পাপ- পর্ব ৫

abandoned hut in a barren landscape

খুব ধীরে পরিবর্তনের হাওয়া গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছিল। তিন্নি আর বিন্নিকে ওদের মামার বাড়ি পাঠানো হল ইস্কুলে পড়াশোনা শেখানোর জন্য। এ নিয়ে বাড়িতে সমালোচনার ঝড় বইলো। মেজ জ্যাঠামশাইকে কেউ তেমন সম্মান করে না তাঁর স্বার্থপরতার জন্য। ছয়-সাত মাস আগে ছোট খুড়িমা তিন ছেলেকে নিয়ে হাঁড়ি আলাদা করলেন। বেশ বোঝা যাচ্ছিল এক অন্নে কেউই থাকতে রাজি নয়। তিন্নি-বিন্নি মেজ জ্যাঠামশায়ের ছোট ছেলের দুই মেয়ে। লেখাপড়া না জানলে এখন ভালো বিয়ে দেওয়া যাবে না—এই কারণ দেখিয়ে সমুদাদা তাদের কলকাতা পাঠিয়ে দিল। মেয়েদের পড়াশোনা করানোর বিপক্ষে যিনি বেশি বলতেন, তিনিই চুপ করে থাকলেন, কারণ তাঁর এই ছেলেও শহরে ভালো চাকরি করে। কিছুদিন পর রাঙাদা তার বউকে নিয়ে গেল পাকাপাকিভাবে। বউটা যেন বেঁচে গেল—তিনবার গর্ভপাতের পর দুই মেয়ে হওয়ায় শাশুড়ি-ননদের কাছে উঠতে-বসতে যে কথা শুনতে হচ্ছিল! এত বড় বাড়িটা ধীরে ধীরে খালি হয়ে আসছিল।

বছর যায়, বছর আসে। গ্রামগঞ্জের থমকে যাওয়া রুদ্ধ বাতাস কখনো অল্প নড়েচড়ে ওঠে। সংসারে নতুন নতুন সদস্য আসে, সঙ্গে আসে হাজারটা সমস্যা আর নিত্য নতুন অশান্তি। সব বোনদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছিল। আমি নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে ছিলাম। তবে খারাপ ছিলাম, তা বলব না। সবার সঙ্গে মৌখিক ভালোবাসার সম্পর্কটুকু ছিল। বিধবা হওয়ার কারণে আঁশ-হেঁশেলে কোনো কাজ থাকত না। কিন্তু নাড়ু, বড়ি, আচার, মোরব্বা—এসব করতে দিন পার হতো। বাপ-মা বেঁচে থাকতে আগে যেটা কখনো হয়নি, ইদানীং তা করতে হচ্ছে। এটাও একটা কাজ বৈকি। এখন আমাকে নিজের থান আর গায়ে দেওয়ার জামা ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতে হয়। আমার খাওয়াতে এখনো টান না পড়লেও, পরাতে টান পড়েছে। শুনছি গোয়ালঘরে যে ঝি কাজ করে, তাকে নাকি ছাড়িয়ে দেওয়া হবে। এত দিন শুনিনি, কিন্তু এখন বলাবলি হচ্ছে ওর কাজ নাকি খুবই অপরিষ্কার। কিন্তু তাকে তাড়ানোর পর কাকে রাখা হবে, সে ব্যাপারে কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করে না। গোয়ালঘরের পাঁচটা গরুর গোবর সংগ্রহ করা, খড়-বিচালি কেটে দেওয়া, গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, সন্ধেবেলায় ধোঁয়া দেওয়া, গুঁটে দেওয়া—এসব কি আমাদের মতো যারা এ বাড়ির আশ্রিত বিধবা তাদের দিয়ে করাতে চায়? কিন্তু আমরা তো এ বাড়িরই সদস্য। একবেলার দুটো অন্নের বিনিময়ে সারা দিন খেটে মরি। জানি না কপালে কী আছে।

