ৭

woman in saree with visitors in background

“এদিকে নয়, এদিকে নয় গো হুই কোনে রাখ দেখি, আবার মন্ডা মেঠাই আনা ক্যানো বাপু! আকাচা পথের কাপড়ে আনা ও জিনিস কেউ ছুঁয়ে দেখবে নাকি? রেখে দেও, ঝিনু নে যাবে খন। নতুন বো – র বাপের ঘরে আচার বিচেরের বালাই নেই বুজি?”

কথা গুলো যিনি বললেন তিনি সম্ভবত এই বাড়ির কাজের বউ, সস্তা ডুরে শাড়ির আধ হাত ঘোমটা মাথায় দিয়ে খরখর করে কথা গুলো বর্ষণ করলো দুজন হা ক্লান্ত মানুষের ওপর । এ বাড়িতে কি আর কেউ নেই? 
গরদের থানের ঘোমটা একটু পেছনে ঠেলে ঈষৎ কঠিন গলায় বললাম — “তুমি কে গো বউ? এ বাড়িতে কাজ কর? বাড়ির আর সব কোথায়? আমাকে নিশ্চই চেন না আগে তো কখনো দেখ নি, আমি এ বাড়ির সেজ বউ।”
আমার গলায় বিনি ভর করেছিল কিনা জানি না, তবে চিরকাল নরম সুরে কথা বলা আমি প্রথমবার শ্বশুর ঘর করতে এসে এভাবে গরম মেজাজে কথা বলব সেটা ভাবিনি। মেজদাদাও নিশ্চই খুব চমকে ছিল ।
এদের কাজের মেয়েটাও বোধহয় ভাবতে পারেনি যে ওর ধৃষ্টতার এমন কঠোর উত্তর কখনো শ্বশুর ঘর করতে না আসা বাল্য বিধবা বউয়ের থেকে পাবে। আমি কিন্তু এখানেই থামলাম না , কড়া গলায় বললাম — “মিষ্টির হাঁড়িটা আঁশ হেঁশেলে রেখে দাও মেয়ে। কুটুম বাড়িতে কেউ খালি হাতে আসে নাকি? এমন ধারা কাণ্ড কোন কালে কখনো দেখেছো? কোথায় হাত পা ধোব দেখিয়ে দাও, বাইরে থেকে এসে মানুষ হাত পা ধোবে তো নাকি?”

রূপের জয় সর্বত্র , তার সঙ্গে যদি ব্যক্তিত্ব যোগ হয় সে রূপের ধার আরও বৃদ্ধি পায়। আর ধারালো জিনিসকে ভয় পেতে হয়। এই মহিলার উঁচু গলা নিমেষে নিচু হয়ে গেল, মিষ্টির হাঁড়িটা হাতে নিয়ে নিচু স্বরে গজ গজ করতে করতে এগিয়ে গেল। আমরাও ওর পিছু পিছু এগোলাম। পর পর কয়েকটা ঘর আর বারান্দা পার হয়ে বিরাট উঠোন , উঠোনের প্রান্তে পাশাপাশি দুটো ঘর । সেগুলো সম্ভবত আঁশ আর নিরামিষ হেঁসেল । বউটা আঙ্গুল তুলে এক দিকে দেখিয়ে দিয়ে বলল –“হুই যে টিউকল আর হুই যে ছান ঘর,জল ভরাই আছে।”
টিউকল? গাঁয়ে থাকতে নাম শুনছিলাম বটে আগে দেখিনি কখনো। 
মেজদাদা এদিক ওদিক নানা কাজে যায় অনেক কিছু জানে, ও গিয়ে সেটার হাতল মতো জিনিসটা চেপে নিচু করতেই লোহার নলের মতো মুখ দিয়ে হড়হড় করে জল পড়তে লাগলো। বুঝলাম আমাকে শেখানোর জন্যই ও এটা করলো। টিউকল চালানোর শব্দে ঝি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো — “ও নতুন বউ দাদাবাবুকে বলুন ছান ঘরে জল তোলাই আছে।”

a moment of respect and care

চান করে পরিষ্কার হলে বউটা আমাকে শাশুড়ির ঘরে নিয়ে গেল । একটা কালো চকচকে উঁচু পালঙ্কে ফর্সা থান পরে তিনি জেগে শুয়ে ছিলেন। এক জন অল্প বয়স্কা বিধবা তাঁকে আধবসা করে দিল কয়েকটা বালিশ উঁচু করে। আমি পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করতে তিনি ভ্রু কুঁচকে চেয়ে দেখলেন, বাঁকা আঙ্গুল গুলো মাথায় দিতে চাইলেন বোধহয়, ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন — “ও কঙ্কা ওকে জল খেতে দিয়েছিস?”
— “এই বার দেব মাসিমা। ও নতুন বউ চল আমার সঙ্গে দুটো মুখে দেবে।”

দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার কারণে বেশ খিদে লেগেছিল। কিন্তু খিদেকে কিল মেরে চুপ করিয়ে রাখার অভ্যেস ছোট বেলা থেকে তৈরি হয়েছে।
আমি ইতস্তত করে বললাম — “আমার মেজ দাদা …”
— “ওঁর জন্য চিন্তা করতে হবে না। তেনার জন্যি লুচি ভাজা হচ্ছে।”

আমার ছোট তোরঙ্গটা ওদের দেখানো একটা ঘরে রেখে দিয়েছিলাম । দুধ কলা আর সাবু দিয়ে ফলার করার পর মেজদাদার ধুতি আর ফতুয়া বের করে দিতে গেলাম। আগের ঝি আমাকে বসার ঘরে নিয়ে গেল। মেজদাদা গল্প করছিলেন এক জনের সঙ্গে , আমাদের সাড়া পেয়ে তিনি মুখ ফেরালেন। নতুন বউ যে ইতিহাস বই দেখিয়েছিল তাতে এক বিদেশি বীরের ছবি ছিল — টিকালো নাক , মাথা ভরা কোঁকড়া চুল চওড়া কপাল । ইনি প্রায় সেই রকমই দেখতে শুধু ধুতি আর হাতা গোটানো জামা পরা । তিনিও আমার দিকে অপলকে চেয়ে রইলেন। 

মেজদা বললেন, “পুঁটি আমি শৈলেন বাবুর সঙ্গে কথা বলছিলাম, ইনি তোর স দেওর হন।”
আমি ভেবেছিলাম মেজদা ওই ঘরে একাই বসে আছে। ওই ভদ্রলোককে আশা করিনি।
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মাথায় ভালো করে কাপড় টেনে দিলাম। 

তিনি ঈষৎ হেসে দু হাত জোড় করে নমস্কার করলেন, আমি এসব আদব কায়দায় অভ্যস্ত না হওয়ায় চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকলাম । 

আমার এ বাড়িতে আসা বেশ কিছুদিন হল। লোকে বলে শ্বশুরবাড়ি হল মেয়েদের নিজের জায়গা, শক্ত ঘাঁটি। বিয়ের পর এখানে দোলায় আসে আর চালায় বের হয়। কথাটা কতটা অন্তঃসারশূন্য ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। কিন্তু আমার দমলে চলবে না, বাপের ঘর যত সহজে ঘাড় থেকে নামিয়ে দিল এখানেও তেমন হলে মাথার ওপর থেকে ছাদ চিরতরে হারিয়ে যাবে। পথে দাঁড়াতে হবে। একমাত্র উপায় হল সংসারে অপরিহার্য হয়ে ওঠা, কিন্তু সেটা কখনোই কায়িক শ্রমে হবে না । 
সেবা যত্ন ভুলে যেতে মানুষ সময় নেয় না, ভালো ব্যবহারে মন জয় করা যায় কিন্তু নরম কাদার ভিত নড়বড়ে হয়, যখন তখন ধসে পড়তে পারে। 
এদের ছোট্ট সংসারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে হলে ওই শয্যাশায়ী মানুষটার বিশ্বাস অর্জন খুব দরকার । আর বাড়ির একমাত্র পুরুষ মানুষটির সম্মান আদায় করে নিতে হবে।

খুব পাতলা ধপধপে সাদা পেয়ালা গুলোর ধারে ঢেউ খেলানো , তার ওপর সরু সোনালী রঙ টেনে দেওয়া। পিরিচের ধারেও তেমনি সোনালী রঙ। দিন পাঁচেক আগে আদালত থেকে ফেরার পথে কোথা থেকে যেন ওগুলো নিয়ে শৈলেন বাবু বাড়ি ফিরলেন। বড় খয়েরি রঙের বাক্স দুহাতে ধরে তাঁর পেছন পেছন একটা মুটে ঘরে ঢুকলো। খুব যত্ন করে জিনিসটা বারান্দায় নামিয়ে রেখে দুটো পয়সা মজুরি নিয়ে সে চলে গেল। নিজের ঘর থেকে কাঁচি এনে আষ্টেপৃষ্ঠে আঠা দিয়ে বাঁধা বাক্সটা কেটে ফেললেন। তার ভেতরে কুচো কাগজ ঠেসে ঢোকানো। 