বিন্নি আসে দমকা হাওয়ার মতো। বাপের বাড়িতে ও মোটে টিঁকতে পারে না। ভাইয়ের বউদের সঙ্গে ওর নিত্য অশান্তি; সংসারে থাকে অথচ কুটোটি নাড়ে না, তাই কে আর সহ্য করে। কিন্তু ওর মুখের ধার—তার কাছে কেউ দাঁড়াতে পারে না। এখন তো আবার নতুন কায়দা ধরেছে। আমি খুব ভালো করেই বুঝেছি, এটা ওর একটা অস্ত্র। কেউ কিছু বললেই শাপশাপান্ত করে। সর্বক্ষণ যেন ক্রোধের আগুনে জ্বলছে; দুর্দান্ত ভরা যৌবন আর রূপের আগুনেও জ্বলছে।

সেদিন সব কাজ সেরে দুপুরে বিষবৃক্ষ পড়ছিলাম। জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুরে গোটা গ্রাম ঝিমোচ্ছে। খোলা দরজায় বিন্নি এসে দাঁড়ালো। উঁকি দিয়ে বলল, “কী করছিস রে পুঁটি?” ওর মুখ ভর্তি পান। পানের রসে টুসটুস করছে ফোলা-ফোলা ঠোঁট দুটো।

আমি হেসে বললাম, “তুই এখন এই খাঁ-খাঁ রোদে এখানে? আয়, বস।”

ও চোখ নাচিয়ে কুৎসিত ইশারা করে বলল, “কী পড়ছিস লো তুই? রসের কথা আছে ওখানে? রাতের বেলায় মাগী-মরদের রগড় আর সোহাগের কথা লেখা আছে? থাকলে শোনা দেখি।”

বিন্নি আজকাল প্রায়ই এমন সব কথা বলে যা শুনলে বিরক্ত লাগে। অবশ্য পুকুরঘাটে, মেয়েমজলিস—সবখানেই এই সব আদিরসাত্মক আলোচনা হয়। সবার মাঝে এসব কথা উঠলে কখনো চুপ করে থাকি, কখনো বা দলে থাকার খাতিরে মুচকি হাসি। কিন্তু বিন্নি এসব কথা যখন একা আমার সঙ্গে বলে, তখন প্রচণ্ড অস্বস্তি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা কথা শুনতে হয়েছে—মেয়েমানুষের চরিত্র হলো গে সাদা কাপড়ের মতো, খুব সহজেই দাগ লেগে যায়, আর একবার দাগ লাগলে মরলেও ওঠে না। বড় যত্নে নিজেকে পাহারা দিতে হয়, সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। নইলে পাড়ার সিধু জেঠামশাই আর আরও কিছু বয়স্ক আর তরুণদের চোখের লোলুপ ভাষা পড়তে পারি না, এমন তো নয়। এমনকি নিজের বাড়িতেও… সে যাক।

বিন্নি আমার কাছে এসে ঘন হয়ে বসে বলল, “পুঁটি, একটা কথা শোন। আমার সঙ্গে একখানে যাবি?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “পাগল নাকি? এই দুপুর রোদে আমি কোথাও যাব না।”

ও অনুনয় করতে লাগল, “চল না, একটা মজা দেখবি!”
বিন্নি কারও কোনো কথা শোনার মানুষ নয়। আমাকে চৌকি থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে হাত ধরে হিড়হিড় করে নিয়ে চলল। চণ্ডী মণ্ডপ, পুকুরঘাট, ওলাবিবির থান সব পেরিয়ে নদীর ধারে দুলে বাগদি পাড়ার কাছে নিয়ে এল। এখানে একটেরে আধভাঙা কুঁড়েঘর আছে লালতি দুলের। চারপাশ ধুধু করা বালি। কুঁড়েটা যে ঝড়-ঝাপটায় কেন ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে যায় না, সেটাই আশ্চর্য। রোদের হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারে বটে, কিন্তু বৃষ্টি-বাদল বা শীতের হাত থেকে একমাত্র বাসিন্দাকে রক্ষা করার ক্ষমতা তার নেই। লালতি বাপ-মা-মরা বড়ো দুঃখী মেয়ে, তিনকুলে তার কেউ নেই, শুধু সিঁথিতে একচিলতে সিঁদুর আছে। সে সিঁদুরের মালিক অন্য কারও সিঁথি রাঙিয়ে তার সঙ্গেই ঘর বেঁধেছে। এই বিষয়ে বিনির সঙ্গে ওর ভাগ্যের আশ্চর্য মিল। মেয়েটা কয়েক বাড়ি ঝি খেটে পেট চালায় আর পরনের কাপড়টুকু কোনোরকমে জোটায়।

ওর কুঁড়ের কাছেই একটা বড়ো আমগাছ। ডালগুলো নিচ থেকেই শুরু হয়েছে। বিন্নি ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে ফিসফিসিয়ে বলল, “এই গাছটায় ওঠ, পুঁটি, একটা মজার দিশ্য দেখবি!”