শৈলেন বাবু খুব সৌখিন মানুষ, তাঁর নজরে কোন অগোছালো কিছু পড়লেই ক্ষেপে আগুন হয়ে যান আর মানদাকে ধমক দিতে থাকেন । সেদিন চা দেওয়ার সময় ওর হাত থেকে মেঝের ওপর পড়ে পেয়ালা আর পিরিচ ভেঙে টুকরো হলো আর তিনিও রেগে গিয়ে মানদাকে চা করতে মানা করে দিলেন । এ জিনিসটার চল আমার বাপের বাড়িতেও ছিল, কিন্তু খেত শুধুমাত্র পুরুষ মানুষেরা । ঠিক তাও নয়, বলা যায় বাড়ির তরুণ পুরুষেরা খেত। এ খেলে নাকি নেশা হয়, চোখ থেকে ঘুম পালায়। আঁশ হেঁশেলে চা তৈরি করে চিনে মাটির মোটা মোটা পেয়ালায় বউরা তাদের স্বামীদের খেতে দিত । সঙ্গে দিত মুড়ি, কালে ভদ্রে কেউ শহর থেকে বিস্কুট কিনে নিয়ে যেত। তখন বাড়ির ছেলেপুলেরাও এক আধ খানা খেতে পেত। এই বিস্কুট জিনিসটা আগে কোন বামুন বাড়িতে ঢুকতে পারতো না। এখন সব বাড়িতেই বিস্কুট লজেন ঢোকে। বিস্কুট নাকি নির্দোষ, ময়দা দিয়ে কারখানায় তৈরি হয়। কে জানে বাবা! আমি নিজে কখনো চা না করলেও পদ্ধতিটা জানতাম। জল ফুটিয়ে তার মধ্যে চা পাতা দিয়ে আরও একটু ফুটিয়ে তাতে দুধ আর চিনি মিশিয়ে পেয়ালায় ছেঁকে পাতা গুলো ফেলে দিতে হয় । 

pouring tea in a rustic kitchen

শৈলেন বাবু একদিন কাগজের ঠোঙায় চা পাতা এনে হাতে দিয়ে বললেন, “একটা কথা বলছিলাম আপনি কি চা করতে পারবেন?” 

আমতা আমতা করে বললাম, ” নিজে হাতে করিনি তো কখনো …”

তিনি বললেন, ” আমি শিখিয়ে দেব , কাল একটা নতুন টি সেট কিনে আনবো।” 

তারই ফল স্বরূপ পরদিন আদালত থেকে ফেরার পথে শক্ত কাগজের রঙিন বাক্স নিয়ে এলেন। ওঁর নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমবার চা করে কাপ প্লেট হাতে তুলে দিতে চুমুক দিয়ে দারুন খুশি হয়ে বললেন — “পারফেক্ট!”

শব্দটা আমার অচেনা বুঝেই হেসে বললেন, “একেবারে ঠিক হয়েছে , একে বলে লিকার চা। ভালো চা দুধ চিনি দিয়ে খেতে নেই। আর এই চা এমন ভাবে করতে হবে যাতে কাপের তলাটা পরিষ্কার দেখা যাবে, বুঝলেন? আপনিও খেতে পারেন, দেখবেন চা খেলে শরীর মন ফ্রেস হয়ে যায় … মাথা পরিষ্কার হয়।”

ইংরেজি শব্দ গুলো একটু একটু করে আমার মাথায় গেঁথে যাচ্ছিল। শুধু তাইই নয় আমার প্রাত্যহিক কথাবার্তা এবং চিন্তা ভাবনাতেও সেগুলো জায়গা করতে শুরু করেছিল।

শৈলেন বাবুকে আমি কিছুতেই ‘ঠাকুরপো ‘ বলে সম্বোধন করতে পারছিলাম না। তিনিও আমাকে বৌঠান বা ওই জাতীয় কিছু বলে ডাকতেন না, দরকার পড়লে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট করে কাশতেন। 

আগেই বলেছি আমার ঘরে কবেকার শুকনো ফুলের মালা পরানো একটা ছবি আছে । লালচে হয়ে যাওয়া সেই ছবির মালিকের মুখে শৈলেন বাবুর মুখের আদল খুব স্পষ্ট, তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে আমার জীবন জড়িয়ে গেছে কখনো শেষ না হওয়া এক দুর্ভাগ্যের বাঁধনে। নাহ, সেই মৃত মানুষটার জন্য আমার কোন অনুভূতি নেই , কোন আত্মীয়তা অনুভব করি না।

সেদিন রবিবার, বেলা পড়ে আসছে। হেঁসেলের বারান্দায় শুয়ে মানদা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বাপের বাড়ি থেকেই দুপুরে ঘুমোনোর অভ্যেসটা ছিল না। ঘরে শুয়ে শেষের কবিতা পড়ছিলাম, এই বই গুলো আজকাল উনিই এনে দেন। হটাৎ দরজার কাছে একটু কাশির শব্দ — “এক কাপ চা দিতে পারবেন?”

মনে পড়লো আজ তো রবিবার, উকিল বাবুর ছুটির দিন । আচ্ছা ওঁকে উকিল বাবু বলে ডাকলে কেমন হয়?

এ বাড়িতে এসে অবধি পাড়ার কারোর সঙ্গে পরিচয় হয়নি। সেদিন সন্ধে বেলায় মজুমদার বাড়ি থেকে একজন এলেন। তিনি অপরেশ মজুমদার মশাইয়ের স্ত্রী। শুনলাম পাড়ার মোড়ে তিন তলা বড় বাড়িটা নাকি তাঁদের। বাজারে জামা কাপড়ের বড় বড় তিন খানা দোকান আছে। এছাড়াও অন্য অনেক ব্যবসা আছে। মোড়াটা এগিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু মজুমদার গিন্নি আমার খাটে গিয়ে বসলেন। এতে আমার সত্যিই খুব আপত্তি। ধপধপে সাদা সুজনি পাতা বিছানায় কেউ বসুক এটা আমি সইতে পারি না। কিন্তু মজুমদার গিন্নি পা তুলে আয়েশ করে বসলেন — “এ সংসারের হাল চাল কেমন বুঝছো সেজ বউমা?”

মনে মনে সতর্ক হয়ে উত্তর দিলাম, “সংসারে তো মোটে তিনটে প্রানী , তার মধ্যে একজন বিছানা ধরা। আর এক জন হপ্তার ছয় দিনই দিনভর আপিসে থাকেন। এ সংসারের হালচাল বোঝার আর কী আছে খুড়িমা।”

মজুমদার গিন্নী গালে হাত দিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললেন, “ওমা সেকি গো! তুমি বুঝি কিছুই জানো না? মানদা কঙ্কা তোমাকে কিছ বলেনি বুঝি?” 

রেকাবিতে করে চারটে নাড়ু আর দুটো সন্দেশ তাঁকে দিয়েছিলাম । ওঁর সামনের দাঁত গুলো বোধহয় তেমন কাজের নয় , গালের পাশে নিয়ে নাড়ুকে কব্জা করতে করতে বললেন,” তোমার বড় আর মেজ জা সোয়ামী আর ছেলেপুলে নিয়ে ঘর ছাড়লে কেন জানো না বুঝি?”

নিতান্ত বিব্রত হয়ে বললাম,”এ সংসারে আমি নতুন এসেছি এত কিছু এখনই জানার কী আছে?”

quiet dinner in warm atmosphere

উনি বেশ জমিয়ে রসালাপ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমার কাছে কোন উৎসাহ না পেয়ে এদিক ওদিক দু চারটে কথা বলে বিদেয় হলেন। কঙ্কা বিধবা মানুষ, দুবেলা আমার সঙ্গেই খায়। রাতে আমি চিরকাল দুধ সাবু বা দুধ খই খাই, কঙ্কা রুটি খায়। এ জিনিসটার প্রচলন আমার বাপের বাড়িতে ছিল না। কঙ্কা খেতে খেতে বললো,”মজুমদার বুড়ি বুঝি ছোট কত্তার বউয়ের কথা বললো?”

ক্রমশ

পাপ- পর্ব ৬


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top