আমি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললাম, “দূর পাগল, বড়ো হয়ে গেছি, এখন আর গাছে উঠতে পারি নাকি?”

—“শশশ… চুপ! আস্তে কথা বল! ওঠ না, নিচু ডাল তো, খুব পারবি।”

এতখানি বয়স হল, এখন এসব ছেলেমানুষি কার ভালো লাগে! কিন্তু বিন্নির এক আশ্চর্য জেদ, ও নিজের কথা না মানিয়ে ছাড়ে না। অগত্যা নিচু ডালটায় পা দিয়ে মাটি থেকে পাঁচ-ছয় হাত উঠলাম। মুখ নিচু করে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী আছে গাছে?”

ও রাগ দেখিয়ে বলল, “মরণ আর কী! গাছে আবার কী থাকবে? আর দু-হাত উঠে লালতির ঘরে উঁকি মেরে দেখ না। একটা মজার জিনিস দেখবি।”

ওর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আরও একটা ডালে পা দিয়ে উঠলাম। হ্যাঁ, এবারে ভাঙাচোরা কুঁড়ের ভেতরটা অনেকটাই দৃশ্যমান হল, জ্বলন্ত দুপুরের কড়া রোদ অজস্র ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে কোনো জীর্ণ বেড়া দিয়ে কোনো মতে ঘেরা জায়গাটাকে আলোকিত করে রেখেছে। ভাঙাচোরা চৌকির মতো কোনো শয্যায় দুটো নগ্ন শরীর সম্ভোগে ব্যস্ত। ওপরের শরীরটার পিঠে উপবীত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। শরীরের আদলটাও আমার খুব চেনা। আমার সারা শরীর শিরশির করে উঠল। ক্ষিপ্ত হয়ে প্রায় লাফিয়ে গাছ থেকে নেমে বিনির গালে সপাটে একটা চড় মারলাম—“নোংরা ইতর কোথাকার! ছি, আর কোনো দিন আমার কাছে আসবি না! আমার বাড়িতে এলে ঘাড় ধরে বের করে দেব।”

বিন্নি চট করে আমার মুখে হাত চাপা দিয়ে টেনে দূরে এনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। গনগনে চোখে পুড়িয়ে দিয়ে দিয়ে বলল, “এহ, সতীলক্ষ্মী এসেছেন রে আমার! মাইরি, কত রঙই দেখাবি লো! মরে যাই যাই! তাও যদি না পোভাস মাস্টারের সঙ্গে তোমার পেরেম-পিরিতের গপ্পো না জানতুম! বেশ করেছি, ওসব দেখেছি। রোজই দেখি। আমার কী দোষ লো? কটা মাস সংসার করে লাথি মেরে সে অন্য বিয়ে করল, আমার শরীর শরীর নয়? তুই কী বুঝবি লো ভাতার-খাগী, এসবের সোয়াদ কখনো পেয়েছিস!”

বিন্নি দর্পিত ভঙ্গিতে আমাকে ফেলে একা একা সেই প্রখর রৌদ্রের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে গেল।

নরনারীর শারীরিক মিলনের ব্যাপার যে জানতাম না, তা নয়। কিন্তু কখনো এভাবে চোখে পড়েনি। নিজেকে কেমন যেন অশুচি মনে হচ্ছিল। ফেরার সময় পুকুরে একটা ডুব দিয়ে নিলাম। প্রচণ্ড গরমে যে-কেউ পুকুরে দশ বার ডুব দিলেও বলার কিছু থাকে না। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, এই সময়ে একা কোথায় গিয়েছিলাম, তার একটা গ্রহণযোগ্য উত্তরও তৈরি হল। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছিল, ওই অত ভোরে তাঁর সঙ্গে দু-তিন দিন যে সামান্য কথা হয়েছে, তা বিনি জানলো কী করে? ও জানে মানে… আর ভাবতে পারছি না।

ক্রমশ

পাপ- পর্ব ৪


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